Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ২৯ মে ২০১৭, ১৫ জ্যৈষ্ঠ , ১৪২৪, ০২ রমজান ১৪৩৮ হিজরী

রমনা পার্র্কে প্রাচীন গাছ ঝুঁকিতে মন্ত্রিপাড়া

| প্রকাশের সময় : ২০ মে, ২০১৭, ১২:০০ এএম

পঞ্চায়েত হাবিব : মোগল শাসনামলে স্থাপিত রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী রমনা পার্ক। এ পার্ক ও আশেপাশে মন্ত্রিপাড়া হিসেবে খ্যাত বেইলি রোড, মিন্টো রোড, হেয়ার রোড ও ইস্কাটন এলাকায় রয়েছে কয়েক হাজার মেয়াদোত্তীর্র্ণ (প্রাচীন) বিশালকায় গাছ। এ পুরোনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ গাছগুলো সাম্প্রতিক ছোট-খাটো ঝড়েই ভেঙ্গে পড়ছে।
গত সোমবার ও বুধবার ঢাকার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সামান্য ঝড়েই রমনা পার্ক, বেইলি রোড ও মিন্টো রোডে এ ধরণের মেয়াদোত্তীর্ণ বেশ কিছু গাছ ভেঙ্গে পড়েছে। যা রমনা পার্কের অনেক অবকাঠামো বিশেষ করে এর সীমানা প্রাচীরের ওপর পড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে। সম্প্রতি মন্ত্রিপাড়ায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার বাসায়ও একটি গাছের মোটা কিছু ডাল ভেঙ্গে পড়ে। তবে এতে তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
এ ধরণের বড় ও পুরোনো গাছগুলো ভেঙ্গে সামান্য বাতাসেই ভেঙ্গে পড়ায় ওই এলাকায় বড় ধরনের দুঘর্টনার আশংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে রমনা পার্কের পাশেই ভিভিআইপি সড়ক দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনগুলো যেকোন সময় বড় ধরণের দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে বলেও অনেকে শংকা প্রকাশ করেছেন।
রমনা পার্কের উত্তর ও পশ্চিম অংশটি মন্ত্রিপাড়া হিসেবে খ্যাত মিন্টো রোড, হেয়ার  রোড, বেইলি রোড হিসেবে পরিচিত। এখানেই রাষ্ট্র পরিচালনা অন্যতম নীতিনির্ধারক মন্ত্রিদের বসবাস। পাশেই থাকেন প্রধান বিচারপতিসহ অনেক বিচারকই। এর মাঝ দিয়ে চলে গেছে অন্যতম ব্যস্ত ও ভিভিআইপি সড়ক। এ এলাকায় বাসকারী  প্রায় সব মন্ত্রিই পুরোনো গাছের কারণে নিরাপত্তা ঝুকিতে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে। এদিকে, রমনা পার্কের চারদিকের রাস্তায় পুরাতন গাছ কেটে ফেলার সরকারি উদ্যোগ পরিবেশবাদিদের কারণে বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না বলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। তারা জানিয়েছেন, সরকার এ ধরণের উদ্যোগ নিলেও তা কোনভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি করে ঝড়ে উপড়ে পড়া গাছ অপসারণ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ গাছের বিষয়ে ইতিবাচক কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হলে, তা ক্ষতিগ্রস্ত পথচারীদেও জানমালের ক্ষতি থেকে রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বাংলাদেশ বর্তমানে বজ্রপাতের ঝুঁকিতে রয়েছে। বজ্রপাতজনিত কারণে গত সাত বছরে এক হাজার ৭৪৪ জন ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। এ ধরণের ঘটনার থেকে রক্ষায় বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে দ্রæত ফাকা জায়গা ত্যাগ করা, কোনো ধরনের গাছ-গাছালির নিচে অবস্থান না করা, উচু ভবনের ফাকা ছাদে না থাকা এবং অপেক্ষাকৃত নিচু ঘওে অবস্থান করা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার ফুসফুস বলা হয় ঘনঘাস, লতা-গুল্ম, মৌসুমি ফুল ও নানান ছোট-বড়-মাঝারি গাছে সমৃদ্ধ রমনা পার্ককে। এ পার্কে রয়েছে অতি দুর্লভ প্রজাতির কিছু গাছ। তবে পার্কেও অধিকাংশ গাছই মেয়াদোত্তীর্ণ। এসবের বেশিরভাগের গোড়ায় মাটি নেই এবং ভেতরের অংশ পচে অকেজো হয়ে গেছে। ফলে এগুলোর বেশিরভাগই দাড়িয়ে থাকার শক্তি হারিয়েছে। বড় অনেক গাছেরই শিকড় বেরিয়ে আসছে মাটির ওপরে। ফলে ঝড়ো হাওয়ায় প্রায়ই ভেঙে পড়ছে দুর্লভ এসব গাছ। পার্ক ও এর আশেপাশের এলাকা ঘুরে এবং কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত সোমবার ও বুধবার রাতের ঝড়ে উপড়ে গেছে বড় বড় ১২ থেকে ১৫টি গাছ। গাছ উপড়ে পড়ায় মিন্টো রোডের মন্ত্রিপাড়ার অনেক বাড়ির দেয়াল ভেঙ্গে চুরমার হয়ে পড়ে আছে। ওই রাতে কাকরাইল-পরিবাগ রাস্তা প্রায় তিন ঘন্টা বন্ধ ছিল। অনেক পথচারীও রাস্তাটি চলাচলের জন্য ব্যবহার করতে পারেনি।
শুত্রবার রমনা পার্কে ঘুরতে আসা অনেকেই উপড়ে পড়া গাছের ছবি তুলেছেন মোবাইল ফোনে। কেউ কেউ এসব চিত্র ভিডিও-ও করেছেন। এতে দেখা যায়, উপড়ে পাড়ার তিন-চারদিন হলেও এ রাস্তাগুলোকে চলাচলের উপযোগী করতে পড়ে থাকা গাছগুলো সরানো হচ্ছেনা।
পার্কে হাটতে আসা পথচারি প্রভাষক সালেহা খন্দকার এই প্রতিবেদককে জানান, রমনা পার্কে পরিচর্যাহীনতার কারণে গাছগুলো উপড়ে পড়ছে। তবে অতি পুরনো গাছগুলো কেটে ফেলে সেখানে নতুন গাছ লাগানো গেলে তা একদিকে পার্কটিকে নিরাপদ করবে, অন্যদিকে পার্কটিকে অতি দ্রæতই আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। এ জন্য সরকারের সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে দ্রæতই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
১৬১০ সালে ঢাকায় মোগলদের শাসন পাকাপোক্ত হওয়ার পর বাগানের অনুরাগী মোগলরা এ উদ্যান তৈরি করা হয়েছিল বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রমনা পার্ক। এটি বর্তমানে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন রয়েছে। পার্কের বর্তমান আয়তন ৬৮ দশমিক ৫ একর। এর লেকের আয়তন ৮ দশমিক ৭৬ একর। তখন এর নাম ছিল বাগ-ই-বাদশাহি। এখনকার ইস্কাটন থেকে নীলক্ষেত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সচিবালয় পুরো এলাকাই ছিল রমনা পার্কের চারপাশে। কোম্পানি আমলে রমনার দক্ষিণের একটি অংশে রেসকোর্স প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ডস। একপর্যায়ে ঢাকা থেকে রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হলে রমনা এলাকা ক্রমে জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়ে। মোগল আমলে গড়ে ওঠা রমনা উদ্যান মোগল সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে তার  সৌন্দর্য হারায়। ঔপনিবেশিক যুগে (১৮২৫ সালে) ঢাকার ইংরেজ কালেক্টর মি. ডস ঢাকা নগরীর উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহন করেন এবং কারাগারের বন্দীদের দিয়ে রমনার জঙ্গল পরিষ্কার করে বের করেন ডিম্বাকৃতির একটি অংশ। পরিষ্কার করা অংশটিকে কাঠের রেলিং দিয়ে ঘিরে তৈরি করা হয় রেসকোর্স। ইংরেজদের আমলে এই  রেসকোর্সের উত্তর-পশ্চিমে একটি টিলাঘর তৈরি করে চারপাশে লাগানো হয় গাছ-গাছালি। এই রেসকোর্সকে  কেন্দ্র করেই আবার রমনার আভিজাত্য ফিরে আসে। ১৮৪০ সালের দিকে বিত্তবানেরা এ এলাকায় বাগানবাড়ি করতে থাকেন। পরে নবাব আবদুল গনি এসব বাগানবাড়ির মধ্য থেকে অবসরপ্রাপ্ত জজ জন ফ্রান্সিস গ্রিফিথের বাড়িটি কিনে নেন। এলাকাটিকে তারাই উন্নত করে নাম দেন শাহবাগ। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর  মোগলদের রমনা তিন ভাগ হয়ে যায়। নবাবদের মালিকানায় থাকে শাহবাগ এলাকা। উত্তর দিকে মিন্টো রোডে হয় সিভিল  স্টেশন নামে সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসিক এলাকা। মাঝখানে রেসকোর্স ও বর্তমানের রমনা উদ্যান মিলিয়ে হয় রমনা এলাকা। রেসকোর্সে পাকিস্তান আমলেই আইন করে ঘোড়দৌড় বন্ধ করে দেয়া হয়। বর্তমানের  সোহরাওয়ার্দী উদ্যান একসময় রেসকোর্স ময়দান নামে পরিচিত ছিল। ১৬১০ থেকে ১৮২৪ সাল পর্যন্ত এর নাম ছিল বাগ-ই-বাদশাহি বা বাদশাহি বাগান। ১৯২৫ সালে এ স্থানটি ঘোড়দৌড়ের জন্য বিখ্যাত ছিল। তাই এর নাম হয় রেসকোর্স ময়দান। ১৯৭১ সালে এর নামকরণ হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। ১৯৯৬ সালে এখানে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শিখা চিরন্তন স্থাপন করা হয়। ১৯৯৯ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণকাজ শুরু হয়, যা শেষ হয় ২০১৫ সালে।
স্থপতি ইকবাল হাবিব ইনকিলাবকে বলেন, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।  আমরা কিছুদিন আগে একটি সভা করেছি। সেখানে পার্কের ভিতরে এবং বাহিরে রাস্তায় যে পরাতন গাছ আঝে সে গুলো সরিয়ে নতুন গাছ লাগনোর সুপারিশ করেছি। কিন্তু গৃহায়ণ অধিদপ্তর এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেননি। বড় ধরনের ঝড় হলে অনেক ক্ষতি হবে এবং পথচারীদের প্রাণহানীর মতো ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি আরো বলেন, আমরা বলেছি ঢাকা সিটি করপোরেশনকে এ উদ্যোগ নিতে হবে।

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।