Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ ২০১৯, ০৫ চৈত্র ১৪২৫, ১১ রজব ১৪৪০ হিজরী।
শিরোনাম

ইউপি নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি?

প্রকাশের সময় : ১০ মার্চ, ২০১৬, ১২:০০ এএম

আহমেদ জামিল
বর্তমান বিশ্বের প্রায় সব দেশেই কেন্দ্রীয় শাসন, প্রাদেশিক শাসন এবং সর্বনিম্ন পর্যায়ে গ্রাম বা শহর এলাকাভিত্তিক শাসন পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশে যেহেতু এক কেন্দ্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু রয়েছে সে প্রেক্ষাপটে স্থানীয় শাসন তথা স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের অংশ হিসেবে অনেকেই দেখে থাকেন। আর স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদকে প্রাথমিক স্তর বলে মনে করা হয়। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের অভিমত হলো, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং দীর্ঘস্থায়ী স্তর হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ। সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে ইউনিয়ন পরিষদ ব্যাপক সুবিধামূলক কার্যাদি সম্পন্ন করে থাকে।
আর এ প্রেক্ষাপটে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। রাষ্ট্রের তৃণমূল পর্যায়ে নাগরিকদের গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রেও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনী ভূমিকা অপরিসীম। এক সময় বাংলাদেশে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে স্বতঃফূর্তভাবে বিপুল সংখ্যক ভোটার অংশ নিতে এবং পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারতো। বিরাজ করতো আনন্দঘনপরিবেশ। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে সে অবস্থা নেই। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনকে ঘিরে সাধারণ মানুষ তথা ভোটারদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততা এবং প্রাণচাঞ্চল্য পরিলক্ষিত হচ্ছে না, বরং বিরাজ করছে বিরোধী দল, প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যে ভীতির পরিবেশ। বর্তমান বাংলাদেশে সরকার সমাজ, রাষ্ট্রের সর্বক্ষেত্রে ভয়ের সংস্কৃতি চালু করেছে ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে।
দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আস্থার প্রতীক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার পর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির প্রায় ভোটারবিহীন ও দেশে-বিদেশে চরম বিতর্কিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে এদেশের সুষ্ঠু নির্বাচন পদ্ধতি এবং ভোটারদের স্বাধীনভাবে রায় প্রদানের ক্ষমতার অবসান ঘটে। জাতীয় সংসদে ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনে জয়ী হওয়া এবং শতকরা ও ৫ শতাংশ ভোটার উপস্থিতিতে জালিয়াতি করে ৪০/৪৫ শতাংশ দেখানোর মধ্যে দিয়ে এদেশে নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। জনগণের গণতান্ত্রিক আশা-আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের পথ রুদ্ধ হয়ে শুরু হয়েছে নির্বাচনের নামে প্রহসন। নির্বাচনের নামে অপনির্বাচন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও বিস্তৃত হয়েছে।
বিগত উপজেলা, ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং পৌরসভা নির্বাচনে ভোট ডাকাতি এবং জাল ভোটের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। বিরোধীদলের নির্বাচনী এজেন্ট ও প্রকৃত ভোটারদের ভোট কেন্দ্র থেকে বিতাড়িত করে বিরোধী প্রার্থীদের নিশ্চিত বিজয় ছিনতাই করে ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত প্রার্থীদের জয়ী করা হয়। এসব বিতর্কিত নির্বাচনকে সরকারের তল্পিবাহক ও মেরুদ-হীন নির্বাচন কমিশন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে বলে সার্টিফিকেট দিয়ে চলেছে। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বিরোধীদলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দানে বাধা প্রদান এবং ভায়-ভীতি প্রদর্শন করে মনোনয়নপত্র-প্রত্যাহারে বাধ্য করাসহ নানা অভিযোগের প্রতি নির্বাচন কমিশন কোনো কর্ণপাত করছে না, অভিযোগ যাতে না উঠে সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও গ্রহণ করছে না। এটা থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, অতীতের আরসব নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও।
অথচ বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন শুধু স্বাধীন সত্তাই নয়, এর পেছনে রয়েছে সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতাÑযার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে অনুষ্ঠিত করা। সত্যি বলতে কি বর্তমান নির্বাচন কমিশন সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতা চর্চার ব্যর্থতার পাশাপাশি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনেও ব্যর্থ হয়েছে। গণতন্ত্র সুরক্ষা, ভোটাধিকার এবং ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল সবার জন্য লেভেল প্লেইং ফিল্ড নিশ্চিত না করে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থরক্ষা এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তৎপরত বর্তমান এই বিতর্কিত নির্বাচন কমিশন। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে উপলক্ষ করে একথা আবারো নিশ্চিত করে বলা চলে যে, এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।
আগামী ২২ মার্চ ৪ হাজার ২৭৯টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ঘোষিত ৭৫২টির মধ্যে ৭২৮টি ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। শুরুতেই এই নির্বাচনে বিরোধী প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বিরত রাখার জন্য ভয়-ভীতি প্রদর্শন এবং নানা দমন-পীড়ন চালানো হয়। যেকারণে অভিযোগ উঠেছে যে, প্রায় ১১৪টি জায়গায় প্রকৃত প্রধান বিরোধী দল বিএনপি প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় নানা পন্থায় বাধা দেয়া হয়েছে। যেকারণে প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র দাখিল করতে পারেনি। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বিএনপি ১০১টি ইউনিয়ন পরিষদে প্রার্থী দিতে পারেনি।
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদের কেমন নির্বাচনী পরিবেশ বিরাজ করছে তা গত ২ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে ‘বিরোধী প্রার্থীদের ওপর চাপ বাড়ছে’ শিরোনামে এক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, “ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেয়া সরকার বিরোধী প্রার্থীদের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের ওপর হুমকি ও হামলার ঘটনা ঘটছে। মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দিয়েছে সরকারি দলের কর্মীরা। সরকার বিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ এনে শতাধিক প্রার্থীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। প্রচারণায় অংশ নেয়ায় সহস্রাধিক কর্মীকে গ্রেফতারের ঘটনাও ঘটেছে।”
বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বিরত রেখে দেশের ২৫টিরও বেশি ইউনিয়ন পরিষদে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এ যেন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জোটের ১৫৩ জন প্রার্থীর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনার পুনরাবৃত্তি। পৌরসভা নির্বাচনেও এমনটি ঘটেছিল। এই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা ও প্রবণতা বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য মোটেই শুভকর নয়। বাগেরহাট এবং ফেনী জেলায় বিনা ভোটে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও মেম্বার নির্বাচিত হওয়ার হার বেশি।
ফেনীর পশুরামে ভিন্ন দলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমাদানে বাধা দানের মাধ্যমে বিনা ভোটে ৩ চেয়ারম্যান ও ১৫ মেম্বার নির্বাচিত হয়েছেন। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্ট হতে এ বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, দলীয় মনোনয়ন পাওয়াকেই বিজয় ভাবছেন আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের অধিকাংশ প্রার্থী। পৌর নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের বিজয় তাদের মধ্যে এমন মনোভাব তৈরি করেছে। এ জন্য দলীয় মনোনয়ন পেতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। অর্থাৎ উপজেলা, ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মতো ইউনিয়ন পরিষদেও যে ভোট ডাকাতি ও নির্বাচনী অনিয়ম হতে যাচ্ছে তা এক রকম নিশ্চিত করে বলা চলে।
হয়তো একারণে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী ও নেতা-কর্মীদের আচরণ বিধি-লঙ্ঘনের নানা অভিযোগ কোনো আমলেই নিচ্ছে না নির্বাচন কমিশন। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা হচ্ছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করার হীন লক্ষ্যে পৌরসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে সকল স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে মেয়র ও চেয়ারম্যান পদ প্রার্থীদের দলীয় প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আইন তৈরি করা হয়। যাতে করে নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন সবাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা অনিয়ম করলে কোনো ব্যবস্থা না নিতে পারেন। এদিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে গণবিচ্ছিন্ন ক্ষমতাসীন দল জোর-জবরদস্তি করে বিজয় হাসিল করে দেখাতে চাচ্ছে যে, সারা দেশে, তাদের জনপ্রিয়তা অটুট রয়েছে। তবে একথা সত্য যে, ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা ভোট ডাকাতি ও কারচুপির করলে তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক গণঅসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে। ফলে তৃণমূল পর্যায় ঘটতে পারে নতুন করে সরকার বিরোধী আন্দোলনের সূচনা।
য় লেখক : কলামিস্ট
লধসরষ২০১৩১২@ষরাব.পড়স



 

Show all comments
  • MD Zahidul Islam Zihad ১০ মার্চ, ২০১৬, ১০:০০ এএম says : 0
    কখনো না, এই সরকারে সময়ে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না।
    Total Reply(0) Reply
  • Ahsan Habib ১০ মার্চ, ২০১৬, ১০:০১ এএম says : 0
    আসন্ন ইউপি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, ভোটারবিহীন এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় হবে।
    Total Reply(0) Reply
  • Saiful Islam ১০ মার্চ, ২০১৬, ১০:০২ এএম says : 0
    আশা করা বোকামি
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন