Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ নভেম্বর ২০১৭, ০৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী

চট্টগ্রামে অপ্রতিরোধ্য মাদক সিন্ডিকেট

ইয়াবা-ফেনসিডিলে সর্বনাশ

| প্রকাশের সময় : ২০ মে, ২০১৭, ১২:০০ এএম

রফিকুল ইসলাম সেলিম : বন্দর নগরীসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামে অপ্রতিরোধ্য মাদক সিন্ডিকেটের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। তাদের দাপটে কার্যত অসহায় প্রশাসন। একের পর বড় চালান উদ্ধার হলেও বন্ধ করা যাচ্ছে না মাদকের আগ্রাসন। বিশেষ করে ইয়াবা আর ফেনসিডিলের জোয়ার কোন ভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে যে পরিমান চালান ধরা পড়ছে তার কয়েক গুন নিরাপদে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
মাদকের ভয়াল আগ্রাসন নতুন প্রজন্মকে ধংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে। মাদক ব্যবসাকে ঘিরে পাড়া, মহল্লা  গ্রামে, গঞ্জে বাড়ছে হানাহানি। মাদকাসক্তির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরাধ প্রবণতাও। পরিবার ও সমাজে বাড়ছে অস্থিরতা। সর্বনাশা মাদকের বিরুদ্ধে সরকারি তরফে জনপ্রতিরোধ কিংবা সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহবানেও তেমন সাড়া মিলছে না। নির্বিকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরাও।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে মাদকের তালিকায় শীর্ষে ইয়াবা ও ফেনসিডিল। এর কোনটাই দেশে তৈরী হয় না। মিয়ানমারের ইয়াবা আর ভারতীয় ফেনসিডিলে সর্বনাশ হচ্ছে বাংলাদেশের। সীমান্ত পথে বানের পানির মতো আসছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ নানা নেশার সামগ্রী। বাংলাদেশকে টার্গেট করে ভারত সীমান্তে গড়ে উঠা ফেনসিডিল কারখানায় তৈরী চালান ঠেলে দেয়া হচ্ছে এপারে। মিয়ানমার সীমান্তে ছোট-বড় অর্ধশত কারখানায় তৈরী ইয়াবার গন্তব্যও বাংলাদেশ। সাগর, পাহাড় আর সড়ক পথে ইয়াবার চালান ঢুকছে দেশে। সীমান্ত পথে আসা এসব মাদকের চালান সিন্ডিকেটের হাত ধরে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে দেশের প্রায় সব এলাকায় মিলছে ইয়াবা, ফেনসিডিল। অথচ এর কোনটাই দেশে তৈরী হয় না। কিন্তু এই মাদকের আগ্রাসন থেকে রেহাই পাচ্ছে না দেশ।
প্রতিদিনই ধরা পড়ছে ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ মাদকের চালান। গত বুধবার রাতে নগরীর প্রবেশ পথ কর্ণফুলী সেতুর দক্ষিণপ্রান্তে মইজ্জ্যার টেকে এক লাখ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ দুই জনকে পাকড়াও করে পুলিশ। টহল পুলিশ নাম্বার প্লেটবিহীন একটি মোটর সাইকেলকে থামার সংকেত দিলে দুই মোটর সাইকেল আরোহী পালাতে শুরু করে। পরে তাদের কাছ থেকে এক লাখ পিস ইয়াবা পাওয়া যায়। গত সোমবার রাতে টেনাফে উদ্ধার করা হয় সোয়া দুই লাখ ইয়াবা। একই দিন নগরীতে চব্বিশ ঘন্টায় ৬ হাজার ইয়াবাসহ ৯ জনকে আট করে পুলিশ। গত মঙ্গলবার ৫ মণ গাঁজা উদ্ধার হয় সীতাকুন্ডে। র‌্যাবের হাতে গত দেড় বছরে প্রায় সোয়া কোটি পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার হয়েছে। এছাড়া বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের অভিযানে প্রতিনিয়ত ইয়াবা ধরা পড়ছে।
এরপরও ইয়াবা সিন্ডিকেটের নেটওয়ার্ক ভাঙা যাচ্ছে না। ইয়াবা পাচারের সাথে জড়িত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় উঠে আসে অনেক রাঘব-বোয়ালের নাম। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। ক্রসফায়ার আর এনকাউন্টারে পাচারকারি চক্রের অনেকে মারাও গেছে। তবে এরপরও মাদক সওদাগরী সিন্ডিকেটের অপতৎপরতা থেমে নেই। সাগর, পাহাড় আর সড়কপথে আসছে ইয়াবার চালান। সাগর পথে সরাসরি মিয়ানমার থেকে ইয়াবার বড় বড় চালান দেশে ঢুকছে।
দেশের সীমান্ত পথে ফেনসিডিলের চালানও আসছে। কুমিল্লা ও ফেনী সীমান্ত হয়ে আসা ফেনসিডিল ও হরেক রকমের কফ সিরাপের চালান ট্রেনে, বাসে কিংবা চোরাকারবারীদের যানবাহনে চট্টগ্রাম আসছে। র‌্যাব-পুলিশ ও বিজিবির অভিযানে প্রায়ই এ ধরনের চালান ধরা পড়ছে। গত ৩ মে নগরীর কদমতলীর মাদক বস্তিখ্যাত বরিশাল কলোনীর মাটির নিচে পাওয়া যায় ২ হাজার ৩০৬ বোতল ভারতীয় ফেনসিডিল। পুলিশ সেখানে বøক-রেইড দিয়ে মাটির নীচে গর্তের ভেতরে আটটি বস্তায় ভরা এসব ফেনসিডিল উদ্ধার করে।
সম্প্র্রতি র‌্যাবের অভিযানে কুমিল্লা থেকে ফেনী হয়ে চট্টগ্রাম আসার পথে ২ হাজার ফেনসিডিলের একটি চালান ধরা পড়ে। চালানের সাথে আটককৃতরা জানায়, ওপার থেকে চালানটি দেশে আসে। গেল বছর যশোর  সীমান্ত থেকে সরাসরি কার্ভাডভ্যান যোগে চট্টগ্রাম আসা কয়েকটি ফেনসিডিলের চালান ধরা পড়ে।
চট্টগ্রাম জেলা ও মহানগর পুলিশের প্রতিটি আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা ও মার্সিক ক্রাইম কনফারেন্সে সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করা হলেও মাদকের বিস্তার রোধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের অসহায়ত্বের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে। প্রায় প্রতিটি সভায় মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান জানানো হয়।
সম্প্রতি চট্টগ্রামে এক সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল স্বীকার করেছেন মাদকের আগ্রাসন বন্ধ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী একা সফল হতে পারবে না। তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের অনুরোধে সাড়া দিয়ে সীমান্তের ফেনসিডিল কারখানা বন্ধ করে দেওয়ায় ফেনসিডিল আসা কমে গেছে। তবে মিয়ানমার অনুরোধে এখনও সাড়া দেয়নি। সে দেশ থেকে ইয়াবা আসা বন্ধ হচ্ছে না। তিনি বলেন, অভিযানে মাদক ধরা পড়ছে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুধু বহনকারিরা ধরা পড়ে।
এসব মামলায় অনেক সময় সাক্ষীও পাওয়া যায় না, অনেকে আবার সাক্ষ্য দিতে আসেন না। তিনি স্বীকার করেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর একার পক্ষে মাদকের এ আগ্রাসন বন্ধ করা সম্ভব নয়। তিনি এর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলারও আহবান জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও কক্সবাজারের জনসভায় কক্সবাজারকে ইয়াবার বদমান মুক্ত করার আহবান জানান। তিনি ইয়াবার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধের ডাক দেন। তবে সরকারের আহবানেও মাদক বিরোধী সামাজিক আন্দোলন হচ্ছে না। সরকারি উদ্যোগে কিছু সভা সমাবেশ আর মাদক বিরোধী র‌্যালীর মধ্যেই তা এখনও সীমিত আছে।

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর