Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫, ৮ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

অজানিত ভাইয়ের অন্বেষণে

| প্রকাশের সময় : ২৪ জুন, ২০১৭, ১২:০০ এএম

মুস্তাফা জামান আব্বাসী : লেখাটি পড়েছি বহু দিন আগে। ‘মাই ব্রাদার্স ফেস’। গল্প শুরু হয়েছে এমনিভাবে : কুয়াশার আবরণ ভেদ করে পথ দিয়ে এগিয়ে আসছেন উল্টো দিক থেকে এক ব্যক্তি। সময়টা হানাহানিতে উত্তাল, মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস গিয়েছিল উবে। লোকটি হিন্দু না মুসলমান, সাদা না কালো, সে কি এগিয়ে আসছে তাকে হত্যা করতে? নিকটে এলে দেখা গেল, আগন্তুক আর কেউ নয়, তার আপন ভাই।
দু’ভাই একসঙ্গে বড় হলাম। তারপর যে যার পথে। সারাদিনে কতটুকু সময় ভাইয়ের জন্য দিই, এক মিনিট, পাঁচ মিনিট? এর বেশি নয়। কতটুকু চিনি, কতটুকু জানি তাকে? বড় হয়ে কতটুকু সময় একসঙ্গে ছিলাম, কতটুকু অন্তরঙ্গ ছিলাম? তার জীবন রহস্যের কতটুকু আবিষ্কার করতে পেরেছি? চিনেছি অল্পই, জেনেছি অল্পই। জীবন বয়ে যায়, রয়ে যাই চির অচেনা। যার যার পথে হেঁটে চলি পৃথিবীর।
তিনি তার জীবন কাহিনী লিখে যাননি, আমার অভিযোগ। অথচ তারটি হত সর্বাপেক্ষা ‘ইন্টারেস্টিং’, উপভোগ্য, কালের নিরুপম কষ্টি পাথরে লেখা শ্রেষ্ঠ-জীবন ইতিহাসের একটি। এটি কেন হলো না তা নিয়ে আমার আফসোসের অন্ত নেই। হয়তো তার মনের সেই ফুরফুরে ভাবটির অনুপস্থিতি, অভিমান, না সময়াভব, বুঝতে পারিনি। যখন তার সঙ্গে গল্প করি ও মেজাজটি ভালো, এমন সুন্দর করে এগিয়ে চলে তার গল্প বলার ভঙ্গি যে অবাক না হয়ে পারা যায় না। কয়েক দিন আগে তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে সদ্য ইন্তেকালপ্রাপ্ত জাস্টিস মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের প্রসঙ্গ ওঠে। তিনি বলে যান তাঁর সঙ্গে হাবিবুর রহমানের অন্তরঙ্গতার কথা, কিভাবে লন্ডনে তাঁদের পরিচয়, তারপর লন্ডনে ভাইয়ের বাসাতে তাঁর অবস্থান। মাত্র আধ ঘণ্টায় এত সুন্দরভাবে তার সারা জীবন আমার সামনে তুলে ধরলেন যেন তাঁকে স্পষ্টভাবে দেখতে পারলাম। ঠিক তেমনি, যাদের সঙ্গে ছিল তার পরিচয়, তাদের প্রতিটি কথা তার অন্তরে গাঁথা আছে, বিশেষ করে সমাজে যারা স্মরণীয় বরণীয় তাদের সঙ্গে ছিল তার ওঠা বসা। তার লেখা এমন একটি জীবন কাহিনী থেকে অকারণেই হলাম বঞ্চিত।
মৎ কাহিনী, ‘জীবন নদীর উজানে’ [এমন কিছু নয়]-তে বলেছি, ফল্গুধারার মতো ভাষায় তার অনায়াস দক্ষতার কথা। যখন তিনি কলেজে পড়েন, তখন তার লেখা একটি বড় গল্প পৃষ্ঠাব্যাপী একটি দৈনিক কাগজে প্রকাশিত হয়। এত সুন্দর গল্প আমি আর পড়িনি। তার সমসাময়িক যারা সাহিত্যিক হিসেবে পসার জমিয়ে যার যার ঘরে ফিরে গেছেন, তাদের লেখা গল্প উপন্যাস তুলনায় মনে হয়েছে পানসে। ‘শীত রাত্রির ঢেউ’ নামে তার একটি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল ফ্রাঙ্কলিন পাবলিকেশনস্ থেকে। আমার মতে তার উচ্চ শ্রেণীর ভাষার কারণে এত সুন্দর অনুবাদ আর কেউ করেছেন কি না সন্দেহ। লেখা প্রসঙ্গে আমার বক্তব্য: শুধু ভাষাই নয়, বক্তব্য হতে হবে গভীর উপলব্ধির ফসল। যাদের জীবনে কোনো উপলব্ধিই ঘটেনি, না জাগতিক, না পারলৌকিক, তাদের লেখা পড়ে কি হবে? গাদা গাদা বই পড়ে আছে আমার গ্রন্থাগারে, ইচ্ছে করেনি বইগুলো ছুঁয়ে দেখতে। আমার পৃথিবী অনেক ব্যস্ত সময়ের দাবি নিয়ে উপস্থিত।
কুচবিহার
কুচবিহারে তাকে নিয়ে আমার স্মৃতি প্রসঙ্গে প্রায় কিছুই মনে পড়ছে না এই জন্য যে আমি তখন অনেক ছোট। মনে পড়ে কুচবিহার জেনকিংস স্কুলের সর্বাপেক্ষা মেধাবী ছাত্র তিনি। তাকে ঘিরে ছিল শিক্ষকদের উচ্চাশা। সবাই হিন্দু, অথচ এই মুসলমান ছেলেটির জন্য সবার আদর। যারা পূর্ববঙ্গ থেকে চলে এসেছিলেন কুচবিহারে পার্টিশনের আগেই সেই শিক্ষকরা সম্প্রদায়গতভাবে ছিলেন আলাদা দৃষ্টিভঙ্গির। আমরা যারা কুচবিহারের আদি সন্তান তাদের সঙ্গে ছিল সেডিউল কাস্ট ও নি¤œবর্ণের হিন্দুদের সঙ্গে বেশি সখ্যতা। আর বহিরাগতদের বলা হতো ‘ভাটিয়া’, অর্থাৎ যারা ভাটির দেশ থেকে এসেছেন। আমার চাচা আবদুল করিমের লেখা একটি গানের শেষ লাইন :
‘হায়রে হায়, ভাটিয়া কি হয়রে আপনার’। গানটি কুচবিহার হিতসাধনীর সভা নানা অনুষ্ঠানে আমি গেয়েছি। গানটির প্রথম লাইন : ‘ও ভাই মোর কুচবিহারি-রে’। শেষ পর্যন্ত আমরাই ঘর বাঁধলাম ভাটির দেশে।
আমার ভাই খুব ভালো বক্তৃতা করতেন সেই প্রথম দিন থেকেই, চটপটে ও বুদ্ধিদৃপ্ত। তার আবৃত্তিরও বিশেষ প্রশংসা করতে হয়, কারণ তার মতো বুঝে আবৃত্তি করার মানুষ খুবই কম। আমি তার কাছেই আবৃত্তি শিখেছি এবং বাঘা বাঘা আবৃত্তিকারদের কুপোকাৎ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম তারই তত্ত¡াবধানে।
জেনকিন্স স্কুলে নিচু ক্লাসে যখন ভর্তি হলাম, ভাই উঁচু ক্লাসে, ক্লাস ওয়ান থেকে অনেক দূরত্বে, মাঝে বিরাট একটি খেলার মাঠ। ভাই খেলাধুলায় অংশ নিতেন, যার মধ্যে ফুটবল, ভলিবল, বাস্কেট বল, ব্যাটমিন্টন। এছাড়াও দাঁড়িয়াবান্ধা ও গোল্লাছুট।
বলরামপুরের গ্রামের বাড়িতে তাকে নিয়ে কোনো স্মৃতি নেই। তবে আমাদের বাড়ির বিরাট পুকুরে তিনি অনেকক্ষণ ধরে সাঁতার কাটতেন। কুচবিহার চন্দন দীঘিতেও তিনি সাঁতার কাটতেন। এত বড় দীঘি এ অঞ্চলে আর ছিল না। কুচবিহারের ‘হিরামন মঞ্জিল’-এ একটি বিরাট বেডরুমে আমরা সবাই একসঙ্গে ঘুমাতাম, সে ঘরটি এত বিরাট যে, তাতে বহু লোকের জায়গা হতো। মশা ছিল, তাই মশারিও ছিল। বারান্দায় আমাদের খাবারের ব্যবস্থা। সবার জন্য কাঁসার প্লেট ও বাটি। নাম লেখা : দুলু, তুলু ও মীর্ণা। কাঁসার বাসন রোজ ভালো করে মাজা হতো এবং খাবারের সময় তা চকচক করে উঠত। গরিব ছিলাম না, আবার বড়লোকও নই। কাপড়চোপড় সংক্ষিপ্ত, দুটো শার্ট, দুটো প্যান্ট। আব্বা কলকাতা থেকে এলে নতুন জামা পেতাম, সেগুলো না ধুয়ে রেখে দিতাম বালিশের নিচে, যাতে পাট না ভেঙে যায়। নতুন জামাগুলোর জন্য ভীষণ মায়া। জুতো মাত্র একজোড়া, নিজেই রোজ পরিষ্কার করতাম। এখনো আমার সে অভ্যাসটি আছে।
কুচবিহারে ‘মুকুল ফৌজ’ ছিল না, সেটির পত্তন করেন আমার ভাই। আমরা রোজ বিকেলে মজিরুদ্দিন চাচার উঠানে লেফ্টরাইট করতাম। এটি চালু ছিল আমরা ঢাকায় চলে আসার আগ পর্যন্ত। প্রতি ঈদে আমাদের হতো ঈদ পুনর্মিলনী। নানা নাটক অভিনীত হতো আমাদের দ্বারা। একবার অভিনয় হলো ‘অবাক জলপান’। আমার ভাই সেই নাটকের পরিচালক। আমিও অভিনয় করেছি বৈকি। কুচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্রনাথ ভুপবাহাদুর একদিন ল্যান্স ডাউন হলে আমাদের অভিনয় দেখতে এলেন। পার্টটি মনে আছে, তা হলো : ‘মহারাজ, হাঁড়ি খুলে দেখি মাংস নেই’। স্টেজের পর্দা উঠলে দেখা যাবে পার্ট মুখস্থরত আমি, পার্টটি আমি আস্তে আস্তে ভুলে যাব। প্রথমে বলব, মহারাজ, হাঁড়ি খুলে দেখি মাংস নেই, তারপর বলব, মহারাজ মাংস নেই এবং শেষে শুধু বলব, নেই, নেই। এই হলো আমার পার্ট। দর্শককুল আমার অভিনয়ে চমৎকৃত, এমনকি মহারাজ নিজেও। আমাদের সংস্কৃতি কর্মকাÐের নেতা আমার ভাই এবং আমার আরেক চাচাতো বোন দীপ্তি।
আব্বা যখন কলকাতা থেকে কুচবিহারে আসতেন, আমাদের বাড়ি হতো আনন্দের হাট। অনেক গান-বাজনা হতো অধিক রাত পর্যন্ত বাড়ির বারান্দায়। সামনের বাগানেও অনেক লোক জুটে যেত সেই গান শোনার জন্য। আমার ভাইও সেই গানে অংশ নিতেন। তার কণ্ঠ মিষ্টি ও উচ্চারণ স্পষ্ট। স্মরণশক্তি তীক্ষè এবং সবার প্রতি দয়ার্দ্র ও মনোযোগী। ছোট মামা মোহাম্মাদ সুলায়মান ডোমার থেকে এসে কিছুদিন আমাদের সঙ্গে থাকতেন। তার সঙ্গে আমার ভাইয়ের ছিল সখ্যতা। এছাড়া চাচাতো বোন হেলেনা, দীপ্তি, লায়লী। চাচাতো ভাই খুকু, মুকু, টুকু, এদের সঙ্গেও তিনি বিকেলে ব্যাডমিন্টন খেলতেন। আমরা ছোট, কাজেই সেই খেলায় আমরা নীরব দর্শক। আমার চাচা আবদুল করিম ছিলেন আমাদের অভিভাবক। তার নির্দেশেই আমরা চলতাম।
বিচারপতি
যারা তাকে চেনেন না, তাদের কাছে তিনি একজন বিচারপতি, গুরুগম্ভীর, নিজেকে গুটিয়ে নেয়া মানুষ, অথচ আমাদের কাছে সহাস্য মজলিশি সংবেদনশীল, অল্পতেই খুশি, অল্পতেই বেজার, অল্পতেই সব উজাড় করে দেন, আবার অল্পতেই নিজকে গুটিয়ে নেয়া। কিছু অভাবী আত্মীয় যারা সবসময়ই তার কাছে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে আছেন, তাদেরকে তিনি অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিবৃত্ত করেন এই বলে যে, তার দায়িত্ব ‘সাপোর্ট’ করা, তাদের সংসার পুরোপুরি চালান নয়। আবার অনেক সময় দেখেছি যে অতি অল্পতে গলে গিয়ে তিনি অনেক বেশি দিয়ে ফেলেছেন। অনেক বছর আগে যখন আমার সার্জারি হয়, ভাবছি কিভাবে পুরো টাকাটা সংগ্রহ করব, বিল হাতে নিলে দেখা গেল ওটা ইতোমধ্যে পরিশোধিত, অথচ এ নিয়ে একটিও উচ্চবাচ্য করেননি তিনি। ভাইবোনরা আল্লাহর রহমতে সচ্ছল, তাই তার কাছে চেয়েছি শুধু ভালোবাসার বিনিময়, অন্যকিছু নয়। যদিও জানি আমাদের জন্য তিনি সদা প্রস্তুত।
মিন্টু রোডে ছিল তার বিশাল অট্টালিকা, ঢাকা শহরের সবচেয়ে অভিজাত পাড়া। আশপাশে যারা থাকেন তারা সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। বিচারপতি, বড় অফিসার, ব্যাংকার। পাশেই ছিল ব্যাংক হাউজ, যেখানে থাকতেন আমার সম্বুন্ধি সুলায়মান চৌধুরী। এখানকার চারপাশে আমি ঘুরে বেড়াতাম, কারণ এখানেই থাকত আসমা চৌধুরী নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত এক তরুণী। আমি চাকরি পাওয়ার পর এর সঙ্গেই আমার বিয়ে হয়।
অনেকের জানা নেই যে, আমার ভাই রান্নায় সিদ্ধহস্ত। এ নিয়ে স্ত্রীর অনুযোগ শুনে এসেছি। আসমা বলে তোমার ভাইয়ের মতো ভালো গরুর গোশ্ত কেউ রান্না করতে পারে না, আর তুমি এককাপ চাও বানাতে পার না। সত্যি আমি তাই। কিছুই পারি না আমি, শুধু খেতে পারি, তবে সেটাও একটা দক্ষতা। ভালো রান্না করেন যারা, খুঁজে বেড়ায় ভালো খাইয়ে। ভাইয়ের বাসায় দাওয়াত হলে খুঁজে খুঁজে তার রান্নাটা আবিষ্কার করি এবং সেটিতেই মনোনিবেশ করি। যখন তিনি লন্ডনে, তখনই রান্নাটা রপ্ত করেন। আমি সারা জীবন মা ও স্ত্রীর রান্নাতে অভ্যস্ত, নিজে রান্না ঘরে যাবার সুযোগ পাইনি। এখানে বলে রাখি, আমার বোন ও স্ত্রী দু’জনেই ভালো রাঁধুনী, এগুলো মা’র উত্তরাধিকার।
‘গানের পাখি ফেরদৌসী রহমান’ গ্রন্থে মৎপ্রণীত একটি প্রবন্ধ : ‘সে আমার ছোট বোন’। ‘আব্বাসউদ্দিনের গান’ পঞ্চম সংস্করণ সম্পাদনায় লিখেছি ছোট লেখা : ‘সে আমার ভাই’।
লিখেছি : মোস্তাফা কামাল, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, আমার একমাত্র ভাই। মেধাবী ছাত্র, তুখোড় বক্তা, পেশাবরেণ্য ব্যারিস্টার, সূ²দৃষ্টি লেখক, সর্বজনশ্রদ্ধেয় প্রধান বিচারপতি। অনেকের জানা নেই, তিনি পিতার গানগুলোর অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রবক্তা, সব গান তার জানা, সুর, গায়কি সমেত। আব্বাসউদ্দিনের প্রথম সন্তান শুধু নন, তাঁর সমগ্র কৃতিত্বের প্রধান উত্তরাধিকার। গান করেননি কারণ তাঁর দাদাজির পেশায় জীবন উৎসর্গ করেছেন, কিন্তু আব্বাসউদ্দিনের গানগুলো যদি তাঁর কণ্ঠে শোনা যেত, তা হলে পাওয়া যেত আরেক আব্বাসউদ্দিন।
টেলিভিশন
ঢাকায় যখন টেলিভিশন এলো তখন সেখানে আমন্ত্রণ এলো আমাদের তিনজনেরই, অর্থাৎ ফেরদৌসী ও আমি সঙ্গীতে আর আমার ভাই একটি কুইজ প্রোগ্রামে। সেটি এত জনপ্রিয় ছিল যে, বলার নয়। পরে আমার ভাই বুঝতে পারলেন যে, তাকে শনাক্ত করা হচ্ছে ‘টিভি কামাল’ বা ‘কুইজ কামাল’ হিসেবে, কামাল হোসেনকে করা হচ্ছে ব্যারিস্টার কামাল হিসেবে এবং কামালউদ্দিন হোসেনকে শনাক্ত করা হচ্ছে সেকুলার কামাল হিসেবে। আমার ভাই টেলিভিশন ছেড়ে দিলেন।
আমার লেখা
তিনি আমার লেখা নিয়ে ছিলেন উচ্ছ¡সিত, আমাকে যা যোগাতো অপরিমিত উৎসাহ। তিনি বলতেন, তুলু এত কিছু লেখার সময় পেল কোথায়? ডক্টর আনোয়ার দিল, বিশিষ্ট স্কলার যিনি আমাদের পরিবার সম্পর্কে বিশদ গ্রন্থ রচনা করেছেন, তার কাছে গেলে তিনি বলেন, তুলু আমার কাছে একটি বিস্ময়। তার এই মন্তব্য শুনে আমার চোখে আনন্দের অশ্রæ। এর চেয়ে ভালো সম্মান আমি কারো কাছে পাইনি এবং পাব না। কিছু লিখলে তাকে দু-এক কপি পাঠাই। এর মধ্যে একটি গ্রন্থ কয়েক বছর ধরে লিখি, প্রভু সম্পর্কে ইংরেজিতে। প্রকাশক বললেন, এদেশে ইংরেজি পড়ার মানুষের অভাব, বাংলায় লিখুন। আবার বাংলায় লিখলাম, নাম দিলাম : ‘যে নামেই ডাকি’। উৎসর্গ : আমার ভাইকে। ততদিনে তার চোখের অসুখ বেড়ে গেছে। সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে দাওয়াত পাই যেখানে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা আমার গানের প্রধান শ্রোতা। তারা একটার পর একটা আমার গান শুনতে উৎসাহী। এ কথা যখন আমার ভাইকে বললাম, তিনি উচ্ছ¡সিত হয়ে উঠলেন। যখনই আমার গান থাকে টেলিভিশনে তাকে একটা এসএমএস পাঠাই। আজকাল অসংখ্য চ্যানেল হওয়াতে আমাদের গানের শ্রোতা কমে এসেছে বিধায় এই ব্যবস্থা।
পরিহাসপ্রিয়তা
এবার বলি তার পরিহাসপ্রিয়তার কথা। এটির সঙ্গে পরিচয় শুধু তাদেরই যারা তার নিবিড় বন্ধু। একজনের নাম তরিকুল ইসলাম, কবি সাংবাদিক। দু’জনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একসাথে। মাঝে মধ্যে তরিকুল ভাই নিজেই রয়ে যেতেন আমাদের বাসায়। সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, নামকরা ছাত্র ও পরে নামকরা অ্যাডভোকেট। দু’জন দু’জনকে ভালোবাসতেন ও রহস্যপ্রিয়তায় মশগুল হতেন। তার স্ত্রী সুফিয়া আহমেদও তার বন্ধু ছিলেন। এরা তুরস্কে গিয়েছিলেন পাকিস্তান প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে, সেই তালিকায় ছিলেন আরো অনেকে, যার মধ্যে নামকরা গায়িকা লায়লা আর্জুমান্দ বানু অন্তর্ভুক্ত। বিশ বছর ছিলেন ওকালতিতে, সেখানে তার প্রচুর বন্ধু-বান্ধব, যারা এসে তার সঙ্গে কাজ ছাড়াও গল্পে মশগুল ছিলেন। এরপর দশ বছর হাইকোর্ট ডিভিশনের বিচারপতি। অনেক বিচারপতি তার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। তিনিও যেতেন। এরপর সাত বছর আপিল ডিভিশনের বিচারপতি ও পরে প্রধান বিচারপতি। বিচারপতি হওয়ার পর বাইরের জগৎ থেকে তিনি নিজকে গুটিয়ে নেন। তার ছিল বিরাট লাইব্রেরি যেখানে শুধু আইনের বই নয়, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থগুলো তিনি সংগ্রহ করেছিলেন নিজ জীবনকে সমৃদ্ধ করতে।
তার একটি সুন্দর রেকর্ড প্লেয়ার আছে, যেখানে দেশ-বিদেশের শ্রেষ্ঠ গানগুলো তিনি নিজেই বাজিয়ে শোনেন। ‘হিজ মাস্টার ভয়েস’ কোম্পানি থেকে আমার অ্যালবামটি বেরুলে তিনি অনেককে বাজিয়ে শোনান এবং বলেন তুলুর গলাটা সেদিন খুব ভালো ছিল। কাউকে অহেতুক প্রশংসা করা থেকে তিনি বিরত থাকতেন। নাশিদ কামালের প্রায় পনেরটি সিডি বেরিয়েছে। সবগুলো সাজান রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় উঁকি দেয় আমার বোনের গাওয়া সিডিগুলো, আমার মেয়ে সামিরার গাওয়া সিডিগুলো ও সর্বশেষ তার নাতনী আরমীন মুসার সিডিগুলো। এগুলো তার জীবনে এনে দেয় আনন্দের হারানো মণিকা।
গ্রাম থেকে বিশেষ করে কুচবিহার বা ডোমার থেকে কেউ এলে তিনি ভীষণ খুশি হতেন। অনেক ক্ষেত্রে নিজের জামা-কাপড় থেকে শুরু করে বই-পত্র দিয়ে দিতেন এবং সম্ভাব্য ক্ষেত্রে দেশী কথায় জড়িয়ে যেতেন পরিহাসপ্রিয়তায়। এদের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। যারা এখনো বেঁচে আছেন তাদের সঙ্গে দেশী কথায় অনেক রগড় করেন।
একদিন এক ভদ্রলোক তার একটা মামলা নিয়ে আমার কাছে এলেন। বললেন, আপনার ভাইকে আপনি একটু বলতে পারবেন? আমি বললাম। এ আর এমন কি? কানের কাছে ফিসফিস করে বললাম, ভাই, কিছু মনে করবেন না, ফলটি হবে উল্টো। উনি বুঝতে পারবেন যে তার ভাইয়ের মাধ্যমে আপনি তার রায়কে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন। এখন বলুন, ভাইকে বলব কি না? ভদ্রলোক চিন্তায় পড়লেন এবং বললেন : না থাক, বলে কাজ নেই। তিনি নিয়ে এসেছিলেন রাজশাহী থেকে কয়েকটি আম। বললাম, ভাই আমটিও নিয়ে যান। এটি কেউ খাবে না।
কোনো মামলা নিয়ে তিনি কোনোদিন আমার সঙ্গে আলাপ করেছেন বলে মনে পড়ে না। অনেক রাতে নিদ্রাহীন পায়চারি করেছেন, সম্ভবত কোনো খুনের মামলায় কাউকে ফাঁসি দিতে হবে অথবা কাউকে ছেড়ে দিতে হবে। এ নিয়ে ছিল তার নিদ্রাহীনতা। কিন্তু পরিবারের কারো সঙ্গে এ নিয়ে বিন্দুমাত্র আলোচনা করেননি।
মিলাদ
ভাই খুব ভালো মিলাদ পড়তে পারেন, কিন্তু কেউ অনুরোধ করলে ফলাফল সবসময় ভালো হয় না। আমরা দু’ভাই প্রতি বছর তিরিশে ডিসেম্বর ও এগারোই মার্চ বাবা ও মা’র মৃত্যুদিবসে আজিমপুর গোরস্থানে সকাল আটটার সময় গিয়ে হাজির হই। কুরআন খতমের পর ভাইকে অনুরোধ করি দোয়া পরিচালনা করতে। তার দোয়া এত সুন্দর যে, সহজেই পানি এসে আশ্রয় নেয় আমার চোখের কোণে। আবার কখনো তিনি আমাকে অনুরোধ করেন দোয়া পড়তে। আমি ছোট ভাই, চিরদিনের ছোট। অকারণে কাঁদতে থাকি, দোয়া করি বাবা-মা’র জন্য, ভাই-ভাবীর জন্য, সবার ছেলেমেয়েদের জন্য, সবার নাতি-নাতনীদের জন্যে, বন্ধু-বান্ধবের জন্য, দেশের জন্যে, রসুল [সা:]-এর জন্য। আমার চোখের পানি সৃষ্টি করে নবতরঙ্গে আমার ভ্রাতার চোখে।
গানের আসর
একদিন ছোট মেয়ের বাসায় গানের আসর। প্রধান শিল্পী : নাশিদ কামাল ও শারমিনী আব্বাসী। এরপর অনুরোধ এলো আমার গান গাওয়ার। শচীনদেব বর্মণের একটি গান শুরু করলাম : ‘তুমি যে গিয়াছ বকুল বিছান পথে’, ভাই স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে কণ্ঠ মেলালেন। আসর চলল প্রায় এক ঘণ্টা, সবগুলো ওর গাওয়া, হারমোনিয়াম বাজিয়েছিলাম। ‘গোধূলীর ছায়াপথে, যে গেল ফিরিল প্রাতে’ গানটি আমার বিশেষ পছন্দ, দেখলাম এতদিন পরেও গানটি তার স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়নি। কণ্ঠ সাবলীল, উপরে নিচে খেলে, কণ্ঠের ছোট কাজগুলো এখনো অমলিন এবং এর মধ্যে উপস্থিত থাকে গানের মূল আবেদনটি, যেটি উপলব্ধি করা সহজ নয়।
ভাই একজন যোদ্ধা, কিভাবে রোগ কব্জায় আনা যায়, তার মন্ত্রটি সঠিকভাবে উপলব্ধি করেন। ডাক্তারের সঙ্গে অল্প কথা বলার পর রোগ সম্পর্কে অধ্যয়ন করার সুযোগ গ্রহণ করেন ইন্টারনেটে। চিকিৎসক হন হতবাক। যা খেতে বলা হয় সঠিক চামচ মাপ পরিচারিকাকে সরবরাহ করেন। এরপর তার বøাড প্রোফাইল প্রস্তুত করা হলে চিকিৎসক অবাক। ভাই তৃপ্তির হাসি হেসে বলেন : যেমনটি বলেছিলেন, তেমনটি মেপে মেপে খেয়েছি। জিভের তৃপ্তি নয়, সুস্থতার পানে ধাবিত হয়েছি। এভাবে তিনি তার দেহভ্যন্তরস্থ কয়েকটি রোগকে অনায়াসেই কাবু করে ফেলতেন। টেলিভিশনে তার কয়েকটি ‘ইন্টারভিউ’ প্রচারিত হলে তাকে রোগাক্রান্ত মনে হয়নি।
টুকরো স্মৃতির কথা। হতাম যদি তার জীবনী লেখক, এই লেখা হতো দীর্ঘ। অনেকের ভালো লাগত, কেননা তার জীবনের প্রতি মোড়ে ভ্রাতা উপস্থিত। সেই যে প্রশস্থ কুচবিহার জেনকিন্স স্কুল, তার প্রতিটি ক্লাসরুম আমি চিনি, কিভাবে সেই বালক ধীরে ধীরে মেলে ধরলেন তার মেধাবী অস্তিত্ব। কলকাতায়, ঢাকায় কিভাবে তিনি হলেন বেস্ট ডিবেটর, বেস্ট অরেটর, বেস্ট স্টুডেন্ট, সারা জীবনের কাহিনী আমার সামনে বায়োস্কোপের ছবির মতো খেলে যাচ্ছে। কোনোটাই ঝাপসা হয়ে যায়নি। দীর্ঘদিন অসুখে কষ্ট পেয়েছেন, সেখানে আমি ছিলাম। এমনকি যেখানে আমি উপস্থিত নই, তারও ছবি গেঁথেছি বৈকি। ‘পুড়িব একাকী’ গ্রন্থে এই খেলা অনেকে প্রত্যক্ষ করেছেন।
গণতন্ত্র ও আইনের শাসন
গণতন্ত্র ও আইনের শাসন নিয়ে তার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা হয়েছে। শুধু তিনি আর আমি। এ নিয়ে আমি দীর্ঘ প্রবন্ধ রচনা করতে পারব। তিনি বলতেন :
১. রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে ‘পূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা না হলে অন্য ক্ষেত্রগুলোও অগণতান্ত্রিকতার সংক্রমণে অসুস্থ হতে বাধ্য। রাষ্ট্রপথপ্রদর্শক, রাষ্ট্র বেপথু হলে জনজীবনে সকল ক্ষেত্র দিক ও নির্দেশনার অভাবে পঙ্গু হয়ে পড়ে’।
২. ‘গণতান্ত্রিক পরিবেশ চালু থাকলে তখন আর ব্যক্তি, গোষ্ঠী, গ্রæপ বা কোটারি কথা বলে না, কথা বলে আইন। যাদের মনে বিন্দুমাত্র এই অস্পষ্ট ধারণা আছে যে আইনের শাসন কথাটি কেবল আইনজীবী ও আদালতের ব্যাপার, তারা বুঝতে শিখুন কেউ তার দায়িত্ব এড়াতে পারবেন না। সরকার সর্বাধিক মামলা জড়িত থাকা সত্তে¡ও আইনের দৃষ্টিতে সরকারের কোনো বিশেষ সুবিধা নেই। পছন্দ ও অপছন্দ, ব্যক্তিগত দর্শন- সবকিছু চাপা পড়ত আইনের ভারে। বিচার চলবে আইনের নির্ধারিত সড়ক ধরে, কোনো আল পথ বাঁকা পথ সৃষ্টি করতে পারবে না’।
৩. ‘দেশে শিক্ষামানের ক্রমাবনতির সাথে সাথে আইন শিক্ষার মানেরও অবনতি ঘটেছে’।
৪. ‘আদালত শ্রমবিমুখ, কর্মবিমুখ, জ্ঞানবিমুখ হওয়ার অর্থ হলো জাতির আত্মহত্যা। বহু ক্ষেত্রে ফাঁকি চলে, আইনের কাছে ফাঁকি চলে না। এখানে কোনো শর্টকাট নেই, না আইনজীবীর ক্ষেত্রে, না আদালতের ক্ষেত্রে’।
তার দর্শন ছিল প্রাসঙ্গিক জীবন থেকে। তিনি লিখছেন:
আব্বা তাকে নিয়ে অনেক উঁচু আশা করতেন। বলতেন, আমার ছেলে আমার নাম রাখবে, সে হবে বাংলাদেশের আইনের জগতে সবচেয়ে উজ্জ্বল ব্যক্তি, শুধু তার কীর্তিতে নয়, প্রভুর প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পণে, রসুল [সা:]-এর প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্যে, সত্যের পথে অবিচল নিষ্ঠায়, মানবতার প্রতি আন্তরিক আবেগে। পিতার সে আশা কি রক্ষিত হয়নি?
প্রতিদিন তার কেটে যেত তাসবিহ্ তাহ্লিলে, নাতি-নাতনী ও কন্যাদের ভালোবাসার মাহ্ফিলে। পরিপূর্ণ ছিল তার জীবন, আনন্দে বিরহে সংগীতে সাহিত্যে দেশের প্রতি ভালোবাসায় উজ্জ্বল। আজ তিনি শুধু স্মৃতি। পরের সংখ্যায় আরও লিখব।
লেখক : সাহিত্য-সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ