Inqilab Logo

ঢাকা বুধবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২১, ১৩ মাঘ ১৪২৭, ১৩ জামাদিউস সানী ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলার ঘোষণা অর্থমন্ত্রীর

প্রকাশের সময় : ৯ মার্চ, ২০১৬, ১২:০০ এএম

হাসান সোহেল : যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে হ্যাকড হওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮শ’ কোটি টাকা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে দু’দেশের সংশ্লিষ্ট শাখা। কোন ব্যাংক থেকে এই টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে, তা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো মন্তব্য না করলেও অর্থমন্ত্রী টাকা ফেরত আনতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা জানিয়েছেন। অপরদিকে গতকাল (মঙ্গলবার) ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেছেন, এ ধরনের হ্যাকিংয়ের ঘটনাই ঘটেনি। এছাড়া হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া এই চক্রের সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জড়িত থাকার সন্দেহ করা হচ্ছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার পাসপোর্ট জব্দ করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে বেশ কিছু কর্মকর্তার ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে, গত মাসের মাঝামাঝিতে ফেডারেল রিজার্ভ থেকে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮শ’ কোটি টাকা খোয়া যাওয়া এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি দল ফিলিপাইনে এ বিষয়ে তদন্তে গেলেও গত সোমবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিষয়টি জানেন না বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। এ নিয়ে সর্বমহলে প্রশ্নের দেখা দিয়েছে। হ্যাকিংয়ের ঘটনা এবং পরিদর্শক দলের তদন্তের বিষয়টি অর্থমন্ত্রীকে জানানো হয়নি বলেও অনেকে মনে করছেন। তারা মনে করেন, এত বড় একটি ঘটনা যা সবার আগে অর্থমন্ত্রীকেই জানানো উচিত ছিল। এছাড়া এই ঘটনার সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তার যোগসাজশ থাকতে পারে এবং তাদের আড়াল করতেই অর্থমন্ত্রীর কাছে এই তথ্য গোপন করা হয়েছে।
ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বিরুদ্ধে অর্থমন্ত্রীর মামলার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা ইনকিলাবকে বলেন, এ ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়ে আমরা এখনো কোনো ব্যাংকের নাম বলিনি। তাই মামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়। এছাড়া কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার বিষয়ে তিনি জানেন না বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে টাকা ফেরত আনা এবং এ বিষয়ে সার্বিক তথ্য নিশ্চিতে বিশ্বব্যাংকে কাজ করেছে, এমন সাইবার পরামর্শক দল এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি বিশেষজ্ঞ দল কাজ করছে বলে উল্লেখ করেন শুভঙ্কর সাহা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রমতে, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে হ্যাকড হওয়া টাকার সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের যোগসাজশের বিষয়ে কিছু কর্মকর্তাকে সন্দেহ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু কর্মকর্তার পাসপোর্টও জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু কর্মকর্তারা যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে সেজন্য তাদের পৃথক নজড়দারি করছে বলে জানা গেছে। গতকাল হ্যাংকিয়ের ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে ওইসব কর্মকর্তাদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। তবে, কত জনের পাসপোর্ট আটক করা হয়েছে তা জানা জায়নি। সূত্র জানায়, যাদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে তাদের মধ্যে অধিকাংশই বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টে কর্মরত।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রমতে, হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় দশ কোটি ডলার হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। অবশ্য বাংলাদেশের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্রকে উদ্ধৃত করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং ব্লুমবার্গকে তারা এ খবর দিয়েছে। তাদের মতে, ফেডারেল রিজার্ভের ব্যবস্থায় হ্যাকিংয়ের কোনো প্রমাণ নেই। তবে রয়টার্স লিখেছে, বাংলাদেশে ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলা হয়েছে কিনা Ñ গোপনীয়তার যুক্তিতে সে ব্যাপারে মুখ খুলতে অস্বীকার করেছে ফেডারেল রিজার্ভ। উল্লেখ্য, বিশ্বের প্রায় ২৫০টির মতো দেশের সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভে টাকা জমা রাখে।
গত সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের এক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে হাতিয়ে নেয়া বিপুল পরিমান অর্থের একাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে ফেডারেল রিজার্ভের এই অস্বীকৃতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। যদিও ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে বিষয়টি তারা পর্যালোচনা করছেন।
এই অর্থের পরিমাণ সম্পর্কে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানালেও কর্মকর্তারা বিবিসিকে জানিয়েছেন, বেহাত হওয়া অর্থের মোট পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, চুরি যাওয়া অর্থ ফিলিপাইনে রয়েছে। ওই অর্থের একটি অংশ আদায় করা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বাকি অর্থের গন্তব্য শনাক্ত করে তা আদায়ের বিষয়ে বাংলাদেশের ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ফিলিপাইনের অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছে। কত পরিমাণ অর্থ ফেরত আনা হয়েছে, বিজ্ঞপ্তিতে তা উল্লেখ করা না হলেও কর্মকর্তারা বলছেন, বেহাত হওয়া অর্থের এক-চতুর্থাংশের মতো আদায় হয়েছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ বর্তমানে ২৮০০ কোটি ডলারের মতো। জানা  গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ নগদ আকারে বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা হয়। বাকি অংশ বন্ড, স্বর্ণ ও অন্যান্য মুদ্রায় বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা হয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে হ্যাকড হওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা ফেরত আনতে মামলা করার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এটা ফেডারেল রিজার্ভের, যারা এটা সেখানে হ্যান্ডেল করেন, তাদের কোনো গোলমাল হয়েছে। ফেডারেল রিজার্ভ কোনোমতেই তাদের দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারবে না। এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোন দোষ নেই।
এ বিষয়ে সরকার কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, অফ কোর্স। আমরা ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করবো। তাদের কাছে টাকা রাখছি, তারাই এই জন্য দায়ী।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি ঊর্ধ্বতন সূত্র জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে বিপুল এ অর্থ চুরির সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কেউ জড়িত থাকতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের বিনিয়োগ যেভাবে সংরক্ষিত হয়, তাতে ভেতরের কারও সহযোগিতা ছাড়া হ্যাক করে অর্থ চুরি করা খুবই জটিল। বিষয়টি নিয়ে এখন বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ছাড়া দাপ্তরিক কাজে তথ্যপ্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার ও অনলাইন কার্যক্রমের বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার সতর্কতামূলক একটি অফিস আদেশও জারি করা হয়েছে।  
অপরদিকে টাকা হ্যাকড হওয়ার ঘটনা সম্পর্কে জানা যায়, সেদিন ছিল বন্ধের দিন। রাত ৮টা থেকে ৩টা পর্যন্ত সময়সীমা। এ সময়ে ১০ কোটি ডলার বা ৮০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে হ্যাকাররা। চক্রটি প্রথমে পাসওয়ার্ড হ্যাক করে। পরে আন্তর্জাতিক লেনদেনের নিয়ম অনুসরণের মধ্য দিয়ে জালিয়াতির কাজ সম্পন্ন করে। একপ্রকার বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মতিতে টাকাগুলো নিয়ে যায়। অবশ্য তখনও বাংলাদেশ ব্যাংক বুঝতে পারেনি আসল ঘটনা। বাংলাদেশ ব্যাংক বিশ্বের বিভিন্ন  কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে যেভাবে লেনদেন করে সেভাবে লেনদেন হয়েছে। প্রথমে টাকার পরিমাণ চেয়ে একটি আবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগে জমা হয়। আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রাক্কালে যেভাবে আবেদন করা হয় এ আবেদনটিও ছিল অনুরূপ। যে কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক টের পায়নি। নির্ধারিত হিসাবে টাকা চলে যায় এবং নির্ধারিত সময় শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকও বুঝতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে দুই কর্মকর্তাকে পাঠানো হয় তিন দিনের জন্য। কিন্তু তারা টাকার  কোনো হদিস পাননি। সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা ১০ থেকে ১২ দিন পর খালি হাতে ফেরেন। তাদের কথায় টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো আশার বাণীও পাওয়া যায়নি। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দাবি করছে- খোয়া যাওয়া ৮০০ কোটি টাকা ফেরত পাওয়া সম্ভব। ইতিমধ্যে কিছু টাকা ফেরত এসেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ফিলিপাইন-ফেরত দুই কর্মকর্তার দেয়া তথ্যে ৮০০ কোটি টাকা ফেরত পাওয়ার লক্ষণ ক্ষীণ। তবুও চেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি ফিলিপাইন সরকার তাদের অর্থ বাজারে ৮০০ কোটি টাকা বেশি পায়। অর্থের উৎস খুঁজতে গিয়ে জানতে পারে এ পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশ থেকে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দেশটির একটি পত্রিকায় এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পরে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থের উৎস ও কিভাবে সরানো হয়েছে তা নিয়ে তদন্ত করে। দুই জন ব্যাংকারকে পাঠানো হয় ফিলিপাইনে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন তারা। কোন পদ্ধতিতে টাকা সরানো হয়েছে তা নিয়ে চলছে অনুসন্ধান। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক গত সোমবার বলেছে, কিছু টাকা হ্যাক হয়েছে। তার একাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি টাকার গন্তব্য সনাক্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক সক্রিয় রয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়ে দেশে এবং দেশের বাইরে তদন্তলব্ধ তথ্যাদি অপ্রকাশিত রাখা হচ্ছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলার ঘোষণা অর্থমন্ত্রীর
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ