Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী

বৃটিশ রেফারেন্ডাম, পার্লামেন্ট নির্বাচন এবং আমাদের গণতন্ত্র

| প্রকাশের সময় : ১৪ জুন, ২০১৭, ১২:০০ এএম

জামালউদ্দিন বারী

বৃটিশ ওয়েস্টমিনিস্টার পার্লামেন্টারি সিস্টেমের আরেকটি চমকপ্রদ অধ্যায়ের মঞ্চায়ন দেখছি আমরা। আমাদের দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ এক অভাবনীয় রাজনৈতিক পরম্পরা। বিগত দশকে লেবার পার্টির নেতা টনি বেøয়ার ও গর্ডন ব্রাউনের পদত্যাগের পর ২০১০এর সাধারণ নির্বাচনে কনজার্ভেটিভ দলের নেতা ডেভিড ক্যামেরণের ক্ষমতারোহণ এবং ২০১৫ সালে নির্বাচনের মেনিফেস্টোতে ‘ব্রেক্সিট’ প্রসঙ্গটি সামনে চলে আসায় ক্যামেরন ব্যক্তিগতভাবে তার বিরোধিতা করলেও এ বিষয়ে নির্বাচনে একটি রেফারেন্ডাম বা গণভোট আয়োজনের ঘোষনা দিয়েছিলেন। ২০১৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত রেফারেন্ডামে বৃটিশ জনগন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের পক্ষেই রায় দেয়। এরই প্রেক্ষাপটে জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তায় ডেভিড ক্যামেরন প্রধানমন্ত্রী ও পার্লামেন্টারি পার্টির নেতা হিসেবে পদত্যাগ করলে কনজারভেটিভ দলের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ-পার্লামেন্টারিয়ান তেরেসা মে নতুন নেতা হিসেবে অভিষিক্ত হন। সংসদে কনজারভেটিভ দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও প্রাইম মিনিস্টার নির্বাচিত হওয়ার শুরুতেই এ সংখ্যাকে আরো নিরঙ্কুশ করার অভিপ্রায় নিয়েই একটি মধ্যবর্তি নির্বাচনের ঘোষনা দিয়েছিলেন তেরেসা মে। নিজের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের পাশাপাশি পার্লামেন্টে দলের অবস্থানকে আরো পাকাপোক্ত করার লক্ষ্যেই এই নির্বাচনের ঘোষনা দিয়েছিলেন তিনি। ক্ষমতা গ্রহনের এক বছরের মাথায় অবশেষে গত সপ্তায় বৃটিশ পার্লামেন্টের কথিত নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হওয়ার পর দেখা গেল কনজারভেটিভ দলের আসন সংখ্যা আগের ৩৩০টি থেকে ১৩ টি আসন কমে ৩১৭ টিতে নেমে এসেছে। দীর্ঘদিন পর বৃটিশ পার্লামেন্ট একটি অনিশ্চিত ঝুলন্ত পার্লামেন্টে পরিনত হয়েছে। অন্যদিকে সংসদের প্রধান বিরোধি দল লেবার পার্টির আসন সংখ্যা আগের চেয়ে ২৯টি বেড়ে ২৬২টি তে দাড়িয়েছে। বৃটিশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে ৬৫০ আসনের বিপরীতে সরকার গঠন করতে কমপক্ষে ৩২৬ আসনে জয়লাভ করতে হয়। উভয় দলের প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান প্রায় আড়াইভাগ, কনর্জাভেটিভদের ৪২.৪ ভাগ এবং লেবারদলের পক্ষে প্রায় ৪০ ভাগ ভোট পড়েছে। নির্বাচনের এই ফলাফলে সরকার গঠনের মত আসন না থাকায় তেরেসা মে’র আত্মবিশ্বাসে বড় ধরনের চিড় ধরলেও তিনি সরকার গঠনের জন্য ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির মত মাইনর দলগুলোর সাথে গত সোমবার পর্যন্ত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এখনো যে কোন কিছুই ঘটতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারনা। ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্টদের সাথে বোঝাপড়া সফল না হলে পুনরায় নির্বাচনের সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেয়া যায়না। বৃটিশ নির্বাচনের এই ফলাফল ব্রেক্সিট সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কনজারভেটিভ সরকারকে আরো দুর্বল অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে। অন্যদিকে এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে লেবার পার্টি নেতা জেরেমি করবিন অনেকটা তলিয়ে যাওয়া অবস্থান থেকে ঘুরে দাড়ানো এক উজ্জ্বল রাজনৈতিক তারকা হয়ে উঠেছেন। বিদ্যমান বিশ্ববাস্তবতায় রাজনীতিতে সত্যাশ্রয়ী মানুষরা এগোতে পারেননা, জেরেমি করবিন সে ধারনাকে পাল্টে দিতে সক্ষম হয়েছেন লেবার সরকারের সময়ই লেবার পাটির এমপি জেরেমি করবিন নানা ইস্যুতে সরকারের বিরোধিতা করে কোনঠাসা হয়েছেন এবং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয়েছেন। তিনি যে সত্যকে ধারণ করে তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন বৃটিশ জনগন যে তা’র যথার্থ মূল্যায়ন করতে সক্ষম একটি অতিব সন্ধিক্ষণেও লেবার দলের প্রতি মানুষের আস্থা ও সমর্থন বেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তার স্বাক্ষর পাওয়া গেল। যদিও এই সমর্থন বৃদ্ধি তাকে এই মধ্যবর্তি নির্বাচনে ক্ষমতায় বসাতে খুব বেশী কার্যকর অবস্থান দিতে পারছেনা। তবে বৃটিশ জনগন সংসদে আরো শক্তিশালী ও কার্যকর বিরোধিদল দেখতে পাবে এবার। আর রাজনৈতিক বাস্তবতায় পুন:নির্বাচনের সিদ্ধান্ত আসলে নতুন নির্বাচনে গণেশ উল্টেও যেতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে নানা জরিপে দেখা যাচ্ছে, এখনকার তরুন প্রজন্ম রাজনীতি বিমুখ হয়ে পড়ছে। এক সময় পরোপকারিতা দেশাত্মবোধ, দেশপ্রেম ও নেতৃত্বের গুনাবলী সম্পন্ন মেধার সমন্বয় ঘটত রাজনীতিতে। এখন প্রাচ্য, প্রতীচ্যের প্রায় সর্বত্র রাজনীতিতে মেধা, সত্যবাদিতা ও সৃজনশীলতার চরম আকাল দেখা যাচ্ছে। এটি বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেমন চরম সত্য, একইভাবে মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা রাজনীতিতেও রাজনৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় চরম আকার ধারন করেছে। বিশেষত ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তা অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে। এমনি সময় বৃটিশ রাজনীতিতে জেরেমি করবিনের পুনরুত্থানকে পশ্চিমা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ সত্যের জয় হিসেবে দেখছেন। গত এপ্রিলে তেরেসা মে’র নতুন নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষনার পর পশ্চিমা কর্পোরেট মিডিয়া একযোগেই মে’র টোরিদলের ল্যান্ড¯øাইড জয়ের সম্ভাবনা তুলে ধরার পাশাপাশি করবিনের রাজনৈতিক জীবনের ইতি ঘটতে যাচ্ছে বলে ভবিষ্যদ্বানী করা হচ্ছিল। মার্কিন লেখক-কলামিস্ট মার্ক ওয়েজব্রট জেরেমি করবিনের আরো সংহত রাজনৈতিক অবস্থানের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘ট্রুথ এজ অ্যান ইফেক্টিভ পলিটিক্যাল ওয়েপন’। পুঁজিবাদি সা¤্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিপরীতে অব্যাহতভাবে অকুণ্ঠচিত্তে সত্য প্রকাশে করবিনের অবস্থানকে বৃটিশ জনগন সমর্থন করেছেন। মূলধারার মিডিয়া ও স্টাবলিশমেন্টের বিপক্ষে দাড়িয়ে আরো বেশী আসনে বিজয়ী করার মাধ্যমে তার প্রমান দিয়েছেন বৃটিশ জনগন। ‘দি রিজারেকশান অব জেরেমি করবিন: ট্রুথ এজ অ্যান ইফেক্টিভ পলিটিক্যাল ওয়েপন’ শিরোনামের একটি নিবন্ধে ওয়াশিংটন ভিত্তিক সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ এর কো- ডিরেক্টর এবং ‘জাস্ট ফরেন পলিসি’ থিঙ্কট্যাঙ্কের প্রেসিডেন্ট মার্ক ওয়েজব্রট দেখিয়েছেন, সেই টনি বেøয়ারের সময় থেকে একের পর বৃটিশ সরকারের রাজনৈতিক ও পররাষ্ট্রনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর বিপরীতে জেরেমি করবিন কিভাবে সত্য প্রকাশে ও অন্যায় যুদ্ধের প্রতিবাদে আপসহীন অকুণ্ঠ ভ’মিকা পালন করে এসেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো বাহিনীর আফগানিস্তান ও ইরাক আগ্রাসনে বৃটিশ লেবারদলের প্রধানমন্ত্রী টনি বেøয়ার যখন শর্তহীন সমর্থন দিয়ে সৈন্য ও সম্পদ নিয়ে আগ্রাসনে যোগ দিয়েছিল তখন যেমন জেরেমি করবিন নিজদলীয় সরকারের বিপক্ষে শক্ত বিরোধিতা করেছেন, একইভাবে লিবিয়া ও সিরিয়ায় পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধেও তার সোচ্চার ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মত। বিগত দশকের শেষদিকে ২০০৯ সালে অর্থনৈতিক মন্দার সময় বৃটিশ সরকারের অস্টারিটি বা কৃচ্ছতা পলিসির বিরুদ্ধে করবিন একক কণ্ঠে বিরোধিতা করেছেন, আবার গত সপ্তাহে নির্বাচনের মাত্র কিছুদিন আগে মানচেস্টারে সন্ত্রাসী হামলার পর সারা পশ্চিমা বিশ্ব যখন আবারো ইসলামোফোবিক বা মুসলিম বিদ্বেষী তৎপরতা ও বক্তব্য ঝাড়তে শুরু করল, আটলান্টিকের অপর পাড়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার মুসলিম অভিবাসন নীতির পক্ষে যুক্তি দেখানোর মওকা পেল, তখন জেরেমি করবিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি টেনে বলেছিলেন, বিদেশের মাটিতে আমরা যেসব যুদ্ধ করছি তার পথ ধরেই এখন আমাদের দেশে এসব সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছে। যদিও এসব হামলার বেশীরভাগই সা¤্রাজ্যবাদের কুশীলবদের সাজানো ফল্স ফ্লাগ অপারেশন হিসেবেও আখ্যায়িত করছেন অনেকে। এ প্রসঙ্গে ওয়েজব্রটের মন্তব্য হচ্ছে, নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের সময় জনতুষ্টিমূলক প্রচারনার বিপরীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোন দলের নেতাই এমন বক্তব্য দেয়ার সাহস রাখেননা। ম্যানচেস্টারে সন্ত্রাসী হামলার পরে করবিনের দেয়া বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন কনজারভেটিভ দলের বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। তার ভাষায় করবিনের বক্তব্যটি ‘অ্যাবসোলিউটলি মনস্টারাস’ । তবে মার্ক ওয়েজব্রট মনে করেন, বরিস জনসন ট্রাম্পের মতই একজন ভাঁড় যার নৈতিক চরিত্র ‘স্যুয়ার র‌্যাট’ বা নর্দমার ইঁদুরের মত।
সন্ত্রাস বিরোধি যুদ্ধের নামে একদিকে পশ্চিমা সব কর্পোরেট মিডিয়ার ঐক্যবদ্ধ মিথ্যা কোরাস, অন্যদিকে সরকারীদল ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের ধারালো আক্রমন উপেক্ষা করেই জেরেমি করবিন দৃঢ়তার সাথে তার সত্যভাষন অব্যাহত রেখেছেন। করবিনের মত ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অনুসরনে কিছু মিডিয়াও ¯্রােতের বিরপীতে গিয়ে সত্য উন্মোচনে প্রয়াস চালিয়ে থাকে বলেই জনগনকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক ভ’মিকা পালন করে থাকে। বৃটিশ নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের সময় মানচেষ্টার ও লন্ডন ব্রীজে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলার পর লন্ডনের ‘দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ পত্রিকা পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, জরিপে অংশগ্রহনকারিদের শতকরা ৭৫ জনই মনে করছেন, ইরাক, আফগানিস্তান ও লিবিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে ইংল্যান্ডের মাটিতে সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। ঠিক এ কথাই জেরেমি করবিন নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, বরিস জনসনের কাছে যা’ মনস্ট্রাস বলে মনে হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ওয়েজব্রট ২০১৫ সালের মার্চে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দেয়া একটি বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়েছেন, সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘আইএসআইএল ইজ ডাইরেক্ট আউটগ্রোথ অব আল-কায়েদা ইন ইরাক, হুইচ গ্রোউ আউট অব আওয়ার ইনভেশান’। অর্থাৎ আইএস সরাসরি আল-কায়েদা ইরাক থেকে সৃষ্ট যা’ সেখানে মার্কিন দখলদারিত্বের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। একতরফা প্রচারনা ও কর্পোরেট প্রপাগান্ডা ম্যাকানিজমের বিপরীতে সাহসিকতার সাথে সত্য কথা বলার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এখন সর্বত্রই বিরল। এ ক্ষেত্রে বৃটেনের ইলেক্টোরাল আইন করবিনের মত সত্যনিষ্ঠ রাজনীতিকের জন্য সহায়ক ভ’মিকা পালন করেছে। নতুন বৃটিশ নির্বাচনী আইন অনুসারে নির্বাচনে অংশগ্রহনকারী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য টিভিতে সমান প্রচার সময় বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে। লেবার মেনিফেস্টো এবং নতুন নির্বাচনী আইন করবিনের জন্য বৃটেনে নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরী করেছে। এ প্রসঙ্গে আমরা স্মরণ করতে চাই, বৃটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে এবারো বাংলাদেশের তিন কন্যা- রুশনারা আলী, রূপা হক এবং টিউলিপ সিদ্দিকী আগের চেয়ে বেশী ভোটের ব্যাবধানে নির্বাচিত হয়েছেন। তারা তিনজনই লেবার দলের টিকেটে নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছেন। এবারের বৃটিশ নির্বাচনে ১৪জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত নাগরিক অংশগ্রহন করেছিল, এদের মধ্যে ৮জনই লেবারপার্টি থেকে বাকি ৬ জনের মধ্যে ৪ জন ইন্ডিপেন্ডেন্ট এবং লিবারেল ডেমোক্রেট ও ফ্রেইন্ডস পার্টি থেকে একজন করে মনোনয়ন লাভ করেন। এ থেকে লেবার পার্টি ও জেরেমি করবিনের মুক্তচিন্তা এবং বাংলাদেশ বান্ধব নীতির পরিচয় পাওয়া যায়। বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত মুসলমানদের লেবার পার্টি থেকে মনোনয়নের সুযোগ দিয়ে আমাদের কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন জেরেমি করবিন। আগামীতে হয়তো করবিনকে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখা যাবে। সেখানে বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত পার্লামেন্ট মেম্বাররাও হয়তো তার কেবিনেটে স্থান পাবেন। তার কাছে পশ্চিমা ও প্রাচ্যের রাজনীতিকদের অনেক কিছু শিক্ষনীয় আছে।
কমনওয়েল্থ বা স্বাধীনতা প্রাপ্ত সাবেক বৃটিশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোর বেশীরভাগই ওয়েস্টমিনিস্টার পার্লামেন্টারী সিস্টেম অনুসরণ করছে বলে দাবী করা হয়। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, মালয়েশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্তত ৩৩টি দেশে বৃটিশ পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার অনুরূপ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে বলে ধরা হয়। কথিত ওয়েস্টমিনিস্টার সংসদীয় ব্যবস্থায় গণতন্ত্রের চর্চা বিশ্বের আর কোথায় কেমন হচ্ছে, সে বিষয়ে খতিয়ে দেখার আগে বাংলাদেশের চলমান ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি, সংসদীয় ব্যবস্থার হতাশাজনক চিত্র নিয়ে সংক্ষিপ্ত কনট্রাস্ট আলোচনা তুলে ধরা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমা বিশ্বের কয়েকটি রেফারেন্ডাম বা গণভোটের রায়কে বিশ্বরাজনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রনে গুরুত্বপূর্ন নিয়ামক হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। গত বছর ২৩ জুন বৃটিশ নাগরিকরা বহুল আলোচিত ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়ে বৃটিশ ও ইউরোপের ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ইতিপূর্বে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে স্কটল্যান্ড বৃটেন থেকে আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে রেফারেন্ডামে ভোট দেয়। সে নির্বাচনে ভোটদাতাদের ৫৫ শতাংশই বৃটেনের সাথে থাকার পক্ষে রায় দেয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বাইরে গুরুত্বপূর্ণ বৃহত্তর সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে রেফারেন্ডামের সুযোগ জনগনের জন্য অনেক বড় অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। সর্বশেষ গত রবিবার ক্যারিবিয়ার মার্কিন অঙ্গরাজ্য পুয়ের্টোরিকোর জনগন একটি গণভোটে অংশ নিয়েছিল পুয়ের্টোরিকো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে থাকবে নাকি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটাবে এই সিদ্ধান্তে আসার জন্য। উল্লেখ্য, প্রায় চারশ বছরের স্পেনিশ ঔপনিবেশিক শাসনশেষে ঊনবিংশ শতকের শেষদিকে স্পেনিশ-আমেরিকান যুদ্ধের পর পুয়ের্টোরিকো মার্কিন শাসনাধীনে যায়। ১৯১৭ সালে পুয়ের্টোরিকোর নাগরিকরা মার্কিন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার ১০০ বছর পর গত ১১ জুন তারা নিজেদের রাজনৈতিক ভাগ্য পুনর্মূল্যায়নের জন্য গণভোটে অংশ নিয়েছিল। পুয়ের্টোরিকোর বিরোধি রাজনৈতিকদলগুলোর গণভোট বর্জনের ডাক দেয়ার মধ্য দিয়ে কথিত গণভোটটি বিতর্কিত হয়েছে। মাত্র ২৩ শতাংশ ভোটার নির্বাচনে অংশগ্রহন করেছে এবং ভোটদাতাদের ৯৭ শতাংশই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে থাকার পক্ষে রায় দিয়েছে বলে প্রাথমিক ফলাফলে জানা যায়। এক-চতুথার্ংশেরও কম ভোটার রেফারেন্ডামে সাড়া দেয়ায় এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পুয়ের্টোরিকোর ভাগ্য নির্ধারণ গণতান্ত্রিকভাবে কতটা স্বচ্ছ ও সঠিক হবে তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। বৃটেন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক গণভোটের রায় নিয়ে বিশ্লেষন করতে যাওয়া আমাদের এখনকার আলোচনায় লক্ষ্য নয়। আমরা শুধু বলতে চাই, বিশ্বের পুরোধা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো যখন রেফারেন্ডামের মাধ্যমে অতীব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহন ও বাস্তবায়ন করছে, তখন বাংলাদেশের তথাকথিত ওয়েস্টমিনিস্টার পার্লামেন্ট সংবিধানের পঞ্চদশ ও ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে রেফারেন্ডামের ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়ে দেশে একটি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেছে। এরপর আদালতের একটি রায়ের দোহাই দিয়ে নির্বাচনকালীন তত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকেই একটি একতরফা খেলো বস্তুতে পরিনত করেছে। আমাদের এসব রাজনীতিক-পার্লামেন্টারিয়ানরাই বাহাত্তুরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা বলতে বলতে বাহাত্তুরের সংবিধান থেকে গণভোটের মত মৌলিক বিষয়কে কেঁটে বাদ দেন শুধুমাত্র নিজেদের রাজনৈতিক অভিসন্ধি জনগনের মাথায় চাপিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে। আমাদের আফসোস বাংলাদেশে একজন জেরেমি করবিনের মত নেতা নেই। তবে সম্প্রতি ঘোষিত বিএনপি’র ভিশন টুয়েন্টি থার্টিতে সংবিধানে গণভোট ফিরিয়ে আনাসহ সংবিধানের বিতার্কিত ও অগণতান্ত্রিক বিষয়গুলো বাদ দেয়ার প্রতিশ্রæতি দেয়া হয়েছে। তবে আগামী নির্বাচন যদি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহনমূলক না হয় সংবিধানের এসব অগণতান্ত্রিক ও বিতর্কিত বিষয়গুলোর মিমাংসারও কোন বিকল্প পথ নেই।
যেখানে স্বচ্ছ ও বিতর্কহীন নির্বাচনের মাধ্যমে বৃটেনের বা জাপানের ওয়েস্টমিনিস্টার পার্লামেন্ট ও সরকার শ্রেফ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের খাতিরে যখন তখন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করে নতুন নির্বাচনের উদ্যোগ নিতে দেখা যায়। সেখানে বাংলাদেশের তথাকথিত ওয়েস্টমিনিস্টার পার্লামেন্টের প্রধানমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতারা প্রধান বিরোধিদলসহ অধিকাংশ রাজনৈতিকদলকে নির্বাচনের বাইরে রেখে, অধিকাংশ আসনে অনির্বাচিত এবং শতকরা ১০ ভাগ ভোটে নির্বাচিত নিয়মরক্ষার সংসদ নিয়ে ৫ বছর পার করতে যেন গর্ববোধ করছেন। তার চেয়েও বিষ্ময়কর বিষয় হচ্ছে, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন সরকার ৫ বছরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ও উত্তরণে কিছুই করেনি। তারা সংবিধান অনুসারে প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচনের কথা বলে আরেকটি একতরফা নির্বাচনের ভাঙ্গাঢোলই যেন বাজিয়ে চলেছেন। এই সংসদেরই চলতি বাজেট অধিবেশনে আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারের অন্যতম শরিক এবং বিরোধিদল জাতীয় পার্টির একজন সংসদ সদস্য বলেছেন দেশের ৯০ ভাগ লোক সরকারের বিরুদ্ধে। এই ৯০ ভাগ মানুষ নিশ্চয়ই নির্বাচনে আওয়ামিলীগকে ভোট দিতে বসে নেই। নব্বই ভাগ না হোক দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হয়তো ক্ষমতার পরিবর্তন চায় এবং প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এই পরিবর্তন বর্তমান ক্ষমতাসীনদের বিপক্ষে যাবে। আর ক্ষমতাসীনরা ভাবতে শুরু করেছে ক্ষমতা হারালে তাদের অনেকের জন্য দেশে থাকা কঠিন হবে। এহেন বাস্তবতায় তারা যেনতেন প্রকারে আরেকবার ক্ষমতায় আসতে চাইবে, এটাই হয়তো স্বাভাবিক। এ জন্যই রাজনৈতিক পালাবদলে ক্ষমতার শান্তিপূর্ন হস্তান্তর এবং সকল নাগরিকের সামাজিক-রাজনৈতিক নিরাপত্তার সাংবিধানিক গ্যারান্টি নিশ্চিত করার উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে।
bari_zamal@yahoo.com

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর