Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ ২০১৯, ০৫ চৈত্র ১৪২৫, ১১ রজব ১৪৪০ হিজরী।

ইরাক ও সিরিয়ায় সুন্নী অধ্যুষিত সব শহর ধ্বংসের শিকার

| প্রকাশের সময় : ৩১ জুলাই, ২০১৭, ১২:০০ এএম

দি নিউ আরব : সিরিয়ার আলেপ্পো ও ইরাকের মসুল। দু’টিই দু’দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী নগরী। দু’টিই আজ প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত। লক্ষ্যণীয় যে দু’টি নগরীই ছিল প্রধানত সুন্নী আরব অধ্যুষিত। আর দু’টি নগরীই ধ্বংসের শিকার হয়েছে শিয়াদের হাতে। ২৭ জুলাই দি নিউ আরবে বিশ্লেষক পল ইদন লিখেছেন, আলেপ্পো ও মসুলসহ সিরিয়া ও ইরাকে সুন্নী শহরগুলো ধ্বংস এ দু’টি দেশের গৃহযুদ্ধ ও সহিংসতায় জনগণকে যে কি ভীষণ মূল্য দিতে হয়েছে তারই প্রমাণ বহন করছে।
ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) নির্মূল করতে পাইকারি হারে মসুল নগরী, বিশেষ করে নগরীর পশ্চিমাংশ ধ্বংসস্তূপ পরিণত করা হচ্ছে ইরাক ও সিরিয়া জুড়ে সংঘটিত অধিকতর সাধারণ সেই ঘটনারই অংশ যাতে কিনা সুন্নী আরব প্রধান শহরগুলোকে ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া না হলে অদূর ভবিষ্যতে এর ফল মারাত্মক হতে পারে।
মসুল পুনর্দখলের আগে ইরাকের আরেকটি সুন্নী প্রধান প্রদেশ আনবারের রাজধানী রামাদি থেকে আইএসকে হটাতে চালানো বিমান হামলায় ও নগর যুদ্ধে অধিকাংশ এলাকাই ব্যাপক ধ্বংসের শিকার হয়। এ শহর দুটি অদূর ভবিষ্যতে পুনর্নির্মাণ করা হবে কিনা তা পরিষ্কার নয়।
মিসিংস অন ইরাক বøগের পরিচালক ইরাক বিশ্লেষক জোয়েল উইং মনে করেন, ইরাকের সুন্নী এলাকাগুলো আইএসের কাছ থেকে পুনর্দখলের পর তা অব্যবস্থাপনার মধ্যেই পড়ে থাকবে। উইং দি নিউ আরবকে বলেন, প্রথমত এখানে বিরাট রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ, আনবারের প্রাদেশিক পরিষদ দু’টি উপদলে বিভক্ত। বিরোধীরা কয়েকমাস ধরে গভর্নরের অপসারণ চাইছে। সালাহউদ্দিনের গভর্নরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হয়েছে। নিনেভেহর গভর্নর ক্ষমতাসীন জোট থেকে বিতাড়িত হয়েছেন।
তিনি বলেন, এ সব থেকে দেখা যায় যে ইরাকের সুন্নী সম্প্রদায় বিভক্তির শিকার। এ সমস্যা চলে আসছে ২০০৩ থেকে।
জোয়েল উইং বলেন, অধিকাংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরে, এমনকি মসুলেও এখন দেখা যাচ্ছে যে কোনো শহর আইএস মুক্ত হওয়ার সাথে সাথে বাসিন্দারা রাস্তা পরিষ্কার এবং বাড়িঘরের ধ্বসাবশেষ পরিষ্কার করেছে। যারা চলে গিয়েছিল তাদের মধ্যে জীবিতরা ফিরতে শুরু করেছে, বাড়িঘর, মালামালের কি অবশিষ্ট আছে খুঁজে দেখছে। মুদি দোকান ও খাবারের দোকানগুলোর মত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দোকান খুলেছে।
মসুল পুনর্নির্মাণের ব্যয় হবে বিপুল। জাতিসংঘের এক হিসেবে বলা হয়েছে যে নগরীতে শুধু পানি, বিদ্যুত, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্কুলগুলো পুনরায় চালু করতেই ১শ’কোটি ডলার লাগবে। উইং বলেন, যে সব ভবন ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভাবে পুনর্নির্মাণে লাগবে আরো বহু অর্থ যা সম্ভব বলে মনে হয় না।
উইং মসুল পুনর্গঠনে আরো যে সমস্যার কথা বলেন তা হচ্ছে প্রতিশোধের বিষয়। তিনি বলেন, অধিকাংশ পশ্চিমা ভাষ্যেই ইরাককে এক গোষ্ঠিগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা হয়। আপনি যখন আইএসএফ (ইরাক সিকিউরিটি ফোর্সেস)-এর ভিডিওগুলো দেখবেন তাতে দেখা যাবে যে ইরাকি সৈন্য ও পুলিশ আইএস সন্দেহভাজনদের হত্যা করছে যার অর্থ আইএস এফের সব সদস্যই শিয়া আর যারা শিকার হচ্ছে তারা সুন্নী। আসলে বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়েও জটিল। আইএস পরিবারদের বিরুদ্ধে হুমকি এবং মসুলের বাইরে বহিষ্কার ও বিচার বহির্ভূত হত্যা চলছে যারা সবাই সুন্নী।
তিনি আইএসের কারণে ইরাকি সমাজে যে বিরাট ক্ষত ও বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে তা উল্লেখ করে আশংকা প্রকাশ করেন যে সহসা তা মিলাবে বলে মনে হয় না। তিনি বলেন, সকল যুদ্ধ বিধ্বস্ত এলাকায় ইরাক সরকার দুর্বল। স্থানীয় প্রশাসন ও সশস্ত্র গ্রæপগুলো উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই, এ ব্যাপারে সরকারের কোনো মাথাব্যথাও নেই।
সিরিয়ার আলেপ্পো নগরীর আড়াই লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত পূর্বাংশ নিয়ন্ত্রণকারী বিদ্রোহীদের হটাতে রাশিয়ার সমর্থনে সিরীয় সরকারী বাহিনী ক্লাস্টার বোমাসহ নির্বিচারে বোমাবর্ষণ করে। ফলে পূর্বাংশের বিরাট এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ২০১২ সাল থেকে যুদ্ধে সুন্নী মুসলিম অধ্যুষিত আলেপ্পোর বহু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থান ধ্বংস হয়ে গেছে।
সুন্নী প্রধান আরেকটি সিরীয় শহর রাক্কায় মার্কিন ও তাদের সহযোগী কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) বাহিনীর সাথে আইএসের এখনো লড়াই চলছে। এসডিএফের এক কমান্ডার বলেন, রাক্কায় থাকা বেসামরিক লোকজন এবং শহরের ঐতিহাসিক নিদর্শন যেমন আব্বাসীয় আমলের আল-আতিক মসজিদ রক্ষার জন্য যুদ্ধের কৌশলে পরিবর্তন আনা হয়েছে যাতে তার পরিণতি মসুলের আল নূরী মসজিদের মত না হয়। তবে যুদ্ধের যে অবস্থা ও আইএসের মরিয়া প্রতিরোধের প্রেক্ষিতে তা কতটা রক্ষা পাবে তা পরিষ্কার নয়।
সিরিয়া বিশেষজ্ঞ ও ওকলাহোমা বিশ^বিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়ন বিভাগের প্রধান যসুয়া ল্যান্ডিস বলেন, ইরাক ও সিরিয়ার সুন্নী শহরগুলোর ধ্বংস আমাদের বলে যে বিদ্রোহ করার জন্য সুন্নীদের কি ভয়ংকর মূল্য দিতে হচ্ছে। উবয় দেশেই বঞ্চিত সুন্নীরা তাদের স্ব স্ব সরকারের বিরদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল। সিরিয়ায় সুন্নীরা সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছিল ২০১১ সালে, আর ইরাকের সুন্নীরা করেছিল ২০১৩ সালে যা শক্তিবলে দমন করেছিল শিয়া নূরী আল মালিকির সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী।
ল্যান্ডিস বলেন, বিদ্যমান অবিশ^াস, বিভক্তি ও অস্থিতিশীলতার প্রেক্ষিতে আইএস অসন্তোষ কবলিত ও স্থিতিশীলতাহীন সুন্নী এলাকাগুলোতে বিরাট এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
তিনি বলেন, বহু সুন্নী ইরাক ও সিরিয়া থেকে পালিয়ে গেছে , অন্যরা গৃহহীন বা দেশের মধ্যে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় বিতাড়িত হয়েছে। কেউ বলতে পারে না যে এ অঞ্চলের এই ধর্মীয় ও জাতিগোষ্ঠিগত সম্প্রদায় পুনরেকীকৃত হবে কিনা।
যসুয়া ল্যান্ডিস বলেন, এটা স্পষ্ট যে ইরাক ও সিরিয়া উভয়েরই ভবিষ্যত এখন ভারসাম্যহীন। সুন্নী শহরগুলো পুনর্নির্মাণের চেষ্টা নির্ধারণ করবে যে বিভক্তি ও অবিচারের অবসান ঘটবে কিনা এবং পরিস্থিতি পাল্টাবে কিনা।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইরাক

৪ নভেম্বর, ২০১৬

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ