Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২২ নভেম্বর ২০১৭, ০৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী

দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা স্থিতিশীল হওয়ার প্রধান বাধা কোথায়?

| প্রকাশের সময় : ১৩ জুলাই, ২০১৭, ১২:০০ এএম

মোহাম্মদ আবদুল গফুর : বিএনপির সরকার বিরোধী আন্দোলনের হুমকির জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব ওবায়দুল কাদের যে বলেছেন, বিএনপির আন্দোলনের হুমকি আষাঢ়ের তর্জন-গর্জন, সে মন্তব্যের মধ্যে আংশিক সত্য রয়েছে। আওয়ামী নেতার মন্তব্যের মধ্যে আংশিক সত্য রয়েছে একথা শুনে আওয়ামী নেতার খুশী হবার কারণ নেই। কারণ এ বাস্তবতার পেছনে রয়েছে বিএনপির তুলনায় আওয়ামী লীগের দীর্ঘতর সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা।
১৯০৬ সালে নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে ঢাকায় উপমহাদেশের মুসলমানদের যে সর্ব প্রথম দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংগঠন নিখিল ভারত মুসলিম লীগ গঠিত হয় তার উদ্যোগেই ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশের উত্তর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান। বৃটিশ শাসিত অবিভক্ত ভারত বর্ষকে বিভক্ত করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মুসলিম লীগের এ আন্দোলনে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা পিতাদেরও সক্রিয় ভূমিকা ছিল। সে ভূমিকার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন আওয়ামী লীগের নেতা মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দুই বছর পর ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন যে সম্মেলনে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় তার নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন। ভাষা আন্দোলন-খ্যাত তমদ্দুন মজলিসের মুখপত্র সাপ্তাহিক সৈনিক-এর সাংবাদিক হিসাবে সে সম্মেলনে উপস্থিত থাকার সুযোগ আমার হয়েছিল। আমার স্পষ্ট মনে আছে, সেই সম্মেলনে অন্যতম ডেলিগেট হিসাবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী। নতুন এ দলের আদর্শ ও মুলনীতি কী হবে এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক “মূল দাবী” শীর্ষক একখানি মুদ্রিত পুস্তিকা পাঠ করছিলেন।
জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরী এর বিরুদ্ধে অন পয়েন্ট অফ অর্ডার বক্তব্য দিতে গিয়ে এর প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, আমরা এখানে এসেছি একটি বিরোধী রাজনৈতিক দল গঠন করতে। এখানে আদর্শের এত কচকচানি কেন? জনাব চৌধুরীর এ বক্তব্যে সভাপতি মওলানা ভাসানী ‘খামোশ’ বলে গর্জন করে উঠে বলেন, মুসলিম লীগ আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ায় জনগণের সাথে সম্পর্ক-বিচ্ছিন্ন হয়ে পকেট লীগে পরিণত হয়েছে। আমরা আম জনগণকে সাথে নিয়ে সেই আদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আম জনগণের মুসলিম লীগ তথা আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করতে এসেছি। কারও যদি আদর্শ বদহজম হয় সে এখান থেকে চলে যেতে পারে। মওলানার এ বক্তব্যে বিক্ষুব্ধ ফজলুল কাদের চৌধুরী রাগে গট গট করে সম্মেলন থেকে ওয়াক আউট করে বেরিয়ে যান।
এই সম্মেলনে মওলানা ভাষানীকে সভাপতি, জনাব আতাউর রহমান খান প্রমুখকে সহ-সভাপতি, জনাব শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক, (কারাগারে থাকার কারণে সভায় অনুপস্থিত) শেখ মুজিবুর রহমানকে যুগ্ম সম্পাদক, খন্দকার মোশতাক আহমদ প্রমুখকে সহ-সম্পাদক এবং ইয়ার মুহম্মদ খানকে কোষাধ্যক্ষ করে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। পরবর্তীকালে শেখ মুজিবুর রহমান দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সমগ্র পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন জনাব হোসেন শহীদ সোহরওয়ার্দী। তবে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ কখনও জনগণের ব্যাপক সমর্থন লাভে সক্ষম হয়নি। এ দলের প্রভাব প্রধানত পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল।
এর কারণও ছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পেছনে বাঙলার মুসলিম লীগের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভূমিকা থাকলেও পাকিস্তানের রাজধানী, প্রতিরক্ষা বাহিনীর সকল শাখার হেড কোয়ার্টার প্রভৃতি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অফিস পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত হওয়ায় পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার মেজরিটি অংশ পূর্বাঞ্চলের অধিবাসী হওয়া সত্তে¡ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু পশ্চিম পাকিস্তানে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় গোড়া থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে একটি বঞ্চনা বোধ কাজ করে। এই বঞ্চনা বোধকে কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে স্বাধিকার চেতনা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। ১৯৭০ সালে জনসংখ্যা অনুসারে সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সমগ্র পাকিস্তানে যে সর্ব প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে আওয়ামী লীগ সমগ্র পাকিস্তানের মধ্যে নিরংকুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জনে সমর্থ হয়।
গণতন্ত্রের নিয়মনুসারে আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা অর্পিত হওয়ার কথা থাকলেও পাশ্চিম পাকিস্তানী নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান সেনা বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কাল রাতে পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তিকামী জনগণের উপর ঝাপিয়ে পড়ে পশু বলে তাদের স্বাধিকার-চেতনা ধ্বংস করে দেয়ার প্রয়াস পায় এই প্রেক্ষাপটে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ আগ্রাসী পাকিস্তানী বাহিনীর এ হামলার বিরুদ্ধে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে নয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশ নামের স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে তুলতে সক্ষম হয়।
স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে জনগণের গণতান্ত্রিক চেতনা বিশেষ কার্যকর ছিল। বিশেষ করে দুটি সাধারণ নির্বাচনের এ ব্যাপারে ছিল ঐতিহাসিক ভূমিকা। এর একটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৬ সালে, যার মাধ্যমে উপমহাদেশের মুসলমানরা কংগ্রেস কর্তৃক সমর্থিত অখÐ ভারতের বিপরীতে মুসলিম লীগের ভারত বিভাগ এবং উপমহাদেশের মুসলিম অধুষিত পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলে স্বতন্ত্র, স্বাধীন রাষ্ট্র তথা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রতি তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করে। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালে যখন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ একচেটিয়াভাবে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার-চেতনার স্বপক্ষে ভোট দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রতি তাদের ঐতিহাসিক রায় প্রদান করে।
এ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে প্রমাণিত হয় পূর্ব পাকিস্তানের তথা বাংলাদেশের জনগণ গণতন্ত্রের আদর্শকে মনে প্রাণে সমর্থন করে। জনগণের এই মনোভাবের প্রতি লক্ষ্য রেখেই স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে যে চারটি রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসাবে গৃহীত হয় তার অপর তিনটি মূলনীতি বিভিন্ন সরকারের আমলে নানাভাবে পরিবর্তিত ও সংশোধিত হলেও গণতন্ত্রের গায়ে আঁচড় দিতে সাহস করেনি কোন সরকার। কিন্তু সাহস না করলে কি হবে? বাস্তবে এই গণতন্ত্রই বাংলাদেশে আগাগোড়া সব চাইতে অবমূল্যায়নের শিকার হয়েছে।
বাংলাদেশের জনগণের দুর্ভাগ্য, যে গণতন্ত্রের প্রতি তারা আগাগোড়া অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছে সেই গণতন্ত্রের মর্মবাণীর প্রতি বৃদ্ধাংগুষ্টি দেখিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের আমলেই সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একটি মাত্র সরকারী দল রেখে দেশে একদলীয় বাকশালী শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হয়। বহু দু:খজনক ঘটনার মধ্যে দিয়ে দেশে বহু দলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুন:প্রতিষ্ঠিত হলে এক পর্যায়ে সামরিক ক্যুর মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে বসেন তদানীন্তন সেনা প্রধান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সে সময় সারা দুনিয়াকে অবাক করে দিয়ে ঐ সামরিক ক্যুর প্রতি সমর্থন দিয়ে বসেন দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেত্রী শেখ হাসিনা।
এই অবিশ্বাস্য ঘটনার স্বপক্ষে একমাত্র সম্ভাব্য কারণ এই হতে পারে যে, সামরিক ক্যুর মাধ্যমে উৎখাত হওয়া ঐ নির্বাচিত সরকারের নেতৃত্বে ছিল আওয়ামী লীগের নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি। এর অর্থ এই দাঁড়ায় যে, নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের তুলনায় তাঁর কাছে অধিক সমর্থনযোগ্য মনে হয়েছিল সামরিক ক্যুর মাধ্যমে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেলের শাসনকে। বলা বাহুল্য, এটা তাঁর গণতন্ত্র-প্রীতির কোন প্রমাণ বহন করে না। গণতন্ত্রে জনগণের স্বাধীন মতামতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। আর এ মতামত প্রকাশ একমাত্র তখনই অবাধ হতে পারে যখন কোন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশের ঐতিহাসে এ ব্যাপারেও সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত রয়েছে। একটি নির্বাচিত সরকারকে তদানীন্তন সেনা প্রধান জেনারেল এরশাদ সামরিক ক্যুর মাধ্যমে উৎখাত করে দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসন চালিয়ে যাওয়া শুরু করলে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তার বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। প্রথম দিকে বহুদিন আওয়ামী লীগ স্বৈরাচার-বিরোধী সে আন্দোলনে অংশগ্রহণ না করলেও পরে আন্দোলনে যোগ দেয়। কিন্তুু ততদিনে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের আপোষহীন নেত্রী হিসাবে জনগণের নিকট আবিভূত হয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। তার প্রমাণ পাওয়া এরশাদ পরবর্তী প্রথম নির্বাচনে। নির্বাচন যাতে নিরপেক্ষ হয় সে জন্য দেশের দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্দলীয় তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচনের প্রশ্নে একমত হয়।
যেমনটা আশা করা গিয়েছিল নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়। আওয়ামীলীগ নেত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব নির্বাচনকেন্দ্রে ভোট দানের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতা কালে এক পর্যায়ে বলেন, আমি সকল জেলার খবর নিয়েছি, নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠ হয়েছে। আপনারা লক্ষ্য রাখবেন, কেউ যেন আবার ভোটে হেরে গিয়ে এর মধ্যে কারচুপি আবিষ্কার না করে। ভোট গণনা শেষে যখন জানা গেল, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নয়, বিজয়ী হয়েছে বিএনপি, তিনি অবলীলাক্রমে বলে ফেললেন, নির্বাচনে সূক্ষ¥ কারচুপি হয়েছে। এর অর্থ এই যে, নির্বাচন যত অবাধ ও নিরপেক্ষই হোক, আওয়ামী বিজয়ী না হলে ধরে নিতে হবে, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। বলা বাহুল্য, এটাও তাঁর সুষ্ঠু গণতন্ত্র সমর্থনের প্রমাণ বহন করে না।
এর পরে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া হন পরবর্তী প্রধান মন্ত্রী এবং শেখ হাসিনা হন সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী। বেগম খালেদা জিয়ার শাসনকালের মেয়াদ শেষে নতুন নির্বাচনের প্রশ্ন উঠলে প্রধানত শেখ হাসিনার দাবীর মুখেই নির্দলীয় তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচনের বিধান সংবিধানে গৃহীত হয়। এই বিধান মতে দেশে বেশ কয়েকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে পর পর দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নির্বাচিত হয়ে দেশ পরিচালনার সুযোগ লাভ করে। এতে প্রমাণিত হয় এটাই বাংলাদেশের বিশেষ পরিস্থিতি গণতন্ত্র অক্ষুন্ন রাখার সর্বাপেক্ষা উপযোগী ব্যবস্থা।
দুর্ভাগ্যের বিষয় পরবর্তীকালে এক পর্যায়ে শেখ হাসিনার প্রধান মন্ত্রীত্বের আমলে নির্দলীয় তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থা পরিবর্তন করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ঘোষণা দিলে বিএনপি অতীত সমঝোতা লংঘনের অভিযোগে যে নির্বাচন বয়কট করে। একটি প্রধান দল নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়ায় সে নির্বাচন পরিণত হয়ে পড়ে নির্বাচনী প্রহসনে। বিরোধী দলের নেতাকর্মী তো দূরে থাক আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মীও ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার গরজ অনুভব করেননি। কারণ তারা জানতেন তাদের অনুপস্থিতিতেও তাদের ভোট দানের ব্যবস্থা ঠিকই করবেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাকর্মীরা। আসলে হয়ও সেটাই। বিরোধী দলের অনুপস্থিতির সুযোগে অল্পসংখ্যক সরকার দলীয় নেতাকর্মী ইচ্ছা মত ব্যালটপত্রে সীল মেরে দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে প্রদত্ত ভোট সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে তোলার সুযোগ গ্রহণ করেন। ফলে ভোট দানের নির্দিষ্ট সময়ে অধিকাংশ ভোট কেন্দ্র থাকে ফাঁকা। এসব কারণে জনগণ এ নির্বাচনের নাম দেয় ভোটারবিহীন নির্বাচন। এই ভোটারবিহীন নির্বাচনের ফসলই দেশের বর্তমান সরকার।
এই প্রেক্ষাপটে দেশে আরেকটি সাধারণ নির্বাচন আসন্ন হয়ে উঠছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। আওয়ামী লীগ যে কোন মূল্যে পুনরায় ক্ষমতায় আসতে দৃঢ় সংকল্প। এ অবস্থায় নির্বাচন প্রভাবিত করা ছাড়া তার সে ইচ্ছা পূরন সম্ভব কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়। সামনের নির্বাচন তাই শুধু একটি নির্বাচন মাত্র নয়। দেশে গণতন্ত্র থাকবে কিনা তাও বোঝা যাবে এর মাধ্যমে। যদি নির্বাচন অবাধ হয় তবে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনাই অধিক। সেক্ষেত্রে নির্বাচন কতটা অবাধ হবে সেটাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্বাচনকে অবাধ করতে হলে ক্ষমতাসীন দলের জনগণের অবাধ রায় প্রদানের নিশ্চয়তা বিধান করার দায়িত্ব রয়েছে। তারা দলীয় ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধে সে দায়িত্ব পালনে কতটা আগ্রহী, তার উপরই নির্ভর করবে দেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ। জনগণের অবাধ রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের পরিবর্তে যদি যে কোন মূল্যে পুনরায় ক্ষমতায় যাওয়াই থাকে ক্ষমতাসীনদের লক্ষ্য, তবে দেশে গণতন্ত্রের অবাধ অগ্রগতির পথে প্রতিবদ্ধকতা সৃষ্টির দায় থেকে ইতিহাস তাদের কখনও ক্ষমা করবে না।

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর