Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ০৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর সুবিধা প্রসঙ্গে

প্রকাশের সময় : ৬ মার্চ, ২০১৬, ১২:০০ এএম

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

ব্যাপক হয়রানি ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা। তারা অতিসামান্য বেতনে  দীর্ঘদিন চাকরি করেছেন। ফলে সঞ্চয় তো দূরের কথা, কোন মতে জীবিকা নির্বাহই তাদের জন্য কষ্টকর। তাই এসব শিক্ষক-কর্মচারীরা যখন অবসরে যান, তখন ফেয়ারওয়েল হিসেবে তাদের পাজামা-পাঞ্জাবি, জায়নামাজ-তসবীহ, টুপি-ছাতা ছাড়া আর কিছুই জোটে না। অনেকটা রিক্তহস্তেই তাদের কর্মস্থল ত্যাগ করতে হয়। অধিকাংশকেই নির্ভর করতে হয় সন্তান-সন্তুতি ও আত্মীয়-স্বজনের উপর। ভাগ্যটা অনুকূল হলে অন্যের গলগ্রহ হয়ে কোন মতে বাকি জিন্দিগিটা কেটে যায়। অন্যথা হলে এসব ভাগ্যবিড়ম্বিত শিক্ষক-কর্মচারীদের দুঃখ-দুর্দশার সীমা-পরিসীমা থাকে না। একদিন যারা জাতিকে আলোর পথ দেখিয়েছেন, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তাদের উপরই নেমে আসে অন্ধকার যা সত্যিই বেদনাদায়ক। বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা অবসরকালীন কিছু অর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকেন। তা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল।  আগের দিনে তাও দেয়া হতো না। সাম্প্রতিক সময়ে দেয়া হচ্ছে। বিষয়টিকে কারো দাক্ষিণ্য বলাটাও পুরোপুরি ঠিক হবে না। কারণ, প্রতিমাসে বেতনÑভাতা থেকে  শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ তহবিলে নির্দিষ্ট হারে অর্থ কর্তন করা হয়। সরকারের পক্ষে এ তহবিলে ভর্তুকি দেয়া হয়। এ তহবিল থেকেই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য অবসরকালীন সুবিধার অর্থ প্রদান করা হয়। এই তহবিল গঠনের শুরুর দিকে অবসরপ্রাপ্তরা ভালোভাবেই তাদের অর্থ ছাড় করাতে পেরেছেন বলেই সকলের জানা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এ অবস্থার মারাত্মক অবনতি হয়েছে। ২০১২ সাল থেকে ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৪২ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী অবসরপ্রহন করলেও তাদের অর্থ ছাড়ের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত সুখবর নেই। ফলে নতুন করে যারা অবসর গ্রহণ করছেন তাদের মধ্যেও  হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে।
গত ডিসেম্বরে একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল আমার। তিনি যা জানালেন তা সত্যিই বেদনাদায়ক। তিনি প্রায় ১ বছর আগে অবসর গ্রহণ করলেও তার অর্থছাড়ের কোন কূলকিনারা তিনি করতে পারেননি। তিনি হতাশার সাথেই জানালেন, তার প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ আরো ১ বছর আগে অবসরগ্রহণ করলেও অর্থছাড়ের কোন সুখবর নেই। আমার এলাকার এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী অর্থছাড়ের বিষয় নিয়ে আমার কাছে জানতে চেয়েছেন। তিনি অবসর নিয়েছেন গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর। তাকে প্রবোধ দেয়ার মতো কোন ভাষা আমার ছিল না। শুধু এতটুকুই বললাম, কাগজ-পত্র ঠিক করেন। একটু সময় লাগলেও পেয়ে যাবেন। তার কথাবার্তার মধ্যেও হতাশা। ২০১২ সালে অবসর নিয়েও এখন পর্যন্ত অর্থ ছাড় করা সম্ভব হয়নি, ২০১৫ সালের ক্ষেত্রে কী হবে-এই নিয়ে তিনি মহাচিন্তায় আছেন।
মনে হয়, একটুখানি সদিচ্ছার অভাবেই হাজার হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক কর্মচারী ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সরকার ও শিক্ষামন্ত্রণালয় একটু সুদৃষ্টি দিলেই এই সমস্যার সমাধান হওয়া খুবই সম্ভব। মূলত শিক্ষকরা জাতির জাগ্রত বিবেক ও মানুষ গড়ার কারিগর। মানুষের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে শিক্ষকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। শিক্ষাকে জাতির মেরদ- বলা হয়। কিন্তু শিক্ষার মেরুদ- যে দেশের শিক্ষক সমাজ এতে কোন সন্দেহ নেই। মনিষীদের ভাষায়, অ সড়ঃযবৎ মরাবং নরৎঃয ঃড় ধ পযরষফ, নঁঃ ধ ঃবধপযবৎ মরাবং ষরভব ঃড় পযরষফৎবহ. মহাকবি মিল্টনের ভাষায়- ঊফঁপধঃরড়হ রং ঃযব যধৎসড়হরড়ঁং ফবাবষড়ঢ়সবহঃ ড়ভ নড়ফু, সরহফ ্ ংড়ঁষ. আর মানুষের দেহ, মন ও আত্মার সমন্বিত উন্নয়নে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তারাই হলেন শিক্ষক। কিন্তু অতীতের ইতিহাস ও বর্তমান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় শিক্ষকরা বরাবরই বঞ্চনা ও অবহেলার শিকার হয়েছেন।
ঔপনিবেশিক শাসনামলে শিক্ষক সমাজের যে কী করুণ দশা ছিল তা সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘প-িত মশায়’ গল্প থেকে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠে। লাট সাহেবে তিন পায়া কুকুরের মাসিক খরচ পঁচাত্তর টাকা, আর ১০ সদস্য বিশিষ্ট পরিবারের জন্য প-িত মশায়ের মাসিক বেতন ২৫ টাকা। তাইতো তিনি  খেদোক্তি করে শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন তার ১০ সদস্যবিশিষ্ট পরিবার লাট সাহেবের তিন পায়া কুকুরের কয় পায়ের সমান? কিন্তু আমরা দু’বার স্বাধীনতা লাভের পরও জাতির বিবেক শিক্ষক সমাজের সথে সুবিচার করতে পেরেছি বলে মনে হয় না। অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের সাম্প্রতিক সময়ের বেহাল অবস্থা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। এটা শুধু দুঃখজনক নয় বরং রীতিমত বেদনাদায়ক। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে শিক্ষক সমাজকে যথাযথভাবেই সম্মান করতে হবে।
বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিক্ষকদের এই ভোগান্তির কারণ অপর্যাপ্ত তহবিল। যত সংখ্যক শিক্ষক আবেদন করেন, তাদের সুবিধা দেয়ার জন্য সেই পরিমাণ অর্থ নেই তহবিলে। ফলে আবেদনের পর শিক্ষকদের দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। অনেকে টাকার অপেক্ষায় থেকে  থেকে মারাও গেছেন। এ সংকট মেটাতে হলে অন্তত  পৌনে দুই হাজার কোটি টাকা লাগবে। অভিজ্ঞমহল এসব কথাকে শুধুই অজুহাতই মনে করছেন। কারণ, রাষ্ট্রের পক্ষে এ সমস্যার সমাধান মোটেই অসম্ভব নয়।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, অবসর বোর্ডে ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৪১ হাজার ৮০১টি আবেদন পড়েছে। এই আবেদন নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজন এক হাজার ৭৪৩  কোটি ৫৭ লাখ টাকা। কিন্তু বোর্ডের কাছে কোনো টাকাই নেই। এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য হলো, ‘ফান্ড সংকটের কারণে আমরা সব আবেদনকারীকে সন্তুষ্ট করতে পারছি না। এই বাস্তবতার কারণেই অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে ভাতা পরিশোধ করে যাচ্ছি।’
এদিকে এই সংকটকে পুঁজি করে একটি মধ্যস্বত্ত্বভোগী ও দালালচক্র গড়ে উঠেছে সেখানে। তারা জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে শিক্ষকদের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চক্রের সদস্যরা শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রাপ্য অর্থের আনুপাতিক হারে কমিশন বা উৎকোচ নিয়ে অর্থ পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়। তাদের খুশি না করলে কম সুবিধা দেয়া বা দিনের পর দিন ঘোরানোর অভিযোগও রয়েছে। জানা গেছে, অবসর সুবিধা তহবিলে শিক্ষকদের এমপিও থেকে চার শতাংশ হারে অর্থ কাটা হয়। এই হিসাবে প্রতি মাসে জমা হয় গড়ে ১৭ কোটি টাকা। প্রতি মাসে অবসরে যাচ্ছেন গড়ে ৯৫০ জন শিক্ষক। তাদের প্রাপ্য মেটাতে মাসে লাগে অন্তত ৫৭ কোটি টাকা। এই হিসাবে মাসে ঘাটতি রয়েছে কমপক্ষে ৪০ কোটি টাকা।
অবসর বোর্ডের পক্ষে বলা হয়েছে, চলমান সংকট মোকাবিলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে এক হাজার কোটি টাকা চেয়ে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এটি অনুমোদন হলে শিক্ষকদের কিছুটা স্বস্তি দেয়া যাবে। সরকার এককালীন ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে ২০০৪ সালে অবসর বোর্ড গঠন করে। বর্তমানে এ তহবিলে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আছে।
আমাদের মনে হয়, শুধুমাত্র সরকারের সদিচ্ছার অভাব ও সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতার কারণেই হাজার হাজার অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসরকালীন সুবিধার অর্থ প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত ও নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তারা সীমাহীন অর্থকষ্টে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন। যাদের কাছ থেকে আলোর সন্ধান নিয়ে আমরা আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছি, জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে তাদের এই দুর্দশা সত্যিই বেদনাদায়ক। তাই একান্ত মানবিক কারণে এবং শিক্ষকসমাজের মর্যাদা রক্ষায় এই অবস্থার অবসান হওয়া উচিত। শিক্ষকদের এমন দুর্দশা আর কেউ দেখতে চায় না।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।