Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২১ জানুয়ারি ২০১৮, ০৮ মাঘ ১৪২৪, ৩ জমাদিউস আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী

৫৭ ধারার অপব্যবহার বাড়ছে- বাতিলের দাবি সর্বমহলে

| প্রকাশের সময় : ২২ জুলাই, ২০১৭, ১২:০০ এএম

ধারাটি সংশোধন করা উচিত -ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ : গণতন্ত্রের জন্য হুমকি আইনটি -এড. খন্দকার মাহবুব হোসেন : ব্যক্তি স্বাধীনতাকে খর্ব করা হয়েছে -ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়–ঁয়া
মালেক মল্লিক : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কোন নিউজ শেয়ার করলেই করা হচ্ছে মামলা। এমনকি গ্রেফতারি পরোয়ানা, এরপর জেল-হাজত। ৫৭ ধারাটিকে ব্যবহার করে কথায় কথায় মামলা হচ্ছে আইসিটি আইনে। কারণে-অকারণে এই আইন ব্যবহার করে মামলা বাড়তে থাকায় অনেকেই বলছেন সামনে এমন সময় আসবে ফেসবুকে কারো ছবি পছন্দ না হলে আইসিটি আইনে কেউ কেউ মামলা করতে পারেন। এখন পর্যন্ত এই আইনে যাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে তারা মামলা থেকে মুক্তি পেতে আদালত প্রাঙ্গণে দিন-রাত ঘুরছেন। বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনটি ৫৭ ধারা যেন এক ধরনের আতঙ্কের নাম। ধারাটি বাতিলের পক্ষে মতামত দিয়েছেন সর্বমহল। বিশেষ করে আইনজীবী, প্রগতিশীল লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক, মানবাধিকার কর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সরকারবিরোধীরা। গত এক বছরে সারাদেশে অন্তত ৫০টি মামলা হয়েছে ৫৭ ধারার অধীনে। অভিযোগ রয়েছে এর অধিকাংশই হয়রানিমূলক এবং প্রতিহিংসা পরায়ন। চলতি বছরেও অন্তত ৩৫টি মামলা হয়। এর মধ্যে সাংবাদিকই ১৬ জন। এছাড়াও আসামি হয়েছেন ছাত্র, শিক্ষক ও মৎস্যজীবী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার মানুষ। অনেক আবার জেলও খাটছেন।
আইনজ্ঞরা জানিয়েছেন, এই ধারার ফলে বাক স্বাধীনতার পথরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। যারা গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, সুশাসনের কথা বলেন তাদের বিরুদ্ধেই এই ধারার প্রয়োগ হচ্ছে বেশি। এটা স্পষ্ট সরকার কর্তৃত্ববাদী লোকজনদের হাতে মোক্ষম অস্ত্র তুলে দিচ্ছেন। সর্বমহলের ব্যক্তি স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে। অবিলম্বে আইনটির বাতিল করার উচিত। সম্পাদক পরিষদও আইনটি বাতিলের দাবি জানিয়ে বলেছেন, এই ধারা সংবিধান পরিপন্থী এবং সংবিধানে রক্ষিত স্বাধীন মতপ্রকাশ প্রতি হুমকি বলেও তারা অভিযোগ করেন।
২০১৩ সালে আইনটি প্রণয়ন করা হয়। এরপর থেকে আইনটির বিভিন্ন ধারা উপ-ধারা বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও ধারাটি বাতিলের জন্য ব্যক্তিপর্যায় থেকে জোর দাবি জানানো হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থা এ ধারার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ, বিরোধী মতকে দমন করতেই আইসিটি আইনে ৫৭ ধারা রাখা হয়েছে। তথ্য প্রযুক্তি আইনটি সংশোধনের পর ৫৭ ধারাটির অপব্যবহারও প্রয়োগে স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো সোচ্চার হয়ে ওঠে।
হাইকোর্টে রিট আবেদন : আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বাতিলের নির্দেশনা চেয়ে ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়। রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বিলুপ্ত করতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না- তা জানতে চেয়ে চার সপ্তাহের রুল জারি করে হাইকোর্ট, যা বর্তমানে চূড়ান্ত শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। রিট আবেদনে বলা হয়, তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা সংবিধানের ২৭, ৩২ ও ৩৯ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে; কিন্তু এই ৫৭ ধারা মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে ব্যাপকভাবে খর্ব করছে। আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় তা বাতিল করা উচিত।
এ আইনের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর শিকার হচ্ছেন দেশের বিভিন্ন সাংবাদিকরা। সর্বপ্রথম ২০১৫ সালে সাংবাদিক প্রবীর শিকদারের বিরুদ্ধে মামলা হলে পুলিশ তাকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেফতার করে। এরপর থেকে ধারাটি বাতিলের জন্য বিভিন্ন মহল থেকে জোর দাবি ওঠে। আইনমন্ত্রী তখন ধারাটি বাতিলের আশ্বাস দিয়েছিলেন। এরপর গত ২ বছরে হয়েছে আরও বেশকিছু মামলা। এরপর মামলার শিকার হয়েছেন ঢাকা, খুলনা ও হবিগঞ্জের ৪ সাংবাদিক। চারদিনের ব্যবধানে তাদের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা হয়। খুলনার সিএমএমের বিষয়ে রিপোর্ট করায় সিএমএমের পক্ষে ওই আদালতের নাজির তপন কুমার বাদী হয়ে ১৪ জুন খুলনা মেট্রোপলিটন সদর থানায় আলোকিত বাংলাদেশের খুলনা প্রতিনিধি মোতাহার রহমান বাবু ও স্থানীয় সময়ের খবরের স্টাফ রিপোর্টার সোহাগ দেওয়ানের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা করেন। এর তিন দিন আগে ১১ জুন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কমের স্টাফ করসপন্ডেন্ট গোলাম মুজতবা ব্রæব’র বিরুদ্ধে এবং এর দুই দিন আগে ১২ জুন হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি ও হবিগঞ্জ সমাচার পত্রিকার সম্পাদক-প্রকাশক গোলাম মোস্তফার বিরুদ্ধে মামলা হয়। এ ছাড়া ওয়ালটনের পণ্য নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের জের ধরে ৫৭ ধারায় দায়ের হওয়া এক মামলায় স¤প্রতি অনলাইন নিউজ পোর্টাল নতুন সময় ডটকমের নির্বাহী সম্পাদক আহমেদ রাজুকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। কয়েক দিন কারাগারে থাকার পর তিনি জামিনে মুক্ত হন। এছাড়াও চট্টগ্রামে দৈনিক সমকালের চট্টগ্রাম ব্যুরোর সিনিয়র রিপোর্টার তৌফিকুল ইসলাম বাবর এবং দিনাজপুরে যমুনা টিভির সিনিয়র রিপোর্টার নাজমুল হোসেনসহ চারজনের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সর্বশেষ গত ৭ জুলাই দৈনিক সকালের খবরের রিপোর্টার ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সহ-সভাপতি আজমল হক হেলালের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলার বাদী হলেন ডা. রুস্তম আলী ডিগ্রী কলেজের প্রভাষক ফারুক হোসেন। ফেসবুক পেজে শেয়ার দেয়ার কারণে মামলাটি হয়। পরবর্তীতে যদিও তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিন নেন। এরপর থেকে সাংবাদিক নেতারা ৫৭ ধারা বাতিলের দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে। কর্মসূচির চলাকালে গত বৃহস্পতিবার এ ধারায় দায়েরকৃত মামলায় দৈনিক যুগান্তরের বিজনেস এডিটর সাংবাদিক হেলাল উদ্দিনকে জামিন না মঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে নিম্ন আদালত। জানা যায়, গত বছর ৫৭ ধারার ৩৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। আসামি হয়ে কমপক্ষে চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জেল খেটেছেন, একজন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার হয়েছেন। সমালোচনা করে মামলার আসামি হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ভুক্তভোগীদের তালিকায় রয়েছেন একজন মৎস্যজীবীও। প্রতি দিনই দেশের কোথাও না কোথায় এ ধারা মামলা হচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার সম্পাদক পরিষদও এ ধারাটি বাতিলের দাবিতে বিবৃতি দিয়েছেন। এতে উল্লেখ করা হয়, এই ধারা সংবিধান পরিপন্থী এবং সংবিধানে রক্ষিত স্বাধীন মতপ্রকাশ ও সাংবাদিকতার প্রতি হুমকি। একই সঙ্গে তারা আইসিটি আইন থেকে ৫৭ ধারা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং নতুন কোনো আইনে এই ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া থেকে বিরত থাকতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ। এতে আরো বলা হয়, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়ার ১৯ ধারায় বিদ্যমান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার সব বিষয় বিদ্যমান থাকায় আমরা উদ্বিগ্ন। সম্পাদক পরিষদ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অন্তরায় হয় এমন সব বিধিবিধান বাদ দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহŸান জানাচ্ছে। সম্পাদক ও সাংবাদিকদের হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের জন্য সারাদেশে যত মিথ্যা মামলা করেছেন, তা প্রত্যাহারের এবং গ্রেফতার হওয়া সাংবাদিকদের মুক্তির দাবি করছে।
সাউথ এশিয়ান ফ্রি মিডিয়া এসোসিয়েশনের (সাফমা) এর আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারা প্রত্যাহার করে সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানি বন্ধ করার আহŸান জানান। তারা বলেন, গণতান্ত্রিক চেতনা ও মিডিয়ার স্বাধীনতা খর্বকারী এই ধারা সরকারের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ করছে। তাদের মতে, ৫৭ ধারার মত কালো আইন থাকলে শুধু মিডিয়া জগতই নয়, সমাজের সব অংশেরই সুস্থতা ও বিকাশ বিঘিœত হবে। সরকারকে এটাই ভাবতে হবে যে তারা যখন ক্ষমতায় থাকবেন না, তখন এ কালো আইন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হবে।
৫৭ ধারা বাতিল চেয়ে রিট আবেদন কারীর আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়–ঁয়া এ বিষয়ে ইনকিলাবকে বলেন, আইনটি করা হয় মূলত মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে হনন করার উদ্দেশ্যে। আমি শুরু থেকে এই আইনটির বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছি। কারণ আমাদের সংবিধানেও নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছেন। এখন তাহলে আবার ৫৭ ধারা কেন। এ ধারাটি সর্বমহলের ব্যক্তি স্বাধীনতা খর্ব করেছেন। রিট আবেদনটির প্রাথমিক শুনানি শেষে রুল জারি করেন আদালত। তবে বিষয়টি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন ইনকিলাবকে বলেন, আইনটি সাংবাদিকদের কন্ঠরোধ করা একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। যে কোন সাংবাদিক ও বৃদ্ধিজীবী মহলের যে কোন সংবাদ ও বক্তব্য ৫৭ ধারা বদলাতে মামলা করা যায়। একই সঙ্গে সঙ্গে সে গ্রেফতার হন। এটা অজামিন অযোগ্য অপরাধ। আমি মনে করি এই আইনটি অবিলম্বে বাতিল করা দরকার। তিনি আরো বলেন, আগে সম্পাদকদের বলা হয়েছিল আইনটি বাতিল করা হবে কিন্তু অদৃশ্য কারণে আইনটি আর বাতিল হয়নি। আইনটি এখন সাংবাদিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষের জন্য বাক স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে। আইনটি দেশের গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার জন্য হুমকিস্বরূপ।
এ প্রসঙ্গে আইন মন্ত্রী ও ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ইনকিলাবকে বলেন, তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি ৫৭ ধারার আইনের কতগুলো বিষয় সংশোধন করা উচিত। কারণ এটা এখন ব্যাপকহারে অপব্যহার হচ্ছে। বিশেষ করে মামলা হওয়ার আগে অভিযোগের বিষয়ে ইনভেস্টিগেশন করতে হবে। তিনি বলেন, ৫৭ ধারায় হয়রানির আশঙ্কা তো বাস্তবেই আমরা দেখছি। ফেসবুকে কেউ একটা স্ট্যাটাস দিল, তাতে কি বলা হল, কেউ কারও অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে কিছু লিখে দিল কিনা বা গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টটি সত্য ছিল কিনা- এসব তদন্ত না করে তো মামলা নেয়া উচিত নয়।

 


Show all comments
  • কাওসার আহমেদ ২২ জুলাই, ২০১৭, ৩:০৯ এএম says : 0
    ৫৭ ধারা বাতিল করলে সবচেয়ে ভালো হয়।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর