Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২ রবিউস সানী ১৪৪০ হিজরী

গণপরিবহন নিয়ে নাটক

পিছু হটলো বিআরটিএ : ১৫ দিন অভিযান বন্ধ

| প্রকাশের সময় : ২০ এপ্রিল, ২০১৭, ১২:০০ এএম

বিশেষ সংবাদদাতা : শেষ পর্যন্ত প্রভাবশালী মালিকদের কাছে হেরে গেল ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। টানা চারদিন সীমাহীন ভোগান্তির পর অতিরিক্ত ভাড়ার খড়্গ আবার যাত্রীদের কাঁধেই চাপিয়ে দেয়া হলো। রাজধানীর গণপরিবহন নিয়ে এ ক’দিন চলল এক নাটক। শেষে ‘চিটিং’খ্যাত সিটিং সার্ভিসের জয় হলো। আগামী ১৫ দিন আগের মতোই সিটিং সার্ভিস চলবে। এই ১৫ দিন বিআরটিএ-এর ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমও বন্ধ থাকবে। গতকাল বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটির) চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান। এর আগে বিকেলে তেজগাঁও এলেনবাড়ি বিআরটিএ অফিসে বাস মালিক সমিতির সঙ্গে বিআরটিএ কর্মকর্তাদের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
গত ৪ এপ্রিল গণপরিবহনে ‘নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা’ ঠেকাতে রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস বন্ধের ঘোষণা দেন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ। সে অনুযায়ী ১৬ এপ্রিল থেকে সিটিং সার্ভিস বন্ধ হওয়ার কথা থাকলেও কার্যত তা হয়নি। বরং লোকাল বাসে সিটিং ভাড়া আদায় করেছে মালিকপক্ষ। আবার বাস রাস্তায় না নামিয়ে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে রাজধানীবাসীকে চরম দুর্ভোগে ফেলে দেয় বাস মালিকরা। বিআরটিএ-এর চেয়ারম্যান বলেছেন, সিটিং সার্ভিস বন্ধ হওয়ার পর গত কয়েকদিনে সাধারণ মানুষকে যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে, সে কারণেই ১৫ দিনের জন্য সিটিং সার্ভিস চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ গত ৪ এপ্রিল সিটিং সার্ভিস বন্ধ করার ঘোষণা দিলে বাস মালিকরা কোনো প্রতিবাদ করেনি। সে সময় ধরে নেয়া হয়েছিল মালিক সমিতির সিদ্ধান্ত মানে মালিকদেরই সিদ্ধান্ত। এর কোনো ব্যতিক্রম হতে পারে তা সাধারণ মানুষতো দূরে থাক বাস মালিকরাও চিন্তা করেননি। আলাপকালে বেশ কয়েকজন বাস মালিক জানান, মালিক সমিতির সেদিনের সিদ্ধান্তকে মেনে নেয়ার পক্ষেই ছিল সাধারণ মালিকরা। কিন্তু যারা প্রভাবশালী, ক্ষমতাধর তারা বাস রাস্তায় না নামিয়ে মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলে আপোসরফা করতে বাধ্য করল। সব মিলে মালিকদের কাছে হেরে গেল মালিক সমিতি ও সরকার। তার অর্থ কি রাজধানীতে সিটিং নামের চিটিং চলতেই থাকবে। যাত্রীরা কি সারা বছরই অতিরিক্ত ভাড়া গুনবে? এর জবাবে মিরপুর রুটের এক মালিক বলেন, মালিক সমিতির নেতারা যাত্রীদের কল্যাণের দোহাই দিয়ে সিটিং বন্ধ করতে হঠাৎ করেই তৎপর হয়েছে। এর বাইরেও তো অনেক বিষয় আছে। যেগুলোর কারণে ভাড়া বাড়ে। সেগুলো নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা নেই কেন?
সিটিং সার্ভিস বন্ধ হওয়ার কথা ছিল গত রোববার থেকে। কিন্তু ওই দিনই দেখা গেল ঢাকার রাস্তায় বাস নেই। লোকাল দু’একটা বাস নামলেও সেগুলোতে ওঠার মতো অবস্থা ছিল না। তার উপর সেই সব লোকালেও সিটিংয়ের ভাড়া আদায় নিয়ে বাঁধলো বিপত্তি। সেই বিপত্তি থেকে উত্তোরণের জন্য মালিক সমিতির নেতারাও নামলেন মাঠে। সিটিং সার্ভিস বন্ধের দ্বিতীয় দিনে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ দাবি করেন, পরিস্থিতির বেশ উন্নতি হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে এই শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত থাকবে। সিটিং সার্ভিস চালাতে হলে নতুন করে রুট পারমিট নিতে হবে। চতুর্থ দিনে যাত্রীদের সীমাহীন ভোগান্তি ছাপিয়ে সেই সব মালিকদের পক্ষেই সায় এলো। বিআরটিএ-এর চেয়ারম্যান সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দেন, আগামী ১৫ দিন সিটিং সার্ভিস চলবে। বন্ধ থাকবে বিআরটিএ-এর অভিযান। এর প্রতিক্রিয়ায় সাধারণ যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিমানবন্দর এলাকার বাসিন্দা চাকরিজীবী মেহেরুননেছা বলেন, আমি তো গত তিনদিন ধরে একই ভাড়ায় মিরপুর যাচ্ছি। আমি জানি সিটিং বন্ধ হবে না। শেষ পর্যন্ত তাই হলো। এখন আতঙ্কে আছি না জানি কখন ভাড়া বাড়ে। যাত্রীদের অভিযোগ, ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি সিটিং সার্ভিস বন্ধের ঘোষণা দেয়ার পর গত রোববার থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে বচসা-মারামারির ঘটনা ঘটছে বিভিন্ন স্থানে। বিআরটিএর অভিযানের মধ্যে অনেক মালিক রাস্তায় বাসও না নামানোয় সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েছে যাত্রীরা। অথচ দ্বিতীয় দিন বিআরটিএ-এর চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, যারা অভিযানের মধ্যে বাস নামায়নি তাদের তালিকা করা হচ্ছে। ওইসব বাসের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা হবে। একদিন পর বিআরটিএ-এর চেয়ারম্যান পিছু হটে জানিয়েছেন, আগামী ১৫ দিন বিআরটিএ-এর অভিযানও বন্ধ থাকবে।
যাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এতকিছুর মধ্যেই প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ক্ষমতাধর মালিকদের বাস চলেছে সিটিং হিসেবেই। মিরপুর ১২ নম্বর-ফার্মগেট রুটের বিহঙ্গ পরিবহনকে গতকাল বুধবারও দেখা গেছে আগের মতোই সিটিং সার্ভিস চালাতে। একজন যাত্রী বলেন, এ নিয়ে অসন্তোষের কথা জানালে এক বাস কন্ডাক্টর তার মালিকের কোনো নির্দেশনা না পাওয়ার কথা জানিয়ে বলেছেন, ‘আমরা সিটিংÑ এই চলব।’ যাত্রীদের কাছ থেকে ‘সিটিং ভাড়া’ রাখা হলেও পথে পথে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা আগের চেয়ে বেড়েছে বলে জানান মোহাম্মদপুরের রাবেয়া বেগম। তিনি বলেন, সিটিং ভাড়া রাখা হচ্ছে, কিন্তু যাত্রী নিয়েছে লোকালের মতো করে। আগের থেকেও খারাপ অবস্থা। গতকালও বিহঙ্গে লোকাল ভাড়া রাখা হয়েছিল, আজকে থেকে তারা আবার নতুন নিয়ম করেছে। মিরপুর ১২ নম্বর-মতিঝিল রুটে চালু থাকা বাস সার্ভিস বিকল্প অটো, ল্যাম্পস ও হাজী পরিবহনের আগে যেখানে পাঁচ মিনিটে একটি করে বাস আসত, সেখানে এখন আধ ঘণ্টায়ও বাসের দেখা মিলছে না বলে জানান মিরপুরের শিক্ষক হারুন অর রশীদ। ওরা গাড়ি কমিয়ে দিয়েছে। ভাড়া কম রাখলেও ঠাসাঠাসি করে যেতে হচ্ছে। উত্তরা এলাকার এক ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, কথা বললে কি আমার সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? সিটিং সার্ভিস তুলে দেয়ার কী দরকার ছিল? আমি প্রতিদিন উত্তরা থেকে নিউ মার্কেট যাই ৫০ টাকায় সিটিং সার্ভিসে। আমার কাছে টাকার থেকে সময়টা বেশি জরুরি। বরং সিটিংয়ের ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়া হোক যাতে সিটিংয়ের নামে কেউ চিটিং করার সুযোগ না পায়। সিটিং সার্ভিস আবার বহাল হওয়ায় হতাশায় পড়েছেন অনেকেই। যাত্রাবাড়ীর হুমায়ুন কবির বলেন, এরা জয়ী হওয়া মানে সামনে ভয়ঙ্কর দিন অপেক্ষা করছে। এরা তখন খেয়াল খুশি মতো ভাড়া আদায় করবে। বিআরটিএ এবং মালিক সমিতি প্রথম দফায় সিটিং সার্ভিস বন্ধ করতে পারেনি মানে সিটিং নামের চিটিংকারীরা ক্ষমতাধর এটা বুঝতে আর বাকি থাকে না।



 

Show all comments
  • Qudry Sumon ২০ এপ্রিল, ২০১৭, ২:২৮ এএম says : 0
    সিটিং সার্ভিসের নামে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি বন্ধ করা যেমন জরুরি তেমনি লোকাল পরিবহনের নামে নৈরাজ্য বন্ধ করা উচিত।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর