Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০১৯, ০৪ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৫ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

আখেরাতের প্রথম মঞ্জিল প্রসঙ্গে

সত্যালোকের সন্ধানে

প্রকাশের সময় : ২৭ এপ্রিল, ২০১৭, ১২:০০ এএম | আপডেট : ৯:৫২ পিএম, ২৬ এপ্রিল, ২০১৭

এ. কে. এম. ফজলুর রহমান মুন্্শী
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
কিন্তু এই এলমুল একিন যার অর্জনের জন্য শুধু ঈমান দরকার তা থেকে দুনিয়ার সকল মানুষ বে-খবর থাকে না। তবে অধিকাংশ লোকই এর অস্বীকারকারী। এ জন্য তারা তাদের কাছে সমুপস্থিত দোজখকে এ সময়ে দেখতে পায় না। কিন্তু মৃত্যু, যার আগমন অবশ্যম্ভাবী, যখন তা এসে যাবে, তখন উপদানের এই পর্দা যা চোখের সামনে পড়ে আছে তা উঠে যাবে। তখন আলমে গায়েবের কিছু গোপন ভেদ তার সামনে খুলে যাবে এবং কাজকর্মের সাদৃশ্যাত্মক উদাহরণ ও সওয়াব এবং আজাব, এমনকি জান্নাত ও দোজখের কিছু দৃশ্যাবলী সামনে এসে হাজির হবে। তখন সে নিজের বিশ্বাসের দৃষ্টিতে বহু ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করবে। আল কোরআনে তাই বলা হয়েছে : “তারপর অবশ্যই তোমরা দোজখকে প্রত্যক্ষ দর্শন করবে।” (সূরা তাকাছুর) এটা হবে মৃত্যু-পরবর্তী ঘটনাপুঞ্জ। যাকে আলমে বরযখ বলে। এরপর যখন কিয়ামত এসে উপস্থিত হবে, তখন সকল রহস্য উন্মোচিত হয়ে যাবে। আল কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে : “যেদিন সকল ভেদ খুলে যাবে” তখন বেহেশত এবং দোজখ নিজস্ব আকৃতিতে এভাবে সামনে এসে যাবে যে, তখন দ্বিধা-সন্দেহের বিন্দুমাত্রও অবশিষ্ট থাকবে না। সেদিন হবে প্রকৃত জ্ঞান এবং পরিপূর্ণ বিশ্বাসের মূর্ত প্রকাশ। আল কোরআনে কিয়ামত সংক্রান্ত ঘোষণায় বলা হয়েছে : “এবং যখন শিঙ্গায় ফুঁৎকার করা হবে; তখন হবে ভয় ও ভীতির দিন। সুতরাং আমি তোমার চোখের পর্দা অপসারিত করেছি, তাই আজ তোমার দৃষ্টিশক্তি খুবই প্রখর।” এই পর্দা অপসারিত হতেই সেদিন মানুষের সকল কর্মকান্ড এক এক করে তার সামনে হাজির হবে এবং দোজখ সাধারণ দৃশ্য হয়ে ফুটে উঠবে। আল কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে : “তখনই সেই বৃহৎ হাঙ্গামা এসে যাবে, যেদিন মানুষ যা কিছু করেছে স্মরণ করবে এবং দোজখকে দর্শকদের সামনে সমুপস্থিত করা হবে।” (সূরা নাজিয়াত : রুকু-২) বরযখের অবস্থায় আইনুল একিন একদিকে কবি আবুল আতাহিয়া আশ্চর্য হয়ে কি উত্তমই না বলেছে, “মৃত্যু হচ্ছে একটি দরজা, সকল মানুষ এ দরজাতে প্রবেশ করবে, যদি আমি জানতে পারতাম এই মৃত্যুদরজার পরে কোন গ্রহ রক্ষিত আছে?” সুতরাং এই জ্ঞান যার জন্য কবি আশ্চর্যবোধ করেছে, তা জীবনে শুধু ‘এলমুল ইয়াকিন’-এর দ্বারা অর্জিত হতে পারে। তবে মৃত্যুর সময় যখন সে অপর জগতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়াবে, তাহলে সে উক্ত দরজার দৃশ্য যৎসামান্য দৃশ্য হলেও দর্শন করে বলে, “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আরেকবার পৃথিবীতে প্রেরণ করুন, যেন আমি যে সকল কাজ পরিত্যাগ করেছিলাম, তন্মধ্যে কোনও নেক আমল করতে পারি। না, কখনো না, কথা একটি মাত্রই যা তিনি বলেন, এখন এই গুনাহগারদের পেছনে ঐ দিন পর্যন্ত একটি পর্দা (বরযখ) রয়েছে, যখন তাকে মৃত্যুর বিছানা হতে জাগিয়ে উঠানো হবে।” (সূরা মুমিনুন : রুকু-৬) এ কথা সুস্পষ্ট যে, যদি মৃত্যুর সময় এবং মৃত্যুর পরে কোনও নতুন গায়েবী অবস্থা তার প্রত্যক্ষ দর্শনে না আসে, তাহলে তার দ্বিধা-সন্দেহ একইভাবে অকস্মাৎ কেমন করে পরিবর্তিত হবে? আল কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে : “এবং মৃত্যুর অজ্ঞানতা সত্যসহ উপস্থিত হয়েছে, আর এটাই হচ্ছে ঐ বস্তু যা থেকে তুমি পিছু হটে যাচ্ছিলে।”এতে বোঝা যায় যে, মৃত্যুর বেহুঁশির সময় মূল কর্মকান্ডের কোনও দৃশ্য অবশ্যই সামনে এসে হাজির হয়। তাফসিরকারগণও এই আয়াতের এই মর্মই গ্রহণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে ইবনে জারীর তাবারী লিখেছেন, “বিল্ হাক্বক্বি” অর্থাৎ আখেরাতের কিছু অবস্থা মৃত্যুর বেহুঁশির সময় মানুষের সামনে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমনকি মানুষ তা বিশ্বাস করতে থাকে এবং তা বর্ণনা করতে শুরু করে।” (তাফসিরে ইবনে জারীর তাবারী : খ. ২৬, পৃ. ৯১) মুহাদ্দিস হাফিজ ইবনে কাসীর স্বীয় তাফসিরে উল্লেখ করেছেন, “আল্লাহতায়ালা বলেন, হে মানুষ! মৃত্যুর বেহুঁশি সত্যসহ এসে পড়েছে, অর্থাৎ তোমার এই বিশ্বাসের পর্দাকে অপসারিত করেছে, যাতে তুমি সন্দেহ পোষণ করছিলে।” (তাফসিরে ইবনে কাসীর ও ফতহুল বয়ান : ৯ খ. ১৯৮ পৃ.) মুহাদ্দিস কাজী শাওকানীর তাফসিরে আছে, “আর সত্য আগমন করার অর্থ হচ্ছে এই যে, মৃত্যুর সময় সত্য কথা সুস্পষ্টরূপে ফুটে ওঠে এবং পয়গাম্বরগণ যে কিয়ামত এবং শাস্তি ও পুরস্কারের খবর নিয়ে এসেছিলেন, তার সত্যতার চিত্র মূর্ত হয়ে ওঠে।”(৫ খ. ৭৩ পৃ.) মুফতি আলুসী হানাফী (রহ.)-এর তাফসিরের ভাষা হচ্ছে, “এ আয়াতের অর্থ হচ্ছে এই যে, মৃত্যুর বেহুঁশি এ যথার্থ হাকিকতকে সামনে এনে দেয়, যা আল্লাহপাকের কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণ বর্ণনা করেছেন।” (তাফসিরে আলুসী : ৬ খ. ১৬৫২ পৃ.) যামাখশারী মুতা’জিলীর তাফসির (কাশ্শাফ : ২ খ. ৪০২ পৃ.) এবং আবু হাইয়্যান উন্দুলুসী মালেকীর তাফসিরে (বাহরুল মুহীত : ৮ খ. ১২৪ পৃ.) এরূপই লেখা রয়েছে। এই তাফসিরকারগণ বিভিন্ন দলের সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু তাদের সম্মিলিত তাফসির হচ্ছে একই। এই তাফসিরের বিশুদ্ধতার অধিক দলিল হচ্ছে এই যে, এরপরেই কিয়ামতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে : “আমি আজ আপনার ওপর হতে আবরণ দূর করে দিলাম, তাই আজ তোমার দৃষ্টি খুবই তীক্ষè।” (সূরা ক্বাফ : রুকু-২) এতে বোঝা যায় যে, মৃত্যুর সময় কোনও পরিমাণ ইনকিশাফ হয়ে যায় এবং কিয়ামতের দিন এই গোপন রহস্যসমূহ পরিপূর্ণরূপে প্রতিভাত হয়। সুতরাং মৃত্যুর এই অবস্থার সময় একিনের পর্দা সম্পূর্ণই খুলে যায়।
কবর বলতে কী বুঝায় : উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহের মাঝে ঐ সকল দৃশাবলির সন্ধান লাভ করা যায়, যা ‘আলমে বরযখের’ সাথে সংশ্লিষ্ট। এই আলমে বরযখ সম্পর্কে সহিহ হাদিসসমূহে বিস্তৃত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সন্নিবেশিত হয়েছে। তাই সাধারণভাবে আলমে বরযখের ঘটনাবলিকে কবরের সাথে সংশ্লিষ্ট রেখে বয়ান করা হয়েছে। কোনো কোনো মুতাজিলা মতবাদের অনুসারী কবরের আজাবকে অস্বীকার করে থাকে। আর তাদের দলিল ছিল এই যে, আল কোরআনে কবরের আজাবের উল্লেখ নেই। এই ভুল বোঝাবুঝি তাদের এ জন্য হয়েছে যে, কোরআনুল কারীমে ব্যবহৃত কবর শব্দ বা বহুবচনে কুবুর শব্দের সাথে আজাবের উল্লেখ নেই। কিন্তু যদি তারা দেখত যে, কোরআনুল কারীমে মৃত্যুর পর এবং কিয়ামতের পূর্বে মানবিক রূহসমূহের আজাব ও সওয়াব এবং রহমত ও দৌলতের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাহলে এর বিরোধিতা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হতো না। আল কোরআনে এই শ্রেণীর বহু আয়াত রয়েছে।
বস্তুত কবর শব্দের দ্বারা মূল উদ্দেশ্য শুধুমাত্র মাটির স্তূপকেই বোঝানো হয়নি, যাতে মৃতদেহের হাড়গুলো পড়ে থাকে; বরং কবর হচ্ছে ঐ আলম বাজগত যেখানে এ সকল দৃশ্যাবলী পরিদৃষ্ট হয়। আসলে তা রূহ ও নফসের জগৎ। এই উপাদান সমৃদ্ধ বস্তুনির্ভর জগৎ নয়। এ কারণে কোরআনুল কারীমে এই জগৎ সম্পর্কে সর্বদাই নফস এবং নুফুসকে খেতাব বা উপলক্ষ করা হয়েছে। আর নফস এবং নুফুসের আজাব ও সওয়াব, রহমত ও লানতের কথাও ব্যক্ত করা হচ্ছে। এই জগতে যে দেহ নজরে পড়ে এগুলো মৃত ব্যক্তির যাবতীয় কর্মকান্ডের মিছালী বা সাদৃশ্যাত্মক অবকাঠামো। যা হুবহু তার মাটির তৈরি দেহের মতোই মনে হয়। তুমি নিদ্রিত এবং তোমার দেহ মৃতাবস্থায় অনুভূতিহীন বিছানায় পড়ে আছে। কিন্তু তুমি স্বপ্নে দেখছ, প্রকৃতই যেন তোমার দেহ আগুনে জ্বলছে কিংবা তুমি সুখ বসন্তের আমোদ-আহ্লাদে নিমগ্ন রয়েছ। এক্ষেত্রে তুমি একই সুখ ও দুঃখ বিছানায় পড়ে থাকা দেহটিও অনুভব করে। এমতাবস্থায় স্বপ্নযোগে তুমি উপাদানে গড়া দেহের পরিবর্তে তোমার নজরে একটি খেয়ালি ও কাল্পনিক দেহ ভেসে ওঠে যেটি হুবহু তোমার উপদানে গড়া দেহেরই মতো। এমনিভাবে মৃত্যু-স্বপ্নেও তোমরা নিজেদের একটি সাদৃশ্যাত্মক দেহ নজরে অবলোকন করবে। এর দ্বারা এই সন্দেহের অবসান হয় যে, আমাদের সামনে মৃতের দেহটি পড়ে থাকলেও কিন্তু এর ওপর আজাব হচ্ছে এমন কোনো নমুনা আমরা খুঁজে পাই না। তাছাড়া এই সন্দেহও দূরীভূত হয় যে, কবরে যখন মৃতদেহ গলে-পচে নিঃশেষ হয়ে যায়, তারপরও আজাব ও সওয়াবের অনুভূতি সে কেমন করে অনুভব করে? তাই তোমাদের রূহ এই সাদৃশ্যাত্মক দেহের আজাব ও শাস্তির দ্বারা প্রভাবিত হবে। কেননা কার্যাবলির আসল জিম্মাদার হচ্ছে মানুষের রূহ, মাটির দেহ নয়। আল কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে : “প্রত্যেক রূহ এবং প্রাণ স্বীয় কাজকর্মের সীমার মাঝেই আবদ্ধ থাকবে।” (সূরা মুদ্দাসসির : রুকু-২) এ জন্য আসল জিম্মাদার বা প্রতিফলের মালিক হচ্ছে রূহ, দেহ নয়। দেহ হচ্ছে একটি যন্ত্রবিশেষ। যার দেহটি দুনিয়াতে মাটির তৈরি ছিল। কিন্তু আলমে বরযখে এর অপর একটি দেহ হবে, যার মাঝে বস্তু বা উপাদানের নামগন্ধও থাকবে না। কিন্তু তবুও আমরা স্বীয় মাটির দেহের এক প্রকার সম্পর্ক অনুভব করব। এই সম্পর্কের খাতিরেই কবর শব্দটি ব্যবহারিক কথাবার্তায় অব্যাবধি ব্যবহৃত হচ্ছে। কেননা আমরা নিজেদের চোখে মৃত মুসলমানদেরকে এই কবরে আমল করতে দেখি। কোরআনুল কারীমের এই আয়াতটি খুবই প্রাণিধানযোগ্য, যা আগেও উল্লেখ করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে : “যদি তুমি অবলোকন করতে, যখন ফেরেশতাগণ কাফিরদের রূহ কবজ করেন, তাদের মুখমন্ডল ও পৃষ্ঠদেশে আঘাত করেন, (এবং বলেন) প্রজ্জ্বলিত অনলকুন্ডের স্বাদ গ্রহণ করতে চল।” (সূরা আনফাল : রুকু-৭) এই আয়াতের দ্বারা এটা যেমন প্রতিপন্ন হয় যে, গোনাহগারদের ওপর মৃত্যুর পর থেকেই আজাব শুরু হয়ে যায়, তেমনি এ কথাও সুস্পষ্ট বোঝা যায় যে, তাদের মুখমন্ডলে ও পৃৃষ্ঠের ওপর আঘাত পড়তে থাকে। কিন্তু এই মুখ এবং পিঠ নয়, যা প্রাণহীন অবস্থায় লাশের সাথে আমাদের সামনে পড়ে থাকে; বরং এই আয়াতে কাফিরদের রূহকে সমস্যার সাথে তুলনা করা হয়েছে। যেভাবে কোনও পশুকে জোরে বা দ্রুত চলার জন্য মুখে এবং পিঠের ওপর আঘাত করা হয়, তেমনি কাফিরদের রূহকে ফেরেশতাগণ সজোরে আঘাত করতে করতে হাঁকিয়ে নিয়ে যাবেন এবং বলবেন চল, শাস্তিময় আস্বাদ লাভ করতে চল। এই মর্মটি এই আয়াতেও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে : ”সেদিন তোমার প্রতিপালকের নিকট হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।” (সূরা কিয়ামাহ : রুকু-১) তবে কোনও পুণ্যবান নেককার বান্দাহর রূহ এমনও হয় যে, আল্লাহপাক স্বীয় ফজল ও করমে আলমে বরযখে তাকে মাটির দেহের আকার-আকৃতি হতে বিমুক্ত করে অন্য কোনও উপযোগী দেহ প্রদান করেন। যেমন হাদিস শরিফে এসেছে যে, “পরিপূর্ণ মুমিনের রূহ পাখির আকারে জান্নাতে উড়তে ফিরতে থাকবে।” সুনানে ইবনে মাজাহ : কিতাবুল জানায়েয) (চলবে)



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন