Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২২ নভেম্বর ২০১৭, ০৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী

অবক্ষয়ের প্রসারে দুর্নীতির বিস্তার

| প্রকাশের সময় : ৯ জুলাই, ২০১৭, ১২:০০ এএম

আফতাব চৌধুরী : দুর্নীতি দমন কমিশন সুনামগঞ্জের হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে বিভাগীয় কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের মধ্যে ৬১ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছে। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করার অভিযোগ আনয়ন করা হয়েছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বরখাস্তকৃত নির্বাহী প্রকৌশলী আফসার উদ্দিনকে প্রধান আসামি করে দায়েরকৃত মামলায় অন্যান্যদের মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিলেট অঞ্চলের সাবেক তত্ত¡াবধায়ক প্রকৌশলী, সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত উপবিভাগীয় প্রকৌশলীসহ ১৫ জন সরকারি কর্মকর্তা ও ৪৬টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ রয়েছে।
দুদকের দায়ের করা এ মামলা দুদক আইনে করা হয়েছে বলে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। হাওর ও বাঁধ নির্মাণের নামে লুটপাটের অভিযোগ তদন্তের আগে হাওর পরিদর্শন করেছেন দুদকের প্রতিনিধিগণ। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক ২৩০টি প্রকল্পের অধীনে প্রায় ৮০ কি.মি. ফসল রক্ষা বাঁধের নির্মাণ, সংস্কারে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। পাশাপাশি দরপত্রের মাধ্যমে আরো প্রায় ৩০০ কি.মি. বাঁধ নির্মাণে ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদার ও পিআইসির অবহেলা-অনিয়মের ফলে সুনামগঞ্জের ৪৭টি হাওরের সবক’টি বাঁধ ভেঙে হাওরের ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এতে ক্ষতি হয় শত শত কোটি টাকা। দুর্দিনের সম্মুখীন হতে হয় লক্ষ লক্ষ মানুষকে যাদের বেশীর ভাগই কৃষক ও দরিদ্র পরিবারের মানুষ।
গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ শুরু করে ২৮ ফেব্রæয়ারি শেষ হওয়ার কথা ছিল। সময় মতো কাজ না হওয়ায় বৃষ্টির পানি ও পাহাড়ি ঢলে ভেঙে বাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে হাওরের ফসল তলিয়ে যায়। সর্বশেষ প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, বরখাস্তকৃত নির্বাহী প্রকৌশলী ও ঠিকাদার বাচ্চু মিয়াকে ঢাকার মতিঝিল এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
আসলে দুর্নীতি একটি কঠিন সামাজিক ব্যাধি। দেশবাসীর মুনষ্যত্ববোধ পুনরুজ্জীবিত না হলে কঠোর আইন করে দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করা যাবে না। অর্থাৎ সুফল কিছুই পাওয়া যাবে না। কেননা, আইন মানুষের দ্বারাই প্রণয়ন ও কার্যকর করতে হবে। দেশে এখন ব্যবহারিক জীবনে আইন কার্যকর করার মতো সৎ মানুষের বড়ই অভাব। যে দেশের সমাজে রন্ধ্রে রন্ধ্রে, পরতে পরতে দুর্নীতি ক্যান্সারের মতো ছেয়ে গেছে, সেখানে কেবল কঠোর-কঠিন আইন প্রণয়ন করে দিলেই দুর্নীতি দূর হবে, এটা আশা করা যায় না। কারণ, আইনের রক্ষকই যেখানে ব্যক্তিস্বার্থে ভক্ষক, সেখানে সুফল আশা করা শুধু বৃথা। আর আইনের রক্ষকরা যদি ভক্ষক না হতেন, তাহলে দেশজুড়ে প্রচলিত আইনসমূহের এরূপ করুণ পরিণতি হতো না। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে বা তা নির্মূল করতে দেশের প্রচলিত আইনসমূহের জোরই বা কম ছিল কিসে? কেবল প্রশাসনিক সদ্ব্যবহারের অভাবেই এগুলো গুরুত্বহীন হয়েছে, তা বোধকরি কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না। এক কথায় দেশের অধিকাংশ মানুষই আজ মনুষ্যত্বের অবক্ষয় ঘটিয়ে দুর্নীতির করাল গ্রাসে গা ভাসিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে, সেখানে ব্যবহারিক জীবনে আইন কার্যকর করার মতো সৎ মানুষের বাস্তবিকই অভাব রয়েছে।
দুর্নীতি নির্মূল করার মাধ্যমে দেশ গড়তে হলে প্রথমত মূল্যবোধযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের দুর্নীতি না করার জন্য শিক্ষা দিতে হবে। তৃতীয়ত, প্রত্যেককেই লোভ সামলাতে হবে। এভাবে এই তিনটি সূত্র প্রয়োগের মাধ্যমে ও শক্তিশালী আইন প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি মহান দেশ হিসেবে গড়ে তোলা যাবে।
সৃষ্টির আদিকালে মানুষ ছিল অরণ্যচারী। মানুষ আগুন জ্বালাতে জানত না, কাপড় বুনতেও জানত না। প্রয়োজনও বোধ করত না। বনের ফলমূল, কাঁচা মাছ-মাংস ইত্যাদি ভক্ষণ করত, উলঙ্গ থাকত। পশুর মতোই ছিল তাদের আচরণ। এতে স্থান, কাল ও পাত্রে কোনও ভেদাভেদ ছিল না। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ মানুষকে বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তির খোরাক দিয়েছেন। পশুকে তা দেননি। আজও পশুরা তাদের পশুত্ব ত্যাগ করেনি। কিন্তু মানুষ প্রকৃতি প্রদত্ত বুদ্ধি, চিন্তাশক্তি ও মনুষ্যত্বের অবক্ষয় ঘটাচ্ছে দ্রুতবেগে। মানুষে ও পশুতে আজ পার্থক্যটা ঠিক এখানেই। সোজা কথায়, পশু আজও তার ঠিক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছে, মানুষ তার মনুষ্যত্ব থেকে সরে গিয়েছে। সরে যাচ্ছে। এ সম্পর্কে নিন্মে দু’চারটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করছি।
প্রকৃতিপ্রদত্ত বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তির জোরে মানুষ চিন্তাশক্তির অনুশীলন করে একদিন সোপান নির্মাণ করে ফেলল। যদিও বস্ত্র বোনার কৌশল আয়ত্ত করতে মানুষের আরও বহু বছর ব্যয় হয়ে গেল। তবুও কী করে শীত-তাপের প্রকোপ থেকে শরীরকে বাঁচিয়ে রাখা যায়, তার উপায় বের করে ফেলল। গাছের ছাল ও লতাপাতায় মানুষ তার দেহের আবরণ তৈরি করে নিল। এ ব্যাপারে যে কেবল শীততাপের প্রকোপই তাকে এ বিষয়ে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল তা-ই নয়, দেহের কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও আচ্ছাদিত করে ফেলার তাগিদেও মনের কোণে বাসা বেঁধে ফেলেছিল। মানুষ সাজতে শিখেছে মূলত প্রকৃতিকে দেখেই। মানবদেহের দৃষ্টিকটু অংশসমূহ আবৃত করে ফেলা এবং গো-মহিষাদির মতো পাত্র-পাত্রী বিচার না করে যত্রতত্র সহবাসে লিপ্ত না হওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করে মানুষ সভ্যতার উন্নততর সোপান গড়ে তুলল। অবশ্য এই পর্যায়ে উন্নীত হতে মানুষের আরও বহু হাজার বছর ব্যয় হয়ে গিয়েছে।
সৃষ্টির আদিতেই পশু সংঘবদ্ধভাবে বাস করত। দল বেঁধেই মানুষের ওপর আক্রমণ চালাত। এই আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে মূলত মানুষ সংঘবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করল। গঠিত হলো সমাজ। বলা হলো, ‘প্রত্যেকেই আমরা পরের তরে।’ কিন্তু ঘাটতি থেকেই গেল। যেমন, এ যুগে আমাদের সবচেয়ে অবক্ষয় ঘটেছে মনুষ্যত্ব, বিবেক ও মানবিক মূল্যবোধের। সৃষ্টির আদিকালে মানুষ যখন পশুর মতো ছিল তখন সঙ্গতকারণেই খাদ্য বা শিকার পেলে তাদের কড়াকাড়ি লেগে যেত। অর্থাৎ, কোনও একজন একাই সবকিছু ভক্ষণ করতে চাইত। বালাবাহুল্য, বলবানরাই এতে সফলও হতো। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণকল্পে তথা সমাজে শৃঙ্খলা স্থাপনার্থে মানুষ রচনা করে ফেলল নানা আইন-কানুনও। মানুষ চলে গেল আইনের অধীনে। শুরু হলো সভ্যতার জয়যাত্রা।
সভ্যতার পতাকায় লেখা হলো, ‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে, সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’ গণতন্ত্রের নামে দেশে দেশে মানুষের মধ্যে সমবণ্টনেরও ব্যবস্থা করা হলো। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় সম্পদ কেউ একা ভোগ করতে পারবে না। সকলেরই এতে সমান অধিকার থাকবে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশ। নব্বই দশক পর্যন্ত মোটামুটি সবই ঠিক চলছিল। আমাদের মানবিক মূল্যবোধ মোটামুটি অক্ষুণœই ছিল। সব বিষয়ে দুর্নীতির এত রমরমা দেখা দেয়নি। সভ্যতার এতগুলো সোপান পেরিয়ে আজ শিক্ষিত বাংলাদেশি যেন সেখানেই ফিরে গিয়েছে! প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতা খুললেই দেখা যায়, এক শ্রেণির মানুষ জনগণের বরাদ্দকৃত কোটি কোটি টাকা হাপিস করে দিচ্ছে। নিম্ন-দরিদ্র মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে এঁরা ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার ভান্ডার গড়ে তুলছে, নানা স্থানে একের পর এক গগনচুম্বী বিলাসবহুল অট্টালিকা নির্মাণ করছে। অন্যদিকে, বহু মানুষ বাড়িঘরের অভাবে খোলা আকাশের নীচে গাছতলায় বাস করছে।
এ কথাটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আল্লাহ সৃষ্ট জীবসমূহের মধ্যে একমাত্র মানুষই আপন প্রগতির পথে বাধা মানেনি। তাই সে আল্লাহ প্রদত্ত চিন্তাশক্তিকে আপন চেষ্টায় প্রসারিত করতে পেরেছে। সে জল-স্থল-অন্তরীক্ষ জয় করে সমগ্র প্রকৃতির ওপর আধিপত্য স্থাপন করেছে। দূরকে নিকট করেছে, কালের ব্যবধানকে ঘুচিয়ে দিয়েছে। আজ আমাদের ঘরে ঘরে টিভি, ইন্টারনেট, কম্পিউটার, হাতে হাতে মোবাইল, সেলফোন ইত্যাদি। কিন্তু বিপত্তিটা হচ্ছে এখানে, সভ্যতায় আমরা যত এগিয়ে যাচ্ছি, মনুষ্যত্ব, বিবেক ও মানবিক মূল্যবোধে যেন আমরা ততই পিছিয়ে পড়ছি! তলিয়ে যাচ্ছি। অর্থাৎ আমাদের পূর্বপুরুষরা একদিন যেখান থেকে মনুষ্যত্ব, বিবেক ও মানবিক মূল্যবোধের কর্ষণ শুরু করেছিলেন,সভ্যতার নামে শিক্ষিত হয়ে অবক্ষয়ের পথ ধরে যেন আমরা আবার দ্রæতবেগে সেখানেই ফিরে যাচ্ছি।
পোশাকে-আশাকে বাংলাদেশি নারী শুধু রূপসী রূপে অপরের মনে উদ্দীপনা সঞ্চার করতে চায়নি, চেয়েছে আপন মাধুর্যে বিশেষ একজনের মনের কোণে শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় স্থান করে নিতে। তাই খাটো পোশাকে নিজেকে শুধু শরীরী আবেদনময়ী করে তোলায় তার অনীহা, বরং লজ্জা তার অঙ্গে সঞ্চার করেছে লাবণ্য। বাংলাদেশের পুরুষ এটাকে সমীহ করেছে, সম্মান দিয়েছে। কাজেই কোথাও নারীর ভূষণ লজ্জার অবক্ষয় দেখলে উল্টো সে-ও লজ্জাবোধ করে, তার সুস্থ রুচিতে পীড়াবোধ করে। নিঃসন্দেহে এটা আমাদের সংস্কৃতিরই ঐতিহ্য।
যান্ত্রিক সভ্যতার রমরমা তথা বিশ্বায়নের নামে আজ আমাদের দেশে নারীর পোশাকে-আশাকে ভিন দেশীয় অপসংস্কৃতির ভিড় জমানো হচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকার উচ্ছিষ্ট অপসংস্কৃতির বিভিন্ন যন্ত্রচালিত প্রচার মাধ্যমের দৌলতে এ দেশে বন্যার মতো বৃদ্ধি পাচ্ছে দুর্নীতি। আশ্চর্যের বিষয়, আমাদের দেশের তথাকথিত শিক্ষিতজনেরা, অর্থলোভী ব্যবসায়ীরা বলছে, এতে নাকি ব্যক্তি বিশেষের (নারীর) মুক্তমনের চিন্তাধারার বিকাশ ঘটছে। কিন্তু এই দেশটির নাম যে বাংলাদেশ, এটা তারা বুঝেও না বোঝার ভান করছে মূলত ব্যবসার খাতিরেই।
মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে দেশজোড়া সীমাহীন দুর্নীতির সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিয়ে চলচ্চিত্র, দুরদর্শন বিভিন্ন বেসরকারি টিভি এখন মেতে উঠেছে ললনাদের স্পর্শকাতর অনাবৃত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রদর্শনে। এসবে এদের কেবল নামমাত্র পোশাকেই হাজির করা হচ্ছে। ব্যবহারিক জীবনে তা অনুসরণ করছে কোটি কোটি ললনা। যারা এতে অগ্রণীর ভূমিকা পালন করছে, তাঁরা প্রত্যেকেই আজকের দিনের একশ্রেণির শিক্ষিত ও বড়লোকের আত্মজা অথবা জায়া। এদের পিছনে রাষ্ট্রযন্ত্রের একাংশের প্রচ্ছন্ন মদত রয়েছে। কারণ, এখানে আছে দুর্নীতি বা টাকার খেলা। তা না হলে সেন্সর বোর্ড কী করে সিনেমা-টিভিতে আপত্তিকর দৃশ্যাবলির ছাড় দিচ্ছে? বলাবাহুল্য, সম্মুখে দাঁড়ালেই দেখা যায়, কেবল স্বল্পবসনা লাস্যময়ী নারীদের শরীরী আবেদনের ছড়াছড়ি। বলতে বাধা নেই, নারীদেহে পোশাকের স্বল্পতা যেভাবে দ্রæতবেগে সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে তাতে সেই আদিমতায় ফিরে যেতে বোধকরি আমাদের আর বেশিদিন বাকি নেই।
এই মূহুর্তে দুর্নীতির আঁতুড়ঘর বা গর্ভগৃহ নির্মূল করার ওপরই বেশি জোর দিতে হবে। আমাদের মিশন হতে হবে কীভাবে আমরা লোভ ও দুর্নীতিকে পরাজয় করব। দুর্নীতির জন্য অবশ্যই সাজা হওয়া দরকার। কিন্তু এর চেয়েও বেশি দরকার সর্বাগ্রে দুর্নীতিকে পরাজিত করার মানসিকতা সৃষ্টি করা। এজন্যই ত্রিধারা ফর্মুলার প্রয়োজন। আমাদের মানবিক মূল্যবোধ তথা মনুষ্যত্ববোধের অধঃপতন রোধকল্পে মূল্যবোধযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে। বাস্তবিকই আজ দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে কেবল ডাক্তার ও ইঞ্জিনিয়ার গড়ার ধুম লেগে গিয়েছে। ‘মানুষ গড়া’র কথা কেউই আর ভাবছে না! যেন দেশ চালাবে কেবল ডাক্তার আর ইঞ্জিনিয়াররাই! আমাদের আর যেন কোনও ভালো সিভিলিয়ানের প্রয়োজন নেই! প্রয়োজন নেই ভালো ভালো জজ, ব্যারিস্টার, ম্যাজিষ্ট্রেট, আইনবিদ, শিক্ষাবিদ। রাজনীতিবিদ, ইতিহাসবিদ, লেখক, সাহিত্যিক, উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ইত্যাদির। আগের দিনে ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়ে অভিভাবকরা বলতেন, আমার ছেলেকে আপনি ‘মানুষ’ করে গড়ে তুলুন। আর আজকের অভিভাবকরা বলছেন, ‘শতকরা একশত নম্বার পাইয়ে দিন, ওকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার করে দিন!’ শিক্ষাবিভাগও স্কুল থেকে চরিত্রগঠন তথা নীতিশিক্ষার পাঠ উঠিয়ে দিয়েছে! আজকের দিনের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘মূল্যবোধযুক্ত শিক্ষা’ ব্যবস্থার কোন বালাই নেই। দিকে দিকে দুর্নীতির জোয়ার আটকাতে হলে ফের ওই মানুষ গড়ার শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে। চরিত্রগঠন ও নীতিশিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। আর তা করতে হলে ধর্মীয় শিক্ষার বিকাল্প নেই।
গোড়াতেই অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের দুর্নীতি না করার জন্য শিক্ষা দেবেন। সদা সত্য কথা বলতে শিখাবেন। এটা করতে হবে সেই মন্ত্রে ‘আপনি আচরি ধর্ম পরের শেখাও।’ সন্তানদের সামনে অনেক অভিভাবকই মিথ্যে কথা বলে থাকেন। শিশুরা এটা শেখে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, কোনও এক পাওনাদার বাড়িতে এসে হাঁক দিল, ‘নরেন বাড়ি আছ কি? নরেনবাবু তাঁর ছোট ছেলেকে কানে কানে বলে দিল ‘বলে দে বাবা ঘরে নেই!’ এ থেকে ছেলে কী শিক্ষা পেল? ওই ছেলে বড় হলে একদিন ইঞ্জিনিয়ার বা আধিকারিক হয়ে ক’টা সত্য কথা বলবে? একশো বস্তা সিমেন্ট দিয়ে কোনও সেতু নির্মাণ করিয়ে দিয়ে এক হাজার বস্তা ব্যয় হয়েছে বলেই হিসাবটা সরকারের কাছে দাখিল করে দিবে।
আজকের দিনে এঁদের সকলের ক্ষেত্রেই তো ওই কথাটি সমান প্রযোজ্য। আজকের দিনের জনপ্রতিনিধি ও মস্ত্রীরাও তো ঠিক তা-ই। তাই তো দুর্নীতির রমরমা দেখা দিয়েছে। শেষ কথা হলো, আমাদের প্রত্যেককেই লোভ সামলাতে হবে। ইউরোপীয় ভোগবাদের প্রবল মোহ ছেড়ে দিয়ে আমাদের মূলমন্ত্র বৈরাগ্যের স্বর্ণখনিতে ফিরে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, ভোগে সুখ নেই, ত্যাগেই সুখ। এই ভোগবাদই ঘুষবাদের জন্ম দিয়েছে। আমার যা আছে তাতেই আমাকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। এই সন্তোষই সুখের মূল।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 


Show all comments
  • মোঃ আব্দুল গাফফার ১৫ জুলাই, ২০১৭, ১২:২১ পিএম says : 0
    ধন্যবাদ ইনকিলাব, অত্র লেখাটি ছাপানোর জন্য ধন্যবাদ, আমার বিশ্বাস হতে সময় লাগছে যে বক্ষমান লেখাটি লেখার মত মানুষ আদৌ বাংলাদেশে বেঁচে আছেন কিনা। যাইহোক, লেখকের দীর্ঘ জীবন কামনা করছি আল্লাহ পাকের শানে। সেই সাথে এও প্রার্থনা করছি যেন এরকম লেখক বাংলাদেশে হাজার জন্ম গ্রহণ করেন এবং প্রিয় দৈনিক ইনকিলাবের আরো আরো উন্নতির জন্য আল্লাহু রাব্বুল আলামীনের দরবারে প্রার্থনা করছি। আমিন।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।