Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ০৭ আশ্বিন ১৪২৪, ০১ মুহাররম ১৪৩৮ হিজরী
শিরোনাম

স্বর্ণ ব্যবসায় ভ্যাট ট্যাক্সে শুভঙ্করের ফাঁকি

| প্রকাশের সময় : ২০ মে, ২০১৭, ১২:০০ এএম

চোরাচালানের জোগান জেনেও ভ্যাট ট্যাক্স নিচ্ছে এনবিআর  মাসোহারার বিনিময়ে চার ভাগের এক ভাগ দিলেই চলে
বিশেষ সংবাদদাতা : দেশের স্বর্ণের বাজারের বড় অংশের জোগান আসে চোরাচালানের মাধ্যমে। এই তথ্য জেনেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ভ্যাট ও ট্যাক্স নিচ্ছে। এই ভ্যাট ট্যাক্স নির্ধারণের মধ্যে রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি। এতে করে এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ শুল্ক কর্মকর্তাদের পেট ভারী হলেও সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। জুয়েলারী ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জুয়েলারী দোকানের বিক্রিত রশীদ দেখে যে পরিমাণ ভ্যাট আসে তার চারভাগের একভাগ দিলেই চলে। বাকী তিনভাগ না দেয়ার জন্য মাস শেষে মাসোহারা দিতে হয় দুর্নীতিবাজ শুল্ক কর্মকর্তাদের। মার্কেট ও এলাকাভদে এই মাসোহারা তোলার জন্য ক্যাশিয়ার নিয়োগ করা আছে। আলাপকালে স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমিতির এক নেতা বলেছেন, দেশে স্বর্ণ বৈধ না অবৈধভাবে আসে সে বিষয়ে এনবিআরের সদস্যরা কখনও কোনও প্রশ্ন তোলেননি। ওই নেতা  বলেন, স্বর্ণ যেভাবে আসুক, ভ্যাট  ও ট্যাক্স পরিশোধের জন্য এনবিআরের কর্মকর্তা  বলেছেন। এত দিন স্বর্ণের উৎস সম্পর্কে আমাদের কোনও প্রশ্ন করা হয়নি। ফলে ব্যবসায়ীদের অনেকেই কমবেশি সুবিধা নিয়েছেন। তিনি বলেন, একদিকে স্বর্ণের দোকান থেকে সরকার ভ্যাট ট্যাক্স নিচ্ছে, অন্যদিকে আমাদের স্বর্ণকে অবৈধ বলছে। আমাদের স্বর্ণ যদি অবৈধ হয়, তাহলে ভ্যাট-ট্যাক্স নেওয়া হয় কেন? এ প্রসঙ্গে এনবিআর-এর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, চোরাচালান থেকেও ব্যবসায়ীরা কালেকশন করে, আবার ১০০গ্রাম করে স্বর্ণ আনার যে সুযোগ আছে, সেখান থেকেও কালেকশন করে। স্বর্ণের বাজারটা মূলত অস্বচ্ছ। এটাকে স্বচ্ছ করতে হলে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে উদ্যোগ নিতে হবে। অনুসন্ধানে এই ভ্যাট ট্যাক্স নিয়ে শুভঙ্করের ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে।
কয়েকজন জুয়েলারী ব্যবসায়ীর সাথে এ বিষয়ে কথা বললে তারা জানান, ভ্যাট ট্যাক্স নিয়ে ফাঁকি তো আছেই। কেউই নিয়ম মেনে ভ্যাট ট্যাক্স দেয় না। মাস শেষে বিক্রির রশীদ দেখে শুল্ক বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভ্যাট নির্ধারণ করেন। সেই ভ্যাট থেকে চার ভাগের একভাগ দিলেই চলে। বিনিময়ে তাদেরকে মাস শেষে মোটা অঙ্কের মাসোহারা দিতে হয়। এই মাসোহারা নির্ধারণ করা হয় বিক্রিত টাকার উপর। নাম প্রকাশ না করে জুয়েলারী দোকানের এক কর্মচারী বলেন, দেখা যায়, বিক্রির টাকার উপর ভ্যাট আসলো ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। সেখান থেকে ৩০ হাজার টাকা সরকারের খাতে জমা নেন শুল্ক কর্মকর্তারা। এই সুযোগ দেয়ার জন্য মাসে মাসে তাদেরকে মাসোহারা দিতে হয়। জানা গেছে, এই মাসোহারা তোলার জন্য জুয়েলারী ব্যবসায়ী বা জুয়েলারী দোকানের কোনো বিস্তস্ত কর্মচারীকেই ক্যাশিয়ার নিয়োগ করা হয়। তারা মাস শেষে মাসোহারার টাকা তুলে যথাস্থানে পৌঁছে দিয়ে আসে। বায়তুল মোকাররম মার্কেটের হয়ে ক্যাশিয়ারের কাজ করেছেন এমন একজন জানান, তিনি নিজেও বহুবার টাকা তুলে পৌঁছে দিয়ে এসেছেন। জুরাইনের এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী জানান, ওই অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ভ্যাট কর্মকর্তারা তার দোকান পরিদর্শন করে একটা অঙ্ক নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই অঙ্কটা ছিল তুলনামূলক বেশি। এরপর তিনি ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে সেই অঙ্ক অনেকাংশে কমে আনতে সক্ষম হন। বিনিময়ে এখন তাকে প্রতিমাসে মাসোহারা দিতে হয়। জুয়েলারী ব্যবসায়ীরা জানান, ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকির এ বিষয়টি অনেকটা ওপেন সিক্রেট। শুধু জুয়েলারী ব্যবসার ক্ষেত্রে নয়, খাবারের দোকানগুলোতেও এমনই কায়দার শুভঙ্করের ফাঁকি চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এতে করে এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ শুল্ক কর্মকর্তার আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হলেও সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।  এদিকে, আপন জুয়েলার্স থেকে স্বর্ণ জব্দকে কেন্দ্র করে এসব বিষয় খোলাসা হতে শুরু করেছে। এনবিআর-এরও টনক নড়েছে। জানা গেছে, দুদিন আগে ঢাকার সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভ্যাট সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে কাস্টম, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট-এর কাছে চিঠি দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে এনবিআরের নির্দেশিত ছকে ভ্যাট সংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠিতে ভ্যাট কমিশনারেটদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, আপনাদের অধিক্ষেত্রভুক্ত জুয়েলারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর গত তিন বছরের ভ্যাট সংক্রান্ত তথ্য আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে এনবিআরে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হলো। এছাড়া আপনার অধিক্ষেত্রভুক্ত হীরক বা অন্য কোনো মূল্যবান পাথর ব্যবসায়ী ( যেমন: ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড, গীতাঞ্জলি ইত্যাদি) আছে কি না? থাকলে ওই হীরক বা অন্য মূল্যবান পাথর ব্যবসায় ব্যবহৃত পণ্যের উৎস কি, তা জানানোর জন্য অনুরোধ করা হলো। একই সঙ্গে আপনার অধিক্ষেত্রভুক্ত জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রীত গহনায় ব্যবহৃত হীরক ও অন্য মূল্যবান পাথরের উৎস কি, তা জানানোর জন্য অনুরোধ করা হলো। এ বিষয়ে এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, মূলত গত তিন বছরে জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা কি পরিমাণ ভ্যাট দিয়েছে তা জানার জন্যই এই উদ্যোগ। এছাড়া তাদের ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা প্যাকেজ ভ্যাট দিয়েছে। কর্মকর্তারা  জানান, এ উদ্যোগের মাধ্যমে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের ভ্যাট ফাঁকির প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে।
এনবিআর সূত্র জানায়, এটা জানতে চাওয়া হয়েছে প্রকৃত চিত্রসহ এ সংক্রান্ত রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগের জন্যই। প্রয়োজনে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ব্যবস্থা অনলাইন করার পাশাপাশি ভ্যাট ফাঁকি বন্ধে জুয়েলারী প্রতিষ্ঠানে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) বসানোর উদ্যোগ নেয়া হবে।

 


Show all comments
  • mohammad ali ২৯ জুন, ২০১৭, ৬:৫৮ পিএম says : 0
    D R SIR, VERY NICE STORY RE.GOLD BUSINESS N ALL R OPEN SECRET. THANKS.
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর