Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২১ অক্টোবর ২০১৭, ০৬ কার্তিক ১৪২৪, ৩০ মুহাররম ১৪৩৯ হিজরী

মানবিক কর্মসূচিতে কুৎসিত হামলায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া

| প্রকাশের সময় : ২০ জুন, ২০১৭, ১২:০০ এএম


মার্জিত রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুলের ওপর হামলায় হতবাক সবাই
রফিকুল ইসলাম সেলিম : পাহাড় ধসে বিধ্বস্ত রাঙ্গামাটিতে ত্রাণসামগ্রী বিতরণের উদ্দেশে যাওয়ার পথে রাঙ্গুনিয়ায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়ি বহরে ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলার ঘটনায় জনমনে তীব্র ক্ষোভ অসন্তোষ ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। গতকালও সাধারণ মানুষকে এই ঘটনায় প্রকাশ্যে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে যাওয়ার মতো একটি মানবিক কর্মসূচিতে এই ধরনের কুৎসিত হামলায় হতবাক বিবেকবান প্রতিটি মানুষ। বিশেষ করে জাতীয় রাজনীতিতে সজ্জন হিসেবে পরিচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মতো পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদের উপর জঘন্য হামলার ঘটনায় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও হতবাক। যারা বিএনপির রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করেন না তারাও এই ঘটনার নিন্দা করছেন। এ ধরনের ঘটনা অতিথিপরায়ণ চট্টগ্রামবাসীর চিরায়ত ঐতিহ্যের পরিপন্থী বলেও মন্তব্য করেছেন অনেকে। দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলের দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যক্তিসহ সিনিয়র জাতীয় নেতাদের উপর এধরনের হামলার ঘটনায় খোদ সরকারী দলের নেতারাও বিব্রত। এ ঘটনাকে চরম অন্যায় মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। জেলা আওয়ামী লীগের নেতারাও এ ঘটনার নিন্দাবাদ জানিয়েছেন।
সিয়াম সাধনার মাস মাহে রমজানে ইফতার সংস্কৃতির মাধ্যমে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে অনুপম সৌহার্দের পরিবশ বিরাজ করছে। জাতীয় রাজনীতির মতো চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনেও নেই কোন উত্তাপ-উত্তেজনা। আত্মশুদ্ধির মাসে ইফতার মাহফিল, দান, খয়রাত ও সামাজিক কর্মসূচিতে ব্যস্ত এখানকার সব দলের রাজনৈতিক নেতারা। অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড় মোরার ধকল কাটতে না কাটতেই ভারী বর্ষণে সৃষ্ট পাহাড় ধস ও পাহাড়ী ঢলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানীতে এখানে এখনও দুর্যোগ পরিস্থিতি। চট্টগ্রামসহ ৫ জেলায় পাহাড় ধসসহ প্রাকৃতি দুর্যোগে দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যুতে এক শোকাতুর পরিবেশ বিরাজ করছে। পাহাড় ধসে শুধু রাঙ্গুনিয়াতেই প্রাণ হারিয়েছে ২৯জন। এমন এক পরিস্থতিতে মানবিক একটি কর্মসূচিতে ঘটে নজিরবিহীন সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা।
রোববার সকালে চট্টগ্রাম থেকে সড়ক পথে রাঙ্গুনিয়া হয়ে রাঙ্গামাটি যাওয়ার পথে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়ি বহর। স্থানীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা তাকে বহনকারী গাড়িতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। গাড়িটি তছনছ করার পাশাপাশি হামলা হয় ওই গাড়িতে থাকা নেতাদের উপর। হামলায় রক্তাক্ত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সিনিয়র ৬ নেতা। হামলাকারী সরকারী দলের অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা হামলার আগে পরে রাস্তায় প্রকাশ্যে মিছিল করে। তাদের মিছিলের পাশে ছিল পুলিশের গাড়ি। আকস্মিক এই হামলার পর জীবনের নিরাপত্তা না থাকায় রাঙ্গামাটিতে না গিয়ে চট্টগ্রাম ফিরে আসে বিএনপির কেন্দ্রীয় ত্রাণ টিমের সদস্যরা।
এ হামলার খবরে বন্দরনগরীসহ সারাদেশে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রæত এ হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ে। সেখানেও নিন্দার ঝড় বইতে শুরু করে। গতকালও বিষয়টি বন্দরনগরীর সর্বত্রই ছিল আলোচনার শীর্ষে। হাটে-মাঠে যেখানে মানুষের জটলা সেখানে এ বিষয়টি ঘুরেফিরে আলোচনায় উঠে আসে। পাহাড় ধসে বেঘোরে গণমৃত্যুতে শোকাতুর পরিবেশ ও দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদদের উপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাকে ন্যাক্কারজনক বলছেন সাধারণ মানুষ। দেশের রাজনীতিতে সজ্জন হিসেবে পরিচিত বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে পরিচ্ছন্ন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ ধরনের সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য এবং পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক নেতাদের উপর কুৎসিত হামলার ঘটনায় রাজনৈতিক কর্মীরাও হতবাক।
জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতার সাথে এ বিষয়ে কথা হয়। তারা সকলেই এ ঘটনাকে নজিরবিহীন নিন্দনীয় বলে মন্তব্য করেন। দলের ও সরকারের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করার জন্য পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলেও তৃণমূল পর্যায়ে নেতাদের অভিমত। রাজনীতি করেন না কিংবা বিএনপির রাজনীতিকে পছন্দ করেন না এমন লোকজনও এ ধরনের হামলার ঘটনাকে নিন্দনীয় বলছেন। রাজনীতিতে যখন চরম উত্তাপ আর উত্তেজনা থাকে তখন প্রতিপক্ষের উপর হামলার ঘটনাকে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ গ্রহণ করে। কিন্তু স্থিতিশীল রাজনীতিক পরিস্থিতিতে মানবিক একটি কর্মসূচিতে যাওয়ার পথে এ ধরনের হামলাকে চরম অন্যায় বলছেন সাধারণ মানুষ।
মহিউদ্দিন চৌধুরী
চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী মির্জা ফখরুলের গাড়ি বহরে হামলার ঘটনাকে চরম অন্যায় উল্লেখ করে বলেন, এ কাজ যারা করেছে তারা জঘন্য অপরাধ করেছে। তিনি গতকাল ইনকিলাবকে বলেন, এ অপরাধের বিচার হওয়া উচিত। প্রতিহিংসার রাজনীতি মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না। যারা প্রতিহিংসার রাজনীতি করে তারা মানুষের জন্য রাজনীতি করেন না। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে সজ্জন উল্লেখ করে মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ভিন্ন রাজনীতি করলেও তারা সজ্জন হিসেবে পরিচিত। রাজনীতিতে তাদের সুনাম এবং গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, রাজনীতিতে ভিন্ন মত থাকবে কিন্তু প্রতিহিংসা থাকা উচিত নয়। চট্টগ্রামের মানুষ অতিথিপরায়ণ। অতিথিদের সম্মান করা এখানকার মানুষের ঐতিহ্য। রাঙ্গুনিয়ায় যা ঘটেছে তা এ ঐতিহ্যকে ¤øান করেছে। ঘটনায় জড়িত যে যা যারাই হোক তাদের শাস্তি হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক রাষ্ট্রদূত নুরুল আলম চৌধুরী ইনকিলাবকে বলেন, এ ধরনের হামলা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক এবং নিন্দনীয়। যে বা যারা এ হামলা করেছে তারা ঠিক কাজ করেনি। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিশেষ করে চট্টগ্রামের সহনশীল রাজনীতির যে ধারা তার সাথে সাংঘর্ষিক। রাঙ্গুনিয়ায় বিএনপি মহাসচিবের গাড়ি বহরে হামলার ঘটনা শোনার পর মানসিকভাবে তিনি কষ্ট পেয়েছেন উল্লেখ করে বলেন, এটি আমাকে পীড়া দিয়েছে। আমার দীর্ঘ রাজনীতির জীবনে প্রতিপক্ষের উপর হামলা কিংবা কারো অনিষ্ট সাধন করার চিন্তাও করিনি। আওয়ামী লীগ এবং আমি ব্যক্তিগতভাবে এ ধরনের রাজনীতি অপছন্দ করি। এ ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেয়া জরুরী বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, এ ঘটনা নিন্দনীয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঘটনার পর যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন সেটিই আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা প্রতিপক্ষের সম্মানী রাজনীতিক নেতাদের উপর হামলা কিংবা তাদের সাথে অশোভন আচরণ করাকে অন্যায় মনে করি। তিনি বলেন, রাজনৈতিক জীবনে প্রতিপক্ষের সাথে সৌহার্দ ও সম্প্রীতির সম্পর্ক রেখে এসেছি। রাজনীতিতে ভিন্নমত থাকতে পারে কিন্তু পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে।

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর