Inqilab Logo

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২০, ১৩ কার্তিক ১৪২৭, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী

পাকিস্তানেও বাঙালি রসনার কদর

| প্রকাশের সময় : ২৬ এপ্রিল, ২০১৭, ১২:০০ এএম


আহমদ আতিক, পাকিস্তান থেকে ফিরে : শুধু বিলেতেই নয়, পাকিস্তানেও রয়েছে বাঙালি রসনার কদর। বন্দরনগরী করাচির ভোজন রসিকরা রসনা পরিতৃপ্ত করতে ছুটে যান বাঙালি মালিকানাধীন এবং বাবুর্চি রয়েছে এমন রেস্টুরেন্টে। স্বাদ নেন বাঙালি রান্নার। সাংস্কৃতিক ও রাজনীতির মূল শহর লাহোরের অন্যতম প্রধান সড়কের নামকরণ করা হয়েছে কিংবদন্তি বাঙালী ‘ফ্লাইং এইস’ মুহাম্মদ মাহমুদ আলম (এম এম আলম)-এর নামে। পাকিস্তানি জাতির জনকের মাজারে এবং মিনার-ই-পাকিস্তানেও রয়েছে বাংলা ভাষার উপস্থিতি। লাহোরের বাদশাহী মসজিদে রয়েছে রাসূল (সা:)-এর বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন।
পাকিস্তানের শহরগুলোতে চলে হাজার হাজার মোটরসাইকেল। সাধারণ মানুষের প্রধান বাহন এগুলো। ১০০ সিসির বেশি কোনো মোটরসাইকেল দেশটিতে চলাচলের অনুমতি নেই। আর এসব মোটরসাইকেল সবই যৌথ উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে তৈরি। ৬০ সিসি থেকে ১০০ সিসির এসব মোটরসাইকেলের দামও খুব সস্তা। বাংলাদেশী টাকায় ২৭ হাজার থেকে শুরু হয়ে ৩৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। সাধারণ মোটরসাইকেল চালকরা লুকিং গøাস ও হেলমেট ব্যবহার করে না। যদিও লাহোর এবং ইসলামাবাদে রাস্তার বিভিন্ন স্থানে মোটরসাইকেল আরোহীদের হেলমেট পরিধান সংক্রান্ত নির্দেশনা রয়েছে। তীব্র গরম থেকে রক্ষার জন্য মোটরসাইকেলগুলো বিশেষ মোটা কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হয়। করাচির স্থানীয় এক মোটরসাইকেল আরোহী জানান, এখানকার পুলিশও ট্রাফিক আইন ভঙ্গের অভিযোগে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনকে থামিয়ে জরিমানা আদায় করে। অনেকের কাছ থেকেই পুলিশ ঘুষও নিয়ে থাকে। তবে তার অঙ্ক ৫০-২০০ রুপির মধ্যে। আমাদের মতো যত্রতত্র চা-পানের ব্যবস্থা পাকিস্তানি শহরগুলোতে নেই। চায়ের দামও অনেক বেশি। রাস্তার পাশের দোকানে দাঁড়িয়ে চা পান করতে গেলেও কাপপ্রতি গুনতে হয় ৩০ থেকে ৪০ রুপি। করাচিতে একটি চায়ের দোকান পাশ কাটিয়ে গেলে আরেকটি  পেতেও ১০-১৫ মিনিট হাঁটতে হয়। তবে লাহোর এবং ইসলামাবাদের মতো শহরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য চা ক্যাফে। এসব ক্যাফেতে এক কাপ চায়ের মূল্য দেড়শ’ থেকে দুইশ’ টাকা হলেও ক্যাফের পরিবেশ এবং অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে দাম খুব কমই মনে হবে।
পাকিস্তানজুড়ে বাস করেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূতরা। ডেইলি আপিল এডিটর শের মো: খাওয়ার জানান, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পাকিস্তানে কয়েক লাখ বাঙালি বসবাস করলেও এখন তাদের সংখ্যা ত্রিশ লাখ ছাড়িয়েছে। এছাড়া স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে অনেক বাংলাদেশীও জীবিকার তাগিদে পাকিস্তানে পাড়ি জমায়। সে হিসেবে বাংলাদেশের বাইরে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মানুষের বাস পাকিস্তানে। এসব বাংলাদেশী এবং তাদের বংশোদ্ভূতরা অধিকাংশই করাচিতে বাস করে। তাদের ৮০ ভাগই মৎসজীবী। কেউ কেউ আবার পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন গার্মেন্টস এবং টাওয়েল ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। তারা অনেকেই স্থানীয়ভাবে বিয়ে-শাদি করে মূল জনপদে মিশে যাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, ১৯৮৪-৮৫ সালের দিকে করাচি থেকে দু’টি বাংলা দৈনিকও বের হতো। বাংলা ভাষার প্রচলন এবং পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কালক্রমে তাদের মাঝ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। বংশোদ্ভূত বাংলাদেশীদের একজন ওয়াজির। তিনি পিটিভির করাচি ব্যুরোর ক্যান্টিন চালান। তিনি জানান, তার বাবা-মা স্বাধীনতার পর পাকিস্তানে রয়ে যান। তারা সব ভাই-বোনও এখানেই বিয়ে করে মূল জনগোষ্ঠীতে মিশে গেছেন। তারা কিছুটা বাংলা বলতে পারলেও তাদের সন্তানরা তাও পারেন না।
শের মো: খাওয়ার আরো জানান, স্থানীয় রাজনীতিতেও ভূমিকা আছে বাঙালিদের। এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সিটি কাউন্সিল ও স্থানীয় নির্বাচনে প্রায় ৪০-৪৫ জন কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। করাচিতে বেঙ্গলি কলোনি, বড় পার্ক ও খাজা শাহাবুদ্দিন পার্ক এলাকায় বাঙালিদের বসবাস বেশি।
জানা যায়, বাংলা বলতে না পারলেও এসব বাঙালি পাকি বাঙালি হিসেবে পরিচিত। এদিকে পাকিস্তানে বাঙালি বাবুর্চিদেরও বেশ সুনাম রয়েছে। অনেকেই সেখানে রেস্টুরেন্টের ব্যবসাও করছেন এবং বিলেতের মতোই বাঙালিদের এসব রেস্টুরেন্টে ভোজনরসিক পাকিস্তানিদের ভিড় লেগে থাকে। স্বাদ নেন বাঙালি রান্নার। তবে বিলেতের মতো এখানে বাংলায় রেস্টুরেন্টগুলোর সাইনবোর্ড নেই।
প্রায় সব পাকিস্তানির কাছেই বাংলাদেশী সঙ্গীত শিল্পী রুনা লায়লা এবং চিত্রনায়িকা শবনম খুবই পরিচিত এবং প্রিয়। মিষ্টি আলুর নাম পাকিস্তানিরা বলে শাকের কান্দি। অনেক অভিজাত রেস্তোরাঁর খাবার মেন্যুতে মিষ্টি আলু সেদ্ধ করে রাখা থাকে।
পাকিস্তানে তেমন বহুতল ভবন না থাকলেও সবচেয়ে উঁচু ভবন নির্মিত হচ্ছে করাচির ক্লিফটন বিচের নিকটস্থ এলাকায়। এর উচ্চতা ৭১ তলা। বিভিন্ন শহরে যান চলাচল সহজসাধ্য করতে অনেক ফ্লাইওভার এবং আন্ডারপাস রয়েছে। দেশটিতে বিদ্যুতের সমস্যা প্রকট। বিভিন্ন শহরে ৫-৮ ঘণ্টার লোডশেডিং হয়। বোতলজাত মিনারেল ওয়াটারের দাম কিছুটা বেশি। হাফ লিটারের বোতল স্থানভেদে ২৪-৪০ টাকা। আর দেড় লিটারের বোতলের দাম ৫৬-৭২ টাকা। প্রায় সব শহরের রাস্তাগুলো সিসি ক্যামেরায় ভরপুর। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং মোড়ে মোড়ে বালুর বস্তা এবং একে-৪৭ ধারী ও মেশিনগানধারী সৈন্য এবং প্রাইভেট সিকিউরিটি চোখে পড়ে। দেশটিতে জ্বালানির দাম বেড়েছে সম্প্রতি। পেট্রল প্রতি লিটার ৫৯ টাকা, অকটেন ও ডিজেল ৬৮ টাকা এবং কেরোসিন ৭১ টাকা।
বিয়ের আয়োজনের জন্য যেসব কমিউিনিটি সেন্টার বা হলরুম রয়েছে এগুলোর ভাড়াও অনেক বেশি। প্রধান শহরগুলোর রাস্তার নিকটস্থ এসব হলের ৩ ঘণ্টার জন্য সবচেয়ে কম ভাড়া বাংলাদেশী আড়াই লাখ টাকা।
লাহোরের মিনার এ পাকিস্তানে পাকিস্তান প্রস্তাব উর্দুর পাশাপাশি বাংলায়ও খচিত রয়েছে। করাচিতে পাকিস্তানি জাতির পিতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মাজারে তার পাশাপাশি ১৯৭১ সালের আগে যেসব পাকিস্তানি নেতা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের কবরও রয়েছে। সেখানেও জিন্নাহর কবরে তার জন্ম এবং মৃত্যুর তারিখ এবং অন্য নেতাদের কবরের এক পাশে বাংলায় তাদের নাম এবং জন্ম-মৃত্যুর তারিখ খচিত রয়েছে।
লাহোর, ইসলামাবাদসহ পাকিস্তানের ৫টি শহরের পরিচ্ছন্নতার কাজ করে তুরস্কের কোম্পানি। ফলে শহরগুলো খুবই সুন্দর। সড়কদ্বীপ এবং অন্যান্য স্থানে প্রচুর ফুলের সমারোহ। খুবই পরিচ্ছন্ন শহর লাহোর। এ শহরের অন্যতম আকর্ষণ গভর্নমেন্ট কলেজ ইউনিভার্সিটি বা জিসি ইউনিভার্সিটি। ১৮৬৪ সালে এ কলেজের যাত্রা শুরু। এ কলেজ থেকেই পাকিস্তানের বিভিন্ন সময়ের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও জাতীয় ক্রিকেট দলের সেরা খেলোয়াড়রা গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। এটি রাজনীতি এবং ধূমপানমুক্ত। শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ছাত্রী। মহাকবি আল্লামা ইকবাল এবং ভারতের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক দেব আনন্দও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।
লাহোরে রয়েছে প্রচুর মূঘল স্থাপনা। মুঘল আমলে তৈরি বাদশাহী মসজিদের জাদুঘরে রয়েছে রাসূল (সা:)-এর চুল, লাঠি, চাদর, পাগড়ি এবং অন্যান্য ব্যবহার্য সামগ্রীসহ ইসলামী ঐতিহ্যের স্মৃতিবিজড়িত বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের স্মৃতিচিহ্ন। কিংবদন্তি বাঙালি ফ্লাইং এইস মুহাম্মদ মাহমুদ আলম (এম এম আলম)-এর নামে লাহোরের অন্যতম প্রধান সড়কের নামকরণ করা হয়েছে। এটি এম এম আলম রোড নামে পরিচিত। এখানে রয়েছে দেশটির সব অভিজাত বিপণি এবং ব্রান্ড শপ। ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্বের সময় আকাশে ওড়ার প্রথম এক মিনিটেই তিনি ভারতের ৫টি জঙ্গিবিমান ঘায়েল করেন। যার মধ্যে ৪টি ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে। এটি একটি বিশ্বরেকর্ড।
পাহাড়ঘেরা রাজধানী ইসলামাবাদ অন্যতম পরিকল্পিত নগরী। রাজধানীতে পাঞ্জাবিদের প্রভাব বেশি। এখানে রয়েছে সুদৃশ্য বাদশাহ ফয়সাল মসজিদ। পাকিস্তানের অন্যতম বড় শপিং মল সেন্টার সেন্টরাস ইসলামাবাদেই অবস্থিত। অভিজাত সব ব্রান্ড শপ রয়েছে এ শপিং সেন্টারে। ইসলামাবাদের পাশের পর্যটক শহর মারী। এখানে পুরো পাকিস্তান থেকে এবং বিদেশী পর্যটকরা ভ্রমণে আসেন। পাহাড়ি এ শহরটির রূপ মোহনীয়। পাহাড়ের ঢালে ঢালে মানুষের বাড়ি-ঘর এবং পর্যটকদের থাকার জন্য রয়েছে কটেজ। মল রোড পর্যটক শহরটির অন্যতম আকর্ষণ। ভাগ্য ভালো হলে মারীতে এসে তুষারপাতও দেখতে পারেন পর্যটকরা। এখানে সবাই বাহারি ধরনের পণ্য এবং বাদাম জাতীয় ফল ক্রয় করে থাকেন। কিন্তু এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের মতো এখানে দালালের কোনো উৎপাত নেই। দামও অনেক সহনীয়। পাকিস্তানের অন্যান্য শহরেও দালালের উৎপাত খুব একটা চোখে পড়ে না। আর পাকিস্তানের সব শহরেই বাংলাদেশী পর্যটকদের কদর করেন স্থানীয়রা। 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: পাকিস্তান

১৯ অক্টোবর, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন