Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২৭ মে ২০১৭, ১৩ জ্যৈষ্ঠ , ১৪২৪, ৩০ শাবান ১৪৩৮ হিজরী

‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ এবং আমাদের আঞ্চলিক বাস্তবতা

উপ-সম্পাদকীয়

| প্রকাশের সময় : ১৭ মে, ২০১৭, ১২:০০ এএম

জামালউদ্দিন বারী : পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতি যখন পশ্চিমাদের হাতছাড়া হতে বসেছে, তখন এশিয়ার পুরনো অর্থনৈতিক শক্তিগুলো চীনের নেতৃত্বে এক যুগান্তকারি পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। দুই হাজার বছর আগে চীনের জিয়ান থেকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ও রোমান সাম্রাজ্য পর্যন্ত যে সুসমৃদ্ধ বাণিজ্য পথ গড়ে উঠেছিল  আরো ব্যাপক পরিসরে তার পুনরুজ্জীবনই চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মূল লক্ষ্য। খৃষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে বিশেষত: সিল্ক বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে চীনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সময়টাকে চীনের প্রাচীন ইতিহাসে গোল্ডেন এজ বা স্বর্ণযুগ নামে অভিহিত হয়। দুই হাজর বছর পেরিয়ে এসে চীন তার সেই হারানো সিল্ক রুট, কানেক্টিভিটি ও অর্থনৈতিক নেতৃত্বকে পুন:প্রতিষ্ঠিত করতে চায় বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মধ্য দিয়ে। শুধু এশিয়া প্যাসিফিক রিজিয়নেই নয়, সাম্প্রতিক বিশ্বের অর্থনৈতিক ইতিহাসে চীনের সিল্করোড যা’ ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ (ওবিওআর) সবচে বড় ও সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে। এমনই সময় এই উচ্চাভিলাষি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে যখন একদিকে বিশ্বায়িত রাজনৈতিক অর্থনীতিতে পশ্চিমা অর্থনৈতিক সাম্প্রাজ্যবাদ চীনের বাণিজ্যিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার কাছে মার খাচ্ছে। অন্যদিকে দক্ষিন এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক এক নতুন কৌশলগত অবস্থান গ্রহন করেছে, সেই সাথে  চীন-ভারত-পাকিস্তানের ট্রায়াঙ্গেল ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক ও বৈরিতা নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। তবে চীনা সিল্ক রুটের সম্ভাবনা থেকে চীন কাউকেই বাদ বা বাইরে রাখতে চায়না। দি সিল্ক রোড ইকোনমিক বেল্ট অ্যান্ড দি টুয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি মেরিটাইম সিল্ক রোডের এই নেটওয়ার্কে চীনের সাথে পারস্য, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের দক্ষিন এশিয়ার প্রায় সব সব দেশই যুক্ত হতে যাচ্ছে। চীন ইতিমধ্যে তার আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দি ভারতকেও এই ইনিশিয়েটিভে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বল এখন ভারতের কোর্টে। এই মুহুর্তে কাশ্মিরে এক অভূতপূর্ব উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে আরেকটি সীমান্তযুদ্ধের আশঙ্কা তৈরী হয়েছে। তবে গত বছরের শেষদিকে এবং চলতি বছরের জানুয়ারীতে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সেনা ছাউনিতে হামলাকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তান আরেকটি যুদ্ধের মুখোমুখি দাড়িয়েছিল। সে সময় ভারতের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে একঘরে করে ফেলার ঘোষনা দেয়া হয়েছিল। তবে চীনের রোড এন্ড বেল্ট লিঙ্কে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশগ্রহন ছাড়াও পাকিস্তানকে নিয়ে চীনের সিপিইসি বা চীন পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর পাকিস্তানকে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পথে নিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানের অবকাঠামো ও জ্বালানীখাতে শত শত কোটি ডলারের চীনা বিনিয়োগ পাকিস্তানকে একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার সংকট থেকে এই সম্ভাবনাময় মহাসরনিতে তুলে দিচ্ছে। সেখানে ভারত এখনো দিশাহীন ও অনিশ্চয়তার দোলাচলে অবস্থান করছে। খোদ ভারতীয় বিশ্লেষকদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, পাকিস্তানকে একঘরে করতে গিয়ে ভারত নিজেই যেন একঘরে হয়ে পড়ছে।
 পুঁজিবাদের আধিপত্যবাদি নীতি কৌশলের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বে অর্থনৈতিক শক্তি-সামর্থ্য ও পুঁজি বিনিয়োগই যখন ভূ-রাজনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে তখন বিশাল চীনের অর্থনৈতিক বুমিং এবং প্রযুক্তি ও শিল্পবাণিজ্যের আধিপত্যকে খোদ পশ্চিমা ও মার্কিনীদেরও মেনে নিতে হচ্ছে। সেখানে ভারতের নিজস্ব খন্ডিত চিন্তা ও আশঙ্কা গৌণ বিষয় হয়ে দাড়ায়। যেখানে ভারত রাজনৈতিক অর্থনৈতিকভাবে পাকিস্তানকে একঘরে করে ফেলার কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছিল, সেখানে চীনের বিশাল পুঁজি ও উচ্চাভিলাষি বাণিজ্যিক-অর্থনৈতিক প্রকল্পের তোড়ে ভারতকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়তে হচ্ছে। এ সপ্তাহে চীনের রাজধানী বেইজিং-এ অনুষ্ঠিত হল রোড অ্যান্ড বেল্ট ইনিশিয়েটিভ ফোরামের দু’দিন ব্যাপী সম্মেলন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ সহ বিশ্বের প্রায় ৩০টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে চীনা প্রেসিডেন্ট ওবিওআর প্রকল্পে ১২৪বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ঘোষনা করেন। নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিকল্পনার আওতায় একসঙ্গে এত বড় বিনিয়োগ প্রস্তাব বাস্তবায়নের ক্ষমতা এই মুহুর্তে চীন ছাড়া আর কোন দেশের নেই বললেই চলে। চীনের এই অর্থনৈতিক সামর্থ্য আঞ্চলিক উন্নয়ন ও সহযোগিতা বৃদ্ধিতে কাজে লাগানোর রোড ও বেল্ট ইনিশিয়েটিভকে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশী কাজে লাগাতে পারে। বর্তমান সরকারের ভারতমুখী পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের এই সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে যে সব আশঙ্কা ঘুরপাক খাচ্ছে, তা থেকে সরকার বেরিয়ে আসবে বলেই জাতি প্রত্যাশা করে।  ভারত যোগ না দিলেও দু’দিনের বেইজিং সামিটে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা যোগ দিয়ে দেশবাসির কাছে সে ম্যাসেজ দিয়েছে সরকার। বেইজিংয়ে বেল্ট অ্যান্ড রোড ফোরামের সম্মেলনে চিনা প্রেসিডেন্ট বলেছেন, বিনিয়োগ হল অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ সম্পর্কে তিনি আরো বলেন, উদ্যোগ চীনের, তবে উন্নতি সবার। প্রাচীন চীনের সিল্ক রোডকে সামনে রেখে এই প্রকল্প গৃহিত হলেও দক্ষিন এশিয়া, রাশিয়া, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আফ্রিকা এমনকি আমেরিকা পর্যন্ত এই রুটকে সম্প্রসারিত করার সুযোগ রয়েছে বলে চীনা নেতা উল্লেখ করেছেন। এমনকি চীন থেকে ইউরোপ হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত দ্রুতগতির রেল যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রস্তাবও ইতিমধ্যে আলোচনায় উঠে এসেছে। ভারতের পক্ষ থেকে এই প্রকল্পে চীনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা করা হলেও চীনা প্রেসিডেন্ট সাবেক আমলের শত্রুতা শত্রুতা খেলা বন্ধ করে নেটওয়ার্কভুক্ত সব দেশের জনগনের ভাগ্যন্নোয়নের মহৎ লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। বিশ্বের সবচে জনবহুল এবং ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের দেশ হিসেবে ভারতীয় উপমহাদেশের দেশগুলো বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সাথে সমতাভিত্তিক অংশিদারিত্ব গ্রহনের মধ্য দিয়ে ঐক্যবদ্ধ হলে বিশ্ব অর্থনীতি এশীয় আধিপত্যের যুগে প্রবেশ করবে। ভারতের মত বৃহৎ আঞ্চলিক শক্তি এ ধরনের উদ্যোগ থেকে নিজেকে বিরত রাখলে তা হবে খুবই দু:খজনক। অনেক মতপার্থক্য ও স্বার্থদ্বন্দ সত্বেও ইউরোপীয় শক্তিগুলো আঞ্চলিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক উদ্যোগকে সামনে রেখে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইউরোপের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক আধিপত্য ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছে। আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ ও সহযোগিতার সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছে। আসিয়ানভুক্ত দক্ষিনপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোও গত তিন দশকে নিজেদের মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা বৃদ্ধি ও বৈষম্য কমিয়ে আনার লক্ষ্যে অনেকটাই সফল হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দক্ষিন এশিয়ার সার্কভুক্ত দেশগুলো দু:খজনকভাবে ব্যতিক্রম। এখানেও ব্যর্থতার মূল কারণ খুঁজতে গেলে অভিযোগের আঙুল ভারতের দিকেই যাবে। তবে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে ভারত না গেলে তা’ ব্যর্থ হয়ে যাবে, নাকি ভারতই তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভাবনার সুযোগ হারাবে, তার প্রিডিকশন করা খুব কঠিন নয়।
দক্ষিন এশিয়ার ৭টি রাষ্ট্র নিয়ে সার্ক নামক আঞ্চলিক ফোরাম গঠনের মূল উদ্যোক্তা ছিল বাংলাদেশ। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের এই প্রস্তাবকে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর কেউ অগ্রাহ্য করতে পারেনি। জিয়ার অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর প্রেসিডেন্ট এরশাদ সার্কের উদ্যোগকে সামনে এগিয়ে নেন। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভূটান ও মালদ্বীপের পর আফগানিস্তান সার্কের সদস্য হওয়ার পর এ আঞ্চলিক সংস্থার সম্ভাবনা বেড়ে গিয়েছিল। যদিও শুরু থেকেই সার্ক নিয়ে ভারতের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবোধক ও সন্দেহজনক। সার্কের গত সাড়ে তিন দশক এবং ভারতের সাথে তার প্রতিবেশিদের দ্বিপাক্ষিক সমস্যাগুলোর সমাধানের প্রশ্নে এখন আর কারো বুঝতে বাকি নেই যে, আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ভারত তার প্রতিবেশীদের সাথে সার্বভৌম সমতাভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ইচ্ছুক নয়। পারমানবিক ক্লাবের সদস্য হলেও অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে পাকিস্তান ভারতের শত্রæ বা শক্ত প্রতিদ্বন্দি হতে পারে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। তবে গত শতাব্দীর ইতিহাসে যে সব দেশ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে তারা তাদের নিকটতম প্রতিবেশিদের আস্থা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়েই তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম জনবহুল ও দারিদ্র্যপীড়িত দেশ ভারতই সম্ভবত: বিশিষ্ট ব্যতিক্রম। ভারতের নিকট প্রতিবেশিরা ভারতের জন্য অনেক ছাড় দিলেও ভারত তার বিনিময়ে প্রত্যাশিত ছাড় দেয়ার উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেনি। ভারত-পাকিস্তান, ভারত-বাংলাদেশ, ভারত-শ্রীলঙ্কা, ভারত-নেপাল এমনকি ভারত-ভূটানের মধ্যকার সাম্প্রতিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানপোড়েন বিশ্লেষন করলেই সেই সত্য বেরিয়ে আসবে। কাশ্মির ও উত্তর ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং সারা ভারত জুড়ে সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা প্রত্যক্ষ করলে দেখা যায়, এমনকি ভারতের আভ্যন্তরীণ সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতেও ব্যর্থ হচ্ছে ভারতীয় নীতি নির্ধারকরা।
মূলত পাকিস্তানকে একঘরে করে রাখার লক্ষ্য নিয়ে ভারত সার্কের প্রটৌকল অকার্যকর করার পাশাপাশি একাধিক উপাঞ্চলিক জোট গঠনের উদ্যোগ গ্রহন করেছে।  সাম্প্রতিক সময়ে ২০১৪ সালে নেপালে অনুষ্ঠিত সার্কের ১৮তম সম্মেলন কার্যত ব্যর্থ হওয়া এবং ২০১৬ সালে পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় ১৯তম সার্ক সম্মেলন ভন্ডুল হওয়ার জন্যও দায়ী পাক-ভারত বৈরীতা ও অনাস্থার সম্পর্ক। আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রসমুহ প্রসারিত করতে বড় শক্তি হিসেবে ভারতের কাছে যে ধরনের কুশলী ভূমিকা প্রত্যাশা করা হয় ভারত বরাবরই তা গ্রহন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ভারতের একরৈখিক স্বার্থপরতার নীতির কারনে এমনকি ভারতের গৃহিত উপাঞ্চলিক উদ্যোগগুলোও সাফল্য লাভ করতে পারছেনা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ বা প্রতিবেশীদের সাথে অগ্রাধিকার ভিত্তিক সুসম্পর্ক গড়ে তোলার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহনের পরও পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে ভারতের প্রস্তাবিত চারজাতির(বাংলাদেশ, ভূটান,ইন্ডিয়া নেপাল) বিবিআইএন বা স্থল যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগে শেষ পর্যন্ত ভূটানের মত ল্যান্ডলক্ড দেশ র‌্যাটিফাই না করায় তা’ পুনর্বিবেচনা করতে হচ্ছে। ২০১৪ সালে কাঠমন্ডুতে অনুষ্ঠিত সার্ক সম্মেলনে ভারতের আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের প্রস্তাব পাকিস্তানের ভেটোতে নস্যাৎ হয়ে যাওয়ার পর ভারত বিবিআইএন ইনিশিয়েটিভ গ্রহন করেছিল। মূলত: ভারতীয় স্বার্থের এই প্রকল্পে বাংলাদেশ ও নেপালের ক্ষমতাসীনরা নিজেদের স্বার্থের দিকে না তাকিয়ে বড় প্রতিবেশির সাথে সুসম্পর্ক রাখার নীতি গ্রহন করলেও ভূটানের পার্লামেন্টে উচ্চকক্ষে এর পক্ষে সমর্থন না থাকায় তা নাকচ হয়ে যায়। ভূটানের বিরোধিদল মূলত সে দেশের ট্রাক-লরি চালকদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে এই সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের প্রস্তাবকে মেনে নেয়নি। নিজ দেশের স্বার্থের প্রশ্নে বৃহৎ প্রতিবেশির চাপের কাছে আপস না করতে ভূটানের পার্লামেন্টের এই সিদ্ধান্ত থেকে আমাদের সরকার এবং রাজনীতিবিদদের অনেক কিছু শিক্ষনীয় আছে। ভারতের স্থল ও নৌ-ট্রানজিট- করিডোর সুবিধা দিতে গিয়ে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা উত্তর-পূর্ব ভারতে রফতানী বাণিজ্যের সম্ভাবনা হারাচ্ছে। আর এই সুবিধা নিয়ে ভারত তিনভাগের একভাগ সময় এবং অর্থব্যয়ে ভারতের এক অংশ থেকে আরেক অংশে পণ্য পরিবহনের সুযোগ নেয়ার পরও বাংলাদেশকে ন্যুনতম মাশুল থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে। অথচ এই ট্রানজিট সুবিধা কার্যকর রাখতে বাংলাদেশকে হাজার হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন ও সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে হচ্ছে। ভূটানের মত বাংলাদেশের পার্লামেন্ট এ নিয়ে আলোচনা বা দ্বিমত পোষনের ক্ষমতাও যেন রাখেনা। এমনকি নিরাপত্তাচুক্তির মত ভারতের সাথে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও বিতর্কিত চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের পার্লামেন্টে চুক্তির আগে বা পরে এক মিনিটের আলোচনাও হয়নি। কাগজে কলমে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র থাকলেও গণতান্ত্রিক রাজনীতি এবং সকলের অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে কার্যকর পার্লামেন্ট গঠিত না হওয়ায় সরাসরি লাভবান হচ্ছে ভারত। প্রতিবেশি দেশগুলোতে গণতন্ত্র না থাকলে যদি হাতে হাতে সুফল পাওয়া যায়, তবে বড় প্রতিবেশি বা পরাশক্তিরা ছোট দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঠিক উন্নয়ন কেন চাইবে? আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এখনো পূর্বাবস্থায় রয়ে গেছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আমাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকেও কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। এহেন বাস্তবতায় আগামী নির্বাচন আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনগনের প্রত্যাশিত উন্নয়নের রোডম্যাপ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের নিয়ামক হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ভারত বিরত থাকার পরও ( ১২ -১৪ মে)বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ফোরাম সামিটে যোগদান এবং  চীনের ওয়ান বেল্ট,ওয়ান রোড ইনিশিয়েটিভে বাংলাদেশের অংশগ্রহনের সম্ভাবনা থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন পথরেখার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। শ্রীলঙ্কা, নেপালসহ সার্কের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বেশীভাগ চীনের সিল্করোডে যুক্ত হতে যাচ্ছে বলে জানা যায়। চীনের শত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এবং ৪ থেকে ৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য সম্ভাবনার রোডম্যাপ থেকে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার সুযোগ নেই। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশ খুব শীঘ্রই তার পূর্বমূখী কানেক্টিভিটির প্রস্তাবনাসমুহ বাস্তবায়নের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহন করবে, এটা জাতির সুর্দীঘ সময়ের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা।     
bari_zamal@yahoo.com

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।