Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৪ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

নজরুল সাহিত্যের বিপ্লবী রূপ

| প্রকাশের সময় : ৪ জুন, ২০১৭, ১২:০০ এএম

শে খ দ র বা র আ ল ম ।

।। এক।।
বিপ্লব শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো- রাষ্ট্র বা সমাজ প্রভৃতির আমূল ও অতি দ্রæত পরিবর্তন। যেমন- ফরাসি বিপ্লব, সিপাহী বিপ্লব, পাশ্চাত্য শিক্ষায় আমাদের চিন্তায় ও ব্যবহারে বিপ্লব, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ইত্যাদি। বিপ্লব শব্দের এ প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য আর একটি অর্থ হলো বিদ্রোহ। আর বিপ্লবী শব্দের অর্থ বিপ্লব সঙ্ঘটনে চেষ্টিত বা ইচ্ছুক।
সাম্য ও সহাবস্থানের কবি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে যখন বিদ্রোহী কবি বলা হয়, তখন তাকে সেই একই সঙ্গে বিপ্লবী কবিও বলা হয়।
ধনতান্ত্রিক সমাজে বা শ্রেণীসমাজে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠার চিন্তা করা বা চেষ্টা করাটাও একটা খুব বড় রকমের বিপ্লবী কাজ। অক্টোবর ১৯৬৯ এর কলকাতার ১২ বঙ্কিম চ্যাটার্জী স্ট্রিটস্থ ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড থেকে প্রকাশিত ‘কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা’র ৩১০ পৃষ্ঠার অভীভক্ত ভারতের মাটিতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ লিখেছেন-
‘১৯২১ সালের নভেম্বর মাসে নজরুল আর আমি ঠিক কির যে, আমরা কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কাজে এগিয়ে যাব। পড়ালেখা করব বলে সামান্য কিছু পুঁজি পুস্তকও কিনেছিলাম। এই অবস্থাতেই ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে নজরুল তার বিদ্রোহী লিখেছিল।’
।। দুই।।
একটা ধনতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে, ধনী এবং গরিবের মধ্যকার একটা বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে একটা সাম্যবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করার চিন্তা ও চেষ্টা যেমন বিপ্লবীর কাজ, বিদ্রোহীর কাজ, অনুরূপভাবে সাম্রাজ্যবাদী ঠিক তেমনি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের উৎখাত ঘটিয়ে স্বাধীনতা আনার চিন্তা ও চেষ্টা করাটাও বিপ্লবীর কাজ, বিদ্রোহীর কাজ।
তার এই বিদ্রোহী কাজ ও বিপ্লবী কাজ ছিল কেবল বাইরের অনেক কিছু পরিবর্তনের জন্য নয়, ভেতরের অনেক কিছু পরিবর্তনের জন্যও। তাই ৯ জানুয়ারি ১৯৪১ তারিখ বৃহস্পতিবারের ঈদুজ্জোহা উপলক্ষে কলকাতায় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির ঈদ সম্মেলনের প্রদত্ত সভাপতির অভিভাষণে কবি কাজী নজরুল ইসলাম এক জায়গায় বলেছেনÑ
‘দুঃখ সয়েছি, আঘাতকে হাসিমুখে বরণ করেছি, কিন্তু আত্মার অবমাননা কখনো করিনি। নিজের স্বাধীনতাকে কখনোও বিসর্জন দেইনি।’ ‘বল বীর, বল চির উন্নত মম শির, এ গান আমি আমার এ শিক্ষার অনুভ‚তি হতেই পেয়েছি। এই আজাদ চিত্তের জন্ম আমি দেখতে চাই। ইসলামের এটাই সর্বশ্রেষ্ঠ বাণী, ইসলামের এটাই মর্মকথা।’
ইসলামের মধ্যেই, ইসলামের ইতিহাসের মধ্যেই নজরুল কেবল নিজের স্বাধীনতার, নিজের সমাজের স্বাধীনতার, নিজের দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতার অনুপ্রেরণা খুঁজে পাননি, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক সাম্যের অনুপ্রেরণাও খুঁজে পেয়েছেন। ১০ ফেব্রæয়ারি ১৯৩৮ তারিখ বৃহস্পতিবার কলকাতার ৫ নম্বর ম্যাঙ্গো লেনে দৈনিক কৃষক পত্রিকার অফিসগৃহে জনসাহিত্য সংসদের শুভ উদ্বোধনে সভাপতির অভিভাষণে কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেনÑ
‘হজরত ওমর, হজরত আলী, এঁরা পৃথিবী শাসন করেছেন, কিন্তু নিজেরা কুঁড়েঘরে থেকেছেন, ছেঁড়া কাপড় পরেছেন, সেলাই করে, কেতাব লিখে সেই রোজগারে দিনপাত করেছেন। ক্ষিধের পেটে পাথর বেঁধে থেকেছেন; তবু রাজকোষের টাকায় বিলাসিতা করেননি। এমন ত্যাগীদের লোকে বিশ্বাস করবে না কেন?’
।তিন।
৯ জানুয়ারি ১৯৪১ তারিখ বৃহস্পতিবারের ঈদুজ্জোহা উপলক্ষে কলকাতা বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির ঈদ-সম্মেলনে প্রদত্ত সভাপতির অভিভাষণে কবি কাজী নজরুল ইসলাম এক জায়গায় বলেছেনÑ
সকল ঐশ্বর্য, সকল বিভ‚তি আল্লাহর রাহে বিলিয়ে দিতে হবে। ধনীর দৌলতে, জ্ঞানীর জ্ঞানভাÐারে সব মানুষের সমান অধিকার রয়েছে। এ নীতি স্বীকার করেই ইসলাম জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম বলে সকলের শ্রদ্ধা অর্জন করতে পেরেছে। আজ জগতের রাজনীতির বিপ্লবী আন্দোলনগুলোর যদি ইতিহাস আলোচনা করে দেখা যায়, তবে বেশ বোঝা যায় যে, সাম্যবাদ সমাজতন্ত্রের উৎসমূল ইসলামেই নিহিত রয়েছে। আমার ক্ষুধার অন্নে তোমার অধিকার না থাকতে পারে, কিন্তু আমার উদ্ধৃত্ত অর্থে তোমার নিশ্চয়ই দাবি আছে, এ শিক্ষাই ইসলামের। জগতের আর কোনো ধর্ম এত বড় শিক্ষা মানুষের জন্য নিয়ে আসেনি। ঈদের শিক্ষার এটাই সত্যিকার অর্থ।
ঈদ-উল ফিতর এর আগের দিন ২২ অক্টোবর ১৯৪১ তারিখ বুধবার কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার তৃতীয় পৃষ্ঠায় চতুর্থ কলামে দৈনিক ‘নবযুগ’ থেকে পুনর্মুদ্রিত ‘ঈদের চাঁদ’ কবিতাতেও কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই চিন্তা ও চেতনা উপস্থিত যা তার বিবিধ রচনায় ও উক্তিতে অন্যত্রও হামেশাই নজরে পড়ে। কোনো পলিটিক্যাল পার্টিকে নয়, আল্লাহকে সার্বভৌম জ্ঞান করে সাম্যবাদী অভীষ্ঠে বিরচিত ঈদের চাঁদ কবিতার শুরুটা এই রকম :
“সিড়িওয়ালাদের দুয়ারে এসেছে
চাষা, মজুর ও বিড়িওয়ালা
মোদের হিস্সা আদায় করিতে ঈদে...”।
লক্ষ্যনীয় যে, একমাত্র নাস্তিক্যের বিষয়টি ছাড়া উপরোক্ত প্রথম তিনটি পংক্তির সঙ্গেয় মার্কসবাদী চিন্তাধারার কোনো বিরোধ নজরে পড়ে না। কেননা, নজরুল সর্ব বিষয়ে সাম্যবাদী ছিলেন ঠিকই, কিন্তু নাস্তিক ছিলেন না। নজরুল সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন এক আল্লাহকে সার্বভৌম জ্ঞান করে। সমস্ত অহমিকা, অসূরাপ্রবণতা ও আধিপত্যকামনা সেই সর্বশক্তিমানের কাছে সমর্পণ করার ফলে কোনো বিরোধের সংস্থা অন্যত্র নেই। বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতার কথা স্মরণে রেখে বিভিন্ন ধর্মীয়, সমাজের অধিকার বঞ্চিত মজলুম মানুষদের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের এবং স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা কবি ব্যক্ত করেছেন এভাবেÑ
“জানি না তাহারা হিন্দু, কি খ্রিষ্টান, কি মুসলমান।
নির্যাতিতের জাতি নাই, জানি মোরা মজলুম ভাই
জুলুমের জিন্দানে জনগণের আজাদ করিতে চাই।’’
জাতীয়তাবাদ প্রসূত সাম্প্রদায়িক পক্ষপাতজনিত ভেদ বুদ্ধির পরিণাম কী হয়েছে তা শনাক্ত করে মহান কবি লিখেছেনÑ
“এই ভেদজড়ানে হারায়েছি মোরা ক্ষুধার অন্ন রুটি।”
শোষকের প্রতি উচ্চারিত কবি কাজী নজরুল ইসলামের
ইসলামি মূল্যবোধ ভিত্তিক হুঁশিয়ারি।
“অর্থের নামে জমেছে তোমার ব্যাংকে বিপুল পাপ।”
ধর্মকে শোষণের হাতিয়ার হতে দিতে অপারগ নজরুল। কুরআন ও সুন্নাভিত্তিক ইসলামি জীবনব্যবস্থাকেই শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের হাতিয়ার করে কবি কাজী নজরুল ইসলামের পৌরুষদীপ্ত সুমহান উক্তিÑ
“আল্লাহর ঋণ শোধ করো, যদি বাঁচিবার থাকে শক্তি,
আমাদের ঝাঁপ ছুরি আঁকা
দেল আকাশে ঈদের চাঁদ।
।। চার।।
সাম্য ও সহাবস্থানকামী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সাম্য সহাবস্থানকামী দৃষ্টিভঙ্গিতে ইসলামের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে নারীর সম্মান ও সমানাধিকারকে নিশ্চিত করতে চেয়েছেন।
১৩৪৩ এর বৈশাখ অর্থাৎ ১৯৩৬ সালের এপ্রিল থেকে শুরু করে ১৯৩৬ এর নভেম্বরের মধ্যে কোনো একটা সময়ে ফরিদপুর জেলা ছাত্র সম্মিলনীতে প্রদত্ত সভাপতির অভিভাষণে কবি কাজী নজরুল ইসলাম এক জায়গায় বলেছেন-
“ইসলামের প্রথম ঊষার ক্ষণে, সুবহ্ সাদেকের কালে যে কল্যাণী নারী শক্তিরূপে আমাদের দক্ষিণ পার্শ্বে অবস্থান করে আমাদের শুধু সহধর্মিনী নয়, সহকর্মিনী হয়েছিলেন যে নারী সর্বপ্রথম স্বীকার করলেন আল্লাহকে, তাঁর রাসূলকে তাঁকেই আমরা রেখেছি দুঃখের দূরতম দুর্গে বন্দিনী করেÑ সকল আনন্দের, সকল খুশির চিন্তা করে। তাই আমাদের সকল শুভ কাজ, কল্যাণ উৎসব আজ শ্রীহীন, রূপহীন, প্রাণহীন। তোমরা অনাগত যুগের মশালবরদার, তোমাদের অর্ধেক আসন ছেড়ে দাও কল্যাণী নারীকে। দূর করে দাও তাদের সামনের ওই অসুন্দর চটের পর্দাÑ যে পর্দার কুশ্রীতা ইসলাম জগতের, মুসলিম জাহানের আর কোথাও নেই।”
বিপ্লবী নজরুল দুনিয়ার মুসলিম জাতির সেবার মধ্যকার অনৈক্য দূর করে তাদের সংঘবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। এই ফরিদপুর জেলা মুসলিম ছাত্র সম্মিলনীতে প্রদত্ত সভাপতির অভিভাষণে তিনি বলেছিলেন-
“তারও আগে তোদের কর্তব্য সম্মিলিত হওয়া, সংঘবদ্ধ হওয়া। যে ইখাওয়াৎ সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব, যে একতা ছিল মুসলিমের আদর্শ, যার জোরে মুসলিম জাতি এক শতাব্দীর মধ্যে পৃথিবীর জয় করেছিল, আজ আমাদের সে একতা নেই। হিংসায়, ঈর্ষায়, কলহে, ঐক্যহীন বিচ্ছিন্ন। দেয়ালের পর দেয়াল তুলে আমরা ভেদ-বিভেদের জিন্দানখানা দৃষ্টি করেছি; কত তার নাম- শিয়া, সুন্নি, শেখ, সৈয়দ, মোগল, পাঠান, হানাফি, শাফি, হাম্বলি, মালেকি, লা মাজহাবি, ওহাবি ও আরও কত শত দল। এই শত দলকে একটি বোঁটায় একটি মৃণালের বন্ধনে বাঁধতে পারো তোমরাই। শতধা বিচ্ছিন্ন এই শতদলকে এক সামিল করো, এক জামাত করো, সকল ভেদ-বিভেদের প্রাচীর নিষ্ঠুর আঘাতে ভেঙে ফেল।”
।। পাঁচ।।
আগেই উল্লেখ করেছি, রাষ্ট্র বা সমাজ প্রভৃতির আমূল ও অতি দ্রæত পরিবর্তন করার কাজটা বিপ্লবী কাজ। নজরুল সমাজহীন মুসলমান সমাজকে একটি সুসংঘবদ্ধ সমাজ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। মুসলমানদের সমাজে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে, এটা চেয়েছিলেন। মুসলিম নারী স্বাধীন, শিক্ষিত ও ব্যক্তিত্ববান মানুষ হিসেবে মর্যাদা পাবেন, এটা তিনি চেয়েছিলেন। মুসলমানরা ইসলামের গৌরবোজ্জল ইতিহাস থেকে প্রেরণা পাবেন এবং শিক্ষা নেবেন এটা তিনি চেয়েছিলেন। এসবই বিপ্লবী মানসিকতার মানুষের চাওয়া।
বিপ্লবী শব্দের আরেকটি অর্থ যে বিদ্রোহ সে কথাও আগে উল্লেখ করেছি।
ভাদ্র ১৩৩৪ (আগস্ট-সেপ্টেম্বর ১৯২৭) এর মাসিক নওরোজ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামকে লেখা প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁর একখানি পত্র। এই চিঠির জবাব চিঠির উত্তরে শিরোনামে কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেনÑ পৌষ্য ১৩৩৪ (ডিসেম্বর ১৯২৭-জানুয়ারি ১৯২৮) এর মাসিক সওগাতে। এই চিঠির এক জায়গায় তার বিপ্লবের কাজ বা বিদ্রোহের কাজ সম্পর্কে কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেনÑ
“বিদ্রোহীর ভয়ে তিলক আমার ললাটে অঙ্কন হয়ে গেল আমার তরুণ বন্ধুদের ভালোবাসায়। একে অনেকেই কলঙ্ক তিলক বলে ভুল করেছেন, কিন্তু আমি করিনি। আমি বিদ্রোহ করেছি, বিদ্রোহের গান গেয়েছি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে যা মিথ্যা কলুষিত, পুরাতন পচা সেই মিথ্যা সনাতনের বিরুদ্ধে ধর্মের নামে ভÐামী ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। হয়তো আমি সব কথা মোলায়েম করে বলতে পারিনি, তলোয়ার লুকিয়ে তার রূপার খাপের ঝক্মকানিটাকে দেখাইনি, এই তো আমার অপরাধ। এর জন্যই তো আমি বিদ্রোহী। আমি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি, সমাজের সকল কিছু কুসংস্কারের বিধি-নিষেধের বেড়া অকুতোভয়ে ডিঙ্গিয়ে গেছি এর দরকার ছিল মনে করেই। এই কুম্ভকর্ণ মার্কা সমাজকে জাগাতে হলে আঘাত দিয়েই জাগাতে হয়। একদল প্রগতিশীল বিদ্রোহীর উদ্ভাবনা হলে এর চেতনা আসবে না।”
কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বিপ্লবী কবি, বিপ্লবী সাহিত্যিক কেন বলা হয়Ñ এটা যারা জানতে চান, তারা কবির উপরোক্ত বক্তব্য যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করলে তা উপলব্ধি করতে পারবেন।
নজরুল সাহিত্যের বিপ্লবী রূপের পরিচয়, কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতায়ও অত্যন্ত ষ্পষ্টভাবেই আছে। বিদ্রোহী কবিতার এক জায়গায় আছেÑ
“মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেইদিন হবো শান্ত
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভ‚মে রণিবে না
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হবো শান্ত।”
নজরুল সাহিত্যের বিপ্লবী রূপের চ‚ড়ান্ত পর্যায়টা উপলব্ধি করার জন্য এর পরের স্তবকটা উদ্ধৃত করা দরকার। সেখানে তিনি লিখেছেনÑ
“আমি বিদ্রোহী ভৃত্য, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন,
আমি স্রষ্টা সূদন, শোক-তাপ নানা খেয়ালি বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন আমি বিদ্রোহী ভৃত্য, ভগবান, বুকে এঁকে দেবো পদচিহ্ন!
আমি খেয়ালি বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!
হিন্দুদের পুরাণে আছে, সৃষ্টির দেবতা ব্রহ্মার মানসপুত্র ভৃত্য।
ব্রহ্মা, মহেশ্বর এবং বিষ্ণু এই তিন দেবতার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কে তা মীমাংসার জন্য সমস্ত মুনিরা একবার ভৃত্যকে তাদের কাছে পাঠিয়েছিলেন।
ব্রহ্মার সম্মুখে ভৃত্য যখন উপস্থিত হয়েছিলেন, ব্রহ্মা বিশ্ব সৃষ্টির সমস্ত কাজ ফেলে রেখে অতীব সমাদরে ভৃত্যকে আদর-আপ্যায়ন করেছিলেন। কিন্তু এই আতিথেয়তার জন্য ব্রহ্মা সৃষ্টির মূল্যবান কাজ বন্ধ রাখায় শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান ব্রহ্মার পাওনা হয় বলে ভৃত্য মনে করেননি।
ব্রহ্মার কাছে যাওয়ার পর ভৃত্য গেলেন মহেশ্বরের কাছে। মহেশ্বর বললেনÑ
“শ্রেষ্টত্বের বিচার আমার কাছে কেন? বিষ্ণুর কাছে যাও। শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপার ব্যাপারে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। আমাকে ওপর-নীচে যেখানে খুশি রাখো। আমি সবেতেই সন্তুষ্ট।
মহেশ্বরের কাছে গিয়ে ভৃত্য বড় বিরক্ত হয়েছিলেন।
বাকি ছিলেন কেবল বিষ্ণু। এরপর বিষ্ণুর কাছে গিয়ে ভৃত্য দেখেছিলেন যে, বিষ্ণু তখন ব্রহ্মাÐ লোলনপালন ছেড়ে দিয়ে গভীর নিদ্রাসুখ উপভোগ করছেন। সে সময় ল²ী দেবী তার পদসেবায় এতই মগ্ন ছিলেন যে, ভৃত্যের উপস্থিতি টেরই পেলেন না। বিশ্ব সৃষ্টির এবং লালনপালনের সমস্ত কাজ ফেলে রেখে ভগবান বিষ্ণু নিদ্রামগ্ন আছেন এটা দেখে ভৃত্য ক্রুব্ধ হয়ে বিষ্ণুবক্ষে সজোরে পদাঘাত করে বসলেন।
মুহূর্তেই ভগবান বিষ্ণুর নিদ্রা ভঙ্গ হলো।
যারপরনাই লজ্জিত হয়ে বিষ্ণু প্রথমেই ভৃত্যকে অভিনন্দন জানালেন তাকে জাগিয়ে দেয়ার জন্য। তারপর বিনয়াবনত হয়ে জিজ্ঞেস করলেনÑ
এ মহর্ষি ভৃত্য! প্রস্তুরসম এই বক্ষে পদাঘাত করে আপনার পা আহত হয়নি তো? এ কথা বলেই ভৃত্যর পা টিপতে লাগলেন বিষ্ণু।
হঠাৎ চমকে উঠলেন ভৃত্য। এমন তরো আশ্চর্য কথা যেন তিনি জীবনে কখনো শোনেননি। বিষ্ণুর মহত্বকে তিনি কোনোমতেই উপেক্ষা করতে পারলেন না। মুক্তকণ্ঠে ভৃত্য ঘোষণা করলেন, দেবতা এবং ঋষিদের মধ্যে বিষ্ণু শ্রেষ্ঠ।
গঙ্গা আর তমসা বা ছোট সরযূ’র (এখন সুপ্ত) সঙ্গমস্থল উত্তর প্রদেশের বালিয়াতে ভৃত্যজীর মন্দির আছে। হিন্দুদের কাছে সেটা তপোভ‚মি, পুণ্যভ‚মি। প্রতি বছর কার্তিক পুর্ণিমায় সেখানে মেলা বসে ভৃত্যজীর এবং তার শিষ্য দর্দরী মুনির নামে ভৃত্য দর্দরী মেলা। এক মাসব্যাপী চলে সে মেলা।
হিন্দুদের কাছে পুরানই তো হলো ধর্ম। এটা হিন্দু ধর্মের বিষয়। এ বিষয়ে অনেক মুসলমানই অজ্ঞ। এই অজ্ঞতার কারণে সুফি জুলফিকার হায়দার পাকিস্তান আমলে প্রকাশিত তার ‘নজরুল জীবনের শেষ পর্যায়’ গ্রন্থে কবির বিরুদ্ধে মিথ্যা নিন্দা অপবাদ এবং কুৎসা রটনা করেছেন। অপরিসীম অজ্ঞতাজনিত কারণে তিনি মিথ্যা করে রটিয়েছেন যে, কবি নাকি আল্লাহর বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিতে চেয়েছেন।
বিদ্রোহী কবিতায় নজরুল ভগবান বিষ্ণুর বক্ষ ভৃত্যর পদচিহ্ন এঁকে দেয়ার কথা স্মরণ করছেন এটা বোঝাতে যে, যিনি যত বড় ক্ষমতাবানই হন না কেন, তিনি তার গাফিলতির বিরুদ্ধে, অনিয়মের বিরুদ্ধে, দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহ’ করবেন। নজরুলের বিপ্লবী আকাক্সক্ষা এতদূর পর্যন্ত ছিল। চ‚ড়া স্পর্শ করেছিল।
।। ছয়।।
ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের মঞ্চে ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে আহমেদাবাদে মহান উর্দু কবি মওলানা ফজলুল হাসান হসরৎ মোহানি সর্বপ্রথম পরিপূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। আহমেদাবাদেই এর অব্যাবহিত পর নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশনে সভাপতির অভিভাষণে ১ জানুয়ারি ১৯২২ সাল থেকে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনাধীন ভারতবর্ষকে ইউনাইটেড স্টেটস অব ইন্ডিয়া ঘোষণা করে এই পরিপূর্ণ স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখার জন্য মহাত্মা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর নেতৃত্বে গেরিলা যুদ্ধ চালানোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। মহাত্মা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী নিখিল ভারত মুসলিম লীগের এই অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন, তিনি এই প্রস্তাবে রাজী হননি। এরপর এসেছিল অর্ধ সাপ্তাহিক ধুমকেতুতে কবি কাজী নজরুল ইসলামের তরফে পরিপূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব সাম্রাজ্যবাদী সেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রথম সংবাদপত্রে পরিপূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জানিয়েছিলেন।
১৯৬৯-এর প্রকাশিত অক্টোবরে কাজী নজরুল ইসলাম : স্মৃতিকথা ৩০২ পৃষ্ঠায় কমরেড মুজাফফর আহমদ লিখেছেন যে, ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে আহমদাবাদে নিখিল ভারত কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনের এবং নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশনে মহান উর্দূ কবি মওলানা ফজলুল হাসন হসরৎ মোহানী পরিপূর্ণ স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে কঠিন মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। তা সত্তে¡ও ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ১৩ অক্টোর (১৩২৯ বঙ্গাব্দের ২৬ আশ্বিন) শুক্রবার অর্ধসাপ্তাহিক ধূমকেতু’র তৃতীয় পৃষ্ঠায় ধূমকেতু’র পথ শিরোনামে সম্পাদকীয় নিবন্ধে বাঙলার কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেনÑ
প্রথম সংখ্যার ধূমকেতুতে সারথির পথের খবর প্রবন্ধে একটু আভাস দেবার চেষ্টা করেছিলাম,Ñ যা বলতে চাই তা বেশ ফুটে ওঠেনি মনের চপলতার জন্য। আজও হয়তো নিজেকে যেমনটি চাই তেমনটি প্রকাশ করতে পারবো না, তবে এই প্রকাশের পীড়া থেকেই আমার বলতে না পারা বাণী অনেকেই বুঝে নেবেনÑ আশা করি।
সর্ব প্রথম, “ধূমকেতু” ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়।
“স্বরাজ টরাজ বুঝি না, কেননা, ও কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারত বর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীর অধীনে থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসন ভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোনো বিদেশীর মোড়লী করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। যাঁরা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এদেশে মোড়লী করে দেশকে শ্মশান ভূমিতে পরিণত করছেন, তাঁদেরকে পাততাড়ি পটিয়ে, বোঁচকা, পুঁটলি বেঁধে সাগর পারে পাড়ি দিতে হবে। প্রার্থনা বা আবেদন নিবেদন করলে তাঁরা শুনবেন না। তাঁদের অতটুকু সুবুদ্ধি হয়নি এখনো। আমাদের এই প্রার্থনা করার, ভিক্ষা করার কুবুদ্ধিটুকুকে দূর করতে হবে।
“পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে সকল কিছু নিয়ম-কানুন বাঁধন মানা নিষেধের বিরুদ্ধে।
“আর এই বিদ্রোহ করতে হলে সকলের আগে আপনাকে চিনতে হবে।”
।। সাত।।
১১ আগস্ট ১৯২২ তারিখ শুক্রবার প্রকাশিত অর্ধসাপ্তাহিক ধূমকেতু সন্ত্রাসবাদী গুপ্ত সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী সংগঠন যুগান্তর দল (১৯০২) উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিল। এই অর্ধসাপ্তাহিক ধূমকেতুতে লেখার জন্য এবং লেখার প্রকাশ করার জন্য রাজদ্রোহের অভিযোগে কবি কাজী নজরুল ইসলামের এক বছর সশ্রম কারাদÐ হয়েছিল। ১৭ জানুয়ারি ১৯২৩ তারিখে ভারতীয় দÐবিধির ১২৪এ এবং ১৫৩এ ধারায়।
অর্থনৈতিক দিক দিয়ে যে সব রাজবন্দী গরীব সেই সব কয়েদীকে হুগলী জেলে সাধারণ কয়েদীর পর্যায়ে নামিয়ে দেয়া হলে এর প্রতিবাদে কবি কাজী নজরুল ইসলাম রাজনৈতিক সহবন্দীদের সঙ্গে নিয়ে অনশন ধর্মঘট শুরু করেছিলেন। সে সময় তিনি অনেক নির্যাতন ভোগ করেছিলেন। তবু পরিপূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জানানো থেকে এবং যে কোনো অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মানসিকতা থেকে তিনি কখনো সরে আসেনি। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর তারিখে ভারতীয় দÐবিধির ১২৪এ ধারায় রাজদ্রোহের অভিযোগ কবি কাজী নজরুল ইসলামের আরো একবার সশ্রম কারাদÐ হয়েছিল। এবার হয়েছিল ৬ মাসের সশ্রম কারাদÐ।
।। আট।।
কলকাতায় ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে কুতুবুদ্দীন আহমদ, শাম্সুদ্দীন হুসয়ন, হেমন্তকুমার সরকার এবং কবি কাজী নজরুল ইসলামের উদ্যোগে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্ত লেবার স্বরাজ পার্টি (ঞযব ষধনড়ঁৎ ঝড়িৎধল চধৎঃু ড়ভ ঃযব ওহফরধ ঘধঃরড়হধষ ঈড়হমৎবংং) নামে একটি সাম্যবাদী রাজনৈতিক সংগঠন গঠিত হয়। এই সাম্যবাদী রাজনৈতিক সংগঠনের ইশতিহার কবি কাজী নজরুল ইসলামের দস্তখতে প্রকাশিত হয়েছিল। কবি কাজী নজরুল ইসলামের পরিচালনায় এই সাম্যবাদী রাজনৈতিক সংগঠনের সাপ্তাহিক মুখপত্র রূপে ‘লাঙল’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৬ ডিসেম্বর ১৯২৫ তারিখে। এতে ঈশ্বর, মানুষ, পাপ, বীরাঙ্গনা, নারী, কুলি-মজুর, এ রকম বিভিন্ন উপ-শিরোনামে কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত সাম্যবাদী কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম সংখ্যাতেই। সারা ভারতবর্ষে যদি নাও হয় অত্যন্ত সারা বাঙলায় সাম্যবাদী সাহিত্যের জনক এই কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সারা ভারতে যদি নাও হয়, সারা বাঙলায় গণসঙ্গীতের এবং গণসাহিত্যের জনক ও কবি কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুলের পরিচালনায় সাপ্তাহিক লাঙল-এর দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘‘কৃষাণের গান’’।
সাপ্তাহিক ‘লাঙল’-এর পূর্ব থেকেই খুব প্রবলভাবেই এলো কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদী কবিতা এবং সাম্যবাদী গণসঙ্গীত। সারা ভারতীয় উপমহাদেশে যদি নাও হয়, অন্তত অভিভক্ত সারা বাঙলায় সাম্যবাদী সাহিত্যের, সাম্যবাদী গণসঙ্গীতে এবং গণসাহিত্যের পথিক্রৎ কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কবির সাম্যবাদী সিরিজের মানুষ উপশিরোনামে প্রকাশিত কবিতার প্রথম দিককার কিয়দংশ উদ্ধৃত করছি।
“গাহি সাম্যের গান মানুষের চেয়ে বড় কিছুই নাই, নহে কিছু মহীয়ান! নাই দেশ কাল পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি, সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।
‘পূজারী, দুয়ারে খোল, ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পূজার সময় হলো! স্বপন দেখিয়া আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়, দেবতার বরে আজ রাজা টাজা হয়ে যাবে নিশ্চয়!Ñ জীর্ণ বস্ত্র শীর্ণ গাত্র, ক্ষূধায় কণ্ঠ ক্ষীণ। ডাকিল পান্থ, দ্বার খেলো বাবা, খাইনি ক’ সাতদিন! সহসা বন্ধ হলো মন্দির, ভ‚খারী ফিরিয়া চলে, তিমির রাত্রি, পথজুড়ে তার ক্ষুধার মানিক জ্বলে!
ভুখারী ফুকারি কয়, ঐ মন্দির পূজারীর, হায় দেবতা, তোমায় নয়!
মসজিদে কাল শিরণী আছিল, অঢেল গোস্ত রুটি বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটিকুটি এমন সময় এলো মুসাফির গায়ে আজারির চিন, বলে, ‘বাবা, আমি ভুখা, ফাঁকা আছি আজ নিয়ে সাত দিন! দেরিয়া হইয়া হাঁকিল মোল্লা- ভ্যালা হলো দেখি লেঠা, ভুখা আছ মরো গো ভাগাড়ে গিয়ে! নামাজ পড়িস বেটা?” ভুখারী কহিল, “না বাবা! মোল্লা হাঁকিল, তাহলে শালা, সোজা পথ দেখ!” গোস্ত-রুটি নিয়ে মসজিদের দিল তালা!
“ভুখারী ফিরিয়া চলে,
জলিতে চলিতে বলে...
আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,
আমার খুধার অন্যতা বলে বন্ধ করেনি প্রভু!
তব মসজিদ-মন্দিরে প্রভু নাই, মানুষের দাবি,
মোল্লা পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি!
কোথা চেঙ্গিস, গজনী মাহমুদ কোথায় কালপাহাড়?
ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা দেওয়া দ্বার!
খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?
সব দ্বার এর খোলা রবে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা!
হায় রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভÐ গাহে স্বার্থের জয়!
মানুষেরে ঘৃণা করি,
ও’ কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি!
ও’ মুখ হইতে কেতাব গ্রন্থ নাও জোরে করে কেড়ে,
যাহারা আনিল গ্রন্থ কেতাব সেই মানুষের মেরে
পুঁজিছে গ্রন্থ ভÐের দল! মূর্খরা সব শোনে,
মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো!”
কবি কাজী নজরুল ইসলাম খুবই সিনসিয়র মানুষ ছিলেন, অত্যন্ত সেনজিটিভ মানুষ ছিলেন, অত্যন্ত স্পর্শকাতর মনের মানুষ ছিলেন। খুবই সংবেদনশীল মনের চিন্তাশীল মানুষ ছিলেন তিনি। তাই মানুষের দুঃখ-কষ্টের ব্যাপারে নির্বিকার থাকতে পারতেন না তিনি। বৈষম্য মানতে পারতেন না। কোনো মানুষের ওপরই অত্যাচার, অবিচার, অসম্মান করা হলে সেটা মানতে পারতেন না। এসব ব্যাপারে নির্বিকার এবং উদাসীন থেকে শিল্প সাহিত্য সৃষ্টি করার কথা ভাবতে পারতেন না। সে জন্য তাঁর সাহিত্য সাধনা তার কাছে কোনো বিলাসিতার বিষয় ছিল না। শিল্পের জন্য শিল্প সৃষ্টি করার বিলাসিতা তার ছিল না। সাম্য ও সহাবস্থানকামী মানুষ হিসেবে অত্যন্ত ও সংবেদনশীল মন এবং গঠনমূলক চিন্তা-ভাবনা নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই সব মানুষের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী সৃষ্টি করার জন্য অর্থনৈতিক সাম্য ও সামাজিক সাম্য এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সমাজের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত, আইনগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের সংস্থান সৃষ্টি করা হোক, এটাই তিনি চাইতেন। একারণেই ৯ জানুয়ারি ১৯৪১ তারিখ বৃহস্পতিবারের ঈদুজ্জোহা উপলক্ষ্যে কলকাতায় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির ঈদ সম্মেলনে প্রদত্ত সভাপতির অভিভাষণে এক জায়গায় তিনি বলেছেন :
“আমার সাহিত্য সাধনা বিলাশ ছিল না।”
সেই জন্যই তিনি তার গণসঙ্গীত “কৃষাণের গান” লিখেছেন। শুরুর দিক থেকে সেই গানে আছে :
ওঠ রে চাষি জগদ্বাসী ধর কষে লাঙল।
আমরা মরতে আছি ভাল করেই মরব এবার চল্\
মোদের ওঠার ভরা শস্য ছিল হাস্য ভরা দেশ
ঐ বৈশ্য দেশের দস্যূ এসে লাঞ্ছনার নাই শেষ,
ও ভাই লক্ষ্য হাতে টানছে তারা ল²ী মায়ের কেশ,
আজ মা’র কাঁদনে লোনা হ’লো সাত সাগরের জল\
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সাম্যবাদী গণসঙ্গীত “শ্রমিকের গান” লিখেছেন দস্তুর মতো একেবারে শ্রেণী সংগ্রামের কথা:
“ওরে ধ্বংস পথে যাত্রীদল।
ধর হাতুড়ি, তোল কাঁধে শাবল\
আমরা হাতের সুখে গ’ড়েছি ভাই,
পায়ের সুখে ভাঙল চল।
ধর হাতুড়ি, তোল কাঁধে শাবল\
সাম্য ও সহাবস্থানের
কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সাম্যবাদী গণসঙ্গীত
“ধীবরের গান” এ লিখেছেন:
“আমরা নীচে প’ড়ে রইব না আর
শান্ রে ও ভাই জেলে
এবার উঠব রে ঠেলে!
ঐ বিশ্ব সভায় উঠল সবাই রে,
ঐ মুটে মজুর জেলে!
এবার উঠব রে সব ঠেলে।
নজরুল সাহিত্যে যে বিপ্লবী রূপ আমরা দেখি সেটা দেখতে পাই পরিপূর্ণ রূপে। একেকবারে সম্পূর্ণ রূপে কিন্তু এটাই নজরুল সাহিত্যের সব কিছুই নয়। নজরুলের নিজের মানসিক হিসাব অনুযায়ী এটা ষোল ভাগের যেন এক ভাগ।
১১ আগস্ট ১৯২৬ তারিখ সকালে কৃষ্ণনগর থেকেই চট্টগ্রামের বেগম শামসুল নাহার মাহ্মুদকে একটা চিঠিতে কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন:
“আমার পনেরো আনা রয়েছে স্বপ্নে বিভোর সৃষ্টির ব্যথায় ডগ মগ, আর এক আনা ক’রছে পলিটিক্স, দিচ্ছে বক্ততা, গড়ছে সংঘ।”
অবশ্যই এটাও স্মরণ রাখা দরকার যে, কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিপ্লবী কাজের অনেক কিছুই পলেটিক্স করার লক্ষ্যে করেননি। আবার পলেটিক্স করাটাও আদৌ তার লক্ষ্যও ছিল না। গঠনমূলক চিন্তা-ভাবনা সম্পন্ন অত্যন্ত সংবেদনশীল মনের মানুষ ছিলেন তিনি। মানুষের অধিকার বঞ্চিত হয়ে থাকাটা, অবদমিত হয়ে থাকাটা এবং নির্যাতিত, অধ:পতিত এবং অসম্মানিত হয়ে থাকাটা তিনি স্বাভাবিক ব্যাপার ব’লে মেনে নিতে পারতেন না। তাই এ অবস্থার অতিদ্রæত আমুল পরিবর্তন ঘটনোর বিপ্লবী কাজ তিনি করতে চেয়ে ছিলেন।
তাঁর বিপ্লবী সাহিত্য কোনো চেষ্টার ফসল ছিল না। সেটা ছিল তাঁর মানসিক অনুভ‚তির স্বত:স্ফ‚র্ত অভিব্যক্তি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।