Inqilab Logo

ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০ আশ্বিন ১৪২৭, ০৭ সফর ১৪৪২ হিজরী

চমেক হাসপাতালেই শিশু কিডনি রোগীদের উন্নত চিকিৎসা

| প্রকাশের সময় : ৮ আগস্ট, ২০১৭, ১২:০০ এএম

রফিকুল ইসলাম সেলিম : শিশু মাহবুবা আলীর (১০) হঠাৎ কিডনী বিকল (একেআই) হয়ে যায়। প্রস্রাব বন্ধ তিনদিন ধরে। তাকে জরুরী ভিত্তিতে ভর্তি করা হয় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু কিডনী বিভাগে। তার রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা ছিল ৫.৩। সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হলেও হিমোডায়ালাইসিস এবং অন্যান্য চিকিৎসার পর সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি চলে যায়। চট্টগ্রাম বিভাগের সবচেয়ে বড় সরকারি এ হাসপাতালের নতুন চালু হওয়া এই বিভাগে প্রতিদিনই মাহবুবার মতো কোন না কোন শিশু নতুন জীবন পাচ্ছে।
নানা কারণে দেশে শিশু কিডনী রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে ব্যয়বহুল এবং জটিল এ চিকিৎসা সেবা দেশে এখনও অপ্রতুল। দেশে এখনো শিশুদের কিডনী প্রতিস্থাপন চালু করা যায়নি। শিশুদের কিডনীর কোন সমস্যা হলেই অনেক ছুটেন বিদেশে। তবে আশার কথা হলো- নানা সঙ্কট আর সমস্যার মধ্যেও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বিশেষায়িত এ চিকিৎসা সেবা চালু রয়েছে। কয়েকজন তরুণ চিকিৎসকের চিন্তা-গবেষণা আর আন্তরিকতায় চমেকের শিশু কিডনী বিভাগের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রত্যন্ত এলাকায়। আর তাইতো চট্টগ্রাম বিভাগের বাইরে বরিশাল, মাদারীপুর থেকেও চিকিৎসা নিতে আসছে রোগীরা। প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকেও কিডনী রোগে আক্রান্ত শিশুরা আসছে এ বিভাগে।
বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ৮ নং ওয়ার্ডে দশটি শয্যা নিয়ে শিশু কিডনি বিভাগের যাত্রা শুরু হয় ২০১৩ সালের ১১ ডিসেম্বর। এখানে অত্যন্ত অল্প খরচে কিডনী বিকল রোগীদের ডায়ালাইসিস (পেরিটোনিয়াল এবং হিমোডায়ালাইসিস) সেবা দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত ১৬৬১ শিশুর পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস এবং ১০ জন শিশুকে হিমোডায়ালাইসিস করা হয়েছে। হিমোডায়ালাইসিসের ক্যাথেটার শিশু কিডনী বিভাগেই করা হয়। দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মধ্যে একমাত্র চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শিশু কিডনী বিভাগের জন্য হিমোডায়ালাইসিস মেশিন সংগ্রহ করা হয়। এ মেশিনটির দাম প্রায় ১৩ লাখ টাকা। এ মেশিনের ফলে হিমোডায়ালাইসিসের মতো উন্নত চিকিৎসা দেয়া যাচ্ছে এখানে। এ ধরনের ব্যবস্থা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমএসএমইউ) ও ঢাকা শিশু হাসপাতাল ছাড়া দেশের আর কোথাও নেই বলে জানান চিকিৎসকরা। এ বিভাগে এ যাবত অত্যন্ত জটিল কিডনী বায়োপসি করা হয়েছে ২৬ জনের। শিশুদের কিডনী রোগের একটি বড় অংশ নেফ্রেটিক সিনড্রোম এবং কিডনীর জন্মগত ত্রæটিতে আক্রান্ত। তাছাড়া লুপাস নেফ্রাইটিস, হঠাৎ এবং স্থায়ী কিডনী বিকল রোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যাও কম নয়। বেসরকারি হাসপাতালে এ ধরনের ডায়ালাইসিস করতে খরচ হয় সর্বনি¤œ ২১শ’ টাকা। সেখানে মাত্র ৪শ’ টাকা খরচে চমেকে করা সম্ভব।
প্রতি রোববার ও বুধবার শিশু কিডনী বহিঃর্বিভাগ চালু আছে। চট্টগ্রাম বিভাগের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে একমাত্র চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু কিডনী বিভাগেই বিশেজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডাঃ বাসনা মুহুরী বলেন, কিডনী রোগে আক্রান্ত শিশুদের বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা দিতে আমরা শিশু কিডনী বিভাগ চালু করি। এখানে উন্নতমানের আধুনিক সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ মোহাম্মদ মারুফ উল কাদেরের নেতৃত্বে একটি টিম শিশু কিডনী রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। বিভাগটিকে আরও সম্প্রসারিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রতিনিয়ত রোগীর সংখ্যা বাড়ায় এ বিভাগের শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০ করার জরুরী বলেও মত দেন ডাঃ মারুফ উল কাদের। তিনি বলেন, কিডনী রোগীদের মধ্যে বিরাট অংশ শিশু আবার অনেক বয়ঃসন্ধিকালের কিশোরও রয়েছে। এ কারণে কিশোরদের জন্য আলাদা বøক থাকা জরুরী বলেও মত দেন তিনি।সাম্প্রতিককালে শিশু কিডনী রোগীর সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মূত্রথলি ও মূত্রনালীতে জন্মগ্রত ত্রæটি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে কিডনী রোগ বাড়ছে। অনেক শিশু জন্মগতভাবে কিডনী রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় কিডনী রোগ দ্রæত ধরাও পড়ছে। এসব রোগীদের চিকিৎসা হচ্ছে এ বিভাগে।
জানা যায়, শিশু কিডনী বিভাগের তরুণ চিকিৎসকরা চিকিৎসার পাশাপাশি শিশু কিডনী রোগ নিয়ে নিত্যনতুন গবেষণা করছেন। তাদের গবেষণাপত্র দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে ছাপাও হচ্ছে। বিভাগের চিকিৎসকরা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সেমিনারেও অংশ নিচ্ছেন। একের পর এক জটিল রোগী চিকিৎসায় সাফল্যের পর এ বিভাগের এসব তরুণ চিকিৎসকেরা শিশুদের কিডনী প্রতিস্থাপনের স্বপ্নও দেখছেন।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন