Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২১ অক্টোবর ২০১৭, ০৬ কার্তিক ১৪২৪, ৩০ মুহাররম ১৪৩৯ হিজরী

বনাঞ্চল রক্ষা করতে হবে

| প্রকাশের সময় : ১২ জুন, ২০১৭, ১২:০০ এএম

আফতাব চৌধুরী

একশ্রেণীর অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে বন থেকে কোটি কোটি টাকার কাঠ ও বাঁশ অবৈধভাবে পাচার হয়ে যাচ্ছে। সরকার ইতিপূর্বে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা ও বনজ সম্পদ রক্ষার্থে গাছ কাটা নিষিদ্ধ করেছে। তবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এ নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল। সরকারের এ শিথিলতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের কিছু সংখ্যক দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারী দেশের বনজ সম্পদ উজাড় করে চলেছে।
প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য বনজ সম্পদের গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশের প্রায় ৫ হাজার বর্গমাইল এলাকা জুড়ে বনাঞ্চল রয়েছে। এ বনাঞ্চল দেশের মোট জমির ৭ ভাগ মাত্র। দেশে বনাঞ্চলের পরিমাণ থাকার কথা ৩০ ভাগ, কিন্তু আমাদের তা নেই। উপরন্তু এ ৭ ভাগ বনাঞ্চল থেকে নির্দয়ভাবে বৃক্ষ নিধন করা হচ্ছে। দৈনন্দিন প্রয়োজন মিটানো ছাড়াও বৃক্ষ এদেশের প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক পরিবেশকে বহুলাংশে প্রভাবিত করে। বনভ‚মি বৃষ্টিপাতে সাহায্য করে, বন্যা, খরা, জলোচ্ছাস ইত্যাদি হতে প্রাণীক‚লকে রক্ষা করে। পর্যাপ্ত পরিমাণ বৃক্ষ ও বনাঞ্চলের অভাবে প্রায় প্রতি বছরই আমাদের প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হতে হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য বনাঞ্চল স¤প্রসারণ করা ছাড়া কোন গতি নেই। আর যদি থেকেও থাকে তাহলে সেটা আমাদের মতো দরিদ্র দেশের পক্ষে মেটানো সম্ভব নয়। বস্তুত বনজ স¤পদের যথাযথ ব্যবহার ও সংরক্ষণের উপর আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বহুলাংশে নির্ভর করে। জানা যায়, সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, সাতগাঁও, জুরী, সিলেটের টিলাগড়, খাদিম নগর এলাকার বনাঞ্চল হতে বন বিভাগের কিছু সংখ্যক দুর্নীতিপরায়ন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগ সাজসে চোরাকারবারীরা কাঠ কেটে অবাধে চোরাই পথে বিক্রি করে চলেছে। হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। চোরাই কাঠের বেশীরভাগই অবৈধভাবে বসানো স’মিলগুলোতে জড়ো করে তা করাত কলের মাধ্যমে সাইজ করে সড়ক ও নদী পথ দিয়ে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে বিক্রি করে। বন বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে দৈনিক ৪-৫ লাখ টাকার কাঠ কাটা হয় বলেও জানা যায়। এতে সিলেট অঞ্চলের বনাঞ্চল সংকুচিত হয়ে আসছে এবং এভাবে চলতে থাকলে সিলেট বিভাগের বনভ‚মির অস্থিত্ব হুমকির স¤মুখীন হয়ে পড়া অস^াভাবিক নয়। শুধু সিলেট কেন, দেশের প্রতিটি বনাঞ্চলে যেভাবে অবাধে গাছ কাটা চলছে তাতে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষা করা তো দূরের কথা গ্রামে গঞ্জেও ঔষধের জন্য প্রয়োজনীয় গাছ-গাছড়া পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।
এক তথ্যে জানা যায়, সিলেট বিভাগে এক হাজারের উপর স’মিল রয়েছে যার বেশীর ভাগই অবৈধ। বন বিভাগ ও পুলিশের লোকজনকে খুশী করেই চলছে এসব অবৈধ সমিল। এছাড়াও প্রতিদিন নতুন নতুন স’মিল গজিয়ে উঠছে। সংশ্লিষ্ট স–ত্রে জানা যায়, সরকারের স’মিল লাইসেন্স বিধিমালা ১৯৯৮-এর ৮(১) ধারায় সুপষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, সংরক্ষিত, রক্ষিত, অর্পিত ও অন্য যে কোন ধরণের সরকারী বনভ‚মির সীমানার ১০ কিলোমিটারের মধ্যে কোন স’মিল স্থাপন ও পরিচালনা করা যাবে না (পৌর এলাকা ছাড়া)। কিন্তু পরিতাপের বিষয়-সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে দেখা যায়, সরকারের এ বিধিমালা লংঘন করে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী সংঘবদ্ধ চোরাই কাঠ ব্যবসায়ী বন বিভাগের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে সরকারের অধ্যাদেশের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে অহরহ নতুন নতুন স’মিল বসানো হচ্ছে। স–ত্রমতে, অবৈধ এসব স’মিল থেকে বন বিভাগের কর্মকর্তাসহ অন্যান্য এজেন্সীর লোকজন মোটা অংকের মাসোহারা পেয়ে থাকে। তাই অবিলম্বে অবৈধ সমিল বা করাত কলগুলো বন্ধ করতে হবে।
সরকার ইতিমধ্যেই বৃক্ষ রোপনের জন্য ব্যাপক কর্মস–চী গ্রহণ করেছে। বৃক্ষমেলা ২০০৯ উদ্বোধনকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের প্রতিজন নাগরিককে অন্তত ১টি ফলজ, ১টি বনজ ও ১টি ঔষধী গাছের চারা রোপণ করে ২০১৫ সালের মধ্যে দেশের বনভূমির পরিমাণ ৭ থেকে বৃদ্ধি করে ২০ শতাংশে উন্নীত করার পরামর্শও দেন। কিন্তু তা তো বাস্তবায়ন হয়নি বরং দিনে দিনে বনভূমির পরিমাণ সংকুচিত হচ্ছে। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য এবং পরিবেশকে সুস্থ, সুন্দর, সবল ও প্রাণীক‚লের বসবাসোপযোগী করার লক্ষ্যে জনগণকে সচেতন করে তোলার জন্য গণমাধ্যমগুলোও যথাসাধ্য প্রচারকার্য চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু লাভ খুব একটা হচ্ছে বলে মনে হয় না। বৃক্ষ রোপন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বনভ‚মি স¤প্রসারনের ব্যাপারে ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগ হরহামেশা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। দূর্নীতি, অনিয়ম, সে^চ্ছাচারিতা উচ্ছেদ করে সকল পর্যায়ের নাগরিককে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে না পারলে শুধু বিবৃতি বা বক্তৃতার দিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে না। বিভিন্ন দেশপ্রেমিক নাগরিকের পক্ষ থেকে জানা যায়, বন বিভাগের অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় বনভ‚মি উজাড় হচ্ছে। তাদের ব্যাপারে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট অভিযোগ করেও কোন ফল পাওয়া যায় না। এমতাবস্থায় প্রশ্ন জাগে-উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে নিরব বা উদাসীন কেন? তাহলে কি ধরে নেয়া যায়, তারাও এ ব্যাপারে জড়িত। প্রকৃত অবস্থা যা-ই হোক এর কোনটাই আমাদের জন্য মঙ্গলজনক নয়। তাদের দুর্নীতির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ ও দেশের মানুষ। জানা যায়, বন বিভাগ সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় বনাঞ্চল সৃষ্টির জন্য প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে থাকে। বিভিন্ন স্থানে মৌসুমের শেষ পর্যায়ে গাছের চারা রোপন করা হলেও এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ উদাসীন। এমনকি একটি গাছের চারা রোপন করার পর একটি বছর অতিবাহিত হলেও এ গাছের চারাটির ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেয়া হয় না। যার ফলে বনাঞ্চল সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ব্যয় করা টাকা ১০ ভাগও যথাযথভাবে কাজে আসছে না। রোপন করা চারা অবহেলা ও অযতেœ অকালে মৃত্যুবরণ করে। এছাড়াও বিভিন্ন এলাকা ও রাস্তার পাশে গাছের চারা রোপন না করেও বিল করে টাকা উঠানো হয় এমন অভিযোগও রয়েছে। অন্যদিকে সময় মতো বৃক্ষচারা রোপন না করা, দুর্নীতি-অনিয়ম, অন্যদিকে রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় কতটুকু কার্যকরী ভ‚মিকা পালন করা হচ্ছে তা ভেবে দেখার ব্যাপার।
১৯৯৮ সালের ১৬ই নভেম্বর বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ পর্যালোচনা বৈঠকে বৃক্ষরোপণে ছাত্র-ছাত্রীদের উৎসাহিত করার লক্ষ্যে স্কুল, কলেজে গাছ লাগানো ও পরিচর্যার জন্যে ছাত্র-ছাত্রীদের দেওয়ার পদ্ধতি চালু কারর পরামর্শ দেন। যাতে ছাত্র-ছাত্রীদের লাগানো গাছে ফল ধরে এবং সে গাছ থেকে স্কুলের আসবাবপত্র তৈরী করা সম্ভব হয়। প্রধানমন্ত্রী ছাত্র-ছাত্রীদের গাছ লাগানোর মানসিকতা তৈরির দায়িত্ব শিক্ষকদের নিতে হবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, প্রতিজন ছাত্র-ছাত্রীকে গাছ লাগিয়ে সে গাছটি বেড়ে উঠার পরিচর্যাও সে যাতে করে সে পদ্ধতিও বের করতে হবে বলে পরামর্শ প্রদান করে। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ কি পালিত হচ্ছে? আমরাতে তার বাস্তবায়ন দেখছিনা। জানিনা সংশ্লিষ্ট বিভাগ এর জবাব কি দিবেন?
মানুষের বসবাসের জন্য যেমন বাড়ীঘরের প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজনীয় অক্সিজেন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্যও বনভ‚মির প্রয়োজন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানুষের প্রয়োজনে বহু অরণ্য বৃক্ষহীন হয়ে পড়লেও তারা আজ বনাঞ্চল স¤প্রসারণ ও সংরক্ষণের জন্য তৎপর হয়ে উঠেছে। আমরা জানি, গাছ কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্রহণ করে তার বিনিময়ে অক্সিজেন সরবরাহ করে প্রাণীকুলের বাঁচার পথ সুগম করে। গাছ অক্সিজেন সরবরাহ না করলে এ পৃথিবীতে মানুষ, গরু,ছাগল, হাঁস-মুরগী, পশু-পাখী কিছুই থাকবে না। বিরাণ হবে সারা পৃথিবী। আমাদের দেশে গাছ-পালার অভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিরূপ ও বৈরী হয়ে উঠছে। এ অবস্থা মোকাবেলা করতে আমাদের অবশ্যই যেখানে সম্ভব গাছের চারা রোপন করতে হবে। আমাদের অফিস-আদালত, কল-কারখানা, রেল ও সড়ক পথের উভয় পার্শ্বে, বেড়ীবাঁধে, বসতবাড়ীর আঙ্গিনায়, সরকারী খাস জমিতে এবং চা-বাগানের অনাবাদী ভ‚মিতে বৃক্ষ রোপন করে বনাঞ্চল সৃষ্টির প্রয়াস চালাতে হবে। আমরা যদি তা না করি তাহলে শূন্যতার সৃষ্টি হবে, বনাঞ্চলের নিবীড়তা কমবে, সারা দেশ ধূ ধূ প্রান্তরে পরিণত হবে। পাশাপাশি বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিভাগের অনাবাদী ভূমিতে বৃক্ষ রোপণ করে বনাঞ্চল সৃষ্টির প্রয়াস চালাতে হবে। আমরা যদি তা না করি তাহলে তাহলে শূন্যতার সৃষ্টি হবে, বনাঞ্চল সম্প্রসারণের ব্যাপারে সরকারী উদ্যোগ একাই যথেষ্ট নয় এ ব্যাপারে প্রত্যেক সচেতন নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে। সবাইকে বোঝাতে হবে গাছ মানুষের পরম বন্ধু। আমাদের প্রয়োজনেই আমরা গাছের কাছে ঋণী।
সরকারকে প্রতিটি জেলা, থানা এবং হাট-বাজারে চারার প্রাপ্যতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মতোই প্রয়োজনীয় কাঠ আমদানীর ব্যবস্থা করতে হবে। আর একটি গাছ কাটার পূর্বে ফলজ, বনজ ও ঔষধি তিন’টি গাছ সম্ভব হলে চারটি গাছ রোপন করে তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সাধারণ মানুষদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট।

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর