Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী

সাহরী ও ইফতারের ফজিলত

| প্রকাশের সময় : ১৫ জুন, ২০১৭, ১২:০০ এএম

মাহফুজ আল মাদানী

রামাদ্বান মাস। মুসলমানদের আনন্দ আর ইবাদাত করার মাধ্যমে সৌভাগ্য লাভের অনন্য মাস। যে মাসকে বরণ করে নেয়ার জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদগ্রীব থাকতেন। তিনি রজব মাসের চাঁদ দেখার পর হতে বলতে থাকতেন, ‘হে আল্লাহ! আমাদের জন্য রজব এবং শাবান মাসকে বরকতময় করুন। আর রামদ্বান মাস পর্যন্ত পৌঁিছয়ে দিন’। মুসলমানরা প্রত্যেকেই এই মাসকে আগ্রহ ও আনন্দের সাথে বরণ করতে থাকে। রজব মাস হতেই রামাদ্বানের আমেজ শুরু হয়। শাবান মাসে পরিপূর্ণ প্রস্তুতির মাধ্যমে মুসলামানরা রামাদ্বানের ইবাদত-বন্দেগীর জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে।
সাহরী গ্রহণের মাধ্যমে রোজা শুরু হয়। ‘শেষ রাতের খাবার, সাধারণত সুবহে সাদিকের পূর্বে রোজার নিয়্যতে পানাহার করাকে সাহরী বলে’। আর দিন শেষে ইফতারের মাধ্যমে রোজার সমাপিÍ ঘটে। ‘দিনের শেষে সূর্যাস্তের সাথে সাথে পানাহার করাকে ইফতার বলে’। চিরাচরিত নিয়ম হিসেবে সকলেই যার যার সাধ্যমত সাহরী ও ইফতার গ্রহণ করে থাকে। এই সাহরী ও ইফতারের মাঝে রয়েছে আনন্দ আর ইবাদাতের পরম সুখ। সাহরী আর ইফতারের রয়েছে আলাদা মর্যাদা ও ফজিলত। যা আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে স্বীকৃত হয়ে আসছে। সাহরীর মধ্যে বরকত বা প্রাচুর্যতা রয়েছে। হাদীস শরীফে এসেছে, ‘হজরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমরা সাহরী খাও। কেননা, সাহরী খাওয়ার মধ্যে বরকত রয়েছে’ -(বোখারী ও মুসলীম)। আমাদের ও আহলে কিতাবদের মধ্যে রোজার ক্ষেত্রে পার্থক্য হলো সাহরী খাওয়া। আমরা রোজার উদ্দ্যেশ্যে সাহরী গ্রহণ করি, আর আহলে কিতাবরা সাহরী খেত না। হাদীসের ভাষ্যানুযায়ী, ‘হজরত আমর ইবনুল আ’স (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, আমাদের রোজা ও আহলে কিতাবদের রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো সাহরী খাওয়া’ -(মুসলীম)। এই সাহরী গ্রহণের জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সঙ্গী সাথীদেরকে আহŸান করতেন। হাদীস শরীফের ভাষ্যমতে, ‘হজরত ইবরাদ্ব ইবনে সারিয়া (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে রামাদ্বানের সাহরী খেতে ডাকলেন এবং বললেন, বরকতময় খাবারের দিকে আস’ -(আবু দাউদ ও নাসায়ী)। এ বরকতময় সাহরীকে কোনভাবেই বর্জন করা উচিৎ নয়। কোন কিছু না থাকলে খেজুরের মাধ্যমেও সাহরীকে সেরে নেয়া উচিৎ। আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খেজুর দ্বারা সাহরী করে নিতেন। ‘হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, মুমিনদের জন্য খেজুর কতইনা উত্তম সাহরী’ -(আবু দাউদ)।
রোজা রেখে দিন শেষে ইফতারের পালা। ইফতার রোজাদারের জন্য আনন্দময় মুহুর্ত। হাদীসের ভাষায়, ‘রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে। একটি তার ইফতারের সময় এবং অপরটি (পরকালে) তার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাৎ লাভের সময়’ -(বোখারী ও মুসলীম)। ইফতারের মধ্যে কল্যাণ ও বরকত রয়েছে। ইফতারের সময় দেরী করতে নেই। আমাদের সমাজে ইফতারের সময় অনেকে ইচ্ছা করে দেরী করে থাকেন। যা কখনো কাম্য নয়। আর হাদীসেরও বিরোধী। হাদীস শরীফে ইফতারের সময় হয়ে গেলে বিলম্ব না করে ইফতার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হাদীসের ভাষ্যানুযায়ী, ‘হজরত সাহল ইবনে সা’দ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, মানুষ ততদিন কল্যাণের সাথে থাকবে, যতদিন তারা ইফতার শীঘ্র শীঘ্র করবে’ -(বোখারী ও মুসলীম)। সময় হওয়ার সাথে সাথে যারা ইফতার করেন তাদেরকে আল্লাহ তা’আলার প্রিয় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ‘হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, আল্লাহ তা’আলা বলেন, আমার বান্দাদের মধ্যে আমার কাছে অধিকতর প্রিয় সে ব্যক্তিরাই যারা শীঘ্র শীঘ্র ইফতার করেন’ -(তিরমিজি)। তাছাড়া বিলম্বে ইফতার করাকে ইয়াহুদী ও খ্রীস্টানদের অভ্যাস বলে চিহ্ণিত করা হয়েছে। ‘হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, দ্বীন সর্বদা জয়যুক্ত থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ শীঘ্র শীঘ্র ইফতার করবে। কেননা, ইয়াহুদী ও নাসারাগণ বিলম্বে ইফতার করে’ -(আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)।
খেজুর দ্বারা ইফতার করা সুন্নাত। আর তাতে কল্যাণ রয়েছে। সর্বোত্তম হলো তাজা খেজুর দ্বারা ইফতার করা। তাজা খেজুর পাওয়া না গেলে শুকনো খেজুর দ্বারা করলে হবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরূপ ইফতার করতেন। হাদীসের ভাষ্যমতে, ‘হজরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (মাগরীবের) নামাজের পূর্বেই কয়েকটি তাজা খেজুর দ্বারা ইফতার করতেন। যদি তাজা খেজুর না মিলত তবে কয়েকটি শুকনো খেজুর দ্বারা ইফতার করতেন। যদি শুকনো খেজুরও না মিলত তবে কয়েক ঢোক পানি দ্বারা (ইফতার করতেন)’ -(তিরমিজি ও আবু দাউদ)। অন্য হাদীসে খেজুর দ্বারা ইফতার করাকে কল্যাণকর বলা হয়েছে। ‘হজরত সালমান ইবনে সামির (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, যখন তোমাদের কেউ ইফতার করে সে যেন খেজুর দ্বারা ইফতার করে। কেননা, তাতে বরকত রয়েছে। আর যদি খেজুর না পাওয়া যায় তবে যেন পানি দ্বারা ইফতার করে। কেননা, তা পবিত্রকারী’ -(তিরমিজি, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ ও দারেমী)। নিজে ইফতার করার পাশাপাশি অন্যকে ইফতার করানোতে অনেক পূণ্য বা সাওয়াব রয়েছে। তাই আমাদের সাধ্যমত অন্যকে ইফতার করানোতে এগিয়ে আসা উচিৎ। ‘হজরত যায়েদ ইবনে খালেদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে ইফতার করাবে অথবা কোন যোদ্ধাকে জিহাদের সামগ্রী দ্বারা সজ্জিত করে দেবে তার জন্যও তার অনুরূপ সাওয়াব রয়েছে’ -(বায়হাকী ও শারহুস সুন্নাহ্)। অন্য হাদীসে এসেছে, ‘হজরত সালমান ফারসী (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, এটা ঐ মাস যাতে মুমিন ব্যক্তির রিজিক বাড়িয়ে দেয়া হয়, এই মাসে যে ব্যক্তি অন্য একজন রোজাদার ব্যক্তিকে ইফতার করাবে এটা তার পক্ষে তার গুণাহ সমূহের জন্য ক্ষমা স্বরূপ হবে এবং তার নিজেকে জাহান্নামের আগুন হতে মুক্তির কারণ হবে। আর তাকে রোজাদারের সমান সাওয়াব প্রদান করা হবে, এতে তার সাওয়াব হতে কিছুই কমানো হবে না। রাবী বলেন, আমরা বললাম ইয়া রাসুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমাদের প্রত্যেক ব্যক্তি এমন সামর্থ্য রাখে না যা দ্বারা রোজাদারকে ইফতার করাতে পারে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলা এ সাওয়াব ঐ ব্যক্তিকেও দান করবেন যে কোন ব্যক্তিকে এক ঢোক দুধ দ্বারা, একটি খেজুর দ্বারা অথবা এক ঢোক পানি দ্বারা ইফতার করায়। যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে পরিতৃপ্তির সাথে ভোজন করায় আল্লাহ তাআলা তাকে আমার হাউজ হতে পানি পান করাবেন। ফলে জান্নাতে পবেশ করা পর্যন্ত সে কোন তৃষ্ণার্ত হবে না’ -(মিশকাতুল মাসাবীহ)।
ইফতারের শুরুতে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোআ করে নিতেন। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন। তার দেয়া নিয়ামতের প্রশংসা করতেন। হাদীস শরীফে এসেছে, ‘হজরত মু’আয ইবনে যুহরাহ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ইফতার করতেন তখন এ দোআ পাঠ করতেন- “আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওআ’লা রিজক্বিকা আফত্বারতু” (হে আল্লাহ! আমি আপনারই জন্য রোজা রেখেছি এবং আপনারই দেয়া রিজিক দ্বারা ইফতার করছি)’ -(ইমাম আবু দাউদ মুরসাল হিসেবে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন)। ইফতার শেষেও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোআ করে নিতেন। ‘হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ইফতার করতেন তখন বলতেন, পিপাসা দূর হলো, শিরা উপশিরা সিক্ত হলো এবং যদি আল্লাহ চান তবে প্রতিদান স্থির হলো -(আবু দাউদ)।

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।