Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৭, ০৪ কার্তিক ১৪২৪, ২৮ মুহাররম ১৪৩৯ হিজরী

চীন-ভারত দ্বন্দ্ব বাড়ছে

| প্রকাশের সময় : ৭ আগস্ট, ২০১৭, ১২:০০ এএম

আফতাব চৌধুরী : এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র চীন ও ভারত। ভারতের প্রায় গায়ে গা লাগিয়ে অবস্থান করছে চীন। উভয় দেশের মধ্যে রয়েছে শুধু তিব্বত। ইতিহাস বলছে, ভারত ও চীনের বন্ধুত্ব বহু পুরোনো। ১৯৬২ সালের আগে কোনো ভারতবাসী ভাবতেই পারেনি চীন একদিন ভারতের সীমান্ত শত্রæ হয়ে দাঁড়াবে। চীন-জাপানের যুদ্ধের সময় চীনের আহত সৈনিকদের নিঃস্বার্থভাবে চিকিৎসা করেন একজন ভারতীয় চিকিৎসক। নাম ছিল দ্বারকানাথ কোটনিশ। কিন্তু চীন দেশে বামপন্থী চিন্তাধারার উত্থানের সাথে সাথে এবং চীন তিব্বত অধিগ্রহণ করলে উভয় দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ভারত-পাক দ্ব›েদ্ব এবং কূটনৈতিকভাবে চীন পাকিস্তানকে অনবরত মদত প্রদান শুরু করে। ভারতের একতা ও অখন্ডতা বিপন্ন করার জন্য চীন এ ঘৃণ্য খেলায় সর্বদা মত্ত হতে থাকে, এমন অভিযোগ ভারতের। আজ এটাই যেন চীনের এক অঘোষিত নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে, মন্তব্য ভারতের।
সড়কপথে প্রতিবেশী পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে আকাশপথে কাবুলের সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য সম্প্রতি ভারত-আফগানিস্তানের যৌথ উদ্যোগে নতুন এয়ার করিডোর উদ্বোধন হয়। চীন ভারতের এই উদ্যোগকে ভালো চোখে দেখেনি। গত ২৬ জুন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র গেøাবাল টাইমস-এ সমালোচনা করে বলা হয়, এটা একগুঁয়ে ভূ-রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফসল। উরি হামলার পর চীন পাকিস্তানের পক্ষ নেয়। এদিকে ২০১৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ভারত পাকিস্তানে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক করে এবং ১৯৫৬ সালের সিন্ধু নদীর পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে ভারত এক সমীক্ষা বৈঠকে বসে। বৈঠক শেষে ভারত জানায়, দেশের সীমান্তে উগ্রবাদী কার্যকলাপ পাকিস্তান বন্ধ না করলে ভারত সিন্ধু নদীর পানি বন্ধ করে দেবে। ভারতের ওই হুঁশিয়ারির কয়েকদিন পরেই চীন ভারতের ব্রহ্মপুত্র নদীর জিয়াবুকু উপনদীর পানি বন্ধ করে দেয় এবং বাঁধ তৈরির প্রকল্প হাতে নেয়। চীনের ওই প্রকল্পটির নাম হচ্ছে লালহো। চীন চায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যেন পানি নিয়ে এক সংকট সৃষ্টি হয়।
চীন ইতোমধ্যে দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পপনায় ব্রহ্মপুত্রের মূল প্রবাহে আরো তিনটি পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজে হাত দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি ভারতকর্তৃক আসাম এবং অরুণাচল প্রদেশ সংলগ্ন করে নির্মাণ করা হয় ভূপেন হাজরিকা সেতু এবং উদ্বোধন শেষ হওয়ার পর চীন নতুন দিল্লিকে সতর্ক করে বলে যে, অরুণাচলে আর ভারত যেন কোন পরিকল্পনা রূপায়ন না করে। ভারত এতে কান দেয়নি, বরং অরুণাচলের চিয়াং জেলায় অন্য একটি নদীবাঁধ প্রকল্পের ঘোষণা করে।
জাতিসংঘ কর্তৃক কাশ্মীরের জয়েশই মোহাম্মদ দলটির প্রধান মাসুদ আজহারকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী ঘোষণা করার জন্য ভারত জাতিসংঘে আবেদন জানায়। জাতিসংঘের সদস্য পদ থাকা ১৫টি দেশের মধ্যে অধিকাংশ দেশই ভারতের আবেদনে সাড়া দিয়ে ভারতকে সমর্থন জানায়। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের চীন ভারতের বিরোধিতা করে। বিশ্বের ৪৭টি দেশকে নিয়ে গঠিত হয়েছে ঘঁপষবধৎ ঝঁঢ়ঢ়ষরবৎং এৎড়ঁঢ় (ঘঝএ)। যারা এই গ্রæপের অন্তর্ভুক্ত দেশ হবে তারা নিজেদের ঘঁপষবধৎ গধঃবৎরধষ বা ঘঁপষবধৎ ধিংঃব ক্রয়-বিক্রয় করতে পারবে। আর সেই সুবিধার কথা মাথায় রেখেই ভারত ওই গ্রæপের সদস্য পদ চেয়েছিল। তাই ৪৭টি দেশের মধ্যে বেশিরভাগ দেশ ভারতের পক্ষে ভোট দেয়। কিন্তু ভারতের এনএসজি সদস্য পদের তীব্র বিরোধিতা করছে চীন। আর এর ফলস্বরূপ আজও ভারত এনএসজি গ্রæপের সদস্যপদ লাভ করতে পারেনি। অর্থনৈতিক করিডোর তৈরি করে চীন পাকিস্তানে ৩ লক্ষ ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে। পাকিস্তান চীনকে প্রায় দুই হাজার একর জমি প্রদান করে। ভারতের মতে, আরব দুনিয়ার কাছে বন্দর তৈরি করতে ভারতকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলার চেষ্টায় রয়েছে চীন। ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশকেও চীন প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ প্রদানের প্রতিশ্রæতি দিয়েছে। চীন এখন পাকিস্তান-বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে ভারতকে কোণঠাসা করতে চাইছে।
চীন দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচাইতে বেশি বাণিজ্য করে ভারতে। ভারতের ২০১৫-১৬ অর্থবছরের দিকে তাকালে দেখা যাবে, চীন ও ভারতের মধ্যে প্রায় ৭১.৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়েছে। তার মধ্যে চীন ভারতে বাণিজ্য করে ৬১.৮ বিলিয়ন ডলার এবং ভারত চীনে বাণিজ্য করে মাত্র ৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ভারতের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ৫২.৬৮ বিলিয়ন ডলার। টাকার হিসাবে এই ঘাটতির হিসাব ৩ লক্ষ ৫৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
সহজ ভাষায় বলতে বাধা নেই, এই বিশাল পরিমাণ অর্থ ভারত চীনের হাতে তুলে দিচ্ছে। উল্লেখ্য, শুধু মোবাইল এবং ইলেকট্রনিক্স দ্রব্য সামগ্রীর ক্ষেত্রে ভারতে চীন বাণিজ্য করেছে প্রায় ১৯.৮ বিলিয়ন ডলারের এবং মেশিনারি দ্রব্যসামগ্রীর ক্ষেত্রে চীন ভারতে বাণিজ্য করেছে ১০.৬ বিলিয়ন ডলারের। ভারতের বাজারে বাজাজ, অজন্তা, উইপ্রো, এভারেডি ইত্যাদি প্রায় ২৫টির মতো এলইডি বাল্ব নির্মাতা কোম্পানি থাকা সত্তে¡ও বিগত অর্থ বছরে ভারতের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় প্রায় দুই কোটি এলইডি বাল্ব চীন থেকে ক্রয় করে। ফলে ভারতের অর্থ ব্যবস্থা ক্রমশ তলানিতে যাচ্ছে।
সম্প্রতি ভারত সরকার ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল করে এবং দেশের আমজনতাকে ক্যাশলেস লেনদেন অধিক পরিমাণে করার আহŸান জানায়। ওই আহŸানে সাড়া দিয়ে দেশের একাংশ মানুষ ক্যাশলেস লেনদেন করে। কিন্তু এই ক্যাশলেসের জন্য ভারতের সবচাইতে বড় দুই ওয়ালেট যথাক্রমে পেটিএম এবং ¯œ্যাপডিলের মালিকানা চীনের অনলাইন রিটেনল কোম্পানি আলিবাবার অধীনে। তাই ক্যাশলেস লেনদেনের সংখ্যাও ভারতে যত বাড়ছে তত চীনা ওয়ালেট কোম্পানির রমরমা ব্যবসাও বাড়ছে। প্রতি বছর একদিকে চীনা দ্রব্যের আমদানি বাড়ছে এবং অন্যদিকে ভারতের রফতানি লাফিয়ে লাফিয়ে কমছে। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। তিন বছর ধরে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের মেক ইন ইন্ডিয়া ¯েøাগান চলছে। কিন্তু চীনের সঙ্গে ভারত পাল্লা দিতে পারছে কই?
ভারতের বাজারে চীনের দাপট দিনের পর দিন বাড়তে থাকায় ভারতের ক্ষুদ্র শিল্প, মাঝারি শিল্প-কারখানা প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। আর বেকারের সংখ্যা দেশে হুহু করে বাড়ছে। অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় ভারতে যুব সম্প্রদায়ের সংখ্যা অধিক। প্রতিবছর ভারতে প্রায় ১.১৫ কোটি কর্মসংস্থানের প্রয়োজন হয় আর এমন একটি দেশে ক্রমশ শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে বেকারত্ব ঘুচবে কী করে! কেমন করে দেশের আর্থিক বিকাশ হবে? জাপান ও আমেরিকার সাথে ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলেও বাণিজ্য ক্ষেত্রে চীন শীর্ষাসনে বসে রয়েছে।
পন্ডিত নেহরুর ‘পঞ্চশিলের’ দফারফা করে ১৯৬২ সালে ভারত আক্রমণ করে নিজের স্বরূপ প্রকাশ করে লালফৌজ। সম্প্রতি চীনা সৈন্য সীমান্ত পেরিয়ে সিকিমে ঢুকে পড়ে। ভারত-ভুটান-তিব্বতের সীমান্তে ডোকা লা অঞ্চলে এই ঘটনা ঘটে। উভয় দেশের সেনাদের মধ্যে হাতাহাতি লড়াই হয়। গত ১৯ জুন তিব্বতের মধ্যে দিয়ে ৪৭ জন ভারতীয় তীর্থযাত্রী কৈলাস মানস সরোবরে যাত্রা করার কথা ছিল। কিন্তু চীন অনুমতি দেয়নি। উল্লেখ্য, ২০১৫ সাল পর্যন্ত কৈলাস সরোবর যাওয়ার একমাত্র রাস্তা ছিল নেপাল সীমান্তের কাছে উত্তরাখন্ডের ভিতর দিয়ে অর্থাৎ ‘লিপ পাস’ দিয়ে। এই রুট অত্যন্ত দুর্গম এবং সময়সাপেক্ষ। পরে উভয় দেশের আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয় সিকিমের নাথুলা পাস দিয়ে যাওয়া যাবে। কেন না, বাস চলাচলের ফলে এই রুট সুবিধাজনক। কিন্তু চীন এখন নাথুলা পাস দিয়ে তীর্থযাত্রী যাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ভারতের সীমান্ত শুল্ক খুব বেশি পরিমাণে থাকায় বিদেশি দ্রব্যের তেমন প্রচলন ছিল না। কিন্তু যখন থেকে ভারত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে তখন থেকে তার সীমান্ত শুল্ক কমে যায়, ফলে সমগ্র দেশের বাজারে বিদেশী দ্রব্যের রমরমা ব্যবসা গড়ে ওঠে, বিশেষ করে চীনা দ্রব্যসামগ্রীর। আর চীন তাদের দেশে সেভাবে ঢুকতে দিচ্ছে না ভারতকে। তাইতো ভারতে স্বাধীনতার সময় ১ টাকা প্রায় ১ ডলারের সমান ছিল। কিন্তু আজ সেই ১ ডলার প্রায় ৬৫ টাকার সমান। এর জন্য মূলত দায়ী ভারতের বাজারে বিদেশী দ্রব্যসামগ্রীর বাড়বাড়ন্ত। চীন বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য বিস্তার করছে। ভারতেও তার বাণিজ্য বাড়ছে, যা রোধ করার ক্ষমতা ভারতের নেই। এতে দু’দেশের মধ্যে একটি দ্বা›িদ্বক অবস্থা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে সীমান্ত বিরোধ আগের চেয়ে বাড়ছে। সীমান্তে মুখোমুখী অবস্থানে দাঁড়িয়ে ভারত ও চীনের সৈন্যরা। সীমান্তবিরোধ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর