Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৪ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

ইনকিলাবের জন্মকথা ও পথ পরিক্রমা

| প্রকাশের সময় : ৪ জুন, ২০১৭, ১২:০০ এএম

রূ হু ল আ মী ন খা ন : ১৯৮৬ সালের ৪ জুন দৈনিক ইনকিলাব আত্মপ্রকাশ করে। প্রত্যেক মহৎকাজের একটা ব্যাকগ্রাউন্ড থাকে। ইনকিলাবেরও আছে তেমন একটা সমৃদ্ধ ব্যাকগ্রাউন্ড। তখন ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলছে। আমেরিকা ‘যুক্তরাষ্ট্র’ যুক্তরাজ্যসহ পাশ্চাত্য দুনিয়ার সমর্থন যেমন ছিল সাদ্দাম হোসেনের প্রতি তেমনি আরব জাহানের রাজপুরুষরাও সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছিলেন তাকে। তার কারণও ছিল সুস্পষ্ট। ইরানের অবিসম্বাদিত আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতুল্লা খোমেনীর নেতৃত্বে যে মহাবিপ্লব শুরু হয়েছিল ইরানের সীমান্ত অতিক্রম করে তার দোলা লেগেছিল ঐ অঞ্চলের সব দেশে। সে বিপ্লবের বিস্তার তাদের দেশেও ঘটতে পারে এ সঙ্কায় তারা সঙ্কিত হয়েছিলেন এবং সাদ্দামের নেতৃত্বে তা প্রতিরোধে তৎপর হয়েছিলেন। এ সময়ই ঐতিহাসিক বাগদাদ নগরীতে আহŸান করা হয় পপুলার ইসলামী কনফারেন্স। বিশ্বের ৮৪টি দেশের বিশিষ্ট ইসলামী স্কলার, আলিম উলামা, পীর-মাশায়েখদের দাওয়াত দেয়া হয় এই ঐতিহাসিক কনফারেন্সে। এতে প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন, দক্ষ সংগঠক ও রাজনীতিবিদ, মাওলানা এম.এ. মান্নানের মাধ্যমে বাংলাদেশের ২২ জনকে দাওয়াত দেয়া হয়। যার মধ্যে ছারছীনার পীর ছাহেব হযরত মাওলানা শাহ আবু জাফর মোঃ ছালেহসহ স্বনামধন্য অনেকেই ছিলেন এবং এই লেখকও ছিলেন। আমাদের থাকার স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিল বাগদাদের সুবিখ্যাত হোটেল আল রশিদে। সেখানে বসেই ছারছীনার পীর ছাহেব মাওলানা হুজুর (মাও: এম.এ. মান্নান)কে বললেন, ইসলাম ও মুসলমানদের কথা তুলে ধরার জন্য একটি দৈনিক পত্রিকার প্রয়োজনীয়তা আমি তীব্রভাবে অনুভব করছি। আমি ফকীর মানুষ, এমন একটি দৈনিক প্রকাশের সাধ্য আমার নেই। আল্লাহপাক আপনাকে সে সাধ্য ও ক্ষমতা দান করেছেন, আপনি এ অভাব পূরণ করুন, একটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করুন। মাওলানা হুজুর সম্মতি প্রকাশ করলেন।
গাউছুল আজম বড় পীর ছাহেব হযরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর মাজার শরীফে ও দরবারে বসে এ জন্য দোয়া ও মুনাজাত করা হল। সেখান থেকে ফেরার পথে মক্কা ও মদীনা শরীফে ওমরা আদায় ও জিয়ারত করারও সৌভাগ্য হল আমাদের এবং পবিত্র হারামাইন শরীফাইনেও দোয়া হল।
আরও একটি ঘটনা মাওলানা হুজুরকে পত্রিকা প্রকাশে প্রাণিত করেছিল। লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলিতে এ সময়ে অনুষ্ঠিত হয় একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষা সম্মেলন। বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনের নেতাদের দাওয়াত দেয়া হয় এ সম্মেলনে। মাদরাসা শিক্ষকদের অবিসম্বাদিত নেতা মাওলানা এম.এ. মান্নানও দাওয়াত পান। মাওলানা হুজর ত্রিপলিতে বসে বাংলাদেশের সরকারী-বেসরকারী শিক্ষক সংগঠনসমূহের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে আলাপ-আলোচনার সুযোগ লাভ করেন। শিক্ষক নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশে শিক্ষা আন্দোলনকে জোরদার করাÑ তথা শিক্ষা সার্বিক উন্নয়ন, শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠাসমূহের উন্নয়নের লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করেন। তারা একমত হন, নিজ নিজ সংগঠন বহাল রেখে সার্বজনিন দাবি-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে একটি শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন গঠন করার। পরবর্তীতে তা গঠন করা হয়েছিল। সে অন্য কথা। তবে শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয় বিশেষভাবে তুলে ধরার জন্যও একটি পত্রিকার আবশ্যকীয়তার বিষয়টিও মাওলানা হুজুরের চিন্তায় যোগ হয়।
মাওলানা এম.এ. মান্নান ছিলেন মাদরাসা শিক্ষকদের অবিসম্বাদিত নেতা। তিনি মাদরাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী লোক। মাদরাসায় সুনামের সাথে শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘদিন। সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেও মাদরাসা শিক্ষকদের ভুলে যাননি। তাদের সাথে সর্বাদা সম্পৃক্ত থেকেছেন। পাকিস্তানী শাসনামলেও তিনি মাদরাসা শিক্ষকদের এতিহ্যবাহী সংগঠন জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরেছেন প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশনে। আদায় করে এনেছেন বেশ কিছু দাবি-দাওয়া। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের পরে তিনি এই সংগঠনের হাল ধরেন শক্তহাতে। আলিয়াধারার মাদরাসা শিক্ষকদের ঐক্যবদ্ধ করেন এই সংগঠনের পতাকাতলে। সম্মেলন, মহাসম্মেলন করে করে তাদের উজ্জীবিত করে তোলেন, করে তোলেন অধিকার সচেতন, আন্দোলনকে করেন বেগবান। মুসলিম জাহান একে পরিচিত করে তোলেন। আরবজাহানের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠাতাকেও কাজে লাগান। বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীন নবপ্রাণ লাভ করে তার বিস্ময়কর নেতৃত্বে। তিনি জমিয়াত নেতৃবৃন্দের সভায়ও পেশ করেন পত্রিকা প্রকাশের সিদ্ধান্তের কথা। তারা এ ব্যাপারে মওলানা হুজুরকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
মাওলানা হুজুর পত্রিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত তো নিয়েছিলেন বাগদাদ শরীফের সেই কনফারেন্স থেকেই, এবার তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করতে থাকেন। তাঁর একটা বিশেষগুণ ছিল, আঁটঘাট বেঁধে কাজে হাত দেয়া। প্রথমে চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন, কর্মসূচি নির্ধারণ, তারপর তা বাস্তবায়নে সর্বশক্তি নিয়োগ। মাওলানা হুজুরের সাথে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল ছাত্র জীবন থেকেই। লেখালেখি, সাংবাদিকতা, সম্পাদনার কাজের সাথে আমার সম্পৃক্তার কথা তিনি জানতেন। আমি তখন দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র ছারছীনা দারুচ্ছুন্নাত আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলাম। সেখানে থেকে তিনি আমাকে নিয়ে এলেন ঢাকায়। দায়িত্ব দিলেন পত্রিকা প্রকাশের জন্য প্রাথমিক কাজগুলো সম্পাদনের।
মাওলানা হুজুর চাইছিলেন ভাড়াটে ছাপাখানায় নয়, নিজস্ব ছাপাখানায় ছাপা হবে, ভাড়াটে বাড়িতে নয়, পত্রিকার নিজস্ব বাড়ির ঠিকানা থেকে ইনকিলাব আত্মপ্রকাশ করবে, যাতে নিয়মিত প্রকাশে কোন বাধা-বিঘœ না ঘটে। আল্লাহর মেহেরবাণীতে সুন্দর একটা জায়গাও পাওয়া গেল। কেনা হল। দৈনিক ইত্তেফাক ভবনের পার্শ্বে ২/১ আর, কে মিশন রোডে নির্মাণ শুরু হল সুরম্য ইনকিলাব ভবন। প্রথমে ভারত থেকে আমদানি করা হবে ওরিয়েন্ট মেশিন। ওর্ডার দেয়া হল কোম্পানীকে। সে মোতাবেক গজ মেশিনের নমুনায় মেশিন তৈরি হল কোম্পানীর হরিয়ানার কারখানায়। হুজুরের সাথে আমিও গেলাম দিল্লীতে। জিয়ারত করলাম হযরত নিজাম উদ্দীন আউলিয়া, হযরত শাহ আবদুল আজীজ (রহ.)সহ দিল্লী ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকাস্থিত পীর, ওলী-আউলিয়াদের মাজার। এরপর দিল্লী থেকে গেলাম হরিয়ানায়। আমাদের দেখানো হল ইনকিলাবের জন্য প্রস্তুত করা প্রিন্টিং মেশিনের ইউনিটগুলো এবং ঢাকায় চালানের উদ্দেশ্য বাক্সবন্দি করা হল।
এরপর শুরু হল সাংবাদিক ও অন্যান্য কর্মচারীদের নিয়োগের পালা। মাওলানা হুজুর ঢাকার সমমনা প্রখ্যাত, সাংবাদিকদের সাথে অনেক আলাপ করলেন। মতবিনিময় করলেন।
তাদের থেকে মূল্যবান পরামর্শ নিলেন। খন্দকার আবদুল হামিদ, সানাউল্লাহ নূরী, আখতারুল আলম, একেএম মহিউদ্দীন, আসাফুদ্দৌলা রেজা প্রমুখ এদের মধ্যে অন্যতম।
সম্পাদক নিয়োগের ব্যাপারে যখন চিন্তা-ভাবনা ও খোঁজাখুঁজি চলছিল তখন অনেক অভিজ্ঞজন পরমার্শ দিলেন, মাওলানা হুজুরের জ্যেষ্ঠপুত্র এ এম এম বাহাউদ্দীনকে সম্পাদক হিসেবে নিয়োগের। বয়সের নবীন হলেও প্রজ্ঞা-পাÐিত্য, দার্শনিক সুলভ বিশ্বদৃষ্টি, নিষ্ঠা ও আদর্শে অবিচলতায় ইতোমধ্যে তিনি পরিচিতজনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। মাওলানা হুজুর অনেক ভেবে-চিন্তে শুভানুধ্যায়ীদের এ প্রস্তাব গ্রহণ করলেন এবং নিয়োগ দিলেন। ধীর স্থির মস্তিষ্কের অধিকারী, সময় অনুবর্তিতা ও নিয়মে নিষ্ঠাবান, অভিজ্ঞ সাংবাদিক এ কে এম মহিউদ্দীনকে নিয়োগ দেয়া হল মহাসম্পাদক হিসাবে; মাওলানা কবি রূহুল আমীন খানকে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে; ভাষা আন্দালনের অন্যতম সৈনিক অধ্যাপক আবদুল গফুরকে ফিচার সম্পাদক হিসেবে। মফিজ উদ্দীন আহমাদ, হাফিজ উদ্দীন আহমাদ, কথা সাহিত্যিক ইউসুফ শরীফ, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লা সিদ্দীকীকে সহকারী সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হলো। কিছু দিন পরে মুনসী আবদুল মাননান এবং আরও পরে হারুনর রশিদ ও আবদুল আউয়াল ঠাকুরকে এই পদে নিয়োগ দেয়া হয়।
বার্তা বিভাগে সুলতান আহমদ (বার্তা সম্পাদক), মো: মূসা (চীফ সাব-এডিটর), নূরুদ্দীন (চীফ রিপোর্টার), মঞ্জুরুল আলম (সিনিয়র রিপোর্টার) এবং মাহবুবুল বাসেত, ড. আবদুল হাই, জাকারিয়া কাজল, সালাহ উদ্দীন (চীফ ফটোগ্রাফার)সহ আরো অনেকে সিনিয়র-জুনিয়র হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্ত হলেন। ফিচার বিভাগকে অধ্যাপক আবদুল গফুর নিজ পছন্দ মত লোক নিয়ে সাজালেন। এদের মধ্যে বিভিন্ন ফিচার পাতার দায়িত্বে নিয়োগ দেয়া হলো শেখ দরবার আলম, মুন্শী মাওলানা ফজলুর রহমান, হাসনাইন ইমতিয়াজ এবং পরবর্তীতে মাওলানা ওবায়দুর রহমান খান নদভী (বর্তমানে সহকারী সম্পাদক) প্রমুখকে। সাধারণ বিভাগে মমিন খান লোহানী, হাবীবুর রহমান তালুকদার, শামসুল হক, আব্দুল কুদ্দুস এবং আরও কয়েকজনকে নিয়োগ দেয়া হল।
আয়োজন প্রায় শেষ কিন্তু ইনকিলাব ভবন নির্মাণের কাজ এখনো সমাপ্ত হয়নি। এ অবস্থার মধ্যেই প্রিন্টিং মেশিন বসানো হলো বটে কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিল সাংবাদিক বসবেন কোথায়? তার জন্য ব্যবস্থা নেয়া হলো Ñসম্পাদকীয় এবং ফিচার বিভাগের কাজ চালানো হবে মাওলানা হুজুরের ৯৫/এফ, বনানীস্থ নিজস্ব বাসভবনের গ্রাউন্ড ফ্লোরে, ব্যবস্থাপনার কাজ পরিচালনার জন্য ভাড়া নেয়া হলো বনানী ২ নং রোডের আর একটি বাড়ি। এখানে বসলেন সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীন এবং তাঁর কনিষ্ঠভ্রাতা ও অন্যতম ডিরেক্টর আবু জাফর মো: সালাহ উদ্দীন। মাওলানা হুজুরের অন্য দুই পুত্র এবং ডিরেক্টর জনাব মঈনুদ্দিন (মুনীর) ও জনাব বাকী বিল্লাহ (বাবু) তখন আমেরিকায় অধ্যায়নরত। নিউজ, রিপোর্টিং, কম্পোজ, পেস্টিং, প্লেট তৈরি এবং অন্যান্য কাজের জন্য ভাড়া নেয়া হলো বনানী ১১ নং রোডের আর একটি বাড়ি। বিভিন্ন স্থানে ৫টি ভিন্ন ভিন্ন বাড়িতে শুরু হলো কাজ। অনেকে দ্বিধান্বিত ছিলেন, ৫টি জায়গায় কাজ সমন্বিত করে, নিয়মিতভাবে যথাসময়ে দৈনিকটি প্রকাশ করা সম্ভব হবে তো? কিন্তু আল্লাহপাকের অফুরন্ত মেহেরবাণী, বিস্ময়করভাবে নিখুঁত নির্বিঘেœ চলেছে সবকাজ বনানী থেকে আর কে মিশন রোডে ছুটাছুটিতে কখনো থমকে দাঁড়াতে হয়নি লাল জীপটিকে। ভারতীয় মেশিন হলেও অত্যন্ত ভালো সার্ভিস দিয়েছে ওরিয়েন্ট প্রেস ইউনিটগুলো।
বিসমিল্লাহ বলে প্রিন্টিং মেশিনের সূচ অন করলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী জালাল আহমদ। এল সেই প্রতিক্ষীত শুভক্ষণ। ১৯৮৬ সালের ৪ জুন হোটেল সোনারগাঁও এ হলো যাত্রা শুরুর অনুষ্ঠান। সবার হাতে হাতে ইনকিলাবের উদ্বোধনী সংখ্যা সেই সঙ্গে সবাই শুনল আর এক আনন্দ বার্তা। ঐ দিনই জন্ম নিল সম্পাদক বাহাউদ্দীনের প্রথমা কন্যা সামনা। দুই নবজাতকের শুভ আবির্ভাবে সবাই হলো হর্ষোৎফুল্ল, পুলক প্লাবিত।
প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যে ইনকিলাব সাড়া জাগাতে সক্ষম হলো পাঠক সমাজে। অনেকটা এলো আর জয় করে নিলো’র মতো।
হ্য্যা, ইনকিলাবের একটা সমৃদ্ধ ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। কিন্তু শুধু ব্যাকগ্রাউন্ড থাকলেই যে, কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যাবে এমনটা নয়। কোন প্রতিষ্ঠানকে প্রতিষ্ঠিত হতে হয় তার নিজ গুণে। এর প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করতে হয় তার স্ববৈশিষ্ট্যে পারঙ্গমতায়। এ জন্য, প্রয়োজন একদল দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। ইনকিলাব সেটা লাভ করেছিলো। আর এর পেছনে প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাওলানা এম. এ. মান্নানের আকাশছোঁয়া ব্যক্তিত্ব্যের যে প্রভাব সক্রিয় ছিল তা অনির্বচণীয়। তিনি তাঁর পিতৃসুলভ আচরণ ও অমীয় বচন দিয়ে সবাইকে নিয়ে গড়ে তুলতে পেরেছিলেন ইনকিলাব পরিবার। কে কোন পদে আছে না আছে, কে কত বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না পাচ্ছে সেটার প্রতি যেন কারোর লক্ষ্যই ছিল না। ‘ইনকিলাব আমার, আমাদের যে যেখানে আছি, যে দায়িত্বে আছি, সেখানে থেকে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে এগিয়ে যাব অভীষ্ঠ লক্ষ্যে, প্রতিষ্ঠা করবই আমার পত্রিকা ইনকিলাবকে।’ প্রত্যেকে চোখে, মুখে ও কাজের মধ্যে ছিল এই প্রতিজ্ঞা ভাস্বর।
আসলে এটা একটা টিম ওয়ার্ক। প্রত্যেককেই নিজ নিজ স্থানে ভাল খেলতে হবে এবং সমন্বিত চেষ্টায় গোল করে বিজয় অর্জন করতে হবে। তেমনটা সুসমন্বয় প্রতিষ্ঠিত ছিল ইনকিলাবে। একদিকে ছিল দূরদর্শী ও অভিজ্ঞ মাওলানার পিতৃসুলভ আচরণ, আর এক দিকে ছিল সম্পাদক বাহাউদ্দীনের আদর্শে অবিচলতা, প্রজ্ঞা-পাÐিত্য ও দর্শনিক সুলভ বিশ্বদৃষ্টি। তার সাথে যোগ হয়েছিল সংশ্লিষ্ট সকল সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাত্ম্যতা ও এক পরিবারচেতনা।
প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই ইনকিলাব সাড়া জাগাতে সক্ষম হল। এর একটা নিজস্ব পাঠক মহল গড়ে উঠল। সম্পাদকীয় উপ-সম্পাদকীয় বিশেষ বিশেষ প্রতিবেদন, ফিচার পাতাগুলোর নিবন্ধের মধ্যে তারা প্রাণের কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পেল। এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের যে বোধ-বিশ্বাস আচার অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট যে সবকে অনেক সময় উপেক্ষা করা হয়েছে, অবজ্ঞা, অবহেলা করা হয়েছে। উপহাস করা হয়েছে সেই ব্যথা প্রসমনের এবং অনেক না বলা কথা। না বলতে পারা কথা, প্রকাশের একটা বলিষ্ঠ মাধ্যম পেয়ে তারা একে লুফে নিলেন। ইনকিলাবকে মনে করলেন একান্তভাবেই নিজের পত্রিকা। এ শ্রেণীর পাঠকরা কী চায় তা বুঝতে পারা, হৃদয়ঙ্গম করতে পারা, তাকে ভাষা দিতে পারা, প্রকাশ করতে পারার মধ্যেই নিহিত ছিল ইনকিলাবের সাফল্য। আপনজনের কাছে, আপন প্রতিষ্ঠানের কাছে মানুষের একটা প্রত্যাশা থাকে, এটা যে যতটা পূরণ করতে পারে সে ততটাই। হৃদয়ে স্থান করে নিতে পারে। প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই সেই পারঙ্গমতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হল ইনকিলাব।
ইনকিলাব কোন রাজনৈতিক দলের মুখপত্র নয়, কোন বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার নয়, সত্য প্রকাশে সে অকুণ্ঠ, দেশের স্বার্থে সে নিরাপোষ, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এর প্রতি ইঞ্চি ভূমির পবিত্রতা রক্ষার ক্ষেত্রে পত্রিকা হিসাবে তার ভূমিকা অটল অবিচল। উগ্রতা, চরমপন্থা, সন্ত্রাস সাম্প্রদায়িকতার সে চরম বিরোধী। আসলে সাম্প্রদায়িকতার কথা ------ মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত। প্রকৃতপক্ষে আমাদের দেশের মানুষের মত এমন উদার এমন অসাম্প্রদায়িক, এমন পরমত সহিষ্ণু মানুষ সমগ্র বিশ্বে.... খুব কমই আছে। এখানের মুসলমানরা পরম নিষ্ঠার সাথে যেমন নিজধর্ম পালন করে, তেমনি অন্য ধর্মের মানুষের ধর্ম পালনেও করে সার্বিক সহযোগিতা। এখানে মসজিদে মসজিদে ইমামগণ, ওয়াজ মাহফিলে মাহফিলে উলামা-মাশায়েখগণ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সর্বদা কথা বলেন। সংখ্যালঘুদের সাথে সহ-অবস্থান, তাদের অধিকার ধর্মীয় স্বাধীনতা সুরক্ষার কথা সোচ্চার কণ্ঠে উচ্চারণ করেন। ইসলাম শান্তি ও নিরাপত্তার ধর্ম। সত্যিকার ইসলামকে আমরা যত বেশী শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে পারব শান্তি ও নিরাপত্তা ততটাই নিশ্চিত হবে। আর এর থেকে যতটাই আমরা সরে যাব অশান্তি ও অস্থিরতা ততই আমাদের গ্রাস করবে। এদেশে ইসলাম এসেছে সুফী সাধক, আউলিয়া কেরামের মাধ্যমে। তাদের শিক্ষা প্রেমের শিক্ষা, ¯্রষ্ঠা ও সৃষ্টিকে ভালোবাসার শিক্ষা উদারতা ও মানবতা শিক্ষা, হিংসাবিদ্বেষ পরিহারের শিক্ষা সাম্য ভ্রাতৃত্ব ন্যায়-ইনসাফের শিক্ষা। এদেশের মুসলমানদের মন মানুষে সে শিক্ষার প্রভাব সদা জাগ্রত। তাই চারদিকে শত উস্কানী সত্তে¡ত্ত তার কুপ্রভাব থেকে আমাদের দেশ আমাদের জনগণ তুলনামূলকভাবে এখনও অনেকটা মুক্ত। ইদানিং এখানে-সেখানে যে দু’একটা সন্ত্রাসী কর্মকাÐ হয়েছে তার সাথে ধর্মে বিশেষ করে ইসলামের কোনই সম্পর্ক নেই। ইনকিলাব তার প্রতিষ্ঠানকাল থেকে নানাভাবে এসব কথা বারবার বলে এসেছে।
তবু সব কথা সবার সহ্য হয় না, সব সত্য সকলে মেনে নিতে পারে না। সবার চিন্তা জীবন দর্শন বিশ্ব দৃষ্টিও এক নয়। সব ফুল ফুটতে দাও এটা মুখে আওড়ালেও অনেকের কাজ হয় বিপরীত এই অসহিষ্ণু লোকেরা অন্যের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে হরণ করতে চায়। গলাটিপে ধরতে চায়। দীর্ঘ চলা পথে ইনকিলাবকেও বারবার এরূপ কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। সাময়িকভাবে কখনো কখনো এর প্রকাশনা বন্ধও থেকেছে। কথায় আছে ‘বিপদে বন্ধুর পরিচয়’। সে পরিচয় ইনকিলাব বারবার পেয়ে ধন্য হয়েছে। ইনকিলাবের প্রকাশনা বন্ধের দুর্দিনে একে খুলে দেয়ার দাবি গ্রামে-গঞ্জে-শহরে-বন্দরে নেভৃত পল্লীর পথঘাটে উচ্চারিত হয়েছে। রাজধানীর রাজপথে মিছিল হয়েছে, সভা হয়েছে, সমাবেশ হয়েছে। মসজিদে সমজিদে, মাহফিলে মাহফিলে দোয়া ও মুনাজাত হয়েছে। দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ছারছীনার পীর ছাহেব হযরত মাওলানা শাহ আবুজাফর মোঃ ছালেহ (রহঃ), জৈনপুরী ছিলছিলার পীরে কামিল হযরত মাওলানা আবদুল লতিফ চৌধুরী (রহ) (ফুলতলী ছাহেব) এজন্য মিছিলে নেমেছেন, সমাবেশ করেছেন। আরও বহু ওলামা-মাশায়েখ ইসলামী জনতা এ দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন সরকারের কাছে দাবি পেশ করেছেন। কেবল দেশেই নয় ইউরোপ আমেরিকা, এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন শহর জনপদে বাংলা ভাষাভাষী লোকদের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। এ দাবিতে সোচ্চার হওয়া দৃশ্যমান হয়েছে। এখানেই ইনকিলাবের সার্থকতা। ইনকিলাবের প্রতি এই একাত্মতার এই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দেশে-বিদেশে সর্বত্র দেখে আমরা অভিভূত হয়েছি।
অগণিত মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত, অগণন গুণগ্রাহির প্রীতিতে ধন্য জনগণ নন্দিত ইনকিলাব বহু চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে বহু বাধা-বিঘœ অতিক্রম করে আল্লাহর মেহেরবাণীতে সুদীর্ঘ তিনটি দশক পূর্ণ করেছে। শুরু করেছে ৩২তম বছরের পথ পরিক্রমা। এর স্বপ্নদ্রষ্টা, রূপকার প্রতিষ্ঠাতা, মাওলানা এম.এ. মান্নান আজ নেই চলে গেছেন না ফেরার দেশে। অনেকে অন্য মিডিয়ায়ও কাজ করছেন। আমরাও থাকব না, চলে যাব দুনিয়া ছেড়ে কিন্তু কাল প্রবাহের অন্তহীন অপ্রতিরুদ্ধ। সেই কালের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে, যে নীতি আদর্শের জন্য ইনকিলাব অনন্য সেই নীতি আদর্শে অটল অবিচল থেকে ইনকিলাব দিশারীর ভূমিকা পালন করে যাক তার চলা পথ কুসুমাস্তীর্ণ হোক সর্বশক্তিমান আল্লাহ রব্বুর আলামীনের দরবারে ৩২তম প্রতিষ্ঠা দিবসের শুভলগ্নে এই আমাদের মোনাজাত।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।