Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫, ১৫ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

মা-বাবাকে বাঁচাতে না পেরে তিন বাংলাদেশি বেছে নিয়েছিলেন স্বেচ্ছামৃত্যু!

গ্রেনফেল টাওয়ার অগ্নিকান্ড

| প্রকাশের সময় : ২৪ জুন, ২০১৭, ১২:০০ এএম


ইনকিলাব ডেস্ক : বাবা-মা’কে আগুনে ফেলে রেখে গ্রেনফেল টাওয়ার থেকে বের হয়ে আসতে চাননি তাদের নিহত তিন সন্তান। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েও নিজেদের জন্মসূত্র অস্বীকার করতে পারেননি তারা। বৃদ্ধ বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে ভবন থেকে নেমে আসার মতো সময় ছিল না; তাই ভবনেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তারা একরকম স্বেচ্ছামৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছিলেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমসের যুক্তরাজ্য সংস্করণ এই খবর দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যে বিবেক আর মনুষ্যত্বের এই অনন্য নজির স্থাপন করেছেন গ্রেনফেলে নিহত বাংলাদেশি পরিবারের তিন সন্তান।
১৪ জুন সংঘটিত ওই অগ্নিকান্ডে নিখোঁজ তালিকায় থাকা নিহতদের মধ্যে রয়েছে এক বাংলাদেশি পরিবার। বাবা কমরু মিয়া (৮২), মা রাজিয়া বেগম (৬০) আর দুই ছেলে আবদুল হামিদ (২৯) ও আবদুল হানিফ (২৬) এবং কন্যা হুসনা বেগম ছিলেন ওই পরিবারে। কমরু মিয়ার পৈত্রিক নিবাস মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আকাইলকুড়া ইউনিয়নের কৈশাউড়া গ্রামে।
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার দিন রাত ৩টা ১০ মিনিটে এক খালাকে ফোন করে শেষ বিদায় জানান ওই পরিবারের তিন সন্তান। তাকে জানান, অসুস্থ বাবা-মাকে আঠার তলা থেকে নামানো সম্ভব না। তাই নিজেদের পক্ষে সুযোগ থাকা সত্তে¡ও তারা নেমে যাননি।
হামিদ, হানিফ আর হুসনার খালা বিজনেস টাইমসকে বলেন, ‘টাওয়ারে আগুন লাগার পর এক ঘণ্টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ভবন থেকে বেরিয়ে আসতে পারত তিন ভাই-বোন। রাত ১টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত তাদের বেরিয়ে আসার সুযোগ ছিল। কিন্তু এই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে মা-বাবাকে মৃত্যুমুখে রেখে নিজেরা বাঁচতে চায়নি তারা। বরং একসঙ্গে মৃত্যুবরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে’।
নিহত ভাই-বোনদের চাচাতো ভাই সামির আহমাদ বিজনেস টাইমসকে পরিবারের ছোট ছেলে সম্পর্কে বলেন, ‘হানিফ খুবই শান্ত প্রকৃতির ছিল। টেলিফোনে বলছিলো, তার সময় চলে এসেছে। তাদের জন্য যেন শোক বা বিলাপ করা না হয়। বরং অন্যরা যেন খুশি হন, কারণ তারা একটি অধিকতর ভালো জায়গায় যাচ্ছেন।’ সামির জানান, তাদের বাবা খুব ভালোভাবে হাঁটাচলা করতে পারতেন না।
শূন্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন সামির, ‘কী করার ছিল ওদের? নিজেদের বাবা মার কথা না ভাবা?’ নিহত ভাইবোনদের সম্পর্কে তার মন্তব্য, ‘ওরা ভীরু ছিল না। মা-বাবার সঙ্গেই থেকেছে। তাদের কাছে পরিবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তারা একসঙ্গে থাকত, একসঙ্গেই মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছে।’
ঠিক করে রাখা হয়েছিল নিহত কমরু মিয়ার কন্যা হুসনা বেগমের বিয়ের দিনক্ষণ। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে লিচেস্টারে তার যৌথ জীবন শুরুর কথা ছিল। সামির আহমাদ জানান, এ মর্মান্তিক ঘটনায় হুসনা বেগমের হবু বর ‘পাগলের মতো’ হয়ে গেছেন। তিনি হাসপাতালগুলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, ঘরে ফিরতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন।
হট পয়েন্টের ফ্রিজ থেকেই গ্রেনফেলে আগুনের সূত্রপাত : লন্ডন পুলিশ
মার্কিন ও ইউরোপীয় ব্র্যান্ড হট পয়েন্ট-এর একটি ত্রুটিপূর্ণ ফ্রিজ থেকেই গ্রেনফেল টাওয়ারে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে নিশ্চিত করেছে লন্ডন পুলিশ। এছাড়া টাওয়ারে আগুন ছড়ানোর জন্য দায়ী বলে বিবেচিত বিতর্কিত ক্ল্যাডিং এবং ইনসুলেশন এর নিরাপত্তা পরীক্ষা করাতেও কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে বলে জানানো হয়। বলা হয়, এ ঘটনায় পুলিশ হত্যার অভিযোগ দায়েরের কথা ভাবছে।
গত ১৪ জুন রাত ১টা ১৫ মিনিটের দিকে পশ্চিম লন্ডনের গ্রেনফেল টাওয়ারে আগুন লাগে। নিখোঁজদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ছেড়ে দিয়ে এ ঘটনায় অন্তত ৭৯ জনের প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ত্রুটিপূর্ণ একটি ফ্রিজ থেকে যে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে তা প্রাথমিকভাবেই ধারণা করা হয়েছিল।
তবে গতকাল পুলিশের ডিটেকটিভ সুপারিনটেনডেন্ট ফিওনা ম্যাককরমাক জানান, ত্রুটিপূর্ণ ওই ফ্রিজটি হটপয়েন্টের তৈরি এবং সরকারের পক্ষ থেকে এরইমধ্যে ওই কোম্পানির ফ্রিজগুলো পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এফএফ১৭৫বিপি মডেলের ফ্রিজটি আগে কখনও ঝুঁকিপূর্ণ বলে শনাক্ত হয়নি।
ফিওনা বলেন, গ্রেনফেল টাওয়ার থেকে ইনসুলেশনের যে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল সেগুলো দিয়ে নিরাপত্তা পরীক্ষা শুরু করার পর পরই তা বিস্ফোরিত হয়। তিনি জানান, ক্ল্যাডিং এর চেয়েও অনেক বেশি দাহ্য ছিল ওই ইনসুলেশন। এখন এসব উপকরণগুলোর ব্যবহার যুক্তরাজ্যে নিষিদ্ধ কিনা তা নিয়ে তদন্ত চলছে বলে জানান ফিওনা। গ্রেনফেল টাওয়ারের সব ক্ষতিগ্রস্তের কথা শুনতে চান তিনি।
‘এ ট্র্যাজেডির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কেউ যেন অজানা না থেকে যান তাই আমি চাই। গ্রেনফেল টাওয়ারে কারা ছিলেন সেটা জানাই আমাদের প্রাধান্যের বিষয়। গ্রেনফেল টাওয়ারে মানুষের থাকার কারণ জানতে আমরা আগ্রহী নই।’ বলেন ফিওনা।
তিনি জানান, হত্যাকান্ডের সম্ভাব্যতা মাথায় রেখে অপরাধের তদন্ত চলছে। অগ্নি নিরাপত্তার পাশাপাশি ভবন ও এর সংস্কার কাজে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি কোম্পানিকে নিয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর