Inqilab Logo

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১০ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

র‌্যাব-পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজছে জঙ্গি রেজওয়ানকে

| প্রকাশের সময় : ১৫ মে, ২০১৭, ১২:০০ এএম

গ্রেফতারে ব্যর্থতায় দোষারোপ করছেন এক সংস্থা আরেক সংস্থাকে : পুলিশ বলছে যে কোন সময় গ্রেফতার, দেশের সকল বিমানবন্দর সীমান্ত এলাকায় আছে সতর্ক নজরদারি
উমর ফারুক আলহাদী : র‌্যাব পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজছে মাস্টারমাইন্ড জঙ্গি রেজওয়ানকে। গত তিন দিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অর্ধশতাধিক অভিযান চালানো হয়েছে তাকে গ্রেফতারের জন্য। কিন্ত এখন পর্যন্ত ওই ভয়ঙ্কর জঙ্গি নেতার হদিস পায়নি আইন শৃংখলা বাহিনী। তাকে নিয়ে প্রশাসনে চলছে তোলপাড়। দেশে প্রবেশের পর বিমানবন্দর থেকে কীভাবে লাপাত্তা হলো এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিমানবন্দরে এতসব গোয়েন্দা নজরদারি, কথিত কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। শাহজালাল বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে এ ধরনের মোস্ট ওয়ান্টেড  একজন আলোচিত জঙ্গিনেতা কীভাবে বিমানবন্দর থেকে নির্বিঘেœ চলে যেতে পারলেন এ নিয়ে মুখ খুলছেন না ইমিগ্রেশনের কর্মকর্তারা। গতকাল মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে (সন্ধ্যা ৬টায়) ওসি ইমিগ্রেশন এ ব্যপারে কোন কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলতে তিনি পরামর্শ দেন।  
 গত ৪ দিন আগে ঢাকায় এসে লাপাত্তা হওয়ার এ ব্যর্থতার জন্য এক সংস্থা আরেক সংস্থাকে দোষারোপ করছে। তবে পুলিশের একটি সূত্র দাবি করছে, রেজওয়ান তাদের নেটওয়ার্কের মধ্যেই আছেন। যে কোন সময় গ্রেফতার হতে পারেন ওই জঙ্গি নেতা। ইতোমধ্যে পুলিশ সদর দফতরের নির্দেশে রেজওয়ানকে খুঁজে বের করতে সমন্বিত অভিযান শুরু করা হয়েছে। র‌্যাব পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনী রাজধানীসহ দেশের বিভিন্নস্থানে তল্লাশী অভিযান অব্যাহত রেখেছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যে কোনো মূল্যে স্বল্প সময়ের মধ্যে রেজওয়াকে গ্রেফতার করা করতে। ইতোমধ্যে মধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও স্থল বন্দরে কড়া সতর্কতার সাথে নজরদারি করতে বলা হয়েছে। সোর্স নিয়োগ করা হয়েছে যাতে রেজওয়ান পুনরায় চোরাইপথে দেশের বাইরে পালাতে না পারে।
পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (কনফিডেন্সিয়াল) মনিরুজ্জামান বলেন, সে (রেজওয়ান) পুলিশের নেটওয়ার্কের মধ্যেই আছে। তার ধরা পড়া এখন সময়ের ব্যাপার। তিনি বলেন, সে যেহেতু বাংলাদেশে ইন করেছে-সংবাদ আমাদের কাছে আছে এখন আর তার কোনো নিস্তার নেই। ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার রেজাউল করিম বলেন, নগরীর ৪৯ থানা এলাকাতেই রেজওয়ানের ব্যাপারে বার্তা পাঠানো হয়েছে। থানা পুলিশের পাশপাশি রেজওয়ানকে গ্রেফতারের লক্ষ্যে গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে।
সূত্র জানায়, জঙ্গিবাদে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগে অভিযুক্ত লেকহেড স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা রেজোয়ান হারুন লন্ডন থেকে তিন দিন আগে ঢাকায় এসে লাপাত্তা হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টায় এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকায় আসেন তিনি। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ইমিগ্রেশন পার হয়ে যান। রেজোয়ানের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদে অর্থায়ন ও মদদের অভিযোগ রয়েছে।
তিনি জঙ্গিবাদে মদদ দেওয়া ঢাকার লেকহেড গ্রামার স্কুলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এই স্কুলে আলোচিত অনেক জঙ্গি বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকতা করেছেন। আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, নব্য জেএমবি ও হিজবুত তাহরীরের কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল রেজওয়ানের।
শনিবার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, শীর্ষ জঙ্গি রেজওয়ান দেশে ফিরেছে শুনেছি, সে কোথায় আছে তা আমরা দেখছি।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি রেজওয়ান। চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিবেদনে রেজওয়ান হারুনকে আইনের আওতায় আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ওই চিঠির আলোকে চলতি বছরের ৬ ফেব্রæয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে উপ-সচিব হাবিব মো. হালিমুজ্জামান স্বাক্ষরিত একটি নির্দেশনা দিয়ে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, পুলিশ সদর দপ্তর ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়।
সূত্রটি আরো জানায়, রেজওয়ান হারুন বাংলাদেশি দু’টি পাসপোর্ট একসঙ্গে ব্যবহার করতেন। তার একটি পাসপোর্ট নাম্বার বিএইচ-০৬৩৪১৩৭। ২০১৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ইস্যু হওয়া এই পাসপোর্টের মেয়াদ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সাল পর্যন্ত। এছাড়া তার আরেকটি পাসপোর্ট নম্বর ৬০১৬৯৩৩। ২০১২ সালের ১২ নভেম্বর ইস্যু হওয়া এই পাসপোর্টটি চলতি বছরের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ রয়েছে।
রেজওয়ান হারুনের বিরুদ্ধে ঢাকার সামুরাই কনভেনশন সেন্টারে প্রচলিত ইসলামী রীতির বিরুদ্ধে গিয়ে একদিন আগে ঈদের জামায়াত আদায়, বাসায় জুম্মার নামাজ আদায় করার রীতি প্রচলনের চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। ২০০৬ সালে ধানমন্ডির ৬/এ সড়কে প্রতিষ্ঠিত হওয়া লেকহেড গ্রামার স্কুলের বিরুদ্ধে জঙ্গি তৎপরতায় ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই স্কুলের বনানী ও গুলশানে আরও দু’টি শাখা রয়েছে। প্রতিষ্ঠাকালীন এই স্কুলের অধ্যক্ষ ছিলেন জেনিফার আহমেদ, যিনি বাংলাদেশে হিযবুত তাহরীর সংগঠিত করার অন্যতম প্রধান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গোলাম মাওলার স্ত্রী। জেনিফার নিজেও হিযবুত তাহরিরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০০৯ সালে হিযবুত তাহরীর নিষিদ্ধ হওয়ার পর এই স্কুল প্রথম আলোচনায় আসে। ওই বছরই এই স্কুল পরিচালনার পূর্ণ দায়িত্ব নেন হারুন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের কর্ণধার হারুন অর রশিদ ও তার ছেলে রেজওয়ান হারুন। তিনি বেশিরভাগ সময় লন্ডনে থাকলেও চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি থেকে প্রকাশ্য চলাফেরা বন্ধ করে আত্মগোপন চলে যান। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বৃহস্পতিবার দেশে এসে গা ঢাকা দিলেন।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, রেজওয়ানের সঙ্গে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের আধ্যাত্মিক নেতা কারাবন্দি জসিমউদ্দিন রাহমানী, আনসারুল্লাহর আরেক শীর্ষনেতা রেজওয়ানুল আজাদ রানা, পাকিস্তানে  গ্রেপ্তার হওয়া বাংলাদেশি জঙ্গি ইফতেখার আহমেদ সনি, জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে অভিযুক্ত ও নিখোঁজ হওয়া ফারজাদ হক তুরাজ, জুবায়েদুর রহমান, তাসনুভা হায়দার, ইয়াসিন তালুকদার, আরিফুর রহমানের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তারা সবাই বিভিন্ন সময়ে রেজওয়ান হারুনের লেকহেড গ্রামার স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। এমনকি হলি আর্টিজানে হামলাকারীদের প্রশিক্ষণদাতা সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জাহিদুল ইসলামও লেকহেড গ্রামার স্কুলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করতেন। গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর রূপনগরে জঙ্গিবিরোধী এক অভিযানে জাহিদ মারা যায়।
একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, রেজওয়ানই প্রথম নর্থ-সাউথসহ উচ্চবিত্ত পরিবারের তরুণদের জঙ্গিবাদে মোটিভেটেড করার কাজ শুরু করেন। তার নির্দেশনায় কায়াকুশিন নামে একটি মার্শাল আর্ট শেখার প্রতিষ্ঠানে জঙ্গিরা প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকে। ওই প্রতিষ্ঠানে মার্শাল আর্ট শিখতে গিয়েই সর্বশেষ মাস তিনেক আগে বনানীর বাসিন্দা সাঈদ আনোয়ার খাঁন নামে এক তরুণ নিখোঁজ হয়েছে। রেজওয়ান ব্রিটেনে থাকা অবস্থায় জামায়াতুল মুসলেমিন নেতা আবু ইসা আল রাফাই (জর্ডান থেকে ব্রিটেনে বসবাসকারী) এর মাধ্যমে জঙ্গিবাদে মোটিভেটেড হয়। ২০০২ সাল থেকে বাংলাদেশে সে জামায়াতুল মুসলেমিন সংগঠিত করার কাজ শুরু করে। আল-কায়েদার অনুসারী জামায়াতুল মুসলেমিন বাংলাদেশে উচ্চবিত্ত তরুণদের দলে ভেড়ানো শুরু করে। জামায়াতুল মুসলেমিন প্রথমে দেশের ১৩ জেলায় তাদের কার্যক্রম শুরু করে। সর্বশেষ জামায়াতুল মুসলেমিনের আমির ছিলেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. রেজাউর রাজ্জাক। রেজওয়ান হারুন ও রেজাউর রাজ্জাক মিলে আরসিইউডি পরিচালনার নামে জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গত বছরের ১ জুলাই গুলশানে হলি আর্টিজানে হামলার পর ড. রেজাউর রাজ্জাক মালয়েশিয়া পালিয়ে যান। জঙ্গিদের অর্থ যোগানদাতা ভয়ঙ্কর এই মাস্টারমাইন্ড জঙ্গি নেতা তিনি।



 

Show all comments
  • jahir ১৫ মে, ২০১৭, ১:২৪ পিএম says : 0
    joto druto somvob desh theke jongi mukto kora houk
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: জঙ্গি

৬ এপ্রিল, ২০১৮
২৭ মার্চ, ২০১৭

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ