Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৫ আশ্বিন ১৪২৬, ২০ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী

সত্যালোকের সন্ধানে : মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কবর দেশে জীবিত আছেন

প্রকাশের সময় : ৩ মার্চ, ২০১৬, ১২:০০ এএম

এ, কে, এম, ফজলুর রহমান
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
ফার্সী ভাষার জনৈক মরমী কবি কত সুন্দরই না বলেছেন যে, “দুচিজ আদমিরা কাশাদ জোরে জোর, একে আবেদানা দিগার খাকে গোর”- অর্থাৎ “দুটি বস্তু মানুষকে গভিরভাবে নিজের দিকে টানতে থাকে। এর একটি হলো দানা পানি বা আহার্য ও পানীয় এবং দ্বিতীয়টি হলো কবরের মাটি।” এই টান বা আকর্ষণ সবার জন্য সমান বলেই আম্বিয়া কেরাম (আ.) কবর দেশে গমন করেছেন এবং সেখানে জীবিত অবস্থায় সালাম কালাম ও ইবাদতসহ আনুষ্ঠানাদি পালন করে যাচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে অনুজ প্রতীম মাওলানা মুফতী মোহাম্মদ তাহের মাসউদ স্পষ্টতই উল্লেখ করেছেন যে, রাহমাতুল্লিল আলামীন খাতামুন নাবিয়্যিন মোহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) ও অন্যান্য নবীগণের কবর পার্শ্বে দাঁড়িয়ে কোন ব্যক্তি সালাত- সালাম পড়লে তিনি নিজে তা শ্রবণ করেন ও উত্তরও দিয়ে থাকেন। বহু সহীহ হাদীসে এর প্রমাণ বির্ধত আছে।
যথা- (ক) হযরত আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, কোন ব্যক্তি আমার উপর সালাম প্রেরণ করলে আমার রুহ আল্লাহ ফেরত দেন। (সুনান আবু দাউদ-১/২৮৬)। (খ) হযরত আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) ফরমান, যে ব্যক্তি আমার কবর পার্শ্বে সালাম জানায়, আমি তা শ্রবণ করি। আর যে দূর হতে সালাত-সালাম জানায়, তা আমার নিকট পৌঁছে দেয়া হয়। (কানযুল উম্মাল-১/৪৯২)। (গ) আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তা’য়ালা পৃথিবীতে পরিভ্রমনকারী একদল ফেরেস্তা নিযুক্ত করেছেন, তারা আমার নিকট উম্মাতের সালাম পৌঁছে দিয়ে থাকেন। (সুনানু নসায়ী-১/১৮৯)। (ঘ) আইম্মায়ে কিরাম এ বিষয়ে একমত যে, রাসূল (সা.)-এর কবর জিয়ারত কালে তাঁকে ও তাঁর দুই সাহাবীকেও সালাম করবে। উহার দলিল, হযরত আবু হুরাইরা (রা.) কর্তৃক বার্ণিত আবু দাউদ শরীফের হাদীস। রাসূল (সা.) বলেছেন, যে কোন মুসলিম আমাকে সালাম করলে আল্লাহ আমাতে রুহ ফিরিয়ে দেন, আমি তার সালামের উত্তর দেই। এটি একটি উত্তম হাদীস। (ফাতাওয়ায়ে ইবনে তাইমিয়্যাহ-৪/৩৬১)। এ আলোচনায় ঐ বর্ণনার কোন দখল নেই যা কেউ কেউ বলেন যে, কোন কোন লোক রাসূল (সা.)-এর কবর হতে অথবা অন্য কোন নেককার লোকের কবর হতে সালামের উত্তর শুনেছেন। হযরত সাঈদ ইবনুল মুসায়্যাব (রা.) হাররার ঘটনার দিনগুলোতে কবর হতে আযান শুনেছেন। (ইকতিয়াউস সিরাতিল মুস্তাকিম-৩৭৩)। আর যারা রওজায়ে আতহার হতে দূরে অবস্থান করেন এবং হুবেব রাসূল (সা.)-এর আকর্ষণে দরূদ ও সালাম পাঠ করেন তবে, দূর হতে সালাম ও দরূদ পাঠকারীদের সালাম ফেরেস্তাদের মাধ্যমে হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর খেদমতে পৌঁছে দেয়া হয়। যেহেতু তিনি কবর দেশে জীবিত আছেন সেহেতু সালামের জওয়াব অবশ্যই প্রদান করেন। এতদ সম্পর্কে হাদীস শরীফে বহু প্রমাণ উক্ত হয়েছে। যেমন: (ক) আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.)-এর বর্ণনায় রাসূল (সা.) বলেন, পৃথিবীতে পরিভ্রমণকারী আল্লাহর ফেরেস্তাম-লী আমার উম্মাতের সালাম আমার নিকট পৌঁছে দেয়। (সুনানু নাসায়ী-১/১৮৯) (খ) আওস বিন আওস (রা.) হতে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম হল জুম’আর দিন। ঐ দিনেই আদম (আ.) কে সৃষ্টি করা হয়েছে, ঐ দিনেই তার ওফাত হয়েছে, ঐ দিনেই শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে। সুতরাং ঐ দিনে আমার উপর বেশি করে সালাত ও সালাম পড়। তোমাদের সালাম আমার নিকট উপস্থাপিত হয়। সাহাবীগণ নিবেদন করলেন, আপনার খেদমতে আমাদের সালাম কিরূপে উপস্থাপিত হবে? এমতাবস্থায়, যে আপনি মাটিতে মিশে যাবেন। রাসূল (সা.) ইরশাদ করলেন, আল্লাহ তা’য়ালা মাটির উপর নবীদের দেহ ভক্ষণ হারাম করে রেখেছেন। (সুনানু নাসায়ী-১/২০৪)। (গ) হযরত আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি আমার কবরের পার্শ্বে সালাম, সালাত পড়ে, আমি তা শুনতে পাই। আর যে দূর হতে সালাম জানায়, আমার নিকট তা পৌঁছে দেয়া হয়। (কানযুল উম্মাল- ১/৪৯২)। ইবনু আবি শাইবাহ ও দারু কুতনীর বর্ণনায় তাই বর্ণিত হয়েছে। সে সনদে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও উক্ত বিষয়ে একাধিক সনদ বর্ণিত হাদীস শাহেদ হিসেবে বর্তমান আছে। (ফাতাওয়ায়ে ইবনে তাইমিয়্যাহ-২৭/১১৬)। তাছাড়া একথাও প্রণিধানযোগ্য যে, হুজুর আকরাম (সা.)সহ সকল নবী- রাসূল ওফাতের পর কবরের জগতেও সেরূপ নবী যেরূপ পৃথিবীর জগতে নবী ছিলেন। কেননা নবীর ওফাতের দ্বারা তাঁর নবুওয়াত ও রিসালাত শেষ হয়ে যায় না। এ প্রসঙ্গে- (ক) ইমাম আবু হানিফা (র.) বলেন : হযরত মুহাম্মদ (সা.) এখনো হাকীকী নবী। (মাসালেকুল উলামা-১০)। (খ) তিনি (সা.) ওফাতের পর প্রকৃত অর্থেই স্বীয় নবুওয়াত ও রিসালাতের উপর স্থিতিশীল আছেন। যেমন মুমিন ব্যক্তি মরণের পরও ঈমানের গুণে গুণান্বিত থাকে অর্থাৎ মরণের পরও তাকে মুমিন বলা হয়। নবীর জন্য দেহ ও আত্মার সমষ্টির উপরই নবুওয়াতের গুণ বাকি থাকে। কেননা নবীর দেহ মাটি ভক্ষণ করতে পারে না। নবী (সা.) কবর দেশে স্থায়ীভাবে প্রকৃত অর্থেই রাসূল হিসেবে জীবিত আছেন। কোন প্রকার রূপক অর্থে নয়। (আর রওযাতুল বাহিয়্যাহ-১৫)। বিস্তারিত বিবরণের জন্য দেখা যেতে পারে রাদ্দুল মুহতার-৩/৩৬৬; ত্ববাকাতুশ শাফিয়িয়্যাহ-২৬০-২৯০; আলমিলাল ওয়ান নুহাল- ২/৮৮)। রওজা মোবারকের সামনে আদবের সাথে দাঁড়াতে হবে। একান্ত আন্তরিকতা মহব্বত ও আকর্ষণকে প্রাধান্য দিতে হবে। বস্তুত ; রওজা মুবারকের জিয়ারতকালে রাসূলের মুখম-লের প্রতি মুখ করে দাঁড়ানো উচিৎ। অনুরূপভাবে দুআ ও শাফাআতের দরখাস্তকালেও চেহারার দিকে নিজের মুখ করে দাঁড়ানো উচিৎ। এ প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে যে, (ক) জিয়ারত কালে কবরকে সামনে রেখে তার দিকে মুখ করে দাঁড়াবে। অতঃপর বলবে, ‘আসসালামু আলাই কা আইয়ুহান নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বরকাতুহু’। প্রকাশ থাকে যে, নবী (সা.) কবর মুবারকে কিবলামুখী অবস্থায় ডান পার্শ্ব দেশের উপর শায়িত আছেন। (ফাতহুল কাদীর-২/৩৬৬)। (খ) বরং তাকে সামনে রেখে তাঁর পানে মুখ করে দাঁড়াবে, তাঁর নিকট সুপারিশের আবেদন করবে। আল্লাহ তা’য়ালা তার সুপারিশ গ্রহণ করবেন। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, যদি তারা নিজেদের ওপর জুলুম করে আপনার কাছে আছে ও আল্লাহর দরবারে ইস্তিগফার করে এবং রাসূলও তাদের জন্য ইস্তিগফার করে তবে অবশ্যই আল্লাহপাককে তওবা কবুলকারী দয়ালু পাবে। (আশ শিফা-২/৩৩)। (গ) ইমাম মালেক, আহমাদ প্রমুখ ইমামগণ বলেন; কবর মুবারকের দিক মুখ করে তাকে সালাম করবে। ইমাম শাফেয়ীর শাগরেদ/অনুসারীগণ এটা উল্লেখ করেছেন। (ফাতাওয়ায় ইবনে তাইমিয়্যাহ-২৭/১৭৭)। মনে রাখা দরাকার যে, হুজুর আকরাম (সা.)-এর কবর মুবারক জিয়ারত করা শুধু মুস্তাহাবই নয় বরং উত্তম নেকী ও শ্রেষ্ঠ ইবাদত বটে। এ প্রসঙ্গে জেনে রাখা উচিৎ যে, রওজা শরীফের জিয়ারত, বড় ধরনের ইবাদত, আনুগত্যের উচ্চস্তর, উচ্চ মর্যাদায় সমাসীন হওয়ার পথ। যে ব্যক্তি এ ব্যতিক্রম বিশ্বাস পোষণ করে সে ইসলামের রশি স্বীয় গলদেশ হতে খুলে ফেলেছে, আল্লাহ রাসূল ও নির্ভযোগ্য উলামাদের বিরোধিতা করেছে। (শরহুয যুরকানী আ’লাল মাওহির-১২/১৭৮)। এ জন্য আশকীনে মোস্তফা (সা.) ও মদীনা গমনকারীর উচিৎ সে যেন মদীনা সফরের সময় রওজা মুবারক জিয়ারতের নিয়্যাত করে। ওইখানে উপস্থিত হওয়ার পর অন্যান্য বরকতময় স্থানের জিয়ারতও হয়ে যাবে। এরূপ করার মধ্যে রাসূলের প্রতি অধিক শ্রদ্ধা ও মর্যাদা প্রদর্শিত হয়। হাদীস শরীফে এসেছ- (ক) হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমার (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি অন্য কোন কাজের প্রয়োজন ছাড়া শুধুমাত্র আমার কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে আগমন করল, তার জন্য কিয়ামাতের দিন সুপারিশ করা আমার কর্তব্য হয়ে পড়ল। (মু’জামে কবীর, তিবরানী- ১২/২২৫)। (খ) হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কায় গমন করল অতঃপর আমার মসজিদের অভিলাস রাখলো, তার জন্য দুটি মকবুল হজ্জের সওয়াব লিখিত হবে। সে ফেরদাউসের মসনদে অধিষ্ঠিত হবে। (ওয়াফাউল ওয়াফা-৪/১৩৭৪)। (গ) মুসলমানগণ এ বিষয় একমত যে, রওজা মুবারকের জিয়ারত করা মুস্তাহাব। ইমাম নবভীর বর্ণনা এরূপই। জাহেরীগণ জিয়ারতকে ওয়াজিব মনে করে। সুতরাং রওজা শরীফের জিয়ারত আম-খাস সকলের নিকটই কাম্য। একথাও উল্লেখযোগ্য যে, রওজা মুবারকের জিয়ারতের দ্বারা রাসূলের তা’জীম প্রকাশ পায়, আর রাসূলের তা’জীম প্রদর্শন করা ওয়াজিব। এজন্য কোন কোন আলিম বলেন- জিয়ারেেতর ব্যাপারে নারী-পুরুষের কোন ব্যবধান নেই। (শরহুয যুরকানী- আ’লাল মাওয়াহিব-১২/১৮৩)। (ঘ) কবর মুবারক জিয়ারতের ইচ্ছা পোষণকারীর কবর জিয়ারতের সাথে সাথে মসজিদে নবভী জিয়ারতেরও তাতে নামায আদায়ের নিয়্যাত রাখা উচিৎ। (শরহুয যুকরানী আ’লাল মাওয়হিব-১২/১৮৩-১৮৪)। অসমাপ্ত।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন