Inqilab Logo

বুধবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২২, ০৫ মাঘ ১৪২৮, ১৫ জামাদিউস সানি ১৪৪৩ হিজরী
শিরোনাম

ইরাকের খ্রিস্টানরা আইএসের পর শিয়াদের হুমকির সম্মুখীন

| প্রকাশের সময় : ৬ জুন, ২০১৭, ১২:০০ এএম

দি নিউ আরব : মনে হচ্ছে এই গতকালও যেন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জিহাদিরা ইরাক কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছিল, তাদের খিলাফতের এলাকা বাড়াতে দখল করছিল নিত্যনতুন এলাকা।
মনে হচ্ছে, ইরাকের খ্রিস্টানদের তাদের বাড়িঘর ও সমাজ থেকে বিতাড়িত করার মাধ্যমে আইএস যে বর্বরতা চালিয়েছিল তার বিরুদ্ধে গোটা বিশে^র খেপে ওঠা এই কালকের ঘটনা।
এখন আইএসের দখলকৃত এলাকায় যেমন মরণ পেরেক ঠোকার কাজ চলছে অন্যদিকে তাদের কাছ থেকে পুনর্দখলকৃত বারটেলা ও অন্যান্য শহরের গির্জাগুলোতে আবার ঘন্টাধ্বনি বাজতে শুরু করেছে। ইরাকি খ্রিস্টানরা এখন নিশ্চিতভাবে স্বস্তির শ^াস ফেলতে পারে যে তারা বিপর্যয় এড়াতে পেরেছে। কিন্তু আসলে কি তাই? প্রকৃত অবস্থা হচ্ছে এই যে আইএসের পর ইরাকের খ্রিস্টানরা এখন উগ্রপন্থী শিয়াদের হুমকির সম্মুখীন।
আইএস ও শিয়া জিহাদিবাদ
গত সপ্তাহে ইরাকের সরকার নিয়োজিত অত্যন্ত প্রবীণ এক শিয়া ধর্মনেতা ও ইরাকের শিয়া ওয়াকফ তহবিলের প্রধান আলা আল-মুসাভি বলেন যে ধর্মগ্রন্থে উল্লেখিত লোকেরা - খ্রিস্টান ও ইহুদিদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করতে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা উচিত।
তিনি বলেন, যদি ইহুদি ও খ্রিস্টানরা ইসলাম গ্রহণ না করে তাদের হত্যা করা উচিত অথবা তাদের প্রাচীনকালের মত জিযিয়া কর দিতে হবে যা শুধু অ-মুসলিমদের জন্যই প্রযোজ্য। আইএসের নিয়ন্ত্রিত নগর ও শহরগুলোতে খ্রিস্টানদের হয় ইসলাম গ্রহণ নয় জিযিয়া কর দিতে হয়েছে। অন্যথায় তাদের শিরñেদ করা হত। ইরাকের ইতোমধ্যে নির্যাতিত খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সাথে কি ধরনের আচরণ করা হবে এ নিয়ে আলোচনাকালে তিনি বলেন, সাবিয়ান ও জোরোস্ট্রিয়ানদেরও জিহাদে লড়াই করতে হয়েছে এবং তাদের প্রতিও কিতাবি লোকদের মতই একই আচরণ করা হত।
খ্রিস্টান ও ইরাকের অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি মুসাভি একাই শুধু এ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন না। তিনি যা বলেছেন তা আইএস প্রধান আবু বকর আল-বাগদাদীর মতই।
২০১৪ সালে আইএস মসুল দখল করার কিছুদিন পর বাগদাদীর আদেশে আইএস তাদের খিলাফতের মধ্যে এক ঘোষণা জারি করে। এ ঘোষণায় বলা হয়, আইএসের নিয়ন্ত্রণাধীন নগর ও শহরগুলোতে থাকা খ্রিস্টানদের অবশ্যই হয় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে হবে নয় তাদের জিযিয়া দিতে হবে। অন্যথায় তাদের তরবারির মুখে সমর্পণ করা হবে।
আইএস উগ্রপন্থীরা তখন মসুল ও অন্যান্য শহরের খ্রিস্টানদের তাদের দোকানপাট ও বাড়িঘরে আরবি ‘নু’ অথবা ইংরেজি এন অক্ষর দিয়ে চিহ্নিত করে যার অর্থ নাসরানি বা খ্রিস্টান। যেসব খ্রিস্টান এ নির্দেশ অমান্য করত তাদের তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হত। প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে বিশে^র বেশীরভাগ টুইটারিটি ইরাকি নির্যাতিত খ্রিস্টানদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতে তাদের প্রোফাইলে ‘নু’ সংযোজন করে। আর এর বিপরীতে আইএস তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের প্রতীক হিসেবে এ অক্ষরটিকে ব্যবহার করার চেষ্টা করে।
ইরাকি নাগরিকদের প্রতি এই সংহতি প্রকাশের বিষয়টি যখন ধর্ম-গোত্র নির্বিশেষে সকল ইরাকিকে স্পর্শ করেছে তখন এটা বিস্ময়কর যে আইএস যেখানে প্রবল প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়েছে সেখানে সরকার সমর্থিত শিয়া ধর্মনেতা খোলাখুলিভাবে একই বর্বরতার প্রবক্তা হয়েছেন।
ইরাকি খ্রিস্টান জঙ্গিবাদ
মুসাভির বক্তব্যের ভীতিকর দিক হচ্ছে তিনি হ”্ছনে ইরাক সরকারের নিযুক্ত ঊর্ধতন ধর্মীয় নেতা, আর ইরাক সরকার হচ্ছে আইএসের বিরুদ্ধে মার্কিনিদের লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিমা মিত্র। পাশ্চাত্য তাদের মিত্রদের কাছ থেকে যা আশা করে তার মানদন্ড যদি এই হয় তাহলে আইএস প্রথম স্থানে থাকলে তা কি বিস্ময়কর? সাবেক প্রধানমন্ত্রী নূরী আল মালিকির বেপরোয়া গোষ্ঠিবাদ ও সুন্নী আরব সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা ইরাকে তথাকথিত সুন্নী জিহাদিবাদের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল এবং আইএসের জন্য পিছনের দরজা খুলে দিয়েছিল।
আইএস তখন সুন্নীদের স্বার্থরক্ষায় অবতীর্ণ হয় এবং যা ভালো ও ন্যায়ের পথ অবলম্বন করে। পরে তারা নির্যাতনের প্রকৃত শিকারদের বাদ দিয়ে অপকর্ম ও পীড়ন শুরু করে।
এ পরিস্থিতি পরিণতিতে ইরাকি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে উগ্রপন্থার জন্ম দেয়। ফেব্রæয়ারিতে খ্রিস্টান মোবিলাইজেশন মিলিশিয়ার কমান্ডার সালমান এসো হাব্বাকে মসুল যে প্রদেশে অবস্থিত সেই নিনেভেহর সুন্নী আরবদের বিরুদ্ধে গোষ্ঠিগত নির্মূল অভিযানের হুমকি দেয়ার সময় ক্যামেরাবন্দী করা হয়।
সুন্নী আরবদের প্রতি হাব্বার প্রতিক্রিয়া যদি এ রকম হয় তাহলে সরকারী ধর্মীয় নেতা যদি সরকারের সমর্থনে খ্রিস্টান, ইহুদি ও অন্যদের প্রতি সক্রিয় উস্কানি প্রদান করেন সেক্ষেত্রে তার ও তার মত জঙ্গি খ্রিস্টানদের প্রতিক্রিয়া কি হবে? যে কেউই বুঝবে যে এতে উগ্রপন্থা আরো জোরদার হবে, কমবে না।
খ্রিস্টান দুর্ভোগের রাজনীতিকায়ন
যুক্তরাষ্ট্রের মত বিশ^শক্তিগুলো যারা খ্রিস্টানসহ সংখ্যালঘুদের রক্ষার জন্য ইরাকে হস্তক্ষেপ করার দাবি করে, তাদের মিত্রদেশের একজন জ্যেষ্ঠ ধর্মনেতার এ ধরনের কথাবার্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি ওঠার পর তাদের ভন্ডামি ধরা পড়ে গেছে।
আল জাজিরা শুক্রবার জানায়, মুসাভির উস্কানিমূলক নির্লজ্জ বক্তব্যের সমালোচনা করার পরিবর্তে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স বিশ^ খ্রিস্টান সমাজ আইএসের ‘গণহত্যা’র শিকার দাবি করে সে আলোচনায় তার সময় অতিবাহিত করেন।
এটা নিশ্চিতভাবে সত্য যে আইএস খ্রিস্টানদের ক্ষতি করতে চায়, কিন্তু তাকে গণহত্যা বলে আখ্যায়িত করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। এগুলো ফাঁকা বুলির মত শোনায় যখন মনে হয় ওয়াশিংটন মুসাভির মত মানুষের বা তেহরান সমর্থিত ও বাগদাদ অনুমোদিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের (পিএমএফ) নিন্দা করতে সক্ষম নয় মানবাধিকার সংস্থাগুলো যাদের বিরুদ্ধে আইএস বিতাড়িত হওয়ার পর খ্রিস্টানদের বাড়িঘরে লুটপাট চালানোর জন্য অভিযুক্ত করেছে।
খ্রিস্টান দুর্ভোগ নিয়ে এই নির্লজ্জ রাজনীতির সর্বোত্তম প্রদর্শনী দেখা যায় যখন আমেরিকান ক্রিশ্চিয়ান লিবার্টি ইউনিভার্সিটি তাদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মধ্যপ্রাচ্যে খ্রিস্টানদের নিপীড়নকারীদের বোমাবর্ষণকারী বলে পরিচয় করিয়ে দেয়।
আসলে এপ্রিল মাসে সিরিয়ায় ট্রাম্পের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রসঙ্গে এ কথা বলা হলেও শ্রোতারা যা বিশ^াস করেছে বলে মনে হয়েছিল তাহল আমেরিকার নেতা ধর্মনিরপেক্ষ বাথপন্থী আসাদ সরকারের উপর বোমাবর্ষণের বদলে খ্রিস্টান বিরোধী আরব মুসলমানদের উপর বোমাবর্ষণ করেছেন।
আসলে ট্রাম্পের খ্রিস্টান রাজনীতি তার নিজের মতই বধির, অন্ধ ও মূক। তারা এক জিহাদি গ্রুপের নিন্দা করে তো আরেক জিহাদি গ্রুপের সাথে মিত্রতা করে ও তাদের বিমান সমর্থন দেয়।



 

Show all comments
  • nayeem ৬ জুন, ২০১৭, ৫:৫০ এএম says : 0
    agulo sunte ar valo lage na
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ