Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট ২০১৭, ৭ ভাদ্র, ১৪২৪, ২৮ যিলকদ ১৪৩৮ হিজরী

ইসলামী ইবাদতের চতুর্থ রোকন : হজ

| প্রকাশের সময় : ১০ আগস্ট, ২০১৭, ১২:০০ এএম

এ. কে. এম. ফজলুর রহমান মুনশী
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
(চার) কুরাইশরা অন্যান্য আরব গোত্রের প্রতিকূলে যে সকল পার্থক্যসুলভ বৈশিষ্ট্য কায়েম করেছিল,-এর ফলশ্রæতিস্বরূপ একমাত্র কুরাইশ ছাড়া অন্যান্য আরব গোত্রের রোকেরা উলঙ্গ অবস্থায় খানায়ে কা’বা প্রদক্ষিণ করতো। এই উদ্দেশ্যে খানায়ে কা’বাতে একটি কাঠের মÐপ রাখা ছিল। যার উপর সকল মানুষ পরিধেয় বসন খুলে রেখে দিত। (তাবাকাতে ইবনে সায়াদ : তাজকেরায়ে সাইয়্যেদুস শোহাদা হযরত হামজাহ রা:)। এ সকল লোকের গাত্রাবরণ কেবলমাত্র কুরাইশদের বদান্যতার উপর নির্ভরশীল ছিল। এক্ষেত্রে কুরাইশদের তরফ হতে আল্লাহর মহব্বতে কাপড় বিতরণ করা হতো। পুরুষ মানুষ পুরুষদেরকে এবং মহিরারা মহিলাদেরকে নির্দিষ্টভাবে তাওয়াপের কাপড় ধার দিত এবং মানুষ এই কাপড় পরেই তাওয়াফ করতো। কিন্তু যে সকল লোক এই বদান্যতার আওতাভুক্ত হতে পারর তো না তারা উলঙ্গ অবস্থায়ই তাওয়াফ করতে বাধ্য হত। কিন্তু ইসলাম এই জঘন্য লজ্জাহীনতামূলক কর্মকাÐকে সমূলে উৎপাদিত করে দেয়। (সহীহ বুখারী : ১ খ:, ২২৬ পৃ:, কিতাবুল হজ্জ) এরই প্রেক্ষিতে এই আয়াত নাজিল হ য় : “তোমরা প্রত্যেক মসজিদ বা ইবাদতের সময় লেবাস পরিধান কর।” (সূরা আ’রাফ : রুকু-৩) তাই রাসূলুল্লাহ (সা:) হিজরী নবম সালের হজ্জের মওসুমে হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা:)-কে এই ঘোষণা দানের জন্য প্রেরণ করেন যে, আগামীতে কেউ যেন উলঙ্গ হয়ে খানায়ে কা’বা তাওয়াফ করতে না পারে। সুতরাং তিনি এই ঘোষণা প্রদান করলেন এবং এই নিন্দনীয় প্রথার বিলুপ্তি সাধিত হয়। (সূহীহ বুখারী : কিতাবুল হজ্জ)
(পাঁচ) কুরাইশদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, হজ্জের সময় সকল গোত্রের লোকেরা আরাফাতে অবস্থান করতো। কিন্তু স্বয়ং কুরাইশরা হেরেমের সীমা-রেখার ভিতর থেকে বাইরে বেরোনোকে নিজেদের মর্যাদার খেলাফ বলে মনে করতো। এজন্য তারা মুজদালিফায় অবস্থান করতো। ইসলাম কুরাইশদের এই বিভেদমূলক নীতির মূলোচ্ছেদ সাধন করেছে। (সহীহ বুখারী : কিতাবুল হজ্জ, ১ম খ:, ২২৬ পৃ:) এরই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত নাজিল হয় : “তারপর তোমরা ঐ স্থান হতে প্রস্থান কর যেখানে হতে অন্যান্য লোকেরা প্রস্থান করে।” (সূরা বাকারাহ : রুকু-২৫)
(ছয়) সাফা এবং মারওয়ার মধ্যবর্তী যে ব্যবধান সেখানে আরবরা দ্রæত দৌড়াতে এবং এই কাজটিকে মাজহাবী সুন্নাত হিসেবে সাব্যস্ত করেছিল। কিন্তু ইসলাম এ কাজকে তাদের অনুসৃত সুন্নাত হিসেবে গ্রহণ করেনি। (সহীহ বুখারী : ১ম খ:, ৫৪৩ পৃ:) বরং এর মধ্যমপস্থাকে গ্রহণ করেছে এবং দ্রæত দৌড়ানোকে বিশেষ বিশেষত্ব দেয়নি।
(সাত) জাহেলিয়াত আমলে হজ্জ্বের বৈশিষ্ট্য কেবল এমন কিছুই ছিল যে, তা ছিল একটি বৃহত্তর মেলার প্রতিরূপ। যেখানে সকল শ্রেণীর জুয়াড়ীদের আড্ডা বসতো। এখানে জমে উঠতো সোরগোল এবং কাব্য চর্চার মাধ্যমে-খুন-খারাবী। এরই মাঝে মহিলাদেরকে পণ্যের মতো ব্যবহার করা হত। মোটকথা, অবিচার ও অনাচার চলত সর্বত্র। কিন্তুু ইসলাম আগমন করেই এসবের মূল্যোচ্ছেদ করে এবং হজ্জকে পবিত্রতা, আত্মনিবেদন, পুণ্যধর্মী কর্মকাÐ ও জিকরে ইলাহীর প্রকৃষ্ট উদাহরণরূপে প্রতিষ্ঠিত করে। একই সাথে আল কুরআনে ঘোষণা করা হয় : “সুতরা যে এই মাসগুলোতে হজ্জের নিয়ত করবে, তাহলে তার উচিৎ মহিলাদের প্রতি শ্লীলতাহানিকর কর্মকাÐ না করা, গালি-গালাজ না করা, ঝগড়া-বিবাদ করা, তবে তোমরা যেসব সদনুষ্ঠান করবে, সে সম্পর্কে আল্লাহপাক সম্পূর্ণ পরিজ্ঞাত।” (সূরা বাকারাহ : রুকু-২৫)
(আট) হজ্জের বিধি-বিধান আদায় করার পর যারা প্রত্যাবর্তন করতে মনস্থ করতো, তারা দু’টি শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। তাদের একদল বলত যে, যারা ‘আইয়্যামে তাশরী’কে প্রত্যাবর্তন করে তারা গোনাহগার। অপর দল যারা দেরীতে প্রত্যাবর্তন করে তাদেরকে দোষারোপ করতো। অথচ এই উভয় শ্রেণীর কেহই গোনাগার ছিল না। এজন্য আল কুরআন উভয় শ্রেণীর কাজকেই বৈধ বলে ঘোষণা করেছে। রিশাদ হচ্ছে : “যে ব্যক্তি তাড়াতাড়ি করে আইয়্যামে তাশরীকের দু’দিনের মাঝেই প্রত্যাবর্তন করে তাহলে এতে তার গোনাহ হবে না এবং যে দেরীতে প্রত্যাবর্তন করবে, তারও কোন গোনাহ হবে না, তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে।” (সূরা বাকারাহ ” রুকু-২৫)
(নয়) আরবরা হজ্জকে একটি নি:শব্দ অনুষ্ঠানে পর্যবসিত করে তুলেছিল। অর্থাৎ তারা হজ্জে¦র ইহরাম বাঁধার পর নিশ্চুপ হয়ে যেত। তাই হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা:) একজন মহিলাকে নিশ্চুপ দেখে এর কারণ জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন যে, সে নিশ্চুপ হজ্জ্বের ইহরাম বেঁধেছে। তিনি তাকে নি:শব্দ থাকতে নিষেধ করলেন এবং বললেন, এটা হচ্ছে অন্ধকার যুগের কুসংস্কার। (সহীহ বুখারী : ১ম খ:, ৫৪১ পৃ:)
আমরা পূর্ববর্তী আলোচনায় হজ্জের সংস্কারসমূহ সম্পর্কে পর্যালোচনা করেছি। এর সাথে আরও কিছু সংস্কারের কথা উপস্থাপন না করলে অধিত বিষয়টির পূর্ণতা লাভ হয় না। তাই বক্ষ্যমান নিবন্ধে সেগুলো সম্পর্কে আলোচনায় প্রবৃত্ত হলাম।
(দশ) আরবরা খানায়ে কা’বা পর্যন্ত পদব্রজে গমন করার জন্য মানত করত এবং তারা এ কাজকে বড়ই পুণ্যের বলে মনে করত। একবার রাসূলুল্লাহ (সা:) একজন বৃদ্ধকে দেখলেন, দু’টি ছেলের উপর ভর করে পদব্রজে হজ্জে গমন করছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এর কারণ কি? উত্তরে জানানো হলো যে, লোকটি পদব্রজে গমন করার জন্য মানত করেছে। ইরশাদ হলো, আল্লাহ কাহারো নফসকে আযাবে নিপতিত করা থেকে বেনিয়াজ। সুতরাং তিনি তাকে সওয়ারীর উপর আরোহণ করে গমন করার নির্দেশ দিলেন। (জামে তিরমিজী : কিতাবুন নুজুরী ওয়াল আইমান)
অনুরূপভাবে মহিলারাও খানায়ে কা’বা পর্যন্ত খোলা মাথায় পদব্রজে গমন করার জন্য মানত করত। একবার রাসূলুল্লাহ (সা:) এই শ্রেণীর একজন মহিলাকে দেখতে পেলেন এবং বললেন, আল্লাহ এই পেরেশানী হালের জন্য কোন বিনিময়ই প্রদান করবেন না। সুতরাং এই মহিলার উচিত সাওয়ারীর উপর আরোহণ করা এবং উড়নী বা চাদর দ্বারা মাথা আবৃত করা। (জামে তিরমিজী : কিতাবুন নুজুরী ওয়াল আইমান)
একই ধারণার বশে তারা কুরবানীর জন্য যে সকল পশু গৃহ হতে আনয়ন করত, সেগুলোর উপর আরোহণ করত না। কুরবানীর পশু হিসেবে সেগুলোকে অন্যরকম মনে করত। সুতরাং একবার রাসূলূল্লাহ (সা:) দেখতে পেলেন যে, একটি লোক উটের রশি ধারণ করে পায়ে হেঁঁটে চলেছে। তিনি বললেন, উটের উপর আরোহণ কর। লোকটি উত্তর করল, এ হচ্ছে কুরবানীর পশু (তাই আরোহণ করতে পারছি না)। একইভাবে রাসূলুল্লাহ (সা:) তিন বার তাকে উটের উপর আরোহণ করতে বললেন। (সহীহ বুখারী : ১ম খ: ২২৯ পৃ: কিতাবুল হজ্জ)
(এগার) আনসারদের মাঝে এই দস্তুর ছিল যে, তারা হজ্জ হতে প্রত্যাবর্তনের পর দ্বার পথে গৃহে প্রবেশ করতেন না; বরং পেছনের দেয়াল টপকে গৃহে প্রবেশ করতেন এবং এ কাজকে পুণ্যময় বলে মনে করতেন। সুতরাং এক ব্যক্তি হজ্জ হতে প্রত্যাবর্তন করে প্রচলিত নিয়মের খেলাপ দ্বার পথে গৃহে প্রবেশ করলেন। ফলে, অন্যান্য লোকেরা তাঁকে খুবই র্ভৎসনা ও তিরস্কার করল। সঙ্গে সঙ্গে আল কুরআনের এই আয়াত নাজিল হয়। এরশাদ হচ্ছে : “ গৃহের পেছনের দেয়াল ডিঙ্গিয়ে প্রবেশ করার মাঝে কোনই পুণ্য নেই; বরং পুণ্য হচ্ছে ঐ ব্যক্তিরই প্রাপ্য যে তাকওয়া ও পরহেজগারী অর্জন করেছে এবং তোমরা গৃহসমূহে দ্বার পথে প্রবেশ কর।”(সূরা বাকারাহ : রুকু-২৪ এবং সহীহ বুখারী : ১ম খ: ২৪২ পৃ:)
(বার) কোন কোন লোক তাওয়াফ করার সময় নিজেদের অপরাধী ও গোনাহগার হওয়ার অবস্থাকে বিভিন্ন অনুপযোগী পন্থায় প্রকাশ করত। এদের কেউ নাকের সাথে রশি ঝুলিয়ে রাখত এবং এই রশি ধরে অপর একজন তাকে টেনে বেড়াত। রাসূলুল্লাহ (সা:) এক ব্যক্তিকে দেখলেন যে, তাকে রশি ধরে তাওয়াফ করানো হচ্ছে। তিনি তার নাকের রশি কেটে দিলেন। (নাসাঈ, কিতাবুল হজ্জ, ৪৬১, পৃ: আল-কালামু ফিত্ তাওয়াফ পরিচ্ছেদ) আরও একবার রাসূলুল্লাহ (সা:) এক ব্যক্তিকে দেখলেন যে, সে নিজের হাত অপর এক লোকের সাথে বেঁধে রেখেছে এবং সেই ব্যক্তি তাকে তাওয়াফ করাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ (সা:) তার রশি কেটে দিলেন এবং বললেন, একে হাত ধরে তাওয়াফ করাও। (সহীহ বুখারী : হজ্জ; আল- কালামু ফিত্্ তাওয়াফ পরিচ্ছেদ) একবার রাসূলুল্লাহ (সা:) দেখলেন, যে, দু’জন লোক একই রশিতে আবদ্ধ হয়ে তাওয়াফ করছে। তিনি এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তারা বললো, আমরা উভয়ে এই মানত করেছি যে, এভাবে রশিতে আবদ্ধ হয়ে খানায়ে কা’বাকে তাওয়াফ করবো। রাসূলুল্লাহ (সা:) বললেন, “এই কুসংস্কারকে দূর করে দাও। এটা বৈধ মানত নয়; বরং বৈধ মানত হচ্ছে এটি যার উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহর জন্যই নিবেদিত।” (ফতহুল বারী : ৩য় খ: ২৮৬ পৃ:)
(তের) আরবের অধিবাসীরা হজ্জের জন্য নির্ধারিত দিনগুলোতে ‘ওমরাহ’ আদায় করত না। তারা বলত, যখন সাওয়ারীগুলো হ্জজ হতে প্রত্যাবর্তন করবে এবং তাদের পিঠের জখম শুকিয়ে যাবে, তখন হয়তো ‘ওমরাহ’ আদায় করা যেতে পারে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা:) খাস হজ্জের দিনগুলোতেই ওমরাহ আদায় করেছেন এবং কার্যত: এই শ্রেণীর অপ্রয়োজনীয় রুসম ও রেওয়াজকে নির্মূল করে দিয়েছেন। (সহীহ বুখারী : আইয়্যামুল জাহিলিয়্যা পরিচ্ছেদ)
(চৌদ্দ) অন্ধকার যুগে কোন কোন লোক হজ্জের নিয়ত করত। কিন্তু তারা এ সময়ে তেজারত বা ব্যবসা-বাণিজ্য করত না এবং তেজারতকে হজ্জের মূল কর্মকাÐের বিপরীত বলে মনে করত। এজন্য অধিকাংশ লোক, যারা শুধুু তেজারত ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য আগমন করত, তারা হজ্জে অংশগ্রহণ করত না; বরং তারা একটি মেলা অনুষ্ঠানের মতই হাজির হত। এদের সাথে হজ্জের কোন সম্পর্কই ছিল না। তারা ‘ওকাজ’ অথবা ‘জুল্-মাজাজ’ নামক মেলায় অংশগ্রহণের মত ব্যবসা-বাণিজ্য করত। ইসলাম আগমনের সময় এই দু’টি পদ্ধতিই প্রচলিত ছিল। এর কুফল ছিল এই যে, হাজী ব্যক্তি তেজারতের মুনাফা হতে বঞ্চিত থাকত। তাছাড়া হাজীদের ছাড়া যে ভিড় জমতো, তা ছিল বাজারী ও তামাসাকারীদের আসর মাত্র। এগুলোতে সকল প্রকার পাপের কাজ অনুষ্ঠিত হত। কিন্তুু পবিত্র ইসলাম এই পৃথকীকরণ ব্যবস্থাকে দূরীভূত করে দিয়েছে এবং সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে, তেজারত ও ব্যবসা-বাণিজ্য হজ্জের পবিত্রতা ও মর্যাদার খেলাপ নয়। এ কারণে হজ্জ এবং তেজারত উভয় কর্মই এক সাথে আদায় করা যায়। আল কুরআনে ইরশা হচ্ছে : “তোমাদের জন্য এটা গোনাহের কাজ নয়। যে, (হজ্জের মৌসুমে) আল্লাহর অনুকম্পা (তেজারত) অসুন্ধান করবে।” (সূরা বাকারাহ : রুকু-২৫) ফলে, এর পরিণাম এই দাঁড়ালো যে, সকল লোক যারা মক্কায় সমবেত হত, তারা হজ্জের নিয়তেই জড়ো হত। এর দরুন অন্ধকার যুগে র ক্ষতিকর কুসংস্কারসমূহ দূরীভূত হয়ে যায় এবং একই সাথে সামগ্রিকভাবে বৈধ তেজারতের পথ সুগম হয়ে উঠে। উপরোক্ত আয়াতের শানে নুজুল সম্পর্কে দু’ ধরনের রেওয়ায়েত পাওয়া যায়। কোন কোন রেওয়ায়েত হতে জানা যায় যে, আরবরা হজ্জ আদায় করার সময় তেজারত করাকে খারাপ জানত এজন্য এই আয়াত নাজিল হয়। অপর বর্ণনাগুলো থেকে জানা যায় যে, আরবরা এ সময়ে তেজারত করত। ইসলাম আগমন করার পর সাহাবীগণ মনেকরলেন যে, হজ্জ হচ্ছে খালেসভাবে আল্লাহর জন্য। এজন্য এ সময়ে তেজারত করা সমীচীন হবে না। সুতরাং তাদের এই খেলায় নির্মূল করার জন্য এই আয়াত নাজিল হয়। (তাফসীরে তাবারী ও আসবাবুন নুজুল : ওয়াহেদী)

(পনের) সাফা-মারওয়ার তাওয়াফ সম্পর্কে দু’দলের উদ্ভব ঘটেছিল। আনসারগণ শুধু ‘মানাতের’ ইহরাম বাঁধতো যা ‘মুসাল্লাল’ নামক স্থানে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল। তারা খানায়ে কা’বাকে তাওয়াফ করত না। তাদের ছাড়া অন্যান্য আরবরা সাফা এবং মারওয়ার তাওয়াফ করত। আল্লাহ পাক যখন সর্বপ্রথম খানায়ে কা’বা তাওয়াফের হুকুম দিলেন, কিন্তু তখনো সাফা এবং মারওয়ার তাওয়াফ সম্পর্কে কোন নির্দেশ নাজিল হয়নি, তখন দ্বিতীয় শ্রেণী লোকেরা রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর নিকট প্রশ্ন উত্থাপন করলো, যে, এটি কি কোন নাজায়েয় কাজ? আনসারগণও এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা:)-কে প্রশ্ন করলেন, তখন এই আয়াত নাজিল হয়। (সহীহ বুখারী : কিতাবুল হজ্জ, ১ম খ: ২২৩ পৃ) “অবশ্যই সাফা এবং মারওয়া (পাহাড়দ্বয়) হচ্ছে আল্লাহর নিদর্শনাবলীর অন্তরর্ভুক্ত। সুতরাং যে ব্যক্তি বাইতুল্লাহর হজ্জ আদায় করবে অথবা ওমরাহ পালন করবে, তাদের জন্য সাফা-মারওয়া তাওয়াফ করাতে কোন গোনাহ হবে না।” (সূরা বাকারাহ : রুকু-১৯)
হজ্জের আরকান
হজ্জের হাকীকত যে সকল আরকানের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং যেগুলোর সংস্কার, সংযোজন ও বিস্তৃতির মাধ্যমে হজ্জের পরিপূর্ণতার রূপরেখা বাস্তবায়িত হয়, তা কেন শরীয়ততে বিধিবদ্ধ করা হয়েছে এর মূলে বহুবিধ উপকারিতা ও মুসলিহাত নিহিত আছে। নি¤েœ তার বিশদ বিবরণ তুলে ধরা হল।
ইহরাম
যাবতীয় কর্মকাÐ যদিও নিয়তের উপর নির্ভরশীল, কিন্তু তবু নিয়তের বিকাশ ও বহি:প্রকাশ আমল বা কাজ ছাড়া সাধিত হয় না। নামাজে তাকবীরে-তাহরীমা সেই নিয়তেরই ঘোষণা। অনুরূপভাবে ইহরামও হচ্ছে হজ্জের তাকবীরস্বরূপ। ইহরাম বাঁধার সাথে সাথে মানুষ সাধারণ জীবন যাত্রা হতে বের হয়ে একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় উপনীত হয়। এজন্য তার উপর ঐ সকল বস্তু হারাম হয়ে যায়, যা জাগতিক আয়েশ-আরাম, সুখ-সৌন্দর্য এবং চিত্তবিনোদনের উপকরণ ছিল। সে শিকার করতে পারে না। শুধু কাজ এবং বাসনার পরিতৃপ্তির জন্য কোনও প্রাণী হত্যা করতে পারে না। স্ত্রীসম্ভোগ ও আত্মতৃপ্তিকর কর্মকাÐে অংশগ্রহণ করতে পারে না। বস্তুুত: এ হচ্ছে খাহেশাতে নফসানী ও আরামপ্রিয়তাকে পরিহার করার মোক্ষম সময়। সেলাই যুক্ত কাপড় যা বিত্ত- বৈভবের প্রকাশক, তা পরিধান করতে পারে না। এ কারণেই অন্ধকার যুগ আরবরা উলঙ্গ অবস্থায় কা’বা শরীফ তাওয়াফ করত। কিন্তু আল্লাহ পাকের সন্নিধানে এটাও ছিল একটি চরম বেয়াদবী। এজন্যই ইসলামে তা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। তাই ইসলাম এ কথা নির্ধারিত করে দিয়েছে যে, ইহরামের নিয়তের সাথে সাতে ধনী, বাদশাহ, গরীব সকলেই নিজ নিজ পরিধেয় সেলাইযুক্ত কাপড় পরিহার করবে এবং মানুষের প্রাথমিক গাত্রাবরণের স্মৃতিস্বরূপ সেলাইবিহীন কাপড় পরিধান করবে। একটি কাপড় দ্বারা নাভি হতে দেহের নি¤œাংশ আবৃত করবে এ ক্ষেত্রেও মাথাকে উন্মুক্ত রাখতে হবে। এটাই হচ্ছে হযরত ইব্রাহীম (আ:)-এর সময়কালীন গাত্রাবরণের নমুনা। হজ্জের সময় এভাবে গাত্রাবরণ গ্রহণ করাকে এজন্যই বিধিবদ্ধ করা হয়েছে যেন সেই বরকতময় যুগের অবস্থা আমাদের বাহ্যিক আকার-আকৃতির মাঝে প্রকাশ পায়, যেন বিশ্ব অধিপতির দরবারে হাজিরী দেয়ার সময় একান্ত নিরহঙ্কার, নিরভিমান ও সাদা-মাটা অবকাঠামো নিয়ে উপস্থিত হওয়া যায়। কারণ অতি সাধারণ বেশ-ভুষার মাঝে দেহ-মনের বিনয়াবনতভাব সহজেই প্রকাশ পায়। (চলবে)

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ