Inqilab Logo

শুক্রবার, ০১ জুলাই ২০২২, ১৭ আষাঢ় ১৪২৯, ০১ যিলহজ ১৪৪৩ হিজরী

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মিরাজ

দিক দর্শন

| প্রকাশের সময় : ২৭ এপ্রিল, ২০১৭, ১২:০০ এএম

অধ্যাপক শাহ মোহাম্মদ আব্দুল মতিন
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
তাফসিরে রুহুল বয়ানে এ প্রশ্নের উত্তর এভাবে দেয়া হয়েছে- ‘জীবিত চারজন নবীকে আল্লাহতায়ালা স্বশরীরে এবং ইনতিকালপ্রাপ্ত আম্বিয়ায়ে কেরামগণকে মেছালী শরীরে বায়তুল মোকাদ্দাছে উপস্থিত করেছিলেন।’ কিন্তু অন্যান্য গ্রন্থে স্বশরীরে উপস্থিতির কথা উল্লেখ আছে। কেননা, নবীগণ অষ্ট অঙ্গ দ্বারা সিজদা করেছিলেন। নবীগণ ও অলীগণ মেছালী শরীর ধারণ করে মুহূর্তের মধ্যে আসমান জমিন ভ্রমণ করতে পারেন এবং জীবিত লোকদের মতোই সব কিছু শুনতে দেখতে পারেন (মিরকাত ও তাইছিল গ্রন্থ)। আধুনিক থিউসোফিতেও (আধ্যাত্মবাদ) এ কথা স্বীকৃত। ফিজিক্যাল বডি, ইথিক্যাল বডি, কস্যাল বডি, এসট্রাল বডি- ইত্যাদি রূপ ধারণ করা একই দেহের পক্ষে সম্ভব এবং বাস্তব বলেও আধুনিক থিউসোফির বিজ্ঞানীগণ স্বীকার করেছেন। আমরা মুসলমান। আল্লাহর কুদরত ও প্রদত্ত ক্ষমতার ওপর আমাদের ঈমান নির্ভরশীল। এ বিষয়ে কবি গোলাম মোস্তফার বিশ্বনবী বইখানায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
মিরাজের দ্বিতীয় পর্যায়
মিরাজের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় বায়তুল মোকাদ্দাছ থেকে এবং শেষ হয় সিদরাতুল মোন্তাহাতে গিয়ে। প্রথম আকাশে গিয়ে জিব্রাইল (আ.) ডাক দিলেন প্রথম আকাশের ভারপ্রাপ্ত ফেরেস্তাকে এবং দরজা খুলে দিতে বললেন। উক্ত ফেরেস্তা পরিচয় নিয়ে হুজুর (সা.)-এর নাম শুনে দরজা খুলে দিলেন। প্রথমেই সাক্ষাৎ হলো হযরত আদম (আ.)-এর সাথে। হুজুর (সা.) তাকে ছালাম দিলেন। কেননা ভ্রমণকারীকেই প্রথমে সালাম দিতে হয়। হযরত আদম (আ.) নবীগণের আদি পিতা। তাই তাকে দিয়েই প্রথম অভ্যর্থনা শুরু করা হলো। হযরত আদম (আ.)-এর নেতৃত্বে অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং প্রথম আকাশের ফেরেস্তারা উক্ত অভ্যর্থনায় যোগদান করেন। এমনিভাবে দ্বিতীয় আকাশে হযরত ঈসা, হযরত যাকারিয়া ও ইয়াহইয়া (আ.) এবং অন্যান্য নবী ও ফেরেস্তারা অভ্যর্থনা জানালেন। হযরত যাকারিয়াও উক্ত অভ্যর্থনায় শরিক ছিলেন। নবী করিম (সা.) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন- ‘যখন আপনাকে করাত দ্বারা দ্বিখন্ডিত করা হচ্ছিল তখন আপনার কেমন অনুভব হয়েছিল? উত্তরে যাকারিয়া (আ.) বললেন- তখন আল্লাহতায়ালা আমাকে ডাক দিয়ে বলেছিলেন- ‘আমি তোমার সাথে আছি। এতদশ্রবণে আমি মউতের কষ্ট ভুলে গিয়েছিলাম’। প্রকৃত আশেকগণের মউতের সময় নবীজীর দিদার নছিব হয়। তাই তাদের মউতের কষ্ট অনুভূত হয় না (আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া ঃ যাকারিয়া অধ্যায়)।
তৃতীয় আকাশে হযরত ইউসুফ (আ.)-এর নেতৃত্বে অন্যান্য নবী ও ফেরেস্তাগণ নবী করিম (সা.)-কে অভ্যর্থনা জানান এবং ছালাম কালাম বিনিময় করেন। চতুর্থ আকাশে হযরত ইদ্রিস (আ.), পঞ্চম আকাশে হযরত হারুন (আ.) ফেরেস্তাগণসহ অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। ৬ষ্ঠ আকাশে হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ হয়। তিনি অভ্যর্থনা জানিয়ে বিদায়কালে আশ্চর্য হয়ে বললেন- ‘এই যুবক নবী শেষকালে এসেও আমার পূর্বে বেহেস্তে যাবেন এবং তার উম্মতগণ আমার উম্মতের পূর্বে বেহেস্তে প্রবেশ করবে’। হযরত মুসা (আ.) নবী করিম (সা.) ও তার উম্মতের বিশেষ মর্যাদা দেখে আনন্দাশ্রæর কান্না কেঁদেছিলেন। যেমন মা সন্তানের কোনো সুসংবাদ শুনতে পেলে আনন্দে কেঁদে ফেলেন। তার এই আফসোস ছিল আনন্দসূচক ও স্বীকৃতিমূলক- বিদ্বেষমূলক নয়, এটাকে ঈর্ষা বলে। গিবতা বা ঈর্ষা করা শরিয়তে জায়েজ- কিন্তু হাছাদ বা হিংসা করা জায়েজ নয় (মিশকাত)।
হযরত মুসা (আ.) সে সময় নবী করিম (সা.)-এর নিকট একটি হাদিসের ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিলেন। হাদিসটি হলো- নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন-
‘আমার উম্মতের যাহেরী-বাতেনী এলেম সম্পন্ন আলেমগণ বনি ইসরাইলের নবীগণের ন্যায় (এলেমের ক্ষেত্রে)। নবী করিম (সা.) উক্ত হাদিসের যথার্থতা প্রমাণের জন্য রুহানী জগৎ থেকে ইমাম গাযালী (র.) কে হযরত মুসা (আ.)-এর সামনে হাজির করালেন। হযরত মুসা (আ.) বললেন- ‘আপনার নাম কি? উত্তরে ইমাম গাযালী (র.) নিজের নাম, পিতার নাম, দাদার নাম, পরদাদার নামসহ ছয় পুরুষের নাম বললেন। হযরত মুছা (আ.) বললেন, আমি শুধু আপনার নাম জিজ্ঞেস করেছি। আপনি এত দীর্ঘ তালিকা পেশ করলেন কেন? ইমাম গাযালী (র.) আদবের সাথে জবাব দিলেন- ‘আড়াই হাজার বৎসর পূর্বে আপনিও তো আল্লাহতায়ালার ছোট্ট একটি প্রশ্নের দীর্ঘ উত্তর দিয়েছিলেন’। ইমাম গাযালীর (র.) এলেম ও প্রজ্ঞা দেখে হযরত মুছা (আ.) মুগ্ধ হয়ে গেলেন এবং হুজুর (সা.)-এর হাদিসখানার তাৎপর্য স্বীকার করে নিলেন। (রুহুল বয়ান তৃতীয় পারা ২৪৮ পৃষ্ঠা)।
এখানে একটি বিষয় তাৎপর্যপূর্ণ। হযরত মুসা (আ.)-এর ইনতিকালের আড়াই হাজার বৎসর পরে মক্কার জমিনে প্রদত্ত হুজুর (সা.)-এর ভাষণ তিনি শুনতে পেয়েছিলেন- আপন রওজা থেকে। অপরদিকে দুনিয়াতে আসার পূর্বে আলমে আরওয়াহ্ থেকে ইমাম গাযালী (র.)-এর মতো একজন বিজ্ঞ অলী আড়াই হাজার বছর পূর্বে তুর পর্বতে ঘটে যাওয়া মুসা (আ.)-এর ঘটনা সম্পর্কেও অবগত ছিলেন। এতে প্রমাণিত হলো- আল্লাহর নবী ও অলিগণকে আল্লাহতায়ালা বাতেনী প্রজ্ঞা দান করেছেন- যাকে নূরে নজর বা ফিরাছাত বলা হয়। আল্লাহর অলিগণ আল্লাহ প্রদত্ত কাশফ দ্বারা অনেক সময় মানুষের মনের গোপন কথাও বলে দিতে পারেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) কুফার এক মসজিদে জনৈক মুসল্লিকে অজু করতে দেখে বলেছিলেন- ‘তুমি জিনা করে এসেছো। লোকটি অবাক হয়ে বলল, আপনি কীভাবে জানলেন? ইমাম আবু হানিফা (র.) বললেন- তোমার অজুর পানির সাথে জিনার গুনাহ্ ঝরে পড়ছিল।’
হাদিসেও অজুর পানির সাথে গুনাহ ঝরে পড়ার কথা উল্লেখ আছে। লোকটি ইমাম সাহেবের বাতেনী এলেম দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল এবং সাথে সাথে ইমাম সাহেবের হাতে তওবা করল। বড়পীর হযরত গাউছুল আযম আবদুল কাদের জিলানী (রহ.) বাহজাতুল আসরার কিতাবে বলেন : ‘দুনিয়ার নেককার ও বদকার- সকলকেই আমার দৃষ্টিতে পেশ করা হয় লওহে মাহফুযে’। লওহে মাহফুযে নেককার- বদকার সকলের তালিকা রয়েছে। হযরত বড়পীড় (রহ.)-এর নযরও দুনিয়া থেকে লওহে মাহফুযে নিবদ্ধ। এ জন্যই মাওলানা জালালুদ্দিন রুমী (র.) মসনবী শরীফে বলেছেন : ‘লওহে মাহফুয অলী-আল্লাহগণের নজরের সামনে।
এ কারণেই তাদের দিব্যদৃষ্টি সমস্ত ত্রæটি থেকে মুক্ত।’
হযরত মুসা (আ.) থেকে বিদায় নিয়ে নবী করিম (সা.), জিব্রাইল (আ.)সহ সপ্তম আকাশে গেলেন। সেখানে হযরত ইব্রাহীম (আ.) ফেরেস্তাগণসহ নবী করিম (সা.)-কে অভ্যর্থনা জানালেন। নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন- ‘আমি হযরত ইব্রাহীম (আ.)-কে একটি কুরছিতে বসে বায়তুল মামুর মসজিদের গায়ে হেলান দিয়ে বসা অবস্থায় দেখতে পেয়েছি’ (রুহুল বয়ান)।
হযরত ইব্রাহীম (আ.) দুনিয়াতে আল্লাহর ঘর কা’বা শরীফ তৈরি করেছিলেন। তার বিনিময়ে আল্লাহতায়ালা তাকে সপ্তাকাশের বাইতুল মামুর মসজিদের মোতাওয়াল্লির সম্মান দান করেছেন। দীর্ঘ এক হাদিসে এসেছে- বাইতুল মামুরে হুজুর (সা.)-এর সাথে নামাজ আদায় করেছিলেন সাদা পোষাকধারী একদল উম্মত, যাদের মধ্যে গাউসুল আযমও ছিলেন। (আ’লা হযরতের ইরফানে শরিয়ত তৃতীয় খন্ড)।
আসমানে ভ্রমণের সময়ই নবী করিম (সা.) বেহেস্ত ও দোজখ প্রত্যক্ষ করেন। পরকালে বিভিন্ন পাপের কি রকম শাস্তি হবে, তার কিছু নমুনা তিনি মেছালী ছুরতে প্রত্যক্ষ করেছেন। সুদ, ঘুষ, অত্যাচার, নামাজ বর্জন, ইয়াতিমের মাল ভক্ষণ, প্রতিবেশীর ওপর জুলুম, স্বামীর অবাধ্যতা, বেপর্দা ও অন্য পুরুষকে নিজের রূপ প্রদর্শন, জিনা, ব্যভিচার ইত্যাদির শাস্তি নবী করিম (সা.) স্বচক্ষে দেখেছেন।
বেহেস্তে হযরত খাদিজা (রা.)-এর জন্য সংরক্ষিত প্রাসাদ, হযরত ওমরের (রা.) প্রাসাদ, হযরত বেলালের (রা.) পাদুকার আওয়াজ- এসব দেখেছেন এবং শুনেছেন। বেহেস্তের চারটি নহরের উৎসস্থল নবী করিম (সা.)-কে দেখানো হয়েছে। বিছমিল্লাহর চারটি শব্দের শেষ চারটি হরফ থেকে চরটি নহর প্রবাহিত হয়ে হাউজে কাউছারে পতিত হতে দেখেছেন। দুধ, পানি, শরবত ও মধু- এই চার প্রকারের পানীয় বেহেস্তবাসীকে পান করানো হবে। যারা ভক্তি ও ঈমানের সাথে প্রত্যেক ভালো কাজ বিছমিল্লাহ বলে শুরু করবে, তাদের জন্য এই নেয়ামত রাখা হয়েছে। (তাফসিরে রুহুল বয়ানে বিছমিল্লাহর ব্যাখ্যায় এর বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে)। সপ্ত আকশে ভ্রমণের পর জিব্রাইল (আ.) খাদেম হিসেবে বা প্রটোকল হিসেবে নবী করিম (সা.)-কে সিদরাতুল মোন্তাহা বা সীমান্তের কুলবৃক্ষের নিকট নিয়ে যান। হাদিসে এসেছে- ‘এ বৃক্ষের পাতা হাতীর কানের মতো বড় এবং ফল ওহোদ পাহাড়ের ন্যায় বড়। শহীদগণের রূহ মোবারক সবুজ পাখির ছুরতে উক্ত বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করছেন।’ নবী করিম (সা.) স্বচক্ষে তা দর্শন করেছেন। সিদরা বৃক্ষ পৃথিবীর সপ্ত তবক নিচ থেকে চৌদ্দ হাজার বছরের রাস্তার উপরে অবস্থিত। সিদরা থেকে আরশের দূরত্ব ছত্রিশ হাজার বছরের রাস্তা। সর্বমোট পঞ্চাশ হাজার বৎসরের দূরত্বে আরশে মোয়াল্লা। (ইবনে আব্বাস)। আরশে মোয়াল্লা থেকেই আল্লাহতায়ালার যাবতীয় নির্দেশ ফেরেস্তাগণের নিকট আসে। হযরত জিব্রাইল (আ.) সিদরাতুল মোন্তাহা থেকেই আল্লাহতায়ালার যাবতীয় নির্দেশ গ্রহণ করে থাকেন। এখানে এসেই জিবরাঈলের গতি শেষ হয়ে যায়। (চলবে)



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন