Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫, ৯ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

একাদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকার আসন সংখ্যা কমছে

| প্রকাশের সময় : ১৫ জুলাই, ২০১৭, ১২:০০ এএম

ডিসেম্বর গেজেট প্রকাশ করবে ইসি

পঞ্চায়েত হাবিব : একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এবার শুধু জনসংখ্যার উপর ভিত্তি না করে জনসংখ্যা, ভোটার সংখ্যা এবং সংসদীয় এলাকার পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে সীমানা পুনঃনির্ধারণের কথা ভাবছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই প্রক্রিয়ায় জনসংখ্যা, মোট আয়তন ও ভোটার সংখ্যাকে প্রাধান্য দিয়ে ঢাকাসহ বড় বড় শহরের আসনসংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ইসি সূত্রে জানা গেছে। দশম জাতীয় সংসদ নিবার্চনে ঢাকায় ১৩টি আসন থেকে বাড়িয়ে ২০টি আসন করা হয়। এবার ঢাকায় ১৫-১৬টি সংসদীয় আসন করার বিষয়ে ভাবছে ইসি।
নির্বাচন কমিশন সচিব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ইনকিলাবকে বলেন এবার বিলুপ্ত ছিটমহলগুলো প্রথম বাড়ের মতো যোগ করার চিন্তা করা হচ্ছে। এছাড়া রোডম্যাপ অনুযায়ী, কমিশন জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সংলাপ করবে। সংলাপের সময় রাজনীতিক দল গুলোর মতামত নেয়া হবে। তাদের মতামতের পরে আগস্ট থেকে সীমানা পুননির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হবে চলতি বছরের ডিসেম্বর । তার পরে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে। ঢাকা কতটি আসন হবে তা এখন বলা যাবে না। তবে ২০টি আসন থেকে কমানের বিষয় আমরা ভাবছি।
গত ১৪ মে ইসির বৈঠকে সীমানা পুননির্ধারণসহ অন্যান্য কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। এছাড়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসির চূড়ান্ত করা রোডম্যাপে বলা হয়েছে, সময়ের পরিবর্তনে এবং জনগণের শহরমুখী প্রবণতার কারণে বড় বড় শহরগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। জনসংখ্যার আধিক্য অথবা ঘনত্ব বিবেচনা করা হলে শহর এলাকায় সংসদীয় আসন সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে পল্লী অঞ্চলে আসন সংখ্যা কমে যাবে। ফলে শহর এবং পল্লী অঞ্চলের সংসদীয় আসনের বৈষম্য সৃষ্টির সুযোগ হবে। সীমানা নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় শুধু জনসংখ্যার উপর ভিত্তি না করে জনসংখ্যা, ভোটার সংখ্যা এবং সংসদীয় এলাকার পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে সীমানা নির্ধারণ করার জন্য আইনি কাঠামোতে সংস্কার আনা প্রয়োজন। কেননা ভোটার তালিকা প্রতিবছর হালনাগাদ করা হয়। জনসংখ্যা, মোট আয়তন ও ভোটার সংখ্যা উভয়কে প্রাধান্য দিয়ে বড় বড় শহরের আসনসংখ্যা সীমিত করে দিয়ে আয়তন, ভৌগোলিক অখন্ডতা ও উপজেলা ঠিক রেখে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ বিষয়টি কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে যোগ করা হয়। রোডম্যাপে বলা হয়,নতুন সৃষ্ট প্রশাসনিক এলাকা এবং বিলুপ্ত ছিটমহলগুলো মূল ভূখন্ডের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট জাতীয় সংসদ নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণের প্রয়োজন হবে। ২০১৩ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন সর্বশেষ জাতীয় সংসদের সীমানা পুন:নির্ধারণ করে। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেওয়া হয়। তখন বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের পক্ষে বলা হয়, জাতীয় সংসদে স্বাধীনতার সময় যে আসন ছিল এখনো তাই আছে। শুধু নারীদের সংরক্ষিত আসন বাড়ানো হয়েছে। স্বাধীনতার পরে ভোটার সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হলেও আসন বাড়েনি। দলটি সংসদের আসন ৩০০ থেকে বাড়িয়ে ৪৫০ করার প্রস্তাব দেয়। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ( জেএসডি) প্রস্তাব দেন ৫০০ আসনের। দলটির পক্ষে বলা হয়, বিদ্যমান ৩০০ আসন রেখে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ২০০ প্রতিনিধি নিয়ে সংসদের উচ্চ কক্ষ গঠন করতে হবে। তার আগে ড. এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে জাতীয় পার্টির পক্ষে সংসদের আসন ৩৫০ করার প্রস্তাব রাখা হয়। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সংসদের আসন বাড়ানোর এখতিয়ার রাখে না। এর জন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন।
আগের সীমানা বিন্যাস : স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সীমানা অনুসারে সম্পন্ন হয়। নির্বাচন কমিশন ১৯৭২ সালের ২০ ডিসেম্বর এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়। এরপর দেশের প্রথম আদমশুমারির প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে নির্বাচন কমিশন ১৯৭৬ সালের ১৯ মার্চ ৩০০ আসনের সীমানা নির্ধারণ সম্পর্কিত দাবি, আপত্তি, পরামর্শ চেয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এর আলোকে কয়েকটি জেলার আসনসংখ্যা হ্রাস-বৃদ্ধি করে ১৯৭৮ সালের ২৭ নভেম্বর গেজেট প্রকাশ করা হয়। এই সীমানা অনুসারে ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। ১৯৮১ সালে দ্বিতীয় আদমশুমারির প্রতিবেদন প্রকাশের পর তৃতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ১৯৮৪ সালে বৃহত্তর ছয় জেলায় ছয়টি আসন কমিয়ে বৃহত্তর তিন জেলায় পাঁচটি ও পার্বত্য এলাকায় একটি আসন বাড়ানো হয়। সে সময় বড় জেলাগুলোকে ভেঙে ৬৪ জেলা করা হয়। ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনের আগে দুটি আন্তঃজেলা নির্বাচনী এলাকা সৃষ্টি করা হয়। ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনের আগে ২০০১ সালের আদমশুমারির প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এ প্রতিবেদন অনুসারে জনসংখ্যার ভিত্তিতে ড. এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন ইসি ব্যাপকভাবে সীমানা পুনর্বিন্যাস করে। নির্বাচন কমিশন তখন এই নীতি গ্রহণ করে যে, কোনো জেলার আসনসংখ্যা দুটির কম হবে না। প্রতি তিন লাখের কাছাকাছি জনসংখ্যার জন্য একটি করে আসন নির্ধারিত হয়। সেনাসমর্থিত তত্ত¡াবধায়ক সরকার আমলে ৩৩ জেলার ১২৫টি নির্বাচনী এলাকার পরিবর্তন আনা হয়। ওই সময় পার্বত্য তিনটি জেলা বাদে দেশের ৬১ জেলার সীমানা পুননির্ধারণ করা হয়। ঢাকায় ১৩টি থেকে আসন হয় ২০টি।
নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ অধ্যাদেশ- ১৯৯৬-এর’ ৮ ধারায় বলা হয়েছে, আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাসমূহের সীমানা (ক) প্রত্যেক আদমশুমারীর সমাপ্তির পর, অনুরূপ আদমশুমারীর পরে অনুষ্ঠিতব্য সংসদের সাধারণ নির্বাচনের উদ্দেশ্যে এবং (খ) কমিশন লিখিতভাবে উল্লেখপূর্বক ভিন্নরূপ নির্দেশ না দিলে, সংসদের প্রত্যেক সাধারণ নির্বাচনের পূর্বে নতুনভাবে চিহ্নিত হবে। এ ছাড়া ৬(২) ধারায় বলা হয়েছে, নির্বাচনী এলাকাগুলোর সীমানা, প্রশাসনিক সুবিধার বিষয় বিবেচনাক্রমে এমনভাবে চিহ্নিত করতে হবে, যাতে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকা নিবিড় হয় এবং এটা করার সময় সর্বশেষ আদমশুমারির প্রতিবেদনে প্রদত্ত জনসংখ্যা বণ্টনের বিষয়টি যতদূর সম্ভব যথাযথভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে।
কিন্তু কাজী রকিবের কমিশন এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে ১৯টি জেলার ৫৩ সংসদীয় আসনের সীমানা পুননির্ধারণ করে। ঢাকায় দুটি নির্বাচনী এলাকার আংশিক পরিবর্তন ঘটানো হয়। ২০০৮ সালে নির্ধারিত সীমানা অপরিবর্তিত থাকে বাকি ৪৫টি জেলার ২৪৭টি আসনের ক্ষেত্রে। রকিব কমিশন সর্বশেষ আদমশুমারি অনুসারে সীমানা নির্ধারণ না করায় সে সময় নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। বাংলাদেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে নিয়োজিত ২৯টি প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রæপ (ইডাবিøউজি) অভিযোগ করে, সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইসি যথাযথভাবে আইন অনুসরণ করেনি। এর ফলে আসনগুলোতে ব্যাপকভাবে ভোটার সংখ্যার তারতম্য ঘটে গেছে। আসন্ন সংলাপে রাজনৈতিক দলসহ অংশীজনের মতামতকে প্রাধান্য দিয়েই সীমানা পুনঃনির্ধারণের কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। এদিকে ইতোমধ্যে বিএনপি সিইসির সঙ্গে সাক্ষাত করে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের সীমানায় ফিরে যাওয়ার সুপারিশ করেছে। পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা জনসংখ্যা ও ভোটার সংখ্যাকে বিবেচনায় নিয়ে সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। বর্তমানে দেশে সোয়া ১৫ কোটি জনসংখ্যা রয়েছে। এরমধ্যে ভোটার রয়েছে ১০ কোটি ১৮ লাখেরও বেশি। সেক্ষেত্রে প্রতি আসনে গড়ে ৫ লাখেরও বেশি জনসংখ্যা ও ৩ লাখ ৪০ হাজারের মতো ভোটার সংখ্যার কম বেশিকে বিবেচনায় কাজ করতে হবে।
সীমানা পুনঃনির্ধারণের দায়িত্বে থাকা নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম ইনকিলাবকে বলেন, জনসংখ্যা, ভোটার ও আয়তন এই তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে এবার সীমানা পুনঃনির্ধারণ করা হবে। সীমানা পুনঃনির্ধারণের জন্য আইন সংশোধন করে সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হবে। তিনি বলেন, আইন সংশোধন করা না গেলে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে আসন সীমিত করে গ্রামাঞ্চলের আসন বাড়ানো হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ