Inqilab Logo

শনিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ২৮ রবিউস সানী ১৪৪৩ হিজরী

আসুন, রমজানের শিক্ষায় জীবনকে সাজাই

| প্রকাশের সময় : ২৭ মে, ২০১৭, ১২:০০ এএম

জালাল উদ্দিন ওমর
বছরের ১২টি মাসের মধ্যে রমজান মাস আলাদা বৈশিষ্ট্য, মর্যাদা এবং গুরুত্ব বহন করে। এই রমজান মাস আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য একটি বিশেষ উপহার। রহমত, বরকত আর মাগফেরাতের বার্তা নিয়ে রমজান মানবজাতির কাছে হাজির হয়। রমজান মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে বান্দাহ আল্লাহর কাছে পাপ মার্জনার সুযোগ লাভ করে। রমজান মাসে মানবজাতি তাকওয়া অর্জন করে। রমজান মাসের ইবাদতের মূল্য আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি। রোজাদারকে ইফতার করানোর মাঝে আল্লাহ বান্দার জন্য বিশেষ পুণ্যের বরাদ্দ রেখেছেন। এই মাসে তারাবিহ পড়তে হয়, সাহেরি খেতে হয়। দিনের শেষে ইফতারির মাধ্যমে রোজা শেষ করতে হয়। মূলত রোজা হচ্ছে মানবজাতির ট্রেনিং এবং আত্মগঠনের মাস। এই মাস মন্দ কাজ চিরতরে পরিহার করে উত্তম চরিত্র গঠনের মাস। এই মাসে তাকওয়া অর্জন করে, বাকি ১১ মাস ভালোভাবে চলার সুযোগ দেয়। রমজান মাসে আল্লাহ, তার প্রিয় রাসুল হযরত মুহাম্মদ (স) এর ওপর কোরান নাযিল করেছেন। এই কারণে রমজান মাস অনন্য বৈশিষ্ট্যের দাবিদার। আর কোরান হচ্ছে বান্দার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত সবর্শেষ এবং সর্বশ্রেষ্ট আসমানী কিতাব, যা মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক। এই মাসেই রয়েছে হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ রাত্রি পবিত্র লাইলাতুল কদর। এ রাত্রির ইবাদাত আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। সুতরাং রমজান মাস আসার সাথে সাথে মুসলিম সমাজে বিরাট এক পরিবর্তন আসে। মুসলমানদের চিন্তা চেতনা এবং কর্মে পরিবর্তন আসে। দৈনন্দিন কাজ কর্মের রুটিনেও পরিবর্তন আসে। অফিস আদালতে নতুন সময়সূচি চালু হয়। মুসলিম সমাজের সর্বত্রই একটি পবিত্র ও ভাবগম্ভীর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার প্রকৃতির নিয়মেই রমজান চলে যায়। মুসলমানরা বছরের পর বছর ধরে রমজান পালন করছে। কয়েক হাজার বছর ধরে এই নিয়ম চলে আসছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত এই ধারা চলবে। রমজান আমাদেরকে সংযম শিক্ষা দেয়, নৈতিকতা শিক্ষা দেয়, সততা শিক্ষা দেয় এবং সর্বোপরি মানবকল্যাণ শিক্ষা দেয়। রমজান সবসময় ধৈর্য্য ধারণের কথা বলেছে, মিথ্যাকে পরিহারের কথা বলেছে, সকল ধরনের পাপকে বর্জনের কথা বলেছে, অশ্লীলতাকে পরিত্যাগের কথা বলেছে এবং অপরের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকার কথা বলেছে। রমজান মানুষকে ভালবাসার কথা বলেছে। লোভ, লালসা, হিংসা, বিদ্বেষ পরিহারের কথা বলেছে। বিপদে-আপদে অপরের পাশে থাকার কথা বলেছে। অপরের দুঃখ লাগবে নিজেকে উৎসর্গ করার কথা বলেছে। কিন্তু মুসলিম জাতির বড়ই দুর্ভাগ্য যে, রমজানের প্রকৃত শিক্ষায় মুসলমানেরা এখনো শিক্ষিত হতে পারেনি। তাই সংযমের মাস রমজানে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আরো বেড়ে যায়। এক শ্রেণির ব্যবসায়ী কীভাবে অত্যাধিক মুনাফা করবে তার জন্য প্রতিযোগিতায় নামে। অথচ এটা ইসলামের শিক্ষা নয়, রমজানেরও শিক্ষা নয়। অপরদিকে সামর্থ্যবান মানুষেরা প্রায়ই পুরো রমজান এবং ইফতারির জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য একসাথে কেনেন। ফলে স্বাভাবিকভাবে বাজারে এসব পণ্যের সংকট সৃষ্টি হয়, যা পুরোটাই কৃত্রিম। আর এই সুযোগে বেশি চাহিদাকে ইস্যু বানিয়ে ব্যবসায়ীরা পণ্য সামগ্রীর দাম বাড়িয়ে দেয়। আবার ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার আশায় পণ্য মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে এবং পণ্যের দাম ইচ্ছামত বাড়িয়ে দেয়। ফলে যারা গরিব মানুষ এবং যারা দিনে আনে দিনে খায়, তারা সাহেরি এবং ইফতারির জন্য ভালো এবং পুষ্টিকর খাবার কিনতে পারে না। তারা সাহেরিতেও ভালো খাবার খেতে পারে না আবার ভালো কিছু দিয়েও ইফতারি করতে পারে না। ধনী লোকেরা যেখানে উদর পূর্তি করে সাহেরি এবং ইফতারি খায়, সেখানে মুসলিম সমাজেরই অনেক মানুষ কোনো রকমে ডাল-ভাত খেয়ে সাহেরি সারে আর পানি পান করে ইফতার করে। সুতরাং এই দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে।
মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত মুনাফার জন্য মজুদদারি এবং অতিরিক্ত বিলাসিতার জন্য লাগামহীন অর্থ ব্যয় কোনটাই ইসলামের শিক্ষা নয়। সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের উচিত একসাথে পুরো মাসের বাজার না করে কয়েক দিনের বাজার করা এবং গরিব লোকেরা যাতে ভালো কিছু খেয়ে সাহেরি এবং ইফতার করতে পারে সেই ব্যবস্থা করা। রমজান এলেই ইফতার পার্টির হিড়িক পড়ে। বড় বড় হোটেলে, জাঁকজকমপূর্ণ আয়োজনে, নানা ধরনের সুস্বাদু খাদ্য দিয়ে ইফতার পার্টির আয়োজন চলে। সমাজের অর্থশালী, বিত্তশালী এবং সামর্থ্যবান লোকেরাই এতে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু এতিম, মিসকিন, গরিব এবং সমাজের অসহায় ও বঞ্চিত মানুষদের জন্য এরকম ইফতার পার্টির আয়োজন তেমন একটা হয় না। অথচ করতে হবে তাদের জন্যই আর এটাই রমজানের শিক্ষা। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার শেষে মহান আল্লাহ তার সিয়াম সাধনাকারী মুসলমানদের জন্য খুশীর উৎসব হিসাবে ঈদুল ফিতরের ব্যবস্থা করেছেন। এদিন মন খুলে কোলাকুলি করার দিন। এদিন ধনী-গরিব সকল মানুষের ঘরে ঘরে আনন্দ এবং খুশীর উৎসব চলাটাই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সবার ঘরে এবং সবার মাঝে ঈদের আনন্দ থাকে না। কারণ, সেদিন অভাবের কারণে অনেক পরিবারের লোকজন নিজেরাও নতুন জামা কিনতে পারে না আবার ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরও নতুন জামা কিনে দিতে পারে না।
মনে রাখতে হবে, আমরা যেন কোনো অবস্থাতেই রমজানের সিয়াম সাধনার চেয়ে অন্য কিছুকে বেশি গুরুত্ব না দিই। সবার আগে রোজাকে গুরুত্ব দিতে হবে। আর অমুসলিম ভাইদের প্রতি বিনীত অনুরোধ, আপনারা দৈনন্দিন কাজ করতে গিয়ে এমন কোনো পরিবেশের সৃষ্টি করবেন না, যাতে রমজানের পবিত্রতা ক্ষুণœ হয় এবং রোজা পালনে মুসলমানদের কোনো ধরনের অসুবিধা হয়। নিশ্চিন্তে এবং নির্বিঘেœ ধর্ম পালন করা একজন নাগরিকের অধিকার। সুতরাং রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করা এবং মুসলমানদের রোজা পালনে সহযোগিতা করাটা সবারই নৈতিক দায়িত্ব। অপরদিকে ইসলাম সবসময় মানব কল্যাণের জন্য নির্দেশ দিয়েছে। পৃথিবীতে একটি সুন্দর, কল্যাণময় এবং স¤প্রীতির সমাজ গঠনের জন্যই ইসলামের আবির্ভাব। আসুন, আমরা ইসলামের এই শিক্ষাকে গ্রহণ করি। আমরা সবাই যেন প্রতিদিন একটু হলেও কোরান পড়ি এবং কেউ যেন কোরান পড়তে ভুলে না যাই। আমরা যেন পবিত্র কোরান অধ্যয়নের জন্যও কিছুটা সময় ব্যয় করি। আমরা যেন সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, জুলুম এবং অবিচার চিরতরে বন্ধ করি। আসুন, আমরা মাদক ও যৌতুককে চিরতরে বর্জন করি। হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, গীবত এবং পরনিন্দাকে পরিহার করি। আসুন, আমরা সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করি। আমরা অপেক্ষাকৃত অপ্রয়োজনীয় কাজে এবং বিনোদনের জন্য অনেক সময় অনেক টাকাই ব্যয় করি। আসুন, আমরা অপ্রয়োজনীয় কাজে অর্থব্যয় বন্ধ করি এবং সেই টাকাটা এ সমাজের গরিব-দুঃখী অসহায় ও বিপন্ন মানুষের দুঃখ দুর্দশা লাঘবের জন্য ব্যয় করি। আসুন আমরা ঠিকভাবে যাকাত আদায় করি এবং যাকাতের অর্থ ইসলাম নির্দেশিত খাতসমূহে ব্যয় করি।
আসুন, অতীতের সকল পাপের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করি এবং ক্ষমা চাই। আর এই রমজান থেকেই জীবনকে আল্লাহর পথে পরিচালিত করি।
লেখক : প্রকৌশলী ও কলামিস্ট



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: রমজান


আরও
আরও পড়ুন