Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট ২০১৭, ৭ ভাদ্র, ১৪২৪, ২৮ যিলকদ ১৪৩৮ হিজরী

বন্যার বড় ঝুঁকিতে দেশ

| প্রকাশের সময় : ২০ জুন, ২০১৭, ১২:০০ এএম


ভারতে অতিবর্ষণ ঢল বন্যা : সর্বোচ্চ সতর্কতা ও উদ্ধার অভিযান : উজানের বন্যা ধেয়ে আসতে পারে ভাটিতে
শফিউল আলম : উত্তর-পূর্ব ভারতে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে অতিবর্ষণ, পাহাড়ি ঢল-ধস, বন্যাজনিত দুর্যোগ দিন দিন ব্যাপক রূপ নিচ্ছে। আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম, মেঘালয় রাজ্যে পাহাড়ি ঢলবাহিত ভয়াবহ বন্যায় ভাসছে গ্রামের পর গ্রাম-জনপদ। গোয়াহাটি শহরও কাদা-পানিতে তলিয়ে গেছে। এ অবস্থায় সে দেশের সরকার দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবেলায় আগাম সর্বোচ্চ সতর্কতা, প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। আসামের বিভিন্ন বন্যা কবলিত ও পানিবন্দী এলাকার হাজার হাজার মানুষকে উদ্ধারে চলছে অভিযান। সেই সাথে পাহাড়-টিলার শানুদেশে তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাসরত লোকজনকে নিরাপদ স্থানে দ্রæত সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। এসব ব্যাপক প্রস্তুতি ও সতর্কতার মধ্যেও উপরোক্ত বন্যা ও ঢল কবলিত উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে এ যাবত কমপক্ষে ২০ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। বাড়িঘর হারিয়েছে হাজারো মানুষ। সিলেটের নিকটবর্তী ওপাড়ে করিমগঞ্জ জেলায় শত শত গ্রাম পাহাড়ি ঢল ও বানের পানিতে ভাসছে। সেখানে দিন দিন বর্ষণ ও বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতির খবর পাওয়া যাচ্ছে।
আবহাওয়া ও পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞ সূত্র জানায়, উত্তর-পূর্ব ভারতের ঠিক লাগোয়া হচ্ছে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা। আসাম রাজ্য এমনিতেই পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা বৃষ্টিপাত-প্রবণ অঞ্চল। আসামসহ পার্বত্য উত্তর-পূর্ব ভারতে বর্ষারোহী মৌসুমি বায়ুমালা এক সপ্তাহ ধরে অত্যধিক মাত্রায় সক্রিয়। এর ফলে সেখানে অবিরাম ভারী বর্ষণ হচ্ছে। অতিবৃষ্টিতে সেখানকার পাহাড়ি খরস্রোতা নদ-নদীগুলো দুই কুল ছাপিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে বর্ষার শুরুতেই বন্যার। আর সেই উজানের বন্যা ধেয়ে আসতে শুরু করেছে ভাটিতে তথা বাংলাদেশের দিকে। এতে করে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বন্যার বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে।
ইতোমধ্যে আসাম অঞ্চলে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সেই রাজ্যের সবক’টি নদ-নদী উপচে গেছে। সেখানকার অন্যতম বৃহৎ লুসাই পাহাড় থেকে উৎসারিত হয়েছে কর্ণফুলী নদী। কর্ণফুলীর উজানভাগে অর্থাৎ আসামের লুসাই এলাকায় অতিবর্ষণের ফলে খর¯্রােতা কর্ণফুলী নদী প্রবাহিত হচ্ছে বিপদসীমার উপর দিয়ে। এ অবস্থায় গত ১৭ জুন থেকে কর্ণফুলীর কাপ্তাই বাঁধের পানি নিয়ন্ত্রণসীমার মধ্যে রাখার জন্য ১৬টি গেইট পর্যায়ক্রমে খুলে দিয়ে পানির চাপ কমানো হচ্ছে। অথচ এক মাসেরও কম সময় আগেও কর্ণফুলী নদীর পানি হ্রাস পেয়ে কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ প্রকল্পের উৎপাদন কমে যায়। কর্ণফুলীর উজানে নাব্যতাও ছিল অনেক কম। এতে নৌ চলাচল ব্যাহত হয়। অথচ এখন হঠাৎ করে ভারী বর্ষণে কর্ণফুলী নদীতে রীতিমতো বান ডেকেছে।
শুধুই কর্ণফুলী নয়; উত্তর-পূর্ব ভারতে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুতাড়িত চলমান অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, ভূমি ধস, বন্যার কারণে বাংলাদেশের উদ্বেগের কারণ আছে। সবচেয়ে বড় কারণটি হলো, সেখানকার পাহাড়ি ঢল-বানের পানি হু হু করে ভাটিতে বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসা এখন সময়য়ের ব্যাপার মাত্র। এতে করে দেশের বিশেষত উত্তর-মধ্য ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ বৃহত্তর ময়মনসিংহ বিভাগ, সিলেট বিভাগ, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল তথা ফেনী-চট্টগ্রাম-পার্বত্য চট্টগ্রামসহ ব্যাপক এলাকা আকস্মিক উজানের পাহাড়ি ঢলে বন্যা কবলিত হওয়া আশঙ্কা রয়েছে। সিলেট অঞ্চলে সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, খোয়াই, বৃহত্তর চট্টগ্রামের কর্ণফুলী, হালদা, মাতামুহুরী, ফেনী, হালদা নদীগুলো বিপদসীমা অতিক্রান্ত করতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরভাগেও মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে অতিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢল সংঘটিত হলে পরিস্থিতির নিঃসন্দেহে আরও অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়ে গেছে। গত বেশ কিছুদিন যাবত আবহাওয়া বিভাগ মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকার কথা জানিয়ে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস ও সেই সঙ্গে পাহাড়-টিলা বা ভূমিধসের সতর্কতা জারি রেখেছে।
তবে উত্তর-পূর্ব ভারতে বিশেষত আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মিজারাম প্রদেশে অব্যাহত ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ি ঢল ও বন্যার অনিবার্য বিরূপ প্রভাবে দেশের উত্তর-মধ্য, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল বন্যা কবলিত হওয়ার ঝুঁকি সত্তে¡ও এখনও পর্যন্ত সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় আগাম কোনো সতর্কতা এবং প্রস্তুতি নেয়া হয়নি। এতে করে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে বিশাল এলাকা। এখনই পর্যাপ্ত প্রস্তুতির তাগিদ অভিজ্ঞজনদের।        
ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগের তথ্য মতে, বিশেষত বৃষ্টি-প্রবণ উত্তর-পূর্ব ভারতে এবার বর্ষায় ভারী ও টানা বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ঘন মেঘমালা বিরাজ করছে এ অঞ্চলে। বাংলাদেশের সংলগ্ন আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামে অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ি ঢল, ধস, আকস্মিক বন্যাজনিত সতর্কতা বজায় রয়েছে। জনগণের জানমাল রক্ষায় সরকার বিভিন্ন প্রস্তুতি ও সতর্ককামূলক ব্যবস্থা চালু রেখেছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের এসব রাজ্য তথা উজানভাগ থেকে পাহাড়ি ঢল-বন্যা ধেয়ে আসলে তার সরাসরি প্রভাবে বাংলাদেশের ভাটিতে বিভিন্ন অঞ্চলে পাহাড়ি ঢল ও আকম্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরও চলতি জুন মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে জানায়, এ মাসে বিশেষত আষাঢ়ে দেশের উত্তরাঞ্চল (রাজশাহী-রংপুর), মধ্যাঞ্চল (ঢাকা-ময়মনসিংহ বিভাগ, কুমিল্লা ও আশপাশ) এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের (বৃহত্তর সিলেট) কিছু কিছু জায়গায় ‘স্বাভাবিক’ বন্যা হতে পারে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ সূত্র জানায়, জুন মাসের (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়) দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে দেশের উত্তর, মধ্যাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কিছু কিছু স্থানে বন্যার সতর্কতা তুলে ধরা হয়েছে। জুনে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টিপাতে এ বন্যা হতে পারে এবং যা বর্তমান সময়ের ‘স্বাভাবিক’ বন্যা হিসেবে গণ্য করা হয়।      
ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ ও গণমাধ্যম জানায়, এবার বর্ষা মৌসুমে (জুন-জুলাই-আগস্ট) হিমালয় পাদদেশীয় ও উত্তর-পূর্ব ভারতে অতিবৃষ্টির আবহ বজায় রয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি এলাকায় উজানে ভারী বর্ষণ হলে ভাটিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন নদ-নদীর দু’কুল ছাপিয়ে আকস্মিক অথবা নিয়মিত বন্যার আশঙ্কা আছে। পাহাড়ি ঢলেও বন্যা কবলিত হতে পারে দেশের বিভিন্ন এলাকা। তবে এরজন্য ভারত জোরদার তৎপর থাকলেও বাংলাদেশে যে সচেতনতা ও প্রস্তুতি প্রয়োজন তা এখনও পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

 


Show all comments
  • Anis Ahmed ২০ জুন, ২০১৭, ২:৩৬ এএম says : 0
    Our Govt should take quickly action for flood awareness & preparedness. Thanking Inqilab for the news.
    Total Reply(0) Reply
  • Selina ২০ জুন, ২০১৭, ১০:১৭ এএম says : 0
    Gates of dam ,embankment of 54 river totally open at a time to make a deluge in my beloved country ..
    Total Reply(0) Reply
  • saddam ২০ জুন, ২০১৭, ১০:৪৪ এএম says : 0
    এ পত্রিকা আমি চয়েজ করি কারন এটার মালিক ও কর্মচারিরা হক্কানি পীর মাশায়েখ দের তথা আল্লাহর অলীদের ভালোবাশে।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর