Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৮ আশ্বিন ১৪২৫, ১২ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

চিকুনগুনিয়া: দোষারোপ নয়, প্রতিকার চাই

| প্রকাশের সময় : ১৩ জুলাই, ২০১৭, ১২:০০ এএম

রাজধানী ঢাকা শহরে ক্রমেই বেড়ে চলেছে মশাবাহিত ভাইরাসজনিত চিকুনগুনিয়া রোগীর সংখ্যা। বিশেষত: ঢাকা শহরে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বিগত দশকে ব্যাপক আতঙ্ক নিয়ে দেখা দিলেও প্রায়ই একই ধরনের উপসর্গের চিকুনগুনিয়ার মহামারি এবারই প্রথম। মার্চ-এপ্রিল মাস থেকে ঢাকায় চিকুনগুনিয়া রোগির সংখ্যা বাড়তে শুরু করে এখন ঘরে ঘরে এই রোগ একটি আতঙ্কের নাম। সাধারণ সর্দিজ্বর, ডেঙ্গু ও টাইফয়েড জ্বরের উপসর্গ সাধারণ চিকিৎসায় এক সপ্তাহ থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে নিরাময় হলেও চিকুনগুনিয়া রোগিরা দীর্ঘমেয়াদির ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। তিন থেকে ১০ দিনের মধ্যে জ্বরের প্রকোপ কমে গেলেও চিকুনগুনিয়া রোগিরা দীর্ঘমেয়াদে হাড়ের জয়েন্ট ও পেশির ব্যথার শিকার হন। শুধুমাত্র ঢাকা শহরেই লক্ষাধিক মানুষ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা যায়। গণমাধ্যমে কেউ কেউ চিকুনগুনিয়ার বিস্তারকে মহামারি বলে অভিহিত করলেও সরকারের সংশ্লিষ্টরা একে মহামারি বলে স্বীকার করতে রাজি নন। তারা মহামারির আভিধানিক সংজ্ঞা ও ত্বত্ত হাজির করছেন। তবে চিকুনগুনিয়া ভাইরাস এখন ঢাকা শহরের সীমানা পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও দেখা দিতে শুরু করেছে। ঢাকাসহ সারাদেশে এডিস মশা অনেক আগে থেকেই ছিল এবং আছে। হঠাৎ করে এডিস মশাবাহিত চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়ার কারণ এখনো পুরোপুরি অজ্ঞাত।
চিকুনগুনিয়া নিয়ে গণমাধ্যমে এক ধরনের আতঙ্কজনক প্রচারনা লাভ করলেও চিকুনগুনিয়ার মূল কারন উদঘাটন ও প্রতিকারের কোন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছেনা। এমনকি ঢাকায় মাত্র দু’টি বিশেষায়িত হাসপাতাল ছাড়া দেশের আর কোথাও চিকুনগুনিয়া ভাইরাস বা রোগ নির্নয়ের প্রযুক্তিগত সুবিধা নেই বললেই চলে। শুরু থেকে দেশের ডাক্তাররা চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের সাধারণ জ্বরের প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধের পাশাপাশি তরল খাবার ও বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দিয়ে আসছেন। তবে দীর্ঘদিনেও জ্বর ও ব্যাথা না কমার উপসর্গ নিয়ে চিকুনগুনিয়া রোগিরা আতঙ্কিত হয়ে ডাক্তারের স্মরনাপন্ন হলে ঢাকার কিছ কিছু ডাক্তার চিকুনগুনিয়া ভাইরাস বা রোগ নির্ণয়ের নামে রোগিদের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে জানা যায়। উচ্চমাত্রার জ্বর, গিঁটে গিঁটে ব্যথা, মাংসপেশিতে ব্যথা,শরীরের চামড়ায় রাশ এবং বমি বমি ভাব ইত্যাদি উপসর্গ দেখে সহজেই চিকুনগুনিয়া বা ডেঙ্গু রোগ শনাক্ত করা সম্ভব বলে কথিত চিকুনগুনিয়া রোগিদের রোগ নির্নয়ের ঝক্কিতে না ফেলে সাধারণ ওষুধ ও পথ্যের উপর গুরুত্বারোপ করা হলেও ইদানিং কিছু কিছু ডাক্তার অযথা চিকুনগুনিয়া টেস্ট করাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মহাখালিস্থ রোগতত্ত¡ ও রোগ গবেষনা প্রতিষ্ঠান এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) ছাড়া আর কোথাও চিকুনগুনিয়া পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকলেও এসব ডাক্তার নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন ডায়গনোস্টিক সেন্টারে চিকুনগুনিয়া টেস্টের জন্য পাঠাচ্ছেন বলে জানা যায়। ক্রমবর্ধমান ও ক্রমাবনতিশীল হারে চিকুনগুনিয়া রোগির সংখ্যা বেড়ে চলেছে, যদিও ভুল চিকিৎসা না হলে এই রোগে মৃত্যুর ঘটনা বিরল। তবে একই বাড়িতে একজন থেকে অন্যজনে রোগ ছড়িয়ে মহামারির রূপ নিতে চলেছে। এহেন বাস্তবতায় সরকারের সংশ্লিষ্টরা এখন প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ও প্রতিকারের উদ্যোগ গ্রহনের বদলে একে অন্যের উপর দোষ চাপানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
গত মঙ্গলবার বিশ্ব জনসংখ্যাদিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ঢাকায় চিকুনগুনিয়া ছড়িয়ে পড়ার জন্য ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনকে দায়ী করেছেন। ঢাকায় মশার প্রকোপ, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও চিকুনগুনিয়ার মত রোগ ছড়িয়ে পড়ার পেছনে সিটি কর্পোরেশন দায় এড়াতে পারেনা। সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং মশক নিধনের পেছনে বছরে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে এসব উদ্যোগে কোন সুফল পাওয়া যাচ্ছেনা। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের অনিয়ম-দুর্নীতি, নজরদারি ও জবাবদিহিতার অভাবকেই দায়ী করা যায়। যেহেতু চিকুনগুনিয়া এখন ঢাকার সীমানা পেরিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে, সে কারনে চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও প্রতিকারে সরকারের ব্যাপকভিত্তিক উদ্যোগ প্রয়োজন। মশা নিধন ও পরিচ্ছন্নতা বিধানে স্থানীয় প্রশাসনকে দায়িত্ব নিতে নিতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির কার্যক্রম গ্রহনের পাশাপাশি বিভাগীয় ও জেলাশহরের সরকারী হাসপাতালগুলোতে স্বল্প খরচে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া ভাইরাস শনাক্তকরণসহ উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে চিকুনগুনিয়া চিকিৎসার নামে একশ্রেনীর ডাক্তার ও প্রাইভেট ক্লিনিকের মুনাফাবাজি বন্ধ হবেনা। লাখ লাখ মানুষ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী ও গৃহবন্দি হয়ে থাকার ফলে ভুক্তভোগি পরিবারগুলো অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে ব্যাপক জনশক্তির উৎপাদনশীলতার উপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টির মধ্য দিয়ে দেশের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। জরুরী ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকুনগুনিয়া ভাইরাসজনিত জ্বর ও সংক্রমন প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহনের পাশাপাশি হঠাৎ করে এই ভাইরাস কোথা থেকে কিভাবে ছড়িয়ে পড়ল তার সঠিক তথ্য খুঁজে বের করতে হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর