Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ১০ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

মে দিবস : রক্তে কেনা চেতনা

| প্রকাশের সময় : ৩০ এপ্রিল, ২০১৭, ১২:০০ এএম

মাওলানা এসএম আনওয়ারুল করীম : ১ মে ঐতিহাসিক মে দিবস। শ্রমিক শ্রেণির ন্যায্য মজুরি ও মর্যাদার লড়াইয়ে একটি রক্তিম দিন। ১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরের শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম, ৮ ঘণ্টা বিনোদনের দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে নেমেছিল। অথচ পুলিশি আক্রমণে সেদিন হে মার্কেট রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। এই রক্তে রঞ্জিত দিনটিকে স্মরণ করেই আজ দেশে দেশে মে দিবস পালিত হয় শ্রমিক আন্দোলনের আন্তর্জাতিক সংহতি প্রকাশের দিন হিসেবে। এ দিনটিতে শ্রমিকরা মিছিল করে এবং একই সঙ্গে শোষণ-নিপীড়ন থেকে মুক্তি পাওয়ার লড়াইকে এগিয়ে নেয়ার শপথও গ্রহণ করে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করে থাকে। সরকারিভাবেও দিবসটি পালিত হয়।
১৮৮৬ সালে হে মার্কেটে শ্রমিকরা বুকের রক্তে রাঙিয়ে যে পতাকা উড্ডীন করেছিল সে লাল পতাকা হাতে বাংলাদেশের শ্রমিকরা যখন রাজপথে নামে তখন তারা কি সত্যি উৎসবের আনন্দে মাতোয়ারা থাকে, নাকি মজুরিবঞ্চনা এবং কাজের সুযোগ ও নিরাপত্তা নিয়ে বিষাদগ্রস্ত মনেই স্মরণ করে পূর্বসূরিদের আত্মদানের স্মৃতি? দ্বিধাহীনভাবেই এটা বলা যায় যে, বাংলাদেশের শ্রমিকরা ভালো নেই। নানা সমস্যায় তারা জর্জরিত। ন্যায্য মজুরি নেই। চাকরির নিরাপত্তা নেই। নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে না ওঠায় কর্মক্ষেত্র বাড়ছে না। ফলে ভালোভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ কেবলই সংকুচিত হচ্ছে। বিভিন্ন সময় সরকারের ভ্রান্ত নীতি শিল্প এবং শ্রমিক উভয়ের স্বার্থই ব্যাহত করেছে। এ প্রেক্ষাপটে দেশের নারী শ্রমিকদের অবস্থা আরও শোচনীয়। তারা নারী এবং শ্রমিক এই দু’ভাবেই শোষিত-বঞ্চিত-অবহেলিত।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা ব্যতীত বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই মহান মে দিবস সরকারি ছুটির দিন। সভ্যতার প্রতিটি ইট, বালু ও পাথরে যাদের ঘাম ও রক্ত জড়িয়ে আছে, যে শ্রমিকেরা ছাড়া কখনোই সভ্যতা গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না, এখনো নয়, সেই শ্রমিকেরা সুদূর অতীত থেকেই অবহেলিত, লাঞ্ছিত এবং শোষিত। ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের পরও স্বাভাবিক জীবনযাপন, স্বাধীনতা এবং ন্যূনতম মর্যাদাটুকুও তাদের কখনোই ছিল না। শোষণ, নির্যাতন এবং বঞ্চনার চূড়ান্ত সীমায় এসে তারা ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রæতি নেয় উনিশ শতকের গোড়ার দিকে। শ্রমিকেরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার অমানবিক পরিশ্রম করত কিন্তু মিলত নগণ্য মজুরি। অনিরাপদ পরিবেশ, রোগব্যাধি, আঘাত, মৃত্যুই ছিল তাদের নিয়মিত সঙ্গী। বন্দী জীবনের শৃঙ্খল থেকে তাদের কঠোর শ্রম দিতে হতো শুধুই রুটি এবং বস্ত্রের বিনিময়ে। শ্রমিকেরা সর্বপ্রথম মুখ খুলল ১৮৬০ সালে মজুরি না কেটে দৈনিক ৮ ঘণ্টা শ্রম সময় নির্ধারণের দাবির মাধ্যমে। কিন্তু কোনো শ্রমিক সংগঠন না থাকায় এ দাবি জোরালো করা সম্ভব হয়নি। এ দাবি ছিল পুঁজিপতিদের বিপক্ষে। সুতরাং সঙ্গত রাজনৈতিক বৈরিতার কারণেই এই সময় সমাজতন্ত্রীরা শ্রমিকদের আন্দোলনে সমর্থন জোগায়। শ্রমিকেরা বুঝতে পারে, মালিক শ্রেণীর এই রক্তশোষণ নীতির বিরুদ্ধে তাদের সংগঠিত হতে হবে এবং সে মাফিক ১৮৮০-৮১ সালের দিকে শ্রমিকরা প্রতিষ্ঠা করে নীতিমালা। পরে ১৮৮৬ সালে সংগঠিত হয়ে শক্তি অর্জন করতে থাকে। ১৮৮৪ সালে সঙ্ঘটি ৮ ঘণ্টা দৈনিক মজুরি নির্ধারণের প্রস্তাব পাস করে এবং মালিক শ্রেণীকে এ দাবি মেনে নেয়ার জন্য ১৮৮৬ সালের ১ মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়।
দাবি পূরণের সাড়া না পেয়ে শ্রমিকদের আন্দোলন যখন প্রতিবাদী এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে থাকে, সে সময় ‘অ্যালার্ম নামের একটি পত্রিকার কলামে ‘একজন শ্রমিক ৮ ঘণ্টা কাজ করুক কিংবা ১০ ঘণ্টাই করুক, সে দাসই’ এ মন্তব্য যেন তাদের আন্দোলনকে আরো বেগবান করে তোলে। ১ মে-কে ঘিরে শিকাগো হয়ে ওঠে আন্দোলনের উত্তপ্ত কেন্দ্রস্থল। একই সাথে মালিক শ্রেণী আন্দোলন মোকাবেলায় অস্ত্র সংগ্রহসহ ব্যাপক প্রস্তুতি নিতে থাকে। কিন্তু শ্রমিক আন্দোলন না দমে বরং আরো বেগবান হয়। ১ মে সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় তিন লাখ এবং শিকাগো শহরে ৪০ হাজার ও পরে এক লাখ শ্রমিক কাজ ফেলে শহরের কেন্দ্রস্থলে সমবেত হয়। তাদের মিছিল, মিটিং, বক্তৃতা এবং ধর্মঘটসহ বিপ্লবী আন্দোলনের সব কিছু মিলে ১ মে উত্তাল হয়ে উঠলে পুলিশের ওপর অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বোমা বিস্ফোরণে ৭ জন পুলিশ মারা যায়। ফলে পুলিশ বাহিনী অতর্কিত হামলা করে শ্রমিকদের ১৯ জনকে হত্যা করে। প্রহসনমূলক বিচারে ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে শ্রমজীবীদের ছয়জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে আন্দোলনের নেতা আগস্ট স্পিজ বলেছিলেন, ‘আজ আমাদের এই নিঃশব্দতা, তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা শক্তিশালী হবে।’ পরে ২৬ জুন, ১৮৯৩ সালে পুলিশ হত্যায় অভিযুক্ত আটজনকে নিরপরাধ বলে ঘোষণা দেয়া হয় এবং শ্রমিকদের ওপর হামলা হুকুম প্রদানকারী পুলিশের কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার দাবি অফিসিয়াল স্বীকৃতি পায়। আর ১ মে প্রতিষ্ঠা পায় শ্রমিকদের দাবি আদায়ের দিন হিসেবে যা পৃথিবীব্যাপী পালিত হয় প্রতি বছর।
মে দিবসের আন্দোলনের মাধ্যমে শ্রমিকেরা যে মর্যাদা, অধিকার পেল এবং কর্মঘণ্টা ও ন্যূনতম মজুরি বিষয়ক যে শ্রমনীতি বাস্তবায়িত হলো, সে বিষয়ে ১৩শ’ বছর আগেই ইসলাম সুস্পষ্ট শ্রমনীতি ঘোষণা করেছিল স্বয়ং আল্লাহ তাঁর কুরআনের মাধ্যমে তার নির্দেশ দেন এবং সে নীতির বাস্তবায়নকারী নবী করিম সা: নিজে আর ন্যায়-অন্যায়ই সে নীতির মাপকাঠি। এর আলোকে শ্রমিকের দাবির তুলনামূলক আলোচনা নিম্নে পেশ করা হলো :
শ্রমিকের অধিকার : শ্রমজীবী মানুষ তাদের সাধারণ কর্মক্ষমতার বাইরেও শ্রম দিতে বাধ্য হয় অথচ সংসার পরিচালনার জন্য ন্যূনতম যে চাহিদা তা পূরণের মতো মজুরি দেয়া হয় না। মালিকেরা শ্রমিকদের যেন দাস মনে করে। ফলে মানুষ হিসেবে ন্যূনতম মর্যাদাটুকুও তারা পায় না। ইসলাম শ্রমিকদের যে অধিকার দান করেছে তা কোনো ধর্ম, জাতি, গোষ্ঠী অথবা মানবরচিত মতবাদ দিতে সক্ষম হয়নি।
শ্রমিকের মর্যাদা : শ্রমিকের অন্যতম সমস্যা হলো তাদের সামাজিক মর্যাদা। বর্তমানের বিজ্ঞানোজ্জ্বল শিক্ষিত সমাজেও শ্রম করা অপমানজনক কাজ বলে বিবেচিত হয়। এখানে শ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা দেয়া হয় না। ইসলাম সর্বপ্রথম কৃত্রিম আভিজাত্যবোধ ও সামাজিক বৈষম্যের ওপর চরম আঘাত হেনেছে। ইসলাম মানুষের মধ্যে প্রকৃত সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধই শুধু জাগ্রত করেনি, শ্রমনীতি এবং মজুরদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মজুরি সমস্যা : শ্রমিকের মজুরিই হচ্ছে তার জীবনধারণের একমাত্র উপায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাড়ভাঙা কাজ করার ফলে তার স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু এরপরও তারা ভালোভাবে বাঁচার মতো মজুরি লাভ করতে পারে না। রোগব্যাধি হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে না পারা, সন্তানসন্ততিদের শিক্ষাদীক্ষা ও লালন-পালনের সুব্যবস্থা না হওয়া, এমনকি কাজের সময় কোনো অঙ্গহানি হলে মানবেতর জীবনযাপন করাই যেন নিয়তি। স্বাধীন মানুষের মতো তাদের মেরুদন্ড খাড়া করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মতো সামর্থ্য হয় না। অথচ ইসলামী অর্থনীতি এসব সমস্যার সমাধান দিয়েছে।
শ্রমিক ও মালিকের সাম্য : শ্রম শোষণ প্রসঙ্গটিও মে দিবসে আলোচিত হয়। এ নিয়ে শ্রমিক ও মালিকদের সম্পর্কে ফাটল দেখা দেয়। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সাথে এ সম্পর্ক ওতপ্রোত জড়িত। ইসলাম বহুকাল আগেই শ্রমিক-মালিকের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এ নীতিমালায় শ্রমিকের প্রতি মালিকের রূপ দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা বলা হয়েছে। হাদিসে রয়েছে যে, মজুরি পাওয়ার অধিকার জন্মে কাজ করা সম্পন্ন হয়ে গেলে এবং মালিকানা নির্দিষ্ট হয় সরকারি বিলি-বণ্টনের সাহায্যে।
শ্রমিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য : নির্দিষ্ট মজুরির বিনিময়ে শ্রমিক নিযুক্ত হলে কাজ বা কাজের নির্দিষ্ট মেয়াদ পরিসমাপ্তির পর পূর্বনির্ধারিত মজুরি পাওয়ার শ্রমিকের অধিকার এবং মালিকের তা যথারীতি আদায় করাই কর্তব্য। অনুরূপভাবে শ্রমিকের ওপরও এ বিষয়ে দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। ইসলাম বলেছে, সে যখনই মালিকের কাজের দায়িত্ব নেয়, তখন তা যেন ন্যায়পরায়ণতা ও সততার সাথে করে, সে যেন মালিকের সাথে অযথা বাড়াবাড়ি না করে, মালিকের সম্পদের ক্ষতি না করে। মালিকের সম্পদ তার কাছে আমানতস্বরূপ। আল্লাহ্ এবং আল্লাহর রাসূল সা: মালিক-বণিক এবং সরকারের প্রতি যেমন শ্রমিকদের অধিকার, মর্যাদা, মজুরি, কর্মঘণ্টা ইত্যাদির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, ঠিক তেমনই শ্রমিকদের প্রতি কাজের ব্যাপারে যত্মবান থাকা এবং সততা, বিশ্বস্ততা এবং দক্ষতার তাগিদ দিয়েছেন। শ্রমিক ও মালিক, উভয়ের যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে উভয়েই উপকৃত হবেন এবং দেশের সার্বিক উৎপাদনশীলতা ও বৃদ্ধি পাবে।
লেখক : ভাষ্যকার, বাংলাদেশ বেতার ও  টেলিভিশন; বিভাগীয় প্রধান (হাদীস, আল ফাতাহ পাবলিকেশন্স)



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর