Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫, ৮ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

নারী পাচার রোধে কঠোর হতে হবে

| প্রকাশের সময় : ২৭ এপ্রিল, ২০১৭, ১২:০০ এএম

আশিকুর রহমান হান্নান : অপরাধ কর্মকান্ডের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের একটি আকর্ষণীয় পথ হচ্ছে নারী পাচার। দেশে নারী পাচারকারীদের একাধিক চক্র রয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে চক্রগুলো দালালের মাধ্যমে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকার বিনিময়ে নারী সংগ্রহ করে। পরে তাদেরকে বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে বিভিন্ন পতিতাপল্লী এবং আবাসিক হোটেলে জোরপূর্বক দেহব্যবসা করানো হয়। সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তাহীন অস্বচ্ছল নারী ও শিশুরাই এই অপরাধ কর্মকান্ডের সহজ শিকারে পরিণত হয়। পাচার রোধে সংশ্লিষ্টদের আরো কঠোর হওয়া প্রয়োজন। এছাড়া পাচার হওয়া নারীদের ফেরত আনার পর যথাযথ পুনর্বাসনের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্রও জরুরি। এব্যাপারে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিও প্রয়োজন। জনপ্রতিনিধিসহ স্থানীয় প্রশাসনকে এব্যাপারে ভূমিকা রাখতে হবে। নারী পাচার রোধে সীমান্ত এলাকা ও বিমানবন্দরগুলোতে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এক্ষেত্রে কার্যকর পন্থা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সম্প্রতি একটি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় নারীদের সৌদি আরবে পাঠানোর নামে একাধিক দালাল চক্র করছে রমরমা ব্যবসা। নানা কৌশল অবলম্বন করলেও বন্ধ হচ্ছে না নারী পাচার। প্রতিনিয়ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারীদের পাচার করা হচ্ছে। পাচারের শিকার হয়ে অনেকেই হয়ে যাচ্ছেন স্থায়ী যৌনকর্মী, আবার বহু নারীর জীবনে ভয়ানক দুর্ভোগ নেমে এসেছে। যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেকেই ফিরে আসছেন দেশে। তবুও বন্ধ হচ্ছে না নারী পাচার। রূপগঞ্জ উপজেলায় কয়েকটি নারী পাচারকারী সিন্ডিকেট রয়েছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো নারীকে মোটা অংকের টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে সৌদি পাঠানোর কার্যক্রম চালাচ্ছে চক্রটি। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হলো নারীকর্মীরা সেখানে প্রতিনিয়ত যৌন নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। নির্যাতিতরা নানা কারণে তা প্রকাশ করেন না, তাদের সঙ্গে দাসের মতো আচরণ করার অভিযোগও উঠে। নারী পাচারকারী চক্রটি বেকার নারীদের সোনালী স্বপ্ন এবং মোটা অংকের টাকা আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সৌদি আরবে পাঠানোর নামে প্রতারণা করে আসছে। তারা ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে নারীদের পাঠান সৌদি আরব। সৌদি আরবে যারা রয়েছেন তাদের সাথে পরার্মশ করে বয়স যতো দেয়া প্রয়োজন তা দিয়ে তৈরি করছেন পাসপোর্ট। এভাবে সৌদি আরব গিয়ে নানা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন গ্রাম-গঞ্জের বিভিন্ন গৃহবধূসহ নারীরা। সচেতন সমাজের নাগরিকদের ভাষ্য, দেশে নারী পাচারের আইন থাকলেও এর প্রয়োগ হচ্ছে না। যদি কোনো স্থানীয় দালালদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হতো, তাহলে নতুন দালালদের সৃৃষ্টি হতো না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নারী পাচারকারীরা বেশ কয়েকটি অভিনব কৌশল নিয়েছে। এর মধ্যে প্রেমের ফাঁদে ফেলে নারী পাচারকারীরা টার্গেট করছে কলেজের ছাত্রীদের। প্রথমে পাচারকারীরা কোনো এক ছাত্রীকে টার্গেট করে। পরে তাদের নিয়োগকৃত তরুণ বা যুবকেরা সেই টার্গেটের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে। ছাত্রীর কথিত প্রেমিক এসময় তার পেছনে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে। গভীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠলে পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে তারা টার্গেটকে বিয়ের প্রলোভন দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে আনে। পরে পাচারকারী মূল চক্রের হাতে তুলে দেয়। এনজিও কর্মকর্তারা বলছেন, ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণত দরিদ্র-অসহায় পরিবারের সহজ-সরল কিশোরী, তরুণী-গৃহবধূদের পাচার করা হয়। বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে কিছুসংখ্যক নারী উদ্ধারসহ পাচারকারী সদস্যরা ধরা পড়লেও বেশির ভাগ চলে যাচ্ছে বিদেশের আদম পাচার চক্রের হাতে। পাচারকারী সদস্যরা ভালো চাকরি দেয়ার লোভ দেখিয়ে সৌদি আরবসহ অন্য কোনো দেশে নিয়ে গিয়ে পতিতাবৃত্তি করতে বাধ্য করছে। এতে রাজি না হলে নেমে আসে অমানসিক নির্যাতন ও অত্যাচার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী পাচার হচ্ছে এক ধরনের সহিংসতা। নারী পাচারের ফলে বিদেশে নারীরা শারীরিক মানবিক এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নারী পাচার রোধে আইন হয়েছে কিন্তু আইনের কার্যকারিতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। একমাত্র সচেতনতাই পারে নারী ও শিশু পাচার বন্ধ করতে। এজন্য সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকে। নারী ও শিশু পাচার একটি জঘন্য অপরাধ এবং পাচারের ফলে নারী ও শিশুরা চরম নির্যাতনের শিকার হয়। আর পাচার হওয়া নারীরা গৃহপরিচারিকা ও যৌনকাজে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তাই নারী পাচার রোধে সকলকে সচেতন থাকতে হবে।
গ্রামের সহজ-সরল নারীদের চাকরিসহ নানা প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করা হয় এবং তাদের পতিতা পল্লীতে বিক্রি করে দেয়া হয়। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, দেশের ১৮টি রুট দিয়ে প্রতি বছর প্রায় ২০ হাজার নারী ও শিশু অবৈধপথে পাচার হচ্ছে সৌদি আরব, ভারত, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে। পাচারের শিকার বেশিরভাগ নারীদের স্থান হয় সেখানকার পতিতা পল্লীতে। ভারতীয় সমাজ কল্যাণ বোর্ডের এক তথ্য থেকে জানা যায়, ভারতের বিভিন্ন পতিতা পল্লীতে প্রায় ৫ লাখ পতিতাকর্মী রয়েছে এর বেশির ভাগ বাংলাদেশী।
প্রতিনিয়ত এদেশ থেকে নারী এবং মেয়ে শিশু ভারত, পাকিস্তান, বাহরাইন, কুয়েত এবং আরব আমিরাতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। দেশের ২০ জেলায় ৯৩টি পয়েন্টে প্রতিনিয়ত নারী ও শিশু পাচারের ঘটনা ঘটছে। এ ক্ষেত্রে সাধারণত স্থলপথই ব্যবহৃত হয়। এছাড়া পানি ও আকাশপথও পাচারের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। ইউনিসেফের তথ্য মতে, দেশে প্রতি মাসে ৪০০ নারী ও শিশু পাকিস্তান, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যে পাচার হয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী যারা পাচারের শিকার হচ্ছে তাদের ৬০ ভাগেরও বেশি কিশোরী, যাদের বয়স ১২ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। সেন্টার ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন স্টাডিজের তথ্যানুসারে বাংলাদেশ থেকে প্রতিমাসে ১০০ শিশু এবং ৫০ জনের বেশি নারী বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ লাখ নারী ও শিশু বিদেশে পাচার হয়েছে। এদের মধ্যে ৪ লাখ নারীকে ভারতে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়। পাকিস্তানে একই পেশায় নিযুক্ত রয়েছে ১০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি নারী। এছাড়াও পাচারকৃত নারীদের ধনী ব্যক্তিদের রক্ষিতা, অশ্লীল ছবি তৈরিতে ব্যবহার, বাসাবাড়ি ও কল-কারখানায় লাভজনক শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার, শিশুদের বিকলাঙ্গ/অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকৃতির মাধ্যমে ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার ও নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে চড়া মূল্যে হস্তান্তর এবং মাদক চোরাচালান ও অন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা হয় বলে সেন্টার ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন স্টাডিজের তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়।
বাংলাদেশের নারী ও শিশুরা কেন দালালদের খপ্পরে পড়েন এর কয়েকটি কারণ গবেষকরা চিহ্নিত করেছেন। কারণগুলো হলোÑ শিক্ষা ও সচেতনতার অভাব, সমাজে নারীদের অবমূল্যায়ন, যৌতুকের জন্য নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, অসম বিবাহ, তালাকের অবাধ সুযোগ, প্রেমের প্রলোভন, প্রতারণার শিকার, দাম্পত্য জীবনে হতাশা, স্বামীর নির্যাতন, বৈধব্য, ভাসমান ও ভবঘুরে নারীদের আশ্রয়ের অভাব, নারীদের সমাজে নিরাপত্তার অভাব, সনাতনী পরিবার ব্যবস্থার বিলুপ্তি, বেশি বেতনে চাকরির প্রলোভন ও উন্নত জীবনযাপনের আকাক্সক্ষা ও প্রলোভন।
এটা আসলে কোনো আনন্দের বিষয় নয়। যাকে পাচার করে আনা হয়, তাকে বলা হয়Ñ তোমাকে ছেড়ে দেয়া হবে যদি তুমি আরো দুজনকে ধরে আনতে পারো। ফলে পিরামিডের আকৃতির মতো এই সমস্যা ক্রমশঃ নিচের দিকে নেমে ছড়িয়ে যাচ্ছে। নারী পাচার বন্ধ করতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। অনেকের মতে, তারা জানে তাদের সমাজে এ সমস্যা বিদ্যমান কিন্তু তা বন্ধ করতে কী করা যেতে পারে তা তারা জানে না। চোখ খুলে তাকালেই এসব ধরা পড়বে। তখন দেখা যাবে, দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, রাস্তার মোড়েই এসব ঘটনা ঘটছে। একটি বাড়িতে অগুনিত মেয়ে আসছে, যাচ্ছে তারা কারা? এ প্রশ্ন কি করা যায় না? এ বিষয়ে দৃষ্টি দেয়ার সময় এসেছে। সরকারকে এই ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে। নারী ও শিশু পাচার বর্বর যুগের জঘন্য নিকৃষ্ট কাজ। এরকম আধুনিক যুগেও এরকম ঘটনা ঘটছে। এটা সত্যিই দুঃখজনক ও অমানবিক। নারী পাচার রোধে সবার আগে আমাদের প্রত্যেকের সচেতন হওয়া জরুরি। এক্ষেত্রে নারী শিক্ষার প্রসার ঘটানো যেতে পারে। কারণ যারা একাজ করছে তারা বেশিরভাগই অশিক্ষিত। নারী পাচারকারী সিন্ডিকেটের অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে। এখনই নারী পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থাগ্রহণ করতে হবে। যে কোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে নারী ও শিশু পাচার।
লেখক : সাংবাদিক



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ