Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ২১ আগস্ট ২০১৭, ৬ ভাদ্র, ১৪২৪, ২৭ যিলকদ ১৪৩৮ হিজরী

মতবিনিময় সভা লোক দেখানো হবে না তো?

উ প স ম্পা দ কী য়

| প্রকাশের সময় : ৬ আগস্ট, ২০১৭, ১২:০০ এএম

মুনশী আবদুল মাননান : গত ৩১ জুলাই নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৬ জুলাই নির্বাচন কমিশন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সাতটি কর্ম পরিকল্পনা সম্বলিত যে রোডম্যাপ ঘোষণা করে তারই অংশ হিসাবে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ওই মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সংক্ষেপে ঘোষিত সাত কর্মপরিকল্পনা হলো : এক. আইন কাঠামো পর্যালোচনা ও সংস্কার, দুই. নির্বাচন প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সবার পরামর্শ গ্রহণ, তিন. সংসদীয় এলাকার সীমানা পুন:নির্ধারণ, চার. নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন, পাঁচ. বিধিবিধান অনুসরণপূর্বক ভোটকেন্দ্র স্থাপন, ছয়. নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ও নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নিরীক্ষা এবং সাত. নির্বাচনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সক্ষমতা বৃদ্ধি। 

নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, সর্ব প্রথম নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সম্পন্ন হয়েছে। পর্যায়ক্রমে নির্বাচন কমিশন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দ, নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা, নারী নেত্রী ও নির্বাচন পরিচালনা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময় করবে। সকল পক্ষ ও মহলের সঙ্গে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভা থেকে আসা সুপারিশগুলো প্রথমে খসড়া ও পরে চূড়ান্ত করা হবে। নির্বাচন কমিশন সম্ভবত: নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতামতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। এ কারণে সর্ব প্রথম তাদের সঙ্গেই মতবিনিময় করেছে। জানা মতে, মোট ৫৯ জনকে ওই মতবিনিময় সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর মোতাবেক, তাদের মধ্যে এতে অংশগ্রহণ করেন ৩০ জন। ব্যস্ততা, অসুস্থতা, বিদেশে অবস্থান, নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থার অভাব ইত্যাদি কারণে বাকীরা অংশ নিতে পারেননি বা নেননি। আমন্ত্রিতদের অর্ধেকের অনুপস্থিত কিছুটা হতাশাজনক বৈকি! মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন এমন একজন তার একটি লেখায় বলেছেন: সংলাপে আমি এমন অনেক সুশীল সমাজের প্রতিনিধিকে দেখেছি, যারা কোনো দিন নির্বাচন প্রক্রিয়া, সুষ্ঠু নির্বাচন ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেননি। যারা নির্বাচন নিয়ে কাজ করেছেন, সেমিনার করেছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন-এমন অনেক ব্যক্তিকে আমি সংলাপে অংশ নিতে দেখিনি। এটাও একটা হতাশার দিক বটে। তারপরও মতবিনিময় সভাটিকে অনেকেই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছেন। তাদের মতে, এই সভায় যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে, বিতর্ক হয়েছে, ঐকমত্য হয়েছে তা পরবর্তী মতবিনিময় সভাগুলোকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
মতবিনিময় সভায় অংশ নেয়া নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা নানা বিষয়ে আলোচনা করেছেন, মতামত দিয়েছেন, কোনো কোনো বিষয়ে বির্তক করেছেন, আবার কিছু বিষয়ে এক ধরনের ঐকমত্যও তাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা গেছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক, অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হোক, এ ব্যাপারে কেউই দ্বিমত পোষণ করেননি। সম্ভবত: দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা তাদের সামনে থাকায় তারা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রকৃত নির্বাচনে হিসাবেই দেখতে চেয়েছেন। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের দৃঢ় ভূমিকা তারা প্রত্যাশা করেছেন। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী এবং প্রভাব ও হস্তক্ষেপ মুক্ত দেখতে চেয়েছেন।
জানা গেছে, আরো কয়েকটি বিষয়ে এক ধরনের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ‘না’ ভোটের পুন:প্রবর্তন, নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার কথা উল্লেখ করা যায়। নির্বাচনকালীন সরকারের প্রকৃতি নিয়েও প্রস্তাব, আলোচনা ও কথাবার্তা হয়েছে। এসবের বাইরে নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার, প্রার্থীদের সম্পদ বিবরণী, রির্টানিং অফিসারদের ভূমিকা, নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, প্রবাসীদের ভোটাধিকার, যৌথ নাগরিকদের ব্যাপারে নীতিমালা প্রণয়ন ইত্যাদি বিষয়ে মতামত উঠে এসেছে।
বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে নাগরিক সমাজ ও দেশবাসীর অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। নির্বাচন কমিশন গঠন বিষয়ে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়। কিন্তু বাস্তবে তাদের অভিমতকে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। এ ব্যাপারে যে নাটকটি হয়েছে তাতে প্রধান ভুমিকা রেখেছে সরকার এবং তার পছন্দমত নির্বাচন কমিশনই গঠিত হয়েছে। একথা তাই বলাই বাহুল্য, বর্তমান নির্বাচন কমিশন বড় রকমের আস্থার সংকট নিয়েই যাত্রা শুরু করেছে। সরকার এবং সরকারী দল ও জোটের বাইরের সব রাজনৈতিক দল ও মহলের মধ্যে এই নির্বাচন কমিশনের প্রতি অবিশ্বাস ও অনাস্থা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সর্ব প্রথম ও সবচেয়ে বড় কাজ হলো, সকল পক্ষের স্বত:স্ফূত আস্থা অর্জন করা। এটা নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে উত্তীর্ণ হয়ে সবার আস্থা অর্জন করতে হলে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ভূমিকা পালন করতে হবে, কঠোর নিরপেক্ষতা অনুসরণ করতে হবে। নির্বাচন কমিশন যদি দুর্বল হয়, পক্ষপাতদুষ্ট হয়, অনভিজ্ঞ-অযোগ্য হয়, সরকার বা কোনো রাজনৈতিক পক্ষের পুচ্ছগ্রাহী হয় তাহলে তার পক্ষে অংশগ্রহণমূলক, অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেয়া সম্ভব নয়। বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে যদি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কাঙ্খিত ও গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে উন্নীত করতে হয় তাহলে তার স্বাধীন সত্তাকে উজ্জীবিত করতে হবে। সংবিধানের ১১৮ থেকে ১২৬ অনুচ্ছেদ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের প্রতিষ্ঠা, দায়-দায়িত্ব ও কার্যকারিতা বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হয়েছে। ১১৮ অনুচ্ছেদের চতুর্থ ধারায় বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবে এবং কেবল এই সংবিধান ও আইনের অধীন হবে। ১২৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য। অত্যন্ত দু:খের বিষয়, নির্বাচন কমিশন কখনোই এই স্বাধীন সত্তা নিয়ে ভূমিকা পালন করতে পারেনি। নির্বাহী বিভাগের কার্যালয়ের বারান্দা হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে বরাবর। বর্তমান নির্বাচন কমিশন কি এই ঘেরাটোপের বাইরে আসতে পারবে? এর ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করছে আগামী নির্বাচন কতটা অংশগ্রহণমূলক, অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হবে।
জানা গেছে, মতবিনিময় সভায় না ভোট পুন:প্রবর্তনের বিষয়ে দুয়েকজন ছাড়া কেউ না বলেননি। না ভোটের ব্যবস্থা এক সময় ছিল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির, নির্বাচনের আগে তা বাতিল করা হয়। সাধারণ ভাবে অনেকেই বাস্তবসঙ্গত কারণে মনে করেন, না ভোটের ব্যবস্থা থাকা উচিত। এটা নাগরিক অধিকারের অংশ। ভোট দেয়া যেমন নাগরিক অধিকার তেমনি কাউকে ভোট না দেয়া কিংবা না ভোট দেয়াও নাগরিক অধিকার। কারো কারো ধারণা, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে না ভোটের সুযোগ থাকলে ভোটারদের অনেকেই না ভোট দিতো। তাহলে ওই ধরনের বিতর্কিত একটি নির্বাচন হয়তো হতে পারতো না।
অনুরূপভাবে নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়টিও এক প্রকার সর্বজনগ্রাহ্যতা পেয়েছে। নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন এক রকম ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে সেনাবাহিনী নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করেছে। উল্লেখ করা যেতে পারে, ২০০৮ সালের সংশোধিত আরপিও-তে আইনশৃংখলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্রবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। কিন্তু ২০০৯ সালে প্রণীত আরপিও-তে আওয়ামী লীগ সরকারই এটা পরিবর্তন সাধন করে। ওই আরাপিওতে আইনশৃংখলা বাহিনীর সংজ্ঞা থেকে সশস্ত্রবাহিনীকে বাদ দেয়া হয়। বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে ব্যতিক্রম বাদে সবাই ফের আরপিও সংশোধন করে সেনাবাহিনীকে কার্যকরভাবে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জায়গায় গিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে নয়, নিয়মিত বাহিনী হিসাবে সেনাবাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিৎ। গত প্রায় এক দশকের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কোনো নির্বাচনই শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। নানা প্রকার সন্ত্রাস, হানাহানি ও জবরদস্তি হচ্ছে। ভোটার, ভোটপত্র, ভোটকেন্দ্র কোনো কিছুরই নিরাপত্তা থাকছে না। তথাকথিত রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের দাপটে সবকিছুই তছনছ হয়ে যাচ্ছে। পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণ, শাসন ও দমন করতে পারছে না। আইনশৃংখলা বাহিনীতে ব্যাপক দলীয়করণ এর একটা উল্লেখযোগ্য কারণ। এ অবস্থায় সেনাবাহিনী মোতায়েন শুধু অপরিহার্য নয়, জরুরিও বটে। কয়েকজন এ প্রস্তাবের ব্যাপারে দ্বিমত প্রকাশ করে যেসব যুক্তি দেখিয়েছেন তা খোঁড়া যুক্তি হিসাবেই গন্য। একজন প্রতিবাদ জানিয়ে যর্থাথই বলেছেন, সেনাবাহিনীকে দিয়ে যদি হাসপাতাল, বীমাপ্রতিষ্ঠান চালানো যায়, রাস্তা নির্মাণ এমনকি ট্যাঙ্কি সার্ভিসের কাজ চালানো যায় তবে নির্বাচনের কাজ করা যাবে না কেন? সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক তার এক দীর্ঘ পর্যালোচনার এক পর্যায়ে বলেছেন, নির্বাচনের সার্বিক বা সামগ্রিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোন থেকে নির্বাচনের আগে, নির্বাচনের দিনে এবং প্রয়োজন হলে নির্বাচনের পরেও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা আবশ্যক।
নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার বিষয়টি সঙ্গতকারণেই মতবিনিময় সভায় বিশেষ প্রাধান্য লাভ করে। এর পক্ষে একটি যুক্তি হলো, সংসদীয় সরকার পদ্ধতিতে পৃথিবীর কোথাও সংসদ বহাল রেখে সংসদ নির্বাচনের নজির নেই। আর সবচেয়ে বড় যুক্তিটি হলো, এরকম ব্যবস্থায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলে আর কিছু থাকে না। এমপি-মন্ত্রীরা এমপি-মন্ত্রী থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বি›িদ্বতা করবেন, বিভিন্ন সরকারী সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করবেন, অন্যপ্রার্থীরা বঞ্চিত থেকে যাবেন, এটা লেভেল প্লেয়িং হলো না। প্রতিদ্বি›িদ্বতাপূর্ণ ও গ্রহণীয় নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। প্রসঙ্গত স্মরণ করা যেতে পারে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার সময় বলেছিলেন, তফসিল ঘোষণার আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে ইসির কিছু করার নেই। তার এই বক্তব্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কাজ আর এখন কেবল নির্বাচন অনুষ্ঠানের কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরো অনেক কিছুই এখন নির্বাচন কমিশনকে করতে হয়। বিশেষ করে গণতন্ত্রের চর্চা বাধামুক্ত ও মসৃন করার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। আমাদের নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর নিয়ন্ত্রক ও তদারকি সংস্থার ভূমিকাও পালন করে। রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন, তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা, জরিমানা করা, নিবন্ধন বাতিল করার যে-ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের রয়েছে তাতে নির্বাচন কমিশনের একথা বলার সুযোগ নেই, সব দলের সমান অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করার এখতিয়ার তার নেই। মতবিনিময় সভায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্যের সমালোচনা হলেও তিনি তার কোনো জবাব দেননি। অত:পর নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কি উদ্যোগ-পদক্ষেপ নেয়, সেটাই দেখার বিষয়।
নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার, বিশেষত বিএনপি কথিত নিরপেক্ষ সহায়ক সরকার বিষয়ে মতবিনিময় সভায় আলোচনা হয়েছে; তবে যতটা প্রাধান্য সহকারে হওয়া উচিৎ ছিল ততটা প্রাধান্য দিয়ে আলোচনা হয়নি বলেই প্রতীয়মান হয়। অথচ এটিই ছিল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সম্ভবত নাগরিক সমাজের উপস্থিত প্রতিনিধিদের অনেকের ধারণা, এটা নিতান্তই রাজনৈতিক ইস্যু। এ ব্যাপারে তাদের তেমন কিছু বলার নেই। যারা নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের প্রস্তাব দিয়ে আলোচনার অবতারণা করেন তারা যথার্থই উপলব্ধি করেছেন যে, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া অংশগ্রহণমূলক, অবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। এ যাবৎ ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে যেসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তার একটিও অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পারিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও আস্থার যে ঘাটতি রয়েছে তার প্রেক্ষাপটে তত্ত¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবতিত হয়েছিল। তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে যে চারটি নির্বাচন হয়েছে তা তুলনামূলকভাবে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে। কিন্তুু ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা ফিরিয়ে এনেছে। একথা সবারই জানা, দেশে যে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে এবং অব্যাহত রয়েছে তার মূলত কারণ ওই সংশোধনী। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের অংশগ্রহণ না করার কারণ ছিল তত্ত¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুন:প্রবর্তনের দাবি অগ্রাহ্য হওয়া। অত:পর দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের নিকৃষ্ট নজির স্থাপিত হয়েছে ওই নির্বাচনে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের উচিৎ ছিল, এ বিষয়ে ব্যাপকভিত্তিক আলোচনা ও ঐকমত্যে উপনীত হওয়া। দু;য়েক জন তাদের আলোচনায় নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থাকে ডেড ইস্যু বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। সাবেক তত্ত¡াবধায়ক সরকারের একজন উপদেষ্টা ‘সহাযক সরকার’ একটা রাজনৈতিক বিষয়ে; এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ হওয়া উচিৎ বলে মন্তব্য করে নাগরিক সমাজের দায় হালকা করার চেষ্টা করছেন। অবশ্যই এটি একটি রাজনৈতিক ইস্যু এবং একথাও মনে রাখতে হবে, সেদিনের মতবিনিময় সভাটিও রাজনীতির বাইরে নয়। নির্বাচন রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। নির্বাচন নিয়ে, শান্তিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে সংকট সৃষ্টি হওয়ার কারণেই তো ওই মতবিনিময় সভা। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে, সব কিছু যথাযথভাবে চললে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের আদৌ কি প্রয়োজন হতো?
নাগরিক সমাজের এব্যাপারে শক্ত অবস্থান নেয়ার আবশ্যকতা রয়েছে। একথা অতি সাধারণ মানুষও বোঝে, ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে সে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হবে না। নির্বাচন কমিশন সরকারের প্রভাব ও হস্তক্ষেপ মুক্ত থেকে নির্বাচন করতে পারবে না। কাজেই, নির্বাচনের সময় যে সরকার ক্ষমতায় থাকবে তার নিরপেক্ষ চরিত্র নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী, দৃঢ় ও সক্ষম করে তোলার পাশাপাশি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠার বিষয়কেও যথোচিত গুরুত্ব ও আমলে নিতে হবে।
ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা যে সব মতামত দিয়েছেন তা সরকার গ্রহণ করবে কি? ‘না’ ভোটের বিষয়ে সরকার-পক্ষের স্পষ্ট মতামত না জানা গেলেও সেনা মোতায়েন, নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙ্গে দেয়া এবং নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে মতামত জানা গেছে। সে মতামত নেতিবাচক। সরকার-পক্ষ সংবিধানে থাকতে চায়; এর বাইরে যেতে চায় না। এ অবস্থান যদি শেষ পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকে তাহলে এই মতবিনিময় সভা আগের বিভিন্ন মতবিনিময় সভার মতোই ‘লোক দেখানো’ বলেই প্রতিভাত হবে। অবশ্য শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি।

 


Show all comments
  • সালাউদ্দিন ৬ আগস্ট, ২০১৭, ২:০০ এএম says : 0
    নাগরিক সমাজকে এব্যাপারে শক্ত অবস্থান নিতে হবে।
    Total Reply(0) Reply
  • Mohammad Saleh Uddin ৬ আগস্ট, ২০১৭, ১১:৩৮ এএম says : 0
    লোক দেদেখানো হবে না কী হবে? যেনে শুনে ভাল নির্বাচন দিয়ে কেউ ক্ষমতা হারাবে?
    Total Reply(0) Reply
  • আসলাম ৬ আগস্ট, ২০১৭, ১১:৩৯ এএম says : 0
    অবস্থা দেখে তো সেরকমই মনে হচ্ছে
    Total Reply(0) Reply
  • ishak ৬ আগস্ট, ২০১৭, ৯:২৪ পিএম says : 0
    nagorik somajk & soseton jnogonke aksate aste hobe.
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ