Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২৭ মে ২০১৭, ১৩ জ্যৈষ্ঠ , ১৪২৪, ৩০ শাবান ১৪৩৮ হিজরী

উত্তর কোরিয়ায় মার্কিন আগ্রাসনের প্রোপাগান্ডা এজেন্ডা

উপ-সম্পাদকীয়

| প্রকাশের সময় : ১০ মে, ২০১৭, ১২:০০ এএম

জামালউদ্দিন বারী : ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাাচত হওয়ার পর এশিয়ায় নতুন করে পারমানবিক যুদ্ধের হুমকি ছড়িয়ে পড়ছে, যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে বিদেশের মাটিতে  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী  যুদ্ধ কমিয়ে আনার প্রতিশ্রæতি ব্যক্ত করেছিলেন। পশ্চিমা পুঁজিবাদি সাম্রজ্যবাদের সাথে বিশ্বের যে কয়টি দেশ সমঝোতা না করে সমমর্যাদার ভিত্তিতে মাথা উঁচু করে দাড়াতে চেয়েছে উত্তর কোরিয়া তার অন্যতম। দক্ষিন কোরিয়া ও জাপান যখন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির উচ্চ শিখরে আরোহনের পরও বিশ্বের কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লায়েন্ট স্টেট হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে, উত্তর কোরিয়া তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চোখ রাঙানিকে থোড়াই কেয়ার করেছে। এর পেছনে অনেক রক্ত, মৃত্যু ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের বিভীষিকাময় ইতিহাস আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার ৫ বছরের মাথায় কোরীয় উপদ্বীপে সংঘটিত ৩ বছর ব্যাপী কোরীয় যুদ্ধ বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে অন্যতম বিভীষিকাময় যুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হয়। সে যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার জনগনের উপর যে পরিমান নাপাম বোমা কার্পেট বোমা ব্যবহার করেছিল তা’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের উপর নিক্ষেপিত বোমার চেয়ে অনেক বেশী। বোমায় লাখ লাখ কোরীয় নাগরিককে হত্যা করার পরও উত্তর কোরিয়ার প্রতিরোধকে দমিয়ে দিতে পারেনি। ১৯৫৩ সালে একটি অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও আনুষ্ঠানিক কোন চুক্তিতে উপনীত না হওয়ায় কোরীয় যুদ্ধ মূলত এখনো শেষ হয়নি। গত ষাট বছরের বেশী সময় ধরেই উত্তর ও দক্ষিন কোরিয়া পরস্পর যুদ্ধংদেহি মনোভাব নিয়ে সদাপ্রস্তুত রয়েছে। ছয় দশকের বেশী সময়ের মধ্যে অনেক বার দুই কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার উপক্রম হলেও সংঘাত কখনো মাঠে গড়ায়নি। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার পর স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্বে ইউরোপে বার্লিন দেয়াল ভেঙ্গে পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানী এক হয়ে যাওয়ার পর  দুই কোরিয়ার  জনগনের মধ্যে একটি ঐক্যবদ্ধ কোরিয়ার স্বপ্ন জেগে উঠলেও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদি শক্তি তা হতে দেয়নি। বিশেষত: দক্ষিন কোরিয়ার উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব অব্যাহত রাখতে উত্তর কোরিয়াকে দক্ষিনের জন্য হুমকি হিসেবে টিকিয়ে রাখা তাদের জন্য বেশ জরুরী ইস্যু। কোরিয় যুদ্ধের পর থেকেই মার্কিন সেনাবাহিনীর হাজার হাজার সদস্য দক্ষিন কোরিয়ায় অবস্থান করছে। দুই কোরিয়ার মধ্যে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি বা শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হলে এসব সৈন্যকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নিতে হবে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কুশীলবরা এটা হতে দিতে চায়না। কারণ চীন ও রাশিয়াকে চাপের মধ্যে রাখতে কোরীয় উপদ্বীপে মার্কিন সেনাদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে চায় তারা। কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা টিকিয়ে রাখতে এবং উত্তর কোরিয়ার নেতাদের সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী বিরূপ ধারনা তৈরী করতে পশ্চিমা কর্পোরেট মিডিয়াগুলো নানা রকম বিভ্রান্তিকর প্রোপাগান্ডা অব্যাহত রেখেছে।
    মধ্যপ্রাচ্য ও সিরিয়া পরিস্থিতিকে ঘিরে গত কয়েকবছর ধরেই আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ বা পারমানবিক যুদ্ধের উত্তেজনা ছড়ানো হচ্ছে। এই উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দেশগুলোকে হাজার হাজার কোটি ডলারের যুদ্ধাস্ত্র ও নিরাপত্তা চুক্তির জালে বন্দি করে ফেলা হচ্ছে। তবে ইরানের কৌশলী ক’টনৈতিক ভ’মিকার কাছে মার্কিন মধ্যপ্রাচ্যনীতি কোনঠাসা হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে ছয় জাতির পারমানবিক সমঝোতা চুক্তির পর মধ্যপ্রাচ্যে গ্রেটার স্কেলের যুদ্ধ পরিকল্পনা হালে পানি পাচ্ছেনা। এর পরও আফগানিস্তানে বিশ্বে এ যাবৎ ব্যবহৃত বৃহত্তম বোমা ‘মাদার অব অল বোম্বস’ ব্যবহার করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল ও সবচেয়ে দরিদ্র দেশের উপর বৃহত্তম সমরসজ্জা ঘটিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করার ১৬ বছর পর আফগানিস্তানে এ ধরনের বোমা ফেলে একসাথে শতাধিক মানুষকে হত্যার মধ্য দিয়ে ঘৃনিত চমক সৃষ্টি করেছে মার্কিনীরা। ইরানের হাতে পারমানবিক যুদ্ধাস্ত্র আবিস্কার করতে না পারায় আপাতত  ইরানকে পারমানবিক পরীক্ষাগার বানানো সম্ভব হচ্ছেনা। এখন উত্তর কোরিয়াকে সামনে রেখেই একটি নতুন পারমানবিক যুদ্ধের ক্লাইমেক্স সৃষ্টি করতে চাচ্ছে।  
‘গিভ অ্যা ব্যাড নেইম এন্ড কিল দ্য ডগ’, কাউকে মারা বা ক্ষতি করার আগে তার বিরুদ্ধে অপবাদ ও বদনাম রটনা করা পশ্চিমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন বিষয় নয়। সিবিএস ও নিউইয়র্ক টাইমস পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে মার্কিন জনসাধারণের শতকরা ৭২ ভাগই বিদেশে কোন দেশের ডিকটেটর বা একনায়ক শাসককে সামরিক শক্তিতে গদিচ্যুত(রিজিম চেঞ্জ) করার মার্কিনী নীতিকে সমর্থন করেনা। আর সিএনএন’র এক জরিপে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ১০ জনের ৬ জন, অর্থাৎ শতকরা ৬০ জন নাগরিক বর্হিবিশ্বের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার পররাষ্ট্রনীতিকে সমর্থন করেন। কিন্তু জনগনের এই প্রত্যাশার সাথে মার্কিন কর্পোরেট মিডিয়া এবং এমআইসি(মিলিটারি ইন্ডাসট্রিয়াল কমপ্লেক্সের) স্বার্থ মেলেনা। পুঁজিবাদি অর্থনীতির গতানুগতিক মুক্তবাজারের ধারায় তারা নিজেদের অবস্থান খুইয়ে বসেছে। এখন অর্থনৈতিক পুঁজিবাদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে টার্গেটেড রাষ্ট্রগুলোকে ডি-স্টাবিলাইজ করা এবং তাদেরকে নিজেদের তৈরী করা অস্ত্র ও সমরপ্রযুক্তি কিনতে বাধ্য করাই হচ্ছে  অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার অবশিষ্ট পন্থা। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এভাবে অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিলে সে দেশের জনগনের কোন উপকার হচ্ছেনা। এ খাতের লাভের গুড় পুরোটাই চলে যাচ্ছে কর্পোরেট পাওয়ার এলিটদের হাতে। দুই কোরিয়ার মধ্যে দৃশ্যমান কোন সীমান্ত বিরোধ বা অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক স্বার্থদ্বন্দ¦ নেই। তবে কোরীয় যুদ্ধের পর থেকেই পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদি শক্তি ও তার বশংবদ রাষ্ট্রগুলো রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে উত্তর কোরিয়াকে বিচ্ছিন্ন বা একঘরে করে রেখেছে। স্নায়ুযুদ্ধোত্তর ইউনিপোলার বিশ্বে চীন-রাশিয়ার সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়লেও উত্তর কোরিয়ার সাথে মার্কিন শাসকদের সম্পর্ক স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়নি। উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে মার্কিনীদের প্রতি বাইলেটারাল ডায়ালগের আহ্বান জানানো হলেও মার্কিনীরা বরাবরই তা’ প্রত্যাখ্যান করেছে। স্মর্তব্য যে, বিশ্বের যে কয়টা সম্ভাব্য পারমানবিক শক্তিধর দেশ কোন যুদ্ধে প্রথম পারমানবিক বোমা ব্যবহার না করার নীতিগত অঙ্গিকার করেছিল উত্তর কোরিয়া তার অন্যতম। এ ছাড়া চীন এবং ভারতও এ ধরনের অঙ্গিকার করেছে। আর ইরান  আরেক ধাপ এগিয়ে পারমানবিক বোমা ও ব্যবহার না করার অঙ্গিকারে অটুট থাকলেও সে পারমানবিক প্রযুক্তিগত সামর্থ্য ও অধিকার অক্ষুন্ন রাখার ক্ষেত্রে কোন ছাড় দিতে রাজি নয়। তবে গত চার দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বার বার ইরানের উপর সামরিক আগ্রাসন চালানোর হুমকি ও উস্কানি দিয়েছে। আর উত্তর কোরিয়ার উপর সামরিক হামলা চালানোর মূল লক্ষ্যবস্তুই হচ্ছে সেখানকার শাসকদের সম্পর্কে অনবরত মিথ্যা প্রচারনা। বিশ্বের সব দেশ একই ভৌগলিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে অবস্থিত নয়। বিশ্বব্যবস্থায় বৈচিত্র্যই হচ্ছে সভ্যতার ঐতিহাসিক বিশেষত্ব। অস্ট্রেলিয়া বা কানাডার নাগরিকরা যদি বৃটিশ রানী ও কমনওয়েলথের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে চায়, তাতে আমাদের বা অন্য কারো উদ্বিঘœ হওয়ার কারণ থাকতে পারেনা। অন্যদেশের শাসক ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে মার্কিনীদের মনোভাব এবং হস্তক্ষেপের ঘটনা হাজার বছরের বিশ্ব ইতিহাসে এক অসভ্য নজির সৃষ্টি করেছে।
    মার্কিনীরা গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা হয়ে তাদের ফাউন্ডিং ফাদারদের অমিয় বানীগুলোকে তুলে ধরেছে। ডেমোক্রেসির সংজ্ঞায় আব্রাহাম লিঙ্কন ‘অব দি পিপল, বাই দি পিপল এন্ড ফর দি পিপল’ বলে যে টার্মস আরোপ করেছিলেন, তা’ যদি আটলান্টিক বা প্রশান্ত মহাসাগরের অপর প্রান্তের মানুষ প্রত্যাখ্যান করে, তা বুঝতে বা আত্মস্থ করতে আরো অনেক সময় নেয় সেটা তাদের ব্যাপার। সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে সে সমস্যার সমাধান করতে যাওয়া অনেক বড় অসভ্যতা। গণতন্ত্রের কথা বলে পানামার শাসক নরিয়েগাকে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে ধরে এনে শাস্তি দেয়ার ঘটনা, ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন যখন তার দেশকে একটি কল্যান রাষ্ট্রে পরিনত করেন, লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফি যখন একটি বেদুইন জাতিকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন জাতি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইস্পাত কঠিন চ্যালেঞ্জ গ্রহন করেন, তখন মার্কিনীরা এসব শক্তিমান জাতীয়তাবাদি নেতাদের ডেমোনাইজ করতে প্রোপাগান্ডা এজেন্ডা গ্রহন করে। ডেলিবারেট অপপ্রচারের মাধ্যমে একেকজন শক্তিমান জাতীয়তাবাদি নেতাকে বিশ্বের সামনে ঘৃন্য, উদ্ভটভাবে উপস্থাপিত করছে পশ্চিমা কর্পোরেট মিডিয়া। গত দুই দশকে সাদ্দাম হোসেন থেকে শুরু করে কিম জং উর পর্যন্ত পশ্চিমা কর্পোরেট মিডিয়া একই রকম ভ’মিকা পালন করে চলেছে। এরপর এসব দেশের উপর কখনো সরাসরি সামরিক আগ্রাসন, কখনো মার্সেনারি বাহিনী নিয়োগ করে গৃহযুদ্ধ বাঁধিয়ে শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করার পাশাপাশি দেশগুলোকে ডি-স্ট্যাবিলাইজ ও অকার্যকর করে তোলা হয়েছে। ডাবিøউএমডি বা ব্যাপক বিধ্বংসি অস্ত্রভান্ডার গড়ে তোলার মিথ্যা অভিযোগ তুলে প্রায় দেড় দশক আগে ইরাক দখল ও সাদ্দাম হোসেনকে হত্যার পর থেকে একটি অশান্ত অনিরাপদ ও দুর্বল রাষ্ট্র হিসেবে টিকে আছে দেশটি। লিবিয়ায় পশ্চিমা সমর্থনপুষ্ট বিদ্রোহী গ্রæপগুলোর পাশাপাশি ন্যাটোর বিমান হামলায় মুয়াম্মার গাদ্দাফি নিহত হওয়ার পর থেকে দেশটি বিশৃঙ্খল-অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিনত হয়েছে। বহু আগেই আফগান তালেবানরা ওসামা বিন লাদেন সম্পর্কে আলোচনার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। সে সময় জর্জ বুশ তালেবানদের সাথে কথা বলতে রাজি হননি। এখন আফগানিস্তান দখলের ১৬ বছর পরে মার্কিনীরা তালেবানদের সাথে সন্ধি করে ইজ্জত ও জান নিয়ে দেশে ফেরার রাস্তা খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এখন তালেবানদের সাথে আলোচনায় বসতে তাদের কোন আপত্তি নেই।
উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম জং উন বা তার দেশ সম্পর্কে পশ্চিমা মিডিয়ায় প্রকাশিত প্রোপাগান্ডার প্রায় পুরোটাই শ্রেফ মতলবি প্রচারনা বলে ধরে নেয়া যায়। কোরীয় যুদ্ধের পর থেকেই পশ্চিমা সাংবাদিক বা গণমাধ্যম কর্মীদের উত্তর কোরিয়ায় প্রবেশ প্রায় নিষিদ্ধ। এহেন বাস্তবতায় সেখানকার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা পশ্চিমা কর্পোরেট মিডিয়ার পক্ষে বেশ কঠিন। এ ক্ষেত্রে কিম পরিবারকে  ডেমোনাইজ করতে কল্পকাহিনীর প্রচারনাই তাদের মূল অবলম্বন। উত্তর কোরিয়ার শাসকদের সম্পর্কে পশ্চিমা মিডিয়ায় প্রায় প্রতিদিনই নানা রকম উদ্ভট প্রচারনা চালানো হচ্ছে। অথচ এ কথা তারা কখনো প্রকাশ করেনা যে, প্রতি বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার সীমান্তে যৌথ সামরিক মহড়া বন্ধের শর্তে তাদের পারমানবিক পরীক্ষা না চালানোর প্রস্তাব দিয়েছিল যা’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করার অব্যাহত হুমকির মধ্যে এ বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিন কোরিয়া প্রায় ৪ লাখ সৈন্যের মহড়া চালিয়েছে। ইতিমধ্যে দক্ষিন কোরিয়ায় মিসাইল বিধ্বংসি থাড মিসাইল ব্যাটারি স্থাপন করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তবে দুই কোরিয়ার অধিকাংশ নাগরিক এমন চাপিয়ে দেয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আগ্রাসী যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সাবেক পরাশক্তিদ্বয়ের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের পর সোভিয়েত রাশিয়ার দিকে তাক করা মার্কিন হাইড্রোজেন বোমাগুলোর নিশানা ১৯৯৩ সাল থেকে উত্তর কোরিয়ার দিকে তাক করা রয়েছে বলে জানা যায়। অত:পর ২০০১ সালের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রি-অ্যাম্পটিভ পারমানবিক হামলার নীতি গ্রহন করে  উত্তর কোরিয়াকে এক্সিস অব ইভিল বা শয়তান চক্রের সদস্য বলে আখ্যায়িত করে তাকে পরমানু বোমা হামলার লক্ষ্যবন্সÍু হিসেবে গণ্য করছে। এরই প্রেক্ষাপটে উত্তর কোরিয়া নিউক্লিয়ার নন-প্রলিফারেশন চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়ে কোরিয়া থেকে সব অস্ত্র পরিদর্শকদের বের করে দিয়েছে। কোনভাবেই উত্তর কোরিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি নয়। আর দুই কোরিয়া এক হয়ে গেলে দক্ষিন কোরিয়ার জন্যও কোন হুমকি ছিলনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে প্রায় ৭ হাজার পারমানবিক যুদ্ধাস্ত্র রয়েছে। এর বেশ কয়েকটি হয়তো কোরিয়ার বর্ডারেও মজুদ আছে। সেখানে সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন উত্তর কোরিয়ার হাতে বড় জোর ৮-১০টি পারমানবিক বোমা থাকতে পারে। তবে এসব বোমা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য কার্যকর ডেলিভারি সিস্টেমও তাদের হাতে নেই। উত্তর কোরিয়া এবং এর শাসকদের সম্পর্কে অনবরত অপপ্রচার চালানোর পরও সিএনএন’র এক জরিপে দেখা যায়, মাত্র ৩৭ ভাগ মার্কিনী উত্তর কোরিয়াকে বিশ্ব বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি বলে মনে করে। এ থেকে বুঝা যায়, উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে পরিচালিত পশ্চিমা মিডিয়ার ৬ দশকের প্রোপাগান্ডা সফল হয়নি। রোডস আইল্যান্ডে বসবাসকারি মার্কিন লেখক-সাংবাদিক জো ক্লিফোর্ড প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন, ক্রমাগত উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে পারমানবিক বোমা হামলার হুমকি দিচ্ছে। অন্যদিকে বিশ্ব না জানলেও উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে বার বার দ্বিপাক্ষিক আলোচনার প্রস্তাব দেয়া হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ক’টনৈতিক-রাজনৈতিক প্রয়াস ছাড়াই শুধুমাত্র সামরিক শক্তিতে সবকিছু নিয়ন্ত্রনের অসুস্থ্য প্রতিযোগিতা নিয়ে মার্কিন শাসকদের মাতামাতি যে বিশ্বের জন্য অনেক বড় হুমকি এ কথা পশ্চিমা জনগন বুঝতে পারলেও পশ্চিমা কর্পোরেট মিডিয়ার ভ’মিকা এখনো অযৌক্তিকভাবে গণবিরোধি। মার্কিন নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সময়ে আইনের শাসন বিষয়ক র্নীতি নির্ধারক উইলিয়াম জন কক্স’র লেখা একটি নিবন্ধ সম্প্রতি আইসিএইচ অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তিনি উত্তর কোরিয়া প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন, জাতিরাষ্ট্র এবং জনগনের পরিচালিত সাম্রাজ্যবাদি যুদ্ধ এখন আর কাজ করছেনা। তথাপি মিথ্যা অজুহাত তৈরী করে সম্ভাবনাময় রাষ্ট্রগুলোকে ধ্বংস অথবা ডিস্ট্যাবিলাইজ করা হচ্ছে, শুধুমাত্র অনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ আরো কিছুদিন টিকিয়ে রাখার জায়নবাদি এজেন্ডা হিসেবে।
bari_zamal@yahoo.com

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।