Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭, ০৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী
শিরোনাম

রেণুপোনা উৎপাদনে ভাটা

বিরাট সম্ভাবনাময় শিল্পে নানা সমস্যা ও সঙ্কট বাসা বেধেঁছে

| প্রকাশের সময় : ২০ মে, ২০১৭, ১২:০০ এএম

০ উৎপাদনের সূতিকাগার যশোরের হ্যাচারীতে চরম মন্দাভাব
০ প্রাকৃতিকভাবে রেণু আহরণ কমেছে নদ-নদীর পানিশূন্যতায়
০ রেণু উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রভাব পড়বে মাছের উৎপাদনে
মিজানুর রহমান তোতা : নদ-নদী, খাল-বিলে পানি নেই। প্রাকৃতিকভাবে মাছের রেণুপোনা আহরণ হচ্ছে না বললেই চলে। মাছের উৎপাদন ধরে রাখার জন্য বিকল্পপন্থায় শূন্যস্থান পুরণ করে থাকে হ্যাচারী ও নার্সারী। রেণুপোনা উৎপাদনের সূতিকাগার যশোরে সারাদেশের মোট চাহিদার ৬৫ভাগ উৎপাদন হয়। বিস্ময়কর সাফল্য দেখিয়ে শীর্ষস্থানে পৌঁছায় যশোর। একটি এলাকা পরিচিতি পায় মাছপাড়া। সেখানে বর্তমানে নানা সঙ্কট ও সমস্যা বাসা বেধেঁছে। ভাটা পড়েছে রেণুপোনা উৎপাদনে। বিরাজ করছে চরম মন্দাভাব। রেণুপোনা উৎপাদন ব্যাহত হলে অসাভাবিকভাবেই দেশে মাছের উৎপাদন কমে যাবে। অথচ গুরুত্বপুর্ণ খাতটি অবহেলিত। আমিষের চাহিদা পুরণ ও জাতীয় অর্থনীতিতে বিরাট ভুমিকা রাখা যশোরের মাছপাড়ার নার্সারী ও হ্যাচারী দিনে দিনে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সমস্যা সমাধানে ও নানামুখী সংকট উত্তরণে বিশাল কর্মযজ্ঞের খাতটিতে সরকারীভাবে যথাযথ দৃষ্টি দেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ।
যশোর জেলা মৎস হ্যাচারী মালিক সমিতির সভাপতি ফিরোজ খান দৈনিক ইনকিলাবকে জানান, মোদ্দাকথা হ্যাচারীতে রেণুপোনা উৎপাদন না হলে মাছ হতো দুস্প্রাপ্য। নদ-নদী, খাল বিল পানিশূন্য, প্রাকৃতিকভাবে আহরণ হচ্ছে না রেণুপোনা। যশোরে মাছের রেণু পোনা উৎপাদনের রেকর্ড ছিল পরিশ্রমের ফল। কোন তত্ত¡ বা প্রযুক্তি জ্ঞান নয়। বাস্তব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অর্থনীতির চেহারা বদলে দেন যশোরের রেণুপোনা উৎপাদনকারীরা। ৩বছর আগেও হ্যাচারীর সংখ্যা ৮২ টি। বর্তমানে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৪টিতে। আর নার্সারির সংখ্যাও ৩শতাধিক থেকে হয়েছে ১শ’৬০টি। চালু নার্সারী ও হ্যাচারীগুলো টিকে থাকতে পারছে না। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাচ্ছে। তিনি বললেন, মাছের খাদ্য ও মেডিসিনসহ উপকরণের অস্বাভাবিক মূল্যবদ্ধি, সিন্ডিকেট করে খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি করা, উৎপাদন খরচ ও বাজার মূল্যের বিরাট ফারাক, শিল্প হিসেবে বিন্দুমাত্র সুযোগ সুবিধা নেই, হ্যাচারী ও নার্সারীতে বিদ্যুৎ বিল কৃষি রেটে না করাসহ নানা সংকট ও সমস্যা সম্ভাবনাময় শিল্পটিতে ধ্বনিত হচ্ছে অশনী সংকেত।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, মাছের রেণু পোনা উৎপাদনের বিরাট সাফল্যের কারণেই যশোরে একটি মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউট স্থাপিত হয়। যশোর শহরতলী চাঁচড়ার মাছপাড়ার চারিদিকে হ্যাচারীগুলোতে রেণু পোনা উৎপাদনকারী, ক্রেতা ও বিক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় থাকতো প্রতিদিন।  এখনো খাকে তবে কম। যশোরের মিঠা পানির রেণু পোনার কদর রয়েছে দেশের সবখানেই। এখানে উৎপাদিত হয় রুই, মৃগেল, কাতলা, সরপুটি, পাঙ্গাস, গ্রাসকার্প ও সিলভার কার্পসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু পোনা। তাছাড়া ব্রæড ফিস থেকে ডিম ও রেণু পোনা উৎপাদন হয় যশোরের চাঁচড়া মাছপাড়া এলাকায়। মাছপাড়ায় যেন আগের মতো প্রাণ নেই। যারা কোনরকমে টিকে আছে তাদের চোখেমুখে অন্ধকারের ছাপ।
সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, একসময় ৮২টি হ্যাচারী ও ৩শ’ নার্সারীর সঙ্গে যুক্ত শত শত বেকার যুবক আত্মনির্ভরশীল হবার সুযোগ পান। ‘মাছের পোনা-দেশের সোনা’ এই শ্লোগানকে সামনে রেখে যশোরের মাছ চাষীরা বিভিন্ন প্রজাতির রেণু পোনা উৎপাদনে দেশের মধ্যে রেকর্ড গড়তে সক্ষম হন। রজনীগন্ধা ও সবজির মতো রেণু পোনাও দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৬৫ ভাগই উৎপাদন করে যশোর শীর্ষস্থানে পৌছে। অনেক আগে যশোর এলাকার অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। যশোর ছিল অস্ত্রবাজ চরমপন্থী, সন্ত্রাসী ও চোরাচালানীদের অভয়ারণ্য। সবজি, রজনীগন্ধা ও মাছের রেণু পোনা আবাদ ও উৎপাদনে বিরাট সাফল্য আসার কারণে মানুষের আর্থিক চেহারা পাল্টে যায়। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয় একথা সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সুত্র একবাক্যে স্বীকার করেছে। কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ নজর না দেয়ায় দিনে দিনে মুখ থুবড়ে পড়ছে রেণুপোনা উৎপাদন শিল্পটি। অথচ একটু নজর দিলেই শিল্পটি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
জানা যায়, ’৮০ এর দশকে চাঁচড়ায় মাস্টার মহসিন আলী প্রথম শুরু করেছিলেন মাছের রেণু পোনা উৎপাদনে হ্যাচারীর ব্যবসা। সেই সময় ভারত থেকে চোরাইপথে বাংলাদেশে বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মাছের রেণু পোনা আসত প্রচুর পরিমাণে। তখন দেশে স্থানীয়ভাবে রেণু পোনা উৎপাদন হতো না। সূতিকাগার যশোরসহ বিভিন্নস্থানে উৎপাদনে জোয়ার সৃষ্টি হওয়ায় একপর্যায়ে ভারত থেকে রেণু পোনা চোরাচালান বন্ধ হয়ে যায়। কোন সরকারী সাহায্য সহযোগিতায় নয়, নিজেদের মেধা ও যোগ্যতা বাস্তবে কাজে লাগিয়ে যশোরে নার্সারী ও হ্যাচারী প্রতিষ্ঠা হয়। আনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। চাঁচড়ার রেণু পোনা উৎপাদনের অনুকরণ করে জেলার অন্যান্য এলাকায়ও হ্যাচারী গড়ে উঠেছে।
সুত্র জানায়, নদ-নদীতে পানি যখন থৈ থৈ করতো তখন প্রাকৃতিকভাবে পর্যাপ্ত মাছের রেণুপোনা উৎপাদন হতো। তখন নার্সারী ও হ্যাচারীর প্রয়োজন হতো না। বর্তমানে নদ-নদীতে পানি নেই। একসময় কমপক্ষে ৩০হাজার কেজি প্রাকৃিতকভাবে রেণুপোনা আহরণ হতো। এখন বড়জোর আহরণ হয় মাত্র ১২শ’কেজি। অথচ দেশে মোট চাহিদা প্রায় ৪লাখ কেজি রেণুপোনা। প্রায় পুরোটাই সরবরাহ করে নার্সারী ও হ্যাচারী। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি কেজি রেণু পোনা থেকে মাছ উৎপাদন হয় প্রায় ৫ লাখ মাছ। যশোরে এত সমস্যা ও সংকটের মধ্যেও চলতি মৌসুমে আড়াই লাখ কেজি রেণুপোনা উৎপাদনের টার্গেট নেয়া হয়েছে। এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া  উৎপাদনের ভরা মৌসুম চলবে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। গোটা শিল্পটির মন্দাভাব কাটিয়ে সমস্যার সমধান ও নানামুখী সংকট উত্তরণে সরকারীভাবে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিল্পটির সাথে সংশ্লিষ্টরা।


 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর