Inqilab Logo

ঢাকা বুধবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২০, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৬ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

ইরানকে রক্ষা করে চলেছে আল কায়েদা

| প্রকাশের সময় : ১০ জুন, ২০১৭, ১২:০০ এএম

ডেইলি বিস্ট : একদল সন্ত্রাসী বুধবার ইরানের পার্লামেন্ট ও আয়াতুল্লাহ খোমেনির মাজারে হামলা চালায়। ইরানের রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার খবর অনুযায়ী এ হামলায় ১২ জন নিহত হয়। আইএস আইএস (ইসলামিক স্টেট বা আইএস-এর আরেক সংক্ষিপ্ত নাম) দ্রæত এ হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর এ জন্য সউদি আরবকে দায়ী করেছে। এর ফলে এ অঞ্চলে নাটকীয়ভাবে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ হামলা একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা যদিও বিষয়টি আসলে যত গুরুতর তার চেয়ে কম করে দেখানো হয়েছে। তেহরান দীর্ঘদিন ধরে শাহাদত বরণ ধরনের হামলা এড়িয়ে আসছে যা পাশর্^বর্তী দু’টি দেশের রাজধানীতে প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা।
এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়। ইরান সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী বৈধ বিক্ষোভ ও অসৎ উদ্দেশ্যে বিক্ষোভসহ সকল ধরনের বিরোধিতা দমনে নিষ্ঠুর ভাবে সফল। সম্ভবত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে ইরানি শাসক গোষ্ঠি আল কায়েদার সাথে একটি গোপন চুক্তি বাতিল করেছে।
ওসামা বিন লাদেনের সংগঠন ও তার উপশাখা তথাকথিত ইসলামিক স্টেট কয়েক বছর ধরে ইরাক ও সিরিয়ায় ইরানের অনুগত সংগঠনগুলোর সাথে লড়াই করেছে। আইএসের সুন্নী জিহাদিদের জন্য শিয়া হত্যা ছিল এক রক্তখেলা। আবু বকর আল বাগদাদির তথাকথিত খিলাফত আগে মোল্লাদের দেশের অভ্যন্তরে আঘাত হানার চেষ্টা করেছিল বলে খবর বেরিয়েছিল। আইএস তাদের ভিডিও ও প্রচারণা বক্তব্যে নিয়মিত ভাবে ইরানের বিরদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। শেষ পর্যন্ত আইএস ইরানের হৃৎপিন্ডে সাফল্যের সাথে হামলা চালিয়েছে।
আল কায়েদা নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে ইরাকের শিয়া বিরোধী সহিংসতার রাশ টেনে ধরতে চেয়েছেন। ওসামা বিন লাদেনের ডেপুটি ও আল কায়েদার আমির আয়মান আল জাওয়াহিরি আল কায়েদা ইন ইরাকের প্রতিষ্ঠাতা আবু মুসাব আল জারকাবিকে বেসামরিক শিয়ােেদর লক্ষ্যবস্তু না করতে রাজি করানোর চেষ্টা করেন। জারকাবি ইরাকে একটি পুরোমাত্রার শিয়া-সুন্নী গোষ্ঠিগত লড়াইয়ের উস্কানি দেয়ার আশা করেছিলেন। যখন তার লোকেরা ২০০৬ সালে সামারার পবিত্র স্বর্ণ মসজিদ উড়িয়ে দেয় তখন তারা তাদের লক্ষ্য অর্জনের কাছে পৌঁছেছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি করে পূর্ণমাত্রার বিপর্যয় এড়ালেও গোষ্ঠিগত সহিংসতা আজো ইরাকে বিরাট সমস্যা।
জাওয়াহিরি জারকাবিকে বেসামরিক শিয়াদের হত্যা বন্ধে রাজি করানোর চেষ্টার এক বছরেরও কম সময়ে ২০০৬ সালের জুনে জারকাবি নিহত হন। তার উত্তরসুরিরা ইরাকে তার গোষ্ঠি সহিংসতার কৌশল অব্যাহত রাখে।  
২০১৪ সালের মে-তে আইএস মুখপাত্র আবু মুহাম্মদ আল আদনানি আল কায়েদা নেতাদের তীব্রভাবে তিরস্কার করেন ও  তেহরানের সাথে তাদের মধুর সম্পর্কের কথা প্রকাশ করেন।
ক্রুদ্ধ ভাষায় আদনানি বলেন, ইতিহাস জানুক যে ইরান আল কায়েদার কাছে বিপুলভাবে ঋণী। তিনি বলেন, তিনি ও তার লোকেরা ইরাকের বাইরে , ইরানে এবং কোনোখানেই শিয়াদের উপর হামলা না করার আল কায়েদার অনুরোধ রক্ষা করেছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে আইএসআইএস ইরানে আল কায়েদার স্বার্থ রক্ষা ও সরবরাহ পথ রক্ষা করার জন্য তাদের নির্দেশ মত কাজ করছে। আদনানি ২০১৬ সালে মার্কিন বিমান হামলায় নিহত হন।
২০১৪ সালে আল কায়েদার জেনারেল কমান্ড আইএসআইএসকে অস্বীকার করার পর বাগদাদি ও আদনানি নিজেদের আর আল কায়েদা নেতা আয়মান আল জাওয়াহিরির কোনো আদেশ দ্বারা আবদ্ধ বিবেচনা করেননি। আইসিস ইরাকের অনেক বাইরে শিয়াদের বিরুদ্ধে নির্বিচার হামলা শুরু করে এবং ইরানের অভ্যন্তরে কার্যক্রম পরিচালনার দিকে দৃষ্টি দেয়।
এখন পর্যন্ত আল কায়েদা ইরানের অভ্যন্তরে হামলা করা পরিহার করে আসছে , অন্তত তাদের উপর যারা সংগঠনের ক্ষেত্রে সরাসরি ভূমিকা রেখেছে। (এটা সম্ভব যে আল কায়েদা অন্য আঞ্চলিক গ্রæপগুলোকে সমর্থন করতে পারে যারা মাঝেমধ্যে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনীর উপর হামলা চালায়)
২০০৭ সালের অক্টোবরে বিন লাদেন বাগদাদির আইএসআইএসের অব্যবহিত পূর্বসূরী ইসলামিক স্টেট অব ইরাকের (আইএসআই) কাছে একটি চিঠি লেখেন। এ চিঠিটি হয়ত ঐ সময়ে আইএসআই-র নেতা আবু হামজা আল মুহাজির (ওরফে আবু আইয়ুব আল মাসরি)-এর কাছে লেখা হয়েছিল। আবু হামজা নিহত হওয়ার পর আবু বকর আল বাগদাদি ২০১০ সালে এ গ্রæপের  নেতা হন।
বিন লাদেন ইরানের বিরুদ্ধে আইএসআই-র হুমকি অনুমোদন করেননি। বিন লাদেন চিঠিতে লেখেন, ‘‘ ইরানের প্রতি আপনার হুমকির ব্যাপারে আমার কিছু কথা আছে, এবং আমি আশা করি যে আপনি ও আপনার ভাইরা তা মানবেন।” আল কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা আরো লেখেনঃ “আপনি এই গুরুতর বিষয়ে আমাদের সাথে আলোচনা করেননি যা আমাদের সার্বিক কল্যাণের উপর প্রভাব ফেলেছে।  আমরা আশা করেছিলাম এ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে আপনি  আমাদের সাথে আলোচনা করবেন। আপনি অবগত যে ইরান জিম্মি বিষয়সহ আমাদের তহবিল, যোদ্ধা ও যোগাযোগের প্রধান ধমনী।”
বিন লাদেন নীতিগত ভাবে ইরানকে টার্গেট করার বিরুদ্ধে ছিলেন না। তিনি শুধু ভেবেছিলেন যে ব্যয় অত্যন্ত বেশী এবং সম্পর্ক থেকে আল কায়েদা যে সুবিধা পায় তা তাৎপর্যপূর্ণ।
বিন লাদেনের উল্লেখিত প্রধান ধমনী পরে মার্কিন অর্থ ও পররাষ্ট্র দফতর কর্তৃক সন্ত্রাসীদের  উপাধি প্রদান, পুরস্কার ঘোষণা ও অন্যান্য  সরকারী বিবৃতিতে ব্যবহৃত হয়।
২০১১ সালের জুলাইতে অর্থ দফতর প্রথম ইয়াসিন আল-সুরি নামে পরিচিত একজনসহ আল কায়েদা নেতাদের সনাক্ত করে  যারা এ সময় ইরানের অভ্যন্তরে সহায়তা প্রদান নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছিলেন। অর্থ দফতর ব্যাখ্যা করে যে সন্ত্রাসী সংগঠন ও ইরান সরকারের মধ্যে পুরনো গোপন চুক্তির আওতায় তারা সেখানে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।  ওবামা প্রশাসনও ইরানি আস্তানাকে আল কায়েদার মূল সহায়তা প্রদান পাইপলাইন বলে উল্লেখ করে যা জিহাদি সংগঠনকে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় যোদ্ধা ও তহবিল সরবরাহের সুবিধা দিচ্ছিল। অন্যদিকে পাশ্চাত্যে হামলার ষড়যন্ত্রকারী আল কায়েদা অপারেটিভরা ইরানের মধ্য দিয়েই চলাচল করছিল।
নেটওয়ার্কের নেতৃত্ব সময়ের ব্যবধানে কয়েকটি কারণে বিবর্তিত হত। উদাহরণ স্বরূপ, ২০১১ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর সুরির জন্য ১ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে। তিনি হন বিশে^র সর্বাপেক্ষা ওয়ান্টেড ব্যক্তিদের একজন। আল কায়েদা তখন নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয় এবং আরেকজনকে দায়িত্বে নিয়োগ করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুরি আবার নেতৃত্বে আসেন।
পরবর্তী বছরগুলোতে ইরানের কয়েকজন বিশিষ্ট আল কায়েদা নেতা সিরিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন। বস্তুত মুহসিন আল ফাযিল ও সানাফি আল নাসরের মত চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা যারা ইরানে একটি সময়ের জন্য নেটওয়ার্কে নেতৃত্ব দিয়েছেন ,  তারা তথাকথিত ‘খোরাসান গ্রæপে’র  প্রধান  নেতায় পরিণত হন।      
আল কায়েদার খোরাসান গ্রæপের সদস্যরা পাশ্চাত্যে হামলার ষড়যন্ত্র করছে বলে ওবামা প্রশাসন ২০১৪ সালে এ গ্রæপের উপর বিমান হালা  চালানোর নির্দেশ দেয়। ফাযিল ও নাসর দু’জনই মার্কিন বিমা হামলায় সিরিয়ায় নিহত হন।
সিরিয়া ও ইয়েমেনে ইরান ও আল কায়েদা পরস্পর বিরোধী পক্ষ হওয়া সত্তে¡ও এসব স্থানে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যে ইরান ও আল কায়েদার মধ্যকার চুক্তি টিকে থাকে। জিহাদি বিশে^ এ এক বিরাট কৌতূহলের বিষয়।  এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন  নেই যে এসব দেশে ইরান ও আল কায়েদার অনুগতরা পরস্পরের নাগালে। এক পর্যায়ে আল কায়েদা ইরানের অভ্যন্তরে এক ধরনের আটক অবস্থায় থাকা কিছু সিনিয়র জিহাদি ও লাদেন পরিবারের সদস্যদের মুক্তি দিতে বাধ্য করতে এক ইরানি কূটনীতিককে অপহরণ করে।
এখনো দু’পক্ষের মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষ ঘটছে, তাদের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। উদাহরণ স¦রূপ, ২০১৬ সালের জুলাই মাসে মার্কিন অর্থ দফতর প্রকাশ করে যে আল কায়েদার সামরিক কমিশন প্রধান ও গ্রæপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা আবু হামজা আল খালিদি তার কিছু সহযোগীসহ ইরানে অবস্থান করছেন। লাদেনের বাসভবন থেকে উদ্ধার করা একটি ফাইল থেকে জানা যায়, নতুন প্রজন্মের নেতা হিসেবে নিহত সহযোগীদের স্থান দখলের জন্য গড়ে তোলা নেতাদের একজন ছিলেন খালিদি।
২০১৪ সালে আদনানির বার্তা থেকে দেখা যায়, আইএসআইএস ইরানে আল কায়েদার হামলা না করার ইচ্ছার কথা তুলে ধরতে আগ্রহী। দুই সুন্নী জিহাদি গ্রæপের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে এবং আইএসআইএস সুন্নী ধর্মান্ধদের মধ্যে আল কায়েদার বৈধতাকে খর্ব করতে চায় যারা বুঝতে পারে না যে কেন বিন লাদেনের উত্তরসুরিরা ইরানে সরাসরি হামলা করা থেকে বিরত রয়েছে। অ্যাবোটাবাদে উদ্ধার করা অন্যান্য ফাইলে দেখা যায়, বিন লাদেন ইরানের আঞ্চলিক অবস্থান খাটো করে আনতে পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু তা বেশীদূর অগ্রসর হয়নি।
অর্থ দফতরের মতে, আবু বকর আল বাগদাদির আইএসআইএসের পুর্বসূরীর ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে জড়িত থাকার সময় ইরানি গোয়েন্দা বিভাগের সাথে সম্পর্ক ছিল। তবে আইএসআইএস এ অপ্রিয় বিষয় সম্পর্কে সমর্থকদের জানায়নি। বরং তারা ইরানের সাথে আপস করার ইচ্ছার জন্য আল কায়েদার সমালোচনা করেছে।
উদাহরণ স্বরূপ, ২০১৬ সালে আইএসআইএসের নাবা ম্যাগাজিন আবু উবায়দা আল লুবনানি নামে পরিচিত এক আলকায়েদা সপক্ষত্যাগীর বেশ কয়েকটি সাক্ষাতকার প্রকাশ করে। আবু উবায়দা দাবি করেন যে ইরানি গোয়েন্দা সংস্থা ইরানের অভ্যন্তরে আল কায়েদার সেফ হাউসের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অত্যন্ত কৌতূহলের বিষয় যে আল কায়েদায় নিজের পদ ত্যাগ করার পর লুবনানি নিজে ইরানের মধ্য দিয়ে স্বঘোষিত খিলাফতে পৌঁছান। কিন্তু তার সাক্ষাতকারের উদ্দেশ্য আইএসআইএ-র প্রতিদ্ব›দ্বীদের অভিযুক্ত করা হলেও ইরানিদের প্রতি তাকে নমনীয় দেখা যায়।
সন্দেহ নেই যে তেহরানে হামলার ঘটনার পর আইএসের বার্তা এ লাইনেই যাবে। আইএসআইএস চূড়ান্তভাবে সুন্নী জিহাদিদের লড়াইকে ইরানে আনার দাবি করতে পারে  আল কায়েদা যা করতে অনিচ্ছুক।



 

Show all comments
  • রেজবুল হক ১০ জুন, ২০১৭, ২:৪৯ এএম says : 2
    আল কায়েদা কাদের তৈরি ?
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইরান


আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ