Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ০৩ কার্তিক ১৪২৬, ১৯ সফর ১৪৪১ হিজরী

কবি ফররুখ আহমদ

| প্রকাশের সময় : ১৬ জুন, ২০১৭, ১২:০০ এএম

কেন তিনি ভিন্ন মাত্রিক
অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান : কবি ফররুখ আহমদের জন্ম ১০ জুন ১৯১৮। এ বছর ১০ জুন তাঁর শততম জন্মশতবার্ষিকী। বাংলা কাব্যের এক ব্যতিক্রমধর্মী শক্তিমান কবি ফররুখ আহমদ। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর উজ্জ্বল স্বাক্ষর সকলকে বিস্ময়-বিমুগ্ধ করে। জাতীয় আশা-আকাংক্ষা, স্বপ্ন-কল্পনার এক বিশিষ্ট অনুভব তাঁর কাব্যে সুস্পষ্ট। ফররুখ-কাব্যের বিষয়-বৈভব, ভাব-চেতনা, শিল্প-সৌকর্য, কলা-রীতি ইত্যাদি সবকিছুর মধ্যেই একটি অভিনবত্ব পরিলক্ষিত হয়। যেটা অন্যদের থেকে ফররুখকে একটি স্বতন্ত্র মহিমা দান করেছে। এ স্বাতন্ত্র্য অসাধারণ ও বর্ণাঢ্য উজ্জ্বলতায় সুস্পষ্ট। প্রত্যেক মৌলিক কবির মধ্যেই এ ধরনের স্বাতন্ত্র্য ও উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। ফররুখ আহমদের মধ্যেও এর উপস্থিতি যে কোন সচেতন পাঠককে অভিভ‚ত করে। এটা তাঁর মৌলিকতার পরিচয়। এ কারণে তিনি স্বতন্ত্র মহিমায় উজ্জ্বল এক অসাধারণ কবি।
বাংলা কাব্যে ফররুখ আহমদের অবদান ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময়। মাত্র ছাপ্পান্ন বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি যে অবদান রেখে গেছেন তা আকার-আয়তন, বিষয়-বৈভব ও কলা-বৈচিত্র্যে রীতিমতো বিস্ময়কর। তবে এ-কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, তাঁর মৌলিকত্ব ও অসাধারণত্ব তাঁর কাব্যের আকার, বিষয় ও কলা-বৈচিত্র্যে নয়, কাব্য-ভাবনার অনন্য বৈশিষ্ট্য, শিল্পকুশলতার তুলনাবিরল নৈপুণ্য, নিজস্ব কাব্য-ভাষা নির্মাণ ও ঐতিহ্যানুসারিতাই তাঁকে বিশিষ্ট করেছে। তাঁর কাব্যে আমাদের জীবন-চেতনা, বোধ-বিশ্বাস, আশা-অভীপ্সা ও স্বপ্ন-কল্পনার সার্থক রূপায়ণ ঘটেছে। তিনি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান রূপকার।
কাব্য-ভাবনা প্রত্যেক কবির নিজস্ব। এর সাথে কবির আদর্শ, জীবন-বিশ্বাস ও জীবন-পরিবেশের ওতঃপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে। প্রত্যেক কবির অনুভব, চিন্তা-ভাবনা ও ব্যক্তিগত আচার-আচরণে যেমন তা পরিষ্ফুট হয়, কাব্য রচনা বা সৃষ্টিশীল প্রতিটি কাজেই তার প্রকাশ ঘটে। কবিরা যদিও প্রধানত কল্পনাপ্রবণ এবং তাঁদের কাব্য-কথায় কল্পনার দিকটি প্রাধান্য পেয়ে থাকে তবু জীবন-বাস্তবতাকে তাঁরা উপেক্ষা করতে পারেন না। কল্পনার অঞ্জন মেখে তা কবিতায় প্রকাশ করে থাকেন। কখনো তা প্রবলভাবে, কখনো গৌণভাবে। সেটাও কবিদের ব্যক্তিগত রুচি-প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল এবং তা থেকে কবিরা কতটা বাস্তববাদী তাও পরিমাপ করা যায়। তবে বাস্তবতার প্রবল অথবা গৌণ উপস্থিতির দ্বারা কবিদের প্রতিভার পরিমাপ করা যায় না। সেটার পরিমাপের জন্য ভিন্ন মানদন্ড রয়েছে। আসল কথা হলো, কবি বা শিল্পী সকলেই কম-বেশী বাস্তববাদী, বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। শিল্পীর যেমন ছবি আঁকার জন্য মডেল প্রয়োজন, কবিও তেমনি জীবন-বাস্তবতার ক্যানভাসে কল্পনার রং-তুলিতে কবিতার বিচিত্র ভুবন নির্মাণ করেন। তবে বাস্তবতাই মুখ্য নয়, কতটা তা পাঠকপ্রিয়, মাধুর্যময় ও আবেদনময় হয়ে উঠেছে তার উপরই নির্ভর করে কবিতার সাফল্য ও দুর্বলতা, স্থায়িত্ব বা অমরত্ব ও অস্থায়িত্ব।
সাহিত্য-চিন্তার ক্ষেত্রে ফররুখ আহমদ ঐতিহ্যবাদী। এ ঐতিহ্য-চেতনা শুধু তাঁর কাব্যের উপাদান-উপজীব্যকে কেন্দ্র করে নয়, কাব্যের ভাষা, আঙ্গিক, উপমা-রূপক-প্রতীক-রূপকল্প ইত্যাদি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও। তাঁর সমগ্র কাব্যের আবহ ও আবেদনে তাঁর ঐতিহ্যানুসারিতার পরিচয় প্রবলভাবে পরিদৃষ্ট হয়।
মুসলিম শাসনামলে বাংলা ভাষার নবজন্ম ও বাংলা সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধিত হয়। ভাব, ভাষা, বিষয়, উপজীব্য ও আবেদনগত দিক থেকে মুসলিম শাসনামলে বাঙালি মুসলমানদের হাতে যে বিশাল সাহিত্য সৃষ্টি হয় সেটাই আমাদের প্রকৃত ও প্রাচীন গৌরবময় সাহিত্য। সে সাহিত্যের ভাষা, ভাবৈশ্বর্য, বিষয়-বৈভব, নির্মাণ-কৌশল ইত্যাদি সবকিছুই ছিল বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ও আমাদের জীবন-স্বভাবের সাথে একান্ত সংগতিপূর্ণ। কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের সুসমৃদ্ধ ভাষার ঐতিহ্যকে তাঁর কাব্যে বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরেন আর ফররুখ আহমদ সে গৌরবময় সাহিত্যের ঐতিহ্যকে আধুনিক রূপাঙ্গিকে তুলে ধরলেন। ভাষার ঐতিহ্যকেও তিনি ধারণ করেন।
ফররুখের পুনর্জাগরণ বিষয়ক রচনায় ইসলামের অতীত ইতিহাস-চারণার প্রয়াস পরিলক্ষিত হয় না, ইসলামের ভাবাদর্শ ও শাশ্বত মূল্যবোধকে কবি তাঁর নৈর্ব্যক্তিক অনুভবে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ শিল্প-নৈপুণ্যে এমনভাবে তুলে ধরেছেন যে তা সর্বজনীন ও মানবতার মুক্তির আশ্বাসে পূর্ণ, উজ্জ্বল ও প্রাণময় হয়ে উঠেছে। জীবন ও শিল্প, বাস্তবতা ও স্বপ্ন পরস্পর-নির্ভর হয়ে হাতধরাধরি করে চলেছে। স্বপ্নমুগ্ধতায় কবি বাস্তবকে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হননি। বাস্তবের সাথে কল্পনার অঞ্জন মাখিয়ে কবি তাঁর নিজস্ব কাব্যের সুরম্য জগৎ নির্মাণ করেছেন।
ঐতিহ্যানুসারিতার ক্ষেত্রেও ঐ একই কথা। গতানুগতিকভাবে তিনি কোন ঐতিহ্যানুসারী কবি নন। ঐতিহ্য মানে পশ্চাৎগামিতা বা অতীতের পুনরাবৃত্তি নয়। ঐতিহ্যের আলোকে তিনি আমাদের অতীতকে অবলোকন করেছেন, বর্তমানকে নিরীক্ষণ করেছেন এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা বিনির্মাণ করেছেন। বর্তমানের স্থবিরতা-দুর্বলতা দূর করে, বাধাবিপত্তিকে উপেক্ষা করে অতীতের গৌরবময় সুস্নিগ্ধ আলোতে জীবনে নতুন গতি সঞ্চার করতে চেয়েছেন। আশা-আনন্দ, স্বপ্ন-কল্পনায় জীবনের দার্ঢ্য অভিব্যক্তিকে করে তুলতে চেয়েছেন আকাশচুম্বী। ফররুখের কবি-কল্পনা এখানে আত্যন্তিক উৎকর্ষতা লাভ করেছে। এক্ষেত্রে তিনি কেবল অতীতচারী ভাব-বিহŸল নন; তন্ময় অনুশীলিত সাধক। সাধকের সচেতন প্রয়াস তাঁর এ জাতীয় কবিতার শরীরে লাবণ্যময় দীপ্তি ছড়িয়ে দিয়েছে। সে দীপ্তি একদিকে যেমন আমাদের তন্ময় চিত্তকে আবিষ্ট করে, অন্যদিকে তেমনি আমাদের সজ্ঞান সত্তাকে প্রবলভাবে জাগরিত ও উদ্ধুদ্ধ করে। কবির ভাব, উপজীব্য, স্বপ্ন-কল্পনা আমাদের বাস্তব অনুভ‚তি ও আবেগ-উদ্দীপনার সাথে অবিমিশ্র হয়ে পড়ে। তিনি একাধারে আমাদের বোধকে যেমন উদ্বুদ্ধ করেন, তেমনি আবেগ-অনুভ‚তিকেও প্রবলভাবে তাড়িত করেন। ফররুখের সার্থকতা এখানেই।
ফররুখের কবি-প্রতিভার প্রদীপ্ত ছটায় বাংলা কাব্যের দিগন্ত যেমন প্রসারিত ও সমৃদ্ধ হয়েছে, তেমনি তাঁর জীবনবোধের দীপ্তি ও ঐতিহ্যানুসারিতার স্নিগ্ধ আলোয় আমরা সচকিত ও নবউদ্দীপনা লাভ করেছে। বাংলা কাব্যে ব্যতিক্রমধর্মী বিরল প্রতিভা হিসাবে, বিশেষত বাঙালি মুসলমানের স্বপ্ন-কল্পনা, আশা-অভীপ্সার বলিষ্ঠ রূপকার হিসাবে ফররুখ চির অমর হয়ে আছেন। ফররুখের বোধ-বিশ্বাসের কারণেই তাঁর স্বপ্ন-কল্পনা, আশা-অভীপ্সা একটি অধঃপতিত জাতিকে প্রাণিত করেছে সত্য-সুন্দর-কল্যাণের দিকে, নবজাগরণের সোনালী সম্ভাবনার সীমাহীন দিগন্তে।
স্রষ্টার প্রতি একনিষ্ঠভাবে বিশ্বাসী কঠোর আত্মমর্যাদাশীল কবি দুনিয়ার কারো নিকট কোন কিছুর প্রত্যাশী ছিলেন না। শত অভাব ও দারিদ্র্য সত্তে¡ও তিনি কারো করুণা ও উপেক্ষার পাত্রে পরিণত হতে চাননি। তাঁর প্রতিভা ছিল মৌলিক, স্বদেশ-স্বজাতি-স্বসমাজ-মাতৃভাষা ও আপন ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার ছিল সুদৃঢ়। তাই ব্যক্তি ফররুখকে উপেক্ষা করা যতটা সহজ, কবি ফররুখকে উপেক্ষা করা ততটা সহজ নয়। বাংলা সাহিত্যে ফররুখ আহমদ এক বলিষ্ঠ, প্রাণময় দীপ্ত আদর্শ ও ঐতিহ্যের রূপকার, তাঁর স্বপ্ন-কল্পনা, আশা ও অভীপ্সার উচ্চকিত বাণী-রূপ ধারণ করে আছে তাঁর বিভিন্ন কাব্য-কবিতা। আমাদের জাতীয় জাগরণে, স্বকীয় জীবনবোধের উজ্জীবনে, স্বাধীনতা ও বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সর্বোপরি, বাংলা সাহিত্যে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল পরিচয় নির্ধারণে ফররুখ আহমদ নিঃসন্দেহে এক উজ্জ্বল পথিকৃৎ ও অকুতোভয় আলোক-বর্তিকা। এক্ষেত্রে তিনি একক ও তুলনাহীন। আমাদের ভাষা, সাহিত্য, জীবনবোধ ও ঐতিহ্যের বলিষ্ঠ রূপায়ণে ফররুখ আহমদ অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন। এক্ষেত্রেও তিনি অনুসরণযোগ্য অনন্য কবি-ব্যক্তিত্ব।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন