Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ২১ আগস্ট ২০১৭, ৬ ভাদ্র, ১৪২৪, ২৭ যিলকদ ১৪৩৮ হিজরী

ক্ষোভে ফুঁসছেন নার্সরা

নতুন ইউনিফর্ম

| প্রকাশের সময় : ৭ আগস্ট, ২০১৭, ১২:০০ এএম

হাসান সোহেল : মহান পেশা ‘নার্সিং’। এ পেশায় নিয়োজিত শতকরা ৯০ ভাগই নারী। দেশের সামাজিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, বাঙালি সংস্কৃতি ও সাধারণ জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনা করলে নারীদের শরীরাবরন ও শালীনতা রক্ষা করার জন্য দীর্ঘদিন থেকে চালু থাকা স্যালোয়ার, কামিজ ও এপ্রোনেই খুশী সাধারন নার্সরা। অথচ এসব বিবেচনা না করেই জলপাই রং’র পোশাক চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে নার্সদের জন্য। একই সঙ্গে দেয়া হয়েছে বিশেষ ধরনের প্যান্ট/শার্ট। যা বাংলাদেশের বেশীরভাগ নারীরা পড়তে অভ্যস্ত নয়। এমনকি বারবার নতুন পোশাক পরিধানের নির্দেশনা আসলেও এতে অনীহা নার্সদের।
কেউ কেউ নির্দেশ মানলেও তাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। আর তাই নার্সিং পেশায় নিয়োজিত প্রায় ৬০ হাজার কর্মী সাদা রং’র পোশাককেই তাদের নির্ধারিত পোশাক হিসেবে প্রদান করতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছেন। নার্সিং পেশাকে মহৎ উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘একটি পরিবারে ‘মা’ যেমন সব। তেমনি একজন নার্সও রোগীর কাছে মা’র মত।’ তাদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে আহত ও মুমূর্ষু রোগীদের সেবা প্রদানের মাধ্যমে আর্ত-মানবতার সেবায় যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তা আজ নার্সিং পেশা হিসেবে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। নার্সিং কেবল পেশা নয়, তা আর্ত-মানবতার সেবা করার শ্রেষ্ঠ অঙ্গন। স্বাস্থ্যাসেবা অবকাঠামোতে নার্সিং পেশায় নিয়োজিত সেবক-সেবিকাদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাদের পোশাক তাদের কাজের উপযোগী এবং পছন্দ অনুযায়ীই হওয়া ভালো বলে উল্লেখ করেন বিশেষজ্ঞরা।
নাসিং পেশায় জড়িতরা মনে করছেন, সাদা শান্তির প্রতিক। দীর্ঘদিন থেকে চালু থাকা এই পোশাক নার্সদের ঐতিহ্য। তাদেরকে জলপাই রং’র পোশাক চাপিয়ে দিয়ে এই পেশার গুরুত্ব ও মর্যাদা ক্ষুন্ন করা হয়েছে। সূত্র মতে, গত ২০১৪ সালে নার্সদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি ও পেশাগত কাজের সুবিধা বিবেচনা করে জাতীয় ইউনিফর্ম পরিবর্তনের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে এ বিষয়ে প্রশাসনিক নির্দেশনাও দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর সাধারণ নার্সদের মতামত গ্রহণ করে সেবা পরিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন দপ্তর ও সংগঠনকে অবহিত করতে ২০১৫ সালের ২৯ নভেম্বর নার্সদের ‘নতুন ইউনিফর্ম’ এর প্রস্তাবনা দেয়া হয়। কিন্তু মমতাময়ী সেবার মাধ্যমে দেশের রোগীদের সুস্থ করার মহান পেশায় নিয়োজিত এসব নার্সদের পছন্দ ও মতামতকে বিবেচনা করা হয়নি। এমনকি নার্সদের অভিযোগ- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র কাছে নার্সদের পক্ষ থেকে যে ইউনিফর্মের ডিজাইন ও রং পছন্দ দেয়া হয়েছে তা উপস্থাপনই করা হয়নি। তাই নার্সদের দাবি পোশাকের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী যে রং’র মতামত দিয়েছেন তাও উপেক্ষা করা হয়েছে। এসব কারণে সর্বস্তরের নার্সরা হতাশ এবং মর্মাহত। তাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নার্স বলেন, বর্তমানে নার্সিং ও মিডওয়াইফারী অধিদপ্তর থেকে নার্সদের যে ন্যাশনাল ইউনিফর্ম নির্ধারিত করা হয়েছে তার রং ও ডিজাইন নিয়ে নার্সদের মধ্যে চরম অসন্তুষ্টি ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। যার ফলশ্রুতিতে সর্বশেষ গত ৩ মে নার্সিং অধিদপ্তরের মহাপরিচালক তন্দ্রা সিকদার স্বাক্ষরিত নির্দেশনাসহ কয়েকবার নতুন ইউনিফর্ম পরিধান করার নির্দেশনা আসলেও নার্সরা তা পরিধান করছেন না। অথচ আধুনিক নার্সিং পেশার রয়েছে ২শ’ বছরের অতীত ঐতিহ্য ও প্রাচীন ইতিহাস। ওই সময় থেকেই নার্সদের পোশাক হিসেবে ‘সাদা’ ব্যবহার হয়ে আসছে। আধুনিক নার্সিং’র জননী হিসেবে পরিচিত ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলও সর্বদা সাদা পোশাকে সেবা দিয়েছেন মানুষকে।
একাধিক নার্স জানান, নার্র্স বান্ধব ও নার্স দরদী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সর্বদাই নার্সদের জন্য নিবেদিত প্রাণ। তাদের মতে, ডিপ্লোমা নার্সদের ২য় শ্রেণীর পদমর্যাদা, সর্বোমোট প্রায় সাড়ে ১৫হাজার জনকে সিনিয়র ষ্টাফ নার্স পদে নিয়োগ, সেবা অধিদপ্তরের নিজস্ব ভবনের জন্য মহাখালীতে জমি বরাদ্ধ ও সেবা ভবন নির্মান শুরু, সেবা পরিদপ্তরকে সেবা অধিদপ্তরে উন্নীত করা, স্টুডেন্ট নার্সদের বৃত্তিভাতা (স্টাইপেন্ড) প্রায় দ্বীগুণ করা, নার্সদের দেশ-বিদেশে উচ্চ-শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি, পদোন্নতি প্রদান ও পেশার মান-মর্যাদা বৃদ্ধিতে যুগপোযোগী নিয়োগবিধি প্রণয়ন, নতুনসৃষ্টপদসহ সকল শূণ্যপদে নিয়োগের উদ্যোগসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূখী কর্মকান্ডের জন্য তাকে নার্র্স বান্ধব ও নার্স দরদী প্রধানমন্ত্রী হিসাবেই সর্বস্তরের নার্সরা মনে করেন।
নতুন ইউনিফর্ম বিষয়ে নার্স নেতৃবৃন্দ প্রশাসনের কাছে দেয়া প্রস্তাবনায় উল্লেখ করেন- সামরিক, আধাসামরিক বাহিনী অথবা অধিদপ্তরের নির্ধারিত জাতীয় ইউনিফর্ম সর্বোচ্চ কর্মকর্তা থেকে সর্বনিম্ন কর্মকর্তা সবার জন্যই নির্ধারিত থাকে। কিন্ত নার্সদের ইউনিফর্ম বিষয়ে আদেশটিতে (মহাপরিচালক, পরিচালক, অধ্যাপক, উপ-পরিচালক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারি অধ্যাপক, সহাকারি পচিালক, প্রজেক্ট অফিসার, সিস্টার টিউটর ইনচার্জ, নার্সিং ইনস্ট্রাকটর ইনচার্জ, সেবিকা শিক্ষয়িত্রী, ডেমোনোস্ট্রেটর, পাবলিক হেল্থ নার্স) এই পদগুলোর ক্ষেত্রে ইউনিফর্ম নির্ধারিত না হওয়ায় আদেশটি অসম্পূর্ন। একই সঙ্গে আদেশে পোষাকের রং জলপাই রং উল্লেখ করা হয়েছে। রং এর ভিন্নতায় এটি কোথাও আনসার বাহিনী কোথাও কারা রক্ষীর ইউনিফর্মের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রস্তাবনায় নার্সরা জানান, নার্সিং পেশায় নিয়োজিত মোট জনবলের শতকরা ৯০ ভাগ নারীই। নতুন পোশাক নার্সদের পেষাগত দায়িত্ব পালনে জড়তা নিয়ে আসবে। যে কারনে স্বাভাবিক সেবা প্রদানে নিরুৎসাহীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশপাশি নার্সদের দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক ও পেশাগত নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলবে।
প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়, অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের মত নার্সদের ইউনিফর্ম কেন্দ্রীয় ভাবে সরবরাহ করা হয়না। তাই একেকজনের পোষাকের রং একেক রং’র আকার ধারণ করার সম্ভাবনা থাকছে। যা ভবিষ্যতে একটি হাস্যকর বিষয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকছে। এছাড়া সেবা পরিদপ্তরের (বর্তমানে নার্সিং ও মিডওয়াইফারী অধিদপ্তর) কিছু অতিউৎসাহী অদক্ষ ও সাধারণ নার্স হতে বিচ্ছিন্ন গুটিকয়েক নার্স কর্মকর্তা এ পোশাক নির্বাচন করে নার্সদের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করছেন। যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র বলিষ্ট নেতৃত্বে যখন নার্সিং পেশার নানামুখী উন্নয়নমূলক পদক্ষেপে বাংলাদেশে এ পেশায় আত্মনিয়োগে উৎসাহীত হওয়ার কথা, ঠিক তখনই এ ধরনের একটি ডিজাইন ও রং এর ইউনিফর্ম পছন্দ করে দেশের রেজিষ্ট্রার্ড ৪৫ হাজারসহ প্রায় ৬০ হাজার নার্স ও তাদের পরিবারের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করছে। আর তাই নার্সদের ক্ষেপিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহল আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিপাকে ফেলার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে বলে মনে করছেন নার্স নেতৃবৃন্দ।
নার্সদের ইউনিফর্ম বিষয়ে বাংলাদেশ ডিপ্লোমা নার্সেস এসোসিয়েশন (বিডিএনএ) কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জুয়েল ইনকিলাবকে বলেন, রঙ্গীন কাপরে অপেক্ষাকৃত বেশী জীবানু ধারন করে বিধায় সারাবিশ্বব্যাপি স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে সেবা প্রদানকারী ব্যক্তিদের প্রথম পছন্দ ‘সাদা’ রং। একই সঙ্গে সারাবিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও নার্সদের পরিচিতি, আভিজাত্য ও অস্তিত্ব বহন করছে সাদা পোষাক। এমনকি রোগী সাধারনের সেবা গ্রহনে নার্সদের চিনতে ও জানতে এটি সহায়ক। জুয়েল বলেন, বাংলাদেশের সামাজিকতা, সকল ধর্মের ধর্মীয় মূল্যবোধ, বাঙ্গালী সংস্কৃতি সাধারণ জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনা করলে এ পেশায় নিয়োজিত শতকরা ৯০ ভাগ নারী জনবলের শরীরাবরন ও শালীনতা রক্ষা করার জন্য স্যালোয়ার, কামিজ ও এপ্রোনেই সাধারন নার্সরা খুশী। এছাড়া নির্ধারিত জলপাই রং পেশার গুরুত্ব ও মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়েছে এবং বিশেষ ধরনের প্যান্ট/ শার্ট বাংলাদেশের বেশীরভাগ নারীরা পড়তে অভ্যস্ত নয়।
তিনি বলেন, কোন কোন প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক চাপের কারনে নতুন ইউনিফর্ম পরিধান করলেও মনের মধ্যে চাপা ক্ষোভ নিয়ে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন নার্সরা। আর তাই দেশের প্রায় ৬০ হাজার নার্স ও তাদের পরিবার নতুন এ ইউনিফর্ম নিয়ে হতাশা বিরাজ করছে। চিকিৎসা সেবায় যার নেতিবাচক প্রভাব বিস্তারের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তাই এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন আসাদুজ্জামান জুয়েল। এ বিষয়ে নার্সিং অধিদপ্তরের মহাপরিচালক তন্দ্রা সিকদারের সাথে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ডা. কামরুল হাসান খান সবার সাথে আলোচনা করে নার্সদের পোশাক ঠিক করার পরামর্শ দেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডবিøউএইচও) দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক আঞ্চলিক পরিচালক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, সাদা বিশুদ্ধতার প্রতীক। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং সম্মাণ জানাতেই সাদাকেই বেছে নেয় মানুষ। আর নার্সদের কাজটাও মহান। তাই তাদের ইউনিফর্ম ‘সাদা’ থাকাটাই শ্রেয়। একই সঙ্গে এপ্রোণও সাদা। দীর্ঘদিন থেকে নার্সদের পোশাক সাদাই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এমনকি পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশেই নার্সদের পোশাক সাদা। তিনি বলেন, যে কোন পোশাকই সরকার নার্সদের দিতে পারে। তবে তাদের মতামত এবং যে পোশাককে তারা কাজের উপযোগী মনে করবে সেটাকে বিবেচনা করা উচিত। ######

 


Show all comments
  • Sarwar Murshed ৭ আগস্ট, ২০১৭, ১১:২৬ এএম says : 0
    Sorry to say , it is a complete insult to the medical personnel. Looking like guard rather than nurse.Please show RESPECT to them
    Total Reply(0) Reply
  • Md Abdul Zahir Miah ৭ আগস্ট, ২০১৭, ১১:২৭ এএম says : 0
    এই পোশাক নার্সদের জন্য গ্রহনযোগ্য না
    Total Reply(0) Reply
  • S M Nasir Uddin ৭ আগস্ট, ২০১৭, ১১:২৮ এএম says : 0
    Aro koto ki dekhar baki ase
    Total Reply(0) Reply
  • Foysal Hasan ৭ আগস্ট, ২০১৭, ১১:২৮ এএম says : 0
    ফাইজলামি মুসলিম দেশে এটা কি ধরনের পোশাক ?
    Total Reply(0) Reply
  • Shuaib Ahmad ৭ আগস্ট, ২০১৭, ১০:২০ পিএম says : 0
    এটা নার্স নাকি সিকিউরিটি গার্ড .
    Total Reply(0) Reply
  • ৮ আগস্ট, ২০১৭, ৬:৪৮ পিএম says : 0
    সেবার সাথে সাদা রংটাই যায় । প্যান্ট শার্ট পরলেই কি নার্সরা অতিমানব হয়ে যাবেন ? অপ্রয়োজনীয় ব্যাপার স্যাপার ।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ