Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ০১ পৌষ ১৪২৪, ২৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী

লন্ডনে মসজিদের কাছে সন্ত্রাসী হামলায় শঙ্কিত মুসলিমরা

| প্রকাশের সময় : ২০ জুন, ২০১৭, ১২:০০ এএম

ভয়ঙ্কর ঘটনা -থেরেসা মে
পরিষ্কারভাবেই লন্ডনবাসীর ওপর ইচ্ছাকৃত হামলা -লন্ডন মেয়র

ইনকিলাব ডেস্ক : ব্রিটেনের লন্ডনে মসজিদের বাইরে মুসল্লিদের ওপর ভ্যান চালিয়ে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় একজন নিহত হয়েছে এবং অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে। হতাহতের সবাই মুসলিম।
ব্রিটেনে মুসলিম কাউন্সিল বলছে, এটা ইসলামোফোবিয়া বা ইসলাম-ভীতির একটি হিংসাত্মক প্রকাশ। খালিদ আমিন নামে প্রত্যক্ষদর্শী একজন জানান, ঘটনার সময় হামলাকারী ব্যক্তিকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, ‘আমি সব মুসলিমকে হত্যা করতে চাই’।
কী ঘটেছিল?
উত্তর লন্ডনের সেভেন সিস্টার্স রোডে ফিনসবারি পার্ক মসজিদের কাছে এই হামলা চালানো হয়।
মুসলিম ওয়েলফেয়ার হাউজের ঠিক বাইরেই অনেক লোক যে সময়টায় রাস্তার ওপর তারাবীহ শেষে বাড়ি ফিরতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই সাদা রং এর একটি ভ্যান দ্রæতবেগে রাস্তায় চলতে দেখা যায় এবং এরপর ফুটপাথে লোকজনের ওপর উঠে যায়। এরপর জরুরি বিভাগে খবর আসতে থাকে। এরপর চিকিৎসক, অ্যাম্বুলেন্স ক্রু, প্যারামেডিক্যাল কর্মী এবং স্পেশালিষ্ট রেসপন্স দল এবং অ্যাডভান্সড ট্রমা ব্যবস্থাপনা দল সেখানে পৌঁছে যায়। অসংখ্য পুলিশ ঘটনাস্থলকে ঘিরে রাখে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাম্বার রাড বলেছেন, এই হামলাকে পুলিশ ‘একটি সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবেই দেখছে। কাউন্টার টেররিজম সদস্যরা এর তদন্ত শুরু করেছে।
হামলাকারী সম্পর্কে কী জানা যাচ্ছে?
পুলিশ বলছে, ৪৮ বছর বয়সী একজন ভ্যানটি চালিয়ে পথচারীদের ওপর উঠিয়ে দেন এবং হামলাকারী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সেই প্রথম কোনও ব্যক্তি যাকে সাধারণ জনতা আটক করে এবং পুলিশের কাছে তুলে দেয়ার জন্য অপেক্ষা করে। এরপর তাকে হাসপাতালে নেয়া হয় স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য এরপর তাকে কাস্টডিতে নেয়া হবে।
তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা অনেকেই বলছেন, এ হামলার পেছনে একাধিক ব্যক্তি জড়িত বলে তারা মনে করেন। যদিও সন্দেহভাজন অন্য কোনও ব্যক্তিকে শনাক্ত করা যায়নি । তবে পুলিশ বলছে, এ বিষয়ে তাদের খোঁজ-খবর চলছে।
হামলার শিকার কারা?
গতকাল ভোরের দিকেই পুলিশ নিশ্চিত করে যে, এ হামলায় একজন নিহত হয়েছে। তবে তার নাম পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি। লন্ডন অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস জানাচ্ছে, তারা গুরুতর আহত অন্তত আটজনকে এবং অপেক্ষাকৃত কম আহত দু’জনকে ঘটনাস্থলে চিকিৎসা সেবা দিয়েছে। আহতদের পরে রাজধানীর তিনটি হাসপাতালে নেয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাস্তায় একজনকে সিপিআর মৃত্যুুপথযাত্রী ব্যক্তিকে বাঁচানোর শেষ প্রচেষ্টা) দিতে এবং মাথায় আঘাত পাওয়া আরেকজনকে অস্থায়ী ড্রেসিং দিতে দেখা যায়।
হামলার পর বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়া
প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে এই হামলাকে ‘ভয়ঙ্কর ঘটনা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আক্রান্তদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান তিনি। লেবার পার্টির নেতা এবং স্থানীয় এমপি জেরেমি করবিন টুইটারে লিখেছেন, এমন হামলায় তিনি ‘ভীষণভাবে ব্যথিত’। সেখানকার বিভিন্ন মসজিদ, পুলিশ এবং স্থানীয় কাউন্সিলের সাথে যোগাযোগ রাখছেন বলেও জানান তিনি।
লন্ডনের মেয়র সাদিক খান বলেছেন, এই স¤প্রদায়ের মানুষদের, বিশেষ করে যারা রোজা রাখছেন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে। মেয়র বলেন, ‘আমরা এখনো এ বিষয়ে বিস্তারিত জানি না কিন্তু এটা পরিষ্কারভাবেই লন্ডনবাসীর ওপর ইচ্ছাকৃত একটি হামলা। আর যাদের ওপর হামলা চালানো হয় তাদের অনেকেই পবিত্র রমজানের নামাজ আদায় শেষ করছিলেন’।
ম্যানচেস্টার, ওয়েস্টমিনিস্টার এবং লন্ডন ব্রিজে ভয়ানক হামলার মত এটাও নির্দিষ্ট একটি স¤প্রদায়ের ওপর চালানো হামলা। একইসঙ্গে পারস্পরিক সহনশলিতা, স্বাধীনতা এবং শ্রদ্ধাবোধের ওপর হামলা এটি।
ব্রিটেনে মুসলিম কাউন্সিলের মহাসচিব হারুন খান সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে মুসল্লীদের ওপর ভ্যান চালিয়ে দেয়া হয়েছে এবং এতে তিনি বিস্মিত এবং ক্ষুব্ধ। কাউন্সিলের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এটা ইসলামোফোবিয়ার (ইসলাম-ভীতি) একটি হিংসাত্মক প্রকাশ’। তারা সব মসজিদের আশেপাশে বাড়তি নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছে। উত্তর লন্ডনের ইহুদি স¤প্রদায়ের কাউন্সিলের পক্ষ থেকে টুইটারে এ হামলাকে বর্বরোচিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মুসলিমদের উসকানি দিচ্ছে আইএস!
যুক্তরাজ্যের ফিনসবারি পার্কে মসজিদের সামনে হামলার খবরকে ব্যবহার করে মুসলিমদের উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করছে ইসলামিক স্টেট বা আইএস। সংগঠনটির পক্ষের কয়েকটি টেলিগ্রাম চ্যানেলে মুসলিমদের জেগে ওঠার আহŸান জানিয়ে পোস্ট দেওয়া হচ্ছে। অনলাইনে জঙ্গি তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা সাইট ইনটেলিজেন্স এমন দাবি করেছে।
টুইটারে সাইট ইনটেলিজেন্স জানায়, লন্ডনে তারাবির নামাজ আদায় শেষে বাড়ি ফিরতে থাকা মুসল্লিদের ওপর হামলাকে উসকানির কাজে ব্যবহার করছে আইএসপন্থী চ্যানেলগুলো। সেই পোস্টগুলোর একটিতে বলা হয়, ‘হে মুসলিমগণ, আপনাদের নিজেদের রাস্তায় যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে তার বিরুদ্ধে জেগে ওঠা প্রয়োজন।’
হামলাকারীকে পুলিশ কেন গুলি করে হত্যা করেনি সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছে ওই পোস্টে।
ব্রিটেনের মুসলিম কাউন্সিল জানায়, স্থানীয় সময় রবিবার দিনগত রাত ১২টা ২০ মিনিটে একটি ভ্যান ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ মুসল্লিদের ধাক্কা দেয়। ওই মুসল্লিদের অনেকে তারাবির নামাজ শেষে বের হচ্ছিলেন। ওই ঘটনায় ১ জন নিহত হন। ঘটনাস্থল ফিনসবারি এলাকা থেকে ৪৮ বছর বয়সী একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।এখনও হামলাকারীর সংখ্যা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ওই গাড়ি থেকে এক সন্দেহভাজন হামলকারী চিৎকার করে বলছিল, ‘আমি সব মুসলিমকে হত্যা করতে চাই।’ সে কারণে মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ থেকেই উত্তর লন্ডনের মসজিদকে লক্ষ্য করে হামলা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফিনসবাড়ি মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ কোজবার বলেন, ‘এটা অবশ্যই সন্ত্রাসী হামলা। ম্যানচেস্টার, ওয়েস্টমিনিস্টার ও লন্ডন ব্রিজের মতো এখানেও সন্ত্রাসী হামলাই হয়েছে।’ ইতোমধ্যে এই ঘটনাকে সন্ত্রাসী হামলা বলে অভিহিত করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে।
শঙ্কিত মুসলিম স¤প্রদায়
মুসল্লিরা তারাবিহর নামাজ পড়ে বের হয়ে আসছিলেন যখন, তখনই সন্ত্রাসীরাপথচারীদের ওপর দ্রæতগতির গাড়ি নিয়ে হামলে পড়েছিল বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। এখনও হামলাকারীর সংখ্যা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ওই গাড়ি থেকে এক সন্দেহভাজন হামলকারী চিৎকার করে বলছিল, ‘আমি সব মুসলিমকে হত্যা করতে চাই।’ সে কারণে মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ থেকেই উত্তর লন্ডনের মসজিদে হামলা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে হামলার সম্ভাব্য কারণ বলা হয়েছে ‘ইসলামবিদ্বেষ’কে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে ডেইলি মেইল জানায়, পুলিশ আসার আগেই হামলাকারীকে ধরে ফেলেন স্থানীয়রা। তখন ওই হামলাকারী চিৎকার করে বলছিলেন, ‘আমি সব মুসলিমকে হত্যা করতে চাই।’
প্রতক্ষ্যদর্শীরা জানায়, ভ্যান থামার পর তারা সন্দেহভাজন দুজনকে পালিয়ে যেতে দেখেছে। ডেইলি মেইল জানায়, জরুরি সার্ভিসের কর্মীরা আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছিলেন। এসময় দুইজন সন্দেহভাজন হামলাকারী পালিয়ে গিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে নিশ্চিত করে কিছু বলা হয়নি।
আতিকুর রহমান নামে এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ‘তিন ব্যক্তি ছিলো। একজনকে তারা আটক করেছেন এবং বাকি দুইজনকে খুঁজছেন। একজন বয়স্ক ব্যক্তি মসজিদ থেকে বের হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তার সাহায্যার্থে অন্যান্যরা এগিয়ে এলে ওই ভ্যান তাদের ধাক্কা দেয়।’
ফাবিয়ান সান্তানা নামে একজন বলেন, তিনি তার বন্ধুকে বাইরে রেখে চিকেন শপে গিয়েছিলেন। বেরিয়ে দেখেন তার বন্ধু মাটিতে লুটিয়ে আছেন। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনায় আমি লন্ডনে আর নিরাপদ বোধ করছি না। আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই। সূত্র : দি মেইল, গার্ডিয়ান ও এএফপি।

 


Show all comments
  • সাফায়েত ২০ জুন, ২০১৭, ১১:৪৩ এএম says : 0
    হামলাকারীদের দ্রুত খুঁজে বের করুন।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।