Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী

চিকুনগুনিয়ার ভয়াবহ বিস্তার : সোয়া মাস পর চেতনা সৃষ্টির অভিযান

| প্রকাশের সময় : ২০ জুন, ২০১৭, ১২:০০ এএম

মোবায়েদুর রহমান : অবশেষে কর্তৃপক্ষের ঘুম ভাঙলো। আজ থেকে সোয়া ১ মাস আগে ঢাকা মহানগরীতে চিকুন গুনিয়ার ব্যাপক প্রাদুর্ভাব ঘটে। দেখতে দেখতে এটি মহামারীর রূপ নেয়। অথচ তখন সংশ্লিষ্ট সব গুলো কর্তৃপক্ষ কুম্ভুকর্ণের মতো গভীর ঘুমে অচেতন ছিলেন। এর মধ্যে এক দুই হাজার নয়, হাজার হাজার রোগী চিকুন গুনিয়ায় আক্রান্ত হন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে দৈনিক ৪শত থেকে ৫ শত রোগী চিকিৎসা নিতে আসে। এছাড়া প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ হসপিটাল এবং প্রাইভেট চিকিৎসকদের চেম্বারে হাজার হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হলো এই যে, এত অসংখ্য লোক এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, টেলিভিশনে টক’শো হচ্ছে, খবরের কাগজ গুলোতে মেডিসিনের বড় বড় চিকিৎসকরা তাদের মতামত দিচ্ছেন, তার পরেও নব্য গ্যালিভারদের চৈতন্যোদয় হয়নি। গ্যালিভার যেমনÑ সাগর সৈকতে ঘুমিয়েছিলেন এরাও মনে হয় তেমনি মন্ত্রীত্ব এবং মেয়রশীপের বিলাসিতায় ঘুমিয়েছিলেন।
কিন্তু কত আর ঘুমাবেন? এই রোগটি নিয়ে যে চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে গেল। চার পাঁচটি টেলিভিশন চ্যানেলে জনতার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। তারা রাগত স্বরে বলেন, সরকার তাদের কোনো খোঁজ নিচ্ছে না, মশা মারারও কোনো চেষ্টা করছে না। গ্রীন রোডের একটি অ্যাপার্টমেন্টের চারটি ফ্ল্যাটে চিকুন গুনিয়া ঢুকেছে। ফ্ল্যাট মালিক থেকে শুরু করে বেগম সাহেবা, ছেলে মেয়ে, কাজের বুয়া এবং ড্রাইভার পর্যন্ত আক্রান্ত। কলাবাগানের একটি অ্যাপার্টমেন্টের পাঁচটি ফ্ল্যাটের সদস্যরা আক্রান্ত। লাল মাটিয়াতে একটি ফ্ল্যাটের দুটি ইউনিটের ১০ জন বাসিন্দার মধ্যে ৬ জনই আক্রান্ত। বনানীতে যে রোডে ঢাকা উত্তরের মেয়র বাস করেন সেই রোডে অর্থাৎ ২৩ নম্বর রোডের অন্তত চারটি ফ্ল্যাটে এই রোগ হানা দিয়েছে। বনানীতে সপ্তাহের একদিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার মেডিসিনের অত্যন্ত নামকরা একজন প্রফেসর বসেন। গত সপ্তাহে তার চেম্বারে যতজন রোগী ছিল, তার ৭০ শতাংশই হলো চিকুন গুনিয়ার রোগী। এভাবে এই বিশাল ঢাকা মহানগরীর প্রতিটি প্রান্ত থেকে যখন চিকুন গুনিয়ার প্রাদুর্ভাবের সংবাদ আসতে থাকে, তখন মনে হয় কর্তৃপক্ষের হুঁশ হয়। এত ক্ষতি খাস্তা এবং এত রোগ শোকের পরেও আধুনিকা গৃহিণীদেরকে বলতে শোনা যায়, ইবঃঃবৎ ষধঃব ঃযধহ হবাবৎ.
কথায় বলে, ‘রাজা যাহা বলে, পারিষদ দল বলে তার শত গুণ।’ সরকার বললো, চিকুন গুনিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর যায় কোথা! বশংবদ মিডিয়া তিন দফা আগ বাড়িয়ে বললো যে মহানগরীর ৯২ ওয়ার্ডেই অভিযান চলবে। গত রবিবার ১৮ই জুন একটি ইংরেজির দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠার খবর থেকে জানা গেল যে যত গর্জে তত বর্ষে না। অনেকে গত শনিবারের সরকারী ও সিটি কর্পোরেশন দুটির লম্ফ ঝম্প দেখে বলেন, অসারের তর্জন গর্জন সার। স্বাস্থ্য মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ঢাকার কর্মসূচি উদ্বোধন করেছেন এবং মানিক গঞ্জেরটি করেছেন স্বাস্থ্য প্রতি মন্ত্রী। ঢাকার এক শ্রেণীর দৈনিকে ফলাও করে বলা হচ্ছে যে, যে অভিযান শুরু হয়েছে সেটি নাকি চিকুন গুনিয়ার বিরুদ্ধে চেতনা সৃষ্টির অভিযান। বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ছাত্রবৃন্দ পোষ্টার নিয়ে মানব বন্ধনের মতো রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল। পোষ্টারে লেখা ছিল, চিকুন গুনিয়ার বিরুদ্ধে সজাগ হোন, বাসি পানি ফেলে দিন, ময়লা আবর্জনা দূর করুন ইত্যাদি। এসব খুব হাই সাউন্ডিং ব্যাপার স্যাপার। কিন্তু বিভিন্ন বাসার কাজের বুয়ারা বলছে, “হ্যারা খালি বক্তৃতা করে। কিন্তু মশা মারার ঔষুধ দেয়না। আগে ঔষুধ দেন, মশা মারেন, তারপর বক্তৃতা করেন।” আসলে এটিই হল মূল সমস্যা।
সারা ঢাকা জুড়ে নিত্যনতুন অ্যাপার্টমেন্ট নির্মিত হচ্ছে। এবার শুরু হয়েছে অকাল বর্ষা। বর্ষার তাজা পানি নির্মিয়মান অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাট গুলোর পাইলিং বা বীমে বা খাম্বায় জমে থাকছে। সেখানে যে এডিস মশার উৎপাদন হচ্ছে সে গুলো আশে পাশের ফ্ল্যাট এবং বাসা বাড়ি গুলোর বাসিন্দাদেরকে কামড়ে দিচ্ছে। শুধু বাসা বাড়িতেই বর্ষার পানি জমছে না, রাস্তা ঘাটেও পানি আটকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এগুলো দেখার তো কেউ নেই। এমনিতেই তো মানুষ বছরের পর বছর ধরে চেতনার কথা শুনে আসছে। এখন এই এডিস মশা এবং চিকুন গুনিয়ার ক্ষেত্রেও শুনতে হচ্ছে চেতনার কথা।
\ দুই \
কর্তৃপক্ষ নিজেই নিজের কথায় ফেঁসে গেছে। মাসাধিক কাল পর চিকুন গুনিয়ার ওপর একটি সরকারী জরিপ গত ১৬ তারিখে প্রকাশ করা হয়েছে। ঐ রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ঢাকায় এডিস মশার সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটেছে মাত্রাতিরিক্ত ভাবে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে এই এডিস মশাই চিকুন গুনিয়া এবং ডেঙ্গুর ভাইরাস ছড়ায়। সরকারী ঐ জরিপে দেখা গেছে যে ৫২ শতাংশ আধার বা কন্টেইনারে এডিস মশার প্রজনন ও বংশ বৃদ্ধি ঘটে। এসব কন্টেইনারের মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিকের ব্যারেল, বাকেট, মাটির পাত্র, পানির ট্যাংক, পরিত্যাক্ত টায়ার এবং টিউব প্রভৃতি। চলতি জুন মাসের এক থেকে ৫ তারিখের মধ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এই জরিপ পরিচালিত করে। স্বাস্থ্য পরিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, ঢাকা মহানগরীর ৫৩ টি এলাকা জরিপের অধীনে আনা হয়। এই ৫৩টি এলাকার মধ্যে ৪৭টি এলাকায় এডিস মশার উপস্থিতি প্রবল। যে সব এলাকায় এডিস মশার উপস্থিতি প্রবল সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ধানমÐি, শাহবাগ, আজিমপুর, মিটফোর্ড, বনশ্রী, গেÐারিয়া সিদ্ধেশ্বরী, হোসেনি দালান, ওয়ারি, বেইলি রোড, গোপিবাগ, কলাবাগান, লালবাগ, মাদার টেক, বনানী, ধোলপুর, উত্তরা, মধ্য বাড্ডা গুলশান -১, পল্লবী, মগ বাজার, চৌধুরী পাড়া, তেজগাঁও প্রভৃতি। ঐ জরিপে দেখা যায় যে, এ বছরের ডেঙ্গু এবং চিকুন গুনিয়ার প্রাদুভার্ব, বিশেষ করে চিকুন গুনিয়ার প্রাদুর্ভাব, অন্যান্য সব বছরকে ছাড়িয়ে গেছে।
সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হলো এই যে, যেখানে এপ্রিলের শেষ, বিশেষ করে মে’র শুরু থেকে চিকুন গুনিয়া মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে, সেখানে স্বাস্থ্য পরিদপ্তর ১লা জুন থেকে চিকুন গুনিয়ার কেস রেকর্ড করা শুরু করেছে।
সরকার ব্যাপক ভিত্তিতে মশক নিধন কর্মসূচির পরিবর্তে এডিস মশা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এই কর্মসূচির অংশ হিসাবে সমস্ত মেডিকেল এবং ডেন্টাল কলেজের ছাত্র, হেলথ টেকনোলজি এবং পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল ইনস্টিটিউটের ছাত্ররা ১৭ই জুন সকাল ৯টা থেকে ২টা পর্যন্ত ঢাকার ৯২টি ওয়ার্ডে জনগণকে সচেতন করার প্রচারণা চালায়।
স্বাভাবিক ভাবেই ধারণা করা হয়েছিল যে সময় মত দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং তার অধিনস্থ যত অধিদপ্তর বা পরিদপ্তর রয়েছে তারা এই রোগ প্রতিরোধ বা নির্মূলে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। এই রোগের প্রাদুর্ভাবের এক মাস দুই দিন পর স্বাস্থ্য দপ্তরের মহা তৎপর কর্মীরা এলান করেন যে তারা এবার মাঠে নামছেন। ঢাক ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করা হয় যে তাদের দপ্তরের কর্মীরা ঢাকা মহা নগরীর ৯২টি ওয়ার্ডে এবার মাঠে নামবেন।এখন মাঠে নামার প্রস্তুতি চলছে। গত কাল ১৭ই জুন শনিবার যখন এই কলাম লেখা শুরু করেছি তখনো ধানমÐিতে স্বাস্থ্য কর্মীদের মশক নিধনের কোনো তৎপরতা চোখে পড়লো না।
\ তিন \
সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হলো এই যে, যেখানে এপ্রিলের শেষ, বিশেষ করে মে’র শুরু থেকে চিকুনগুনিয়া মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে, সেখানে স্বাস্থ্য পরিদপ্তর ১লা জুন থেকে চিকুন গুনিয়ার কেস রেকর্ড করা শুরু করেছে। গত রবিবার ‘ডেইলি স্টারে’ সরকারী তৎপরতা সম্পর্কে যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, সেই রিপোর্টের প্রধান শিরোনামে বলা হয়েছে যে সরকার চেতনা সৃষ্টির যে অভিযান চালাচ্ছে সেটি আসলে হলো প্রতীকি অভিযান বা প্রতীকি চেতনা (Symbolic Awareness).
ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তকে বিশেষ করে ইংরেজি শিক্ষার বইয়ে Tense শেখানো হতো। একটি Tense ছিল Past Perfect Tense. Past Perfect Tense এ দুইটি Tense থাকে। একটি হলো Past Indefinite Tens বা Simple Past Tense আর একটি হলো Past Perfect Tense. দুটি ঘটনার মধ্যে যে ঘটনাটি আগে ঘটে সেটি হলো Past Perfect Tense এবং যেটি পরে ঘটে সেটি হলো Past Indefinite Tense. উদাহরণস্বরূপ, ডাক্তার আসিবার পূর্বেই রোগী মারা গেল, এর ইংরেজি হবে, The patient had died before the doctor arrived. এখানে রোগী আগে মারা গেল, তাই এটি হলো Past Perfect Tense. সে জন্য ইংরেজিটি হবে The patient had died. অর্থাৎ had died, শুধু died নয়। কিন্তু ডাক্তার পরে এসেছেন, তাই সেটি হয়েছে The doctor arrived, had arrived নয়।
প্রিয় পাঠক, এখানে আমি ইংরেজি শিক্ষার আসর নিয়ে বসিনি। আমি শুধু এটুকুই বলতে চেয়েছি যে সরকারের সেই চেতনা উদ্রেককারী অভিযানের পূর্বেই চিকুন গুনিয়ায় কেউ মারা যায়নি। সরকারের আরো কপাল ভালো যে, চিকুন গুনিয়াতে নাকি কেউ মারা যায় না, তবে এই রোগে রোগীর ১২টা বেজে যায়। সোজা কথায়, চিকুন গুনিয়া একটি ফ্যাটাল ডিজিস নয়। অর্থাৎ চিকুন গুনিয়াতে রোগী কষ্ট পায়, কিন্তু মারা যায় না। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে যখন প্রথম ডেঙ্গু দেখা দেয়, তখন অনভিজ্ঞতার কারণে ডেঙ্গুতে কয়েক জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এখন অবশ্য এসম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করায় চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া যায়নি।
এখন চিকুন গুনিয়া নিয়ে সরকারের ভ‚মিকা অনেকটা স্কুলে পাঠ্য পুস্তকের মতো চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে, অথবা ডাক্তার আসিবার পূর্বেই রোগী মারা গেল’র মতো অবস্থা। তাই সরকারের কপাল ভালো। অন্যথায় এই দেড় মাস সরকার যে রকম নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়েছে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারতো। বাংলাদেশের বিরোধী দল যদি কার্যকর এবং শক্তিশালী হতো তাহলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘুরে যেতে পারতো। সরকারের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন করা তো দূরের কথা, তারা এই ইস্যু নিয়ে বলতে গেলে কোনো কথাই বলেনি। তাই যে কোনো সঙ্কটে নসিবের ওপর ভরসা করা ছাড়া এই জাতির সামনে সম্ভবত এই মুহুর্তে আর কোনো পথ নাই।
journalist15@gmail.com

 


Show all comments
  • Zafar Khan ২৫ জুন, ২০১৭, ৩:০৫ পিএম says : 0
    Ke r montoboo korbo. We are all the Family members attacked by the "Chikonbunia" last 15 days. Jar hayasa sha buja majata. Choto balay nam sunasi " Patabunia, Hoglabunia". R ekhon boyobridikala sunlam "Chikonbunia". Lekhaka dhanabad.
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর