Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ এপ্রিল ২০১৭, ১৪ বৈশাখ , ১৪২৪, ২৯ রজব ১৪৩৮ হিজরী।

মিয়ানমার ও তিনটি দেশের দ্বৈত ভূমিকা

| প্রকাশের সময় : ১৯ এপ্রিল, ২০১৭, ১২:০০ এএম

সৈয়দ রশিদ আলম : প্রায় এক মাস আগে জাতিসংঘে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উত্থাপন হয়েছিল চীন ও রাশিয়ার বিরোধিতার কারণে সে প্রস্তাবটি আলোর মুখ আর দেখেনি। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের দ্বারা রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর যে অত্যাচার-নির্যাতন হচ্ছে তার বিরুদ্ধে জাতিসংঘ একটি তদন্ত কমিটি করতে চেয়েছিল। এই কমিটির কাজ হতো মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের মংডুতে গিয়ে যেখানে রোহিঙ্গাদের বসবাস সেখানে তারা রোহিঙ্গাদের উপর কী ধরনের অত্যাচার হয়েছিল তা জানার চেষ্টা চালাতেন। কিন্তু আমাদের দুই বন্ধু দেশ চীন ও রাশিয়ার কারণে প্রস্তাবটি হিমঘরে বন্দি হয়ে গেল। আরেক বন্ধুদেশ ভারত প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোটদানে বিরত ছিল।
বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর অস্ত্র রপ্তানীর দুটি বড় দেশ হচ্ছে চীন ও রাশিয়া। বাংলাদেশের জনগণ এর কাছে দেশদুটি বন্ধুদেশ হিসাবে স্বীকৃত। কিন্তু এই বন্ধু দুটি দেশ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের ষড়যন্ত্রের কথা খুব ভালো করে জানেন। তারা আরো জানেন বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বসবাস করছেন। এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মিয়ানমারের উন্নয়নে ভ‚মিকা থাকলেও তাদের নেই নাগরিক অধিকার, তারা ইচ্ছা করলেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা যেতে পারেন না। একের অধিক সন্তানের পিতা-মাতা হতে পারেন না। সরকারি কোন চাকরিতে তাদের কোন সুযোগ নেই। জাতীয় পাসপোর্ট নেই, জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। সবকিছু জেনেও তারা মিয়ানমারের নিষ্ঠুর শাসকদের বিরুদ্ধে যেন জাতিসংঘ কোন তদন্ত না চালাতে পারে এ কারণেই জাতিসংঘে দেশদুটি মিয়ানমারের স্বপক্ষে ভোট দিয়েছেন। বাংলাদেশের কাছে রাশিয়া আট হাজার কোটি টাকার সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করার চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। অপরদিকে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর জন্য চীন থেকে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশ সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় করছে। বাংলাদেশের জনগণ আশা করেছিলেন চীন ও রাশিয়া বাংলাদেশের বসবাসরত রোহিঙ্গাদের ব্যথা উপলব্ধি করবেন। কিন্তু সেটা হল না। তার কারণ রাশিয়া ও চীন মিয়ানমারের কাছে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করে থাকে।
২০১৬-২০১৭ সালে চীন মিয়ানমারের কাছে দুটি অত্যাধুনিক ফ্রিগেট, চারটি উপক‚ল রক্ষী জাহাজ, বারটি এফ-৭ জঙ্গিবিমান, একশতটি বিমান বিধ্বংশী কামান বিক্রি করেছে। মিয়ানমার যেন নিজেই যুদ্ধজাহাজ তৈরি করতে পারে সে কারণে চীন মিয়ানমারকে কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমারের সেনা গোয়েন্দা সংস্থাকে অতি গোপনীয় তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে। অপরদিকে রাশিয়া মিয়ানমারের কাছে বিশটি মিগ-২৯ জঙ্গিবিমান বিক্রি করেছে। বাংলাদেশের কাছে রাশিয়া মিগ-২৯ জঙ্গিবিমান বিক্রি করলেও মিয়ানমারের কাছে আধুনিক সংস্করণের মিগ-২৯ বিক্রি করেছে। এছাড়া মিয়ানমারের নৌবাহিনীর কাছে রাশিয়ার নানা শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ বিক্রির পরিকল্পনা করছে। অপরদিকে ভারত বাংলাদেশের সাথে সামরিক সহায়তা চুক্তি করতে চাচ্ছে। সেই সাথে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীতে সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীতে পরিণত করতে চাচ্ছে। এক চুক্তির আওতায় ভারত মিয়ানমারের কাছে সাবমেরিন বিধ্বংসী টর্পেডো বিক্রি করবে। আটত্রিশ মিলিয়ন ডলার দিয়ে ভারতের তৈরি শেইনা টর্পেডো মিয়ানমার সংগ্রহ করবে। বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে সাবমেরিন পাওয়ার পর ভারত সেই সাবমেরিনকে ধ্বংস করতে সক্ষম টর্পেডো মিয়ানমারের কাছে বিক্রি করছে। আরেক চুক্তির আওতায় ভারত মিয়ানমার নৌবাহিনীর কাছে সাবমেরিন খুঁজে বের করার জন্য সোনার ও রাডার বিক্রি করছে। মিয়ানমার যেহেতু সাবমেরিন সংগ্রহ করতে পারেনি সে কারণে সাবমেরিন ধ্বংস করতে ও শনাক্ত করতে সক্ষম সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় করছে। আর বিক্রি করছে ভারত। প্রথম থেকে বাংলাদেশর সাবমেরিন ক্রয় করার ব্যাপারে ভারতের আপত্তি ছিল। এখন মিয়ানমার নৌবাহিনীর কাছে ভারতের এই সাবমেরিন ধ্বংস করতে সক্ষম সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশকে চাপের মধ্যে রাখা। উল্লেখিত তিনটি দেশই আমাদের বন্ধুদেশ। কিন্তু তাদের দ্বৈত ভ‚মিকা এটাই বলে দেয় এসব বন্ধু দেশের কথা ও কাজের মধ্যে কোন মিল নেই। তারা মূলত দোকানদার। অর্থাৎ নিজেদের পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে কে বন্ধু আর কে বন্ধু নয় এটা তারা কখনোই বিবেচনায় আনেন না।
ষ লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।