Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট ২০১৭, ৭ ভাদ্র, ১৪২৪, ২৮ যিলকদ ১৪৩৮ হিজরী

মিরপুর বেড়িবাঁধে অপরাধীরা বেপরোয়া

| প্রকাশের সময় : ১৩ আগস্ট, ২০১৭, ১২:০০ এএম

উমর ফারুক আলহাদী : রাজধানীর মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকা অপরাধীদের যেন নিরাপধ আস্তানায় পরিণত হয়েছে। অরক্ষিত হয়ে পড়েছে পুরো এলাকা। ওই এলাকায় ছিনতাইকারী, ডাকাতদল, মাদক ব্যবসায়ী, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের আড্ডা চলে দিনে রাতে। আছে বিনোদনের নামে সড়কের উভয় পাশের ঝুপড়ি ঘরে তরুণ তরুণীদের অসামাজিক নোংরামি। ওই এলাকাটিতে পুলিশের তৎপরতা না থাকায় প্রায়ই সন্ত্রাসীরা খুন করে লাশ ফেলে যায় সেখানে। ঈদকে কেন্দ্র করে কোরবানীর পশুবাহী যানবাহনকে টার্গেট করে অপরাধী চক্র প্রতিবছরই সংঘবদ্ধ হয়ে ছিনতাই ডাকাতি করে । ঈদের আগে ও পরে বেড়িবাঁধ এলাকায় অপরাধী চক্রের তৎপরতা আরও বেড়ে যায়। গরু ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে ওই সড়কে বিভিন্ন সময় ট্রাক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। রাজধানীর দারুস সালাম, শাহ আলী, রূপনগর, তুরাগ এবং ঢাকা জেলার আশুলিয়া ও সাভার মডেল থানা পুলিশের সীমানা নিয়ে ঠেলাঠেলির কারণে পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। এমনটি দাবী করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পুলিশ ও স্থানীয় সুত্র জানা যায়, গত ৭ মাসে ওই এলাকায় কমপক্ষে দুই শতাধিক ছিনতাই ও শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ ঘটনাই পুলিশের অজানা।
এ ব্যপারে জানতে চাইলে মিরপুর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আহমেদ মিয়া গতকাল ইনকিলাবকে বলেন, ওই বেড়িবাঁধ এলাকার কিছু অংশ মিরপুর জোনে পড়েছে, কিছু অংশ ঢাকা জেলা এবং কিছু অংশ উত্তরা জোনের অধীনে। এখানে প্রায়ই ক্রাইম হয়ে থাকে। আমারা নিয়মিতই অভিযান চালিয়ে থাকি। ইতোমধ্যে বেশ কিছু অপরাধীকে গ্রেফতারও করেছি। তিনি আরো বলেন,ঈদ আসলে আমাদের পুলিশের টহল ওই এলাকায় বাড়ানো হয়, এবারও তা হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সড়কের উভয় পাশেই ঝুপড়ি ঘর আছে। আমার এলাকাতেও কিছু ঘর আছে। আমরা ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে বেশ কয়েক বার অভিযান চালিয়ে এসব ঝুপড়ি ঘর থেকে যুবক যুবতী আটক করেছি, আদালতে পাঠিয়েছি। কিন্ত স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীরা এসব ঝুপড়ি ঘর তৈরী করে ভাড়া দেয়াতে আমরা এসব অপরাধ স্থায়ীভাবে ব›দ্ধ করতে পারছি না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বেড়িবাঁধ এলাকায় তৎপর অপরাধী চক্রের সদস্যরা নানা কৌশল ব্যবহার করে। কখনও তারা প্রাইভেটকারের ওপর ঢিল ছোড়ে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে চালক গাড়ি থামিয়ে কারণ জানতে গেলে তাকে আটকে সবকিছু ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ ছাড়া ডিম ব্যবসায়ীদেরও টার্গেট করে ছিনতাইকারীরা। ডিমসহ গাড়ি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় রূপনগর থানায় একাধিক মামলা হয়েছে। অনেক সময় কৌশলে গাড়ি থামিয়ে অপরাধী চক্রের সদস্যরা ‹উলঙ্গ› হয়ে পড়ে। এরপর গাড়ি ভাংচুরের ভয় দেখিয়ে টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার কেড়ে নেওয়া হয়। আবার মাইক্রোবাস কিংবা প্রাইভেট কারে অন্য এলাকা থেকে যাত্রীদের জিম্মি করে নিয়ে আসে । তারপর ওই এলাকার নীরিবিলি স্থানে নিয়ে যাত্রীদের সব কিছু লুটে নেয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীরা জানান, ওই এলাকাটিতে নজরদারি ও জনবসতি কম হওয়ায় মাঝেমধ্যেই ছিনতাই, হত্যাসহ বিভিন্ন ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দারা সন্ধ্যার পর ওই রাস্তা দিয়ে খুব প্রয়োজন ছাড়া যাতায়াত করেন না। বিভিন্ন এলাকার অপরাধীরা রাতের বেলা মোটরসাইকেল ও মাইক্রোবাস নিয়ে এই রাস্তা দাপিয়ে বেড়ায়।
স্থানীয়রা জানান, বেড়িবাঁধ এলাকায় মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায়ী কোম্পানি মিন্টু, আনোয়ার, মুজাম, পাগলা নজরুল, আলম, মোহাব্বত, আসাদ, খাটা মাসুদ, বাগবাড়ীর ডেবড়া সুমন ও সোহেলের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা সক্রিয়। এরা পুলিশের খাতায় তালিকাভুক্ত হলেও অনেকেই অধরা। অপরদিকে ওই এলাকায় হাজি গ্রæপ, গাংচিল বাহিনীর মতো ভয়ঙ্কর বাহিনীর রয়েছে তৎপরতা। গত জানুয়ারি মাসে বেড়িবাঁধের অদূরে কাউন্দিয়া মেলারটেক এলাকায় র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে গাংচিল বাহিনীপ্রধান আনোয়ার নিহত হয়। আনোয়ার ২০০৭ সালের মার্চ মাসে দুই র‌্যাব সদস্যকে গুলি ও জবাই করে হত্যা মামলার প্রধান আসামি ছিলেন।
এদিকে মিরপুরের শাহআলী কাঁচাবাজার থেকে তুরাগ নদী অন্যদিকে উত্তরার সংযোগ সড়ক পর্যন্ত এলাকাটি বেড়িবাঁধ হিসেবে পরিচিত। বেড়িবাঁধের মিরপুর শাহ আলী মাজারের মোড় থেকে ধউর মোড় পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার সড়কটি তিনটি থানার অন্তর্গত। এর মধ্যে শাহ আলী মাজার থেকে গড়ান চটবাড়ি এলাকাটি শাহ আলী থানার আওতায়, গড়ান চটবাড়ি থেকে বিরুলিয়া রূপনগর থানা এবং বিরুলিয়া থেকে তুরাগ ধউর পর্যন্ত থানার অধীনে। বেরিবাঁধের রুস্তমপুর থেকে ইস্টার্ন হাউজিং পুলিশ চেকপোস্ট পর্যন্ত চার কিলোমিটার এলাকা অপরাধীদের ‘সেইফ জোন’। জনমানবশূন্য এ সড়কে হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা অপরাধ অনেকটা নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অভিনব উপায়ে ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছে প্রাইভেটকার, বাসচালক ও তরুণ-তরুণীরা। ট্রাক ও বাসেও ঘটছে ডাকাতি। আশপাশে বসতি কম হওয়ায় সন্ধ্যা হলেই অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় ওই এলাকা। বারবার অপরাধ সংঘটিত হওয়ায় পুলিশের কাছেও ওই চার কিলোমিটার সড়ক কালতালিকা হিসেবে পরিচিত। প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মিরপুর বেড়িবাঁধ সড়কটিতে নেই কোনো স্থায়ী পুলিশ চেকপোস্ট। বিদ্যুৎ না থাকায় সন্ধ্যার পর অন্ধকার সড়কে ছিনতাইকারীদের তৎপরতা বাড়ে কয়েকগুণ।
সপ্তাহখানেক আগের ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুই শিক্ষার্থী ঘুরতে গিয়েছিলেন মিরপুরের পেছনে তুরাগ নদী সংলগ্ন বেড়িবাঁধ এলাকায়। একটি ছৈওয়ালা নৌকা ঘণ্টায় ৪০০ টাকা চুক্তিতে ভাড়া করেন তারা। নৌকায় চড়ে কয়েকশ গজ দূরে ওপারের চরে নামেন তারা। এক পর্যায়ে নির্জন চরে নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তারা। হঠাৎ জঙ্গলের আড়াল থেকে চার থেকে পাঁচজন যুবক বের হয়ে আসেন। দুর্বৃত্তরা ছেলেটিকে জঙ্গলের ভেতর বেঁধে ফেলে। আর প্রেমিকের সামনেই মেয়েটির শ্লীলতাহানি করে। তারপর টাকা-পয়সা, মোবাইলসহ অন্য জিনিসপত্র নিয়ে চলে যায়। বেড়িবাঁধের মিরপুর-আশুলিয়া সড়কের গড়ান চটবাড়িসহ আশপাশের এলাকায় বিনোদনের নামে বেহায়াপনা করতে গিয়ে এভাবেই ধর্ষণ, ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছে তরুণ-তরুণীরা।
গত বুধবার এবং বৃহস্প্রতিবার ওই এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ছৈওয়ালা নৌকায় করে তরুণ-তরুণীরা চরে ঘুরতে যাচ্ছে। বেড়িবাঁধ চরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক ধরনের ঝুপড়ি ঘর। এসব ঘরেও সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত একান্ত সান্নিধ্যে সময় কাটানোর ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিদিনেই সেখানে চলে অনৈতিক কর্মকান্ড জানিয়েছেন স্থানীয় দুইজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
এদিকে বেড়িবাঁধ ও তুরাগ নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন রকমের ঝুপড়ি ঘরে বিনোদনের নামে চলছে নানা অপকর্ম। ঝোপঝাড় এলাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে জমজমাট মাদক ব্যবসা। মিরপুর মাজার রোডের বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের পাশ দিয়ে আশুলিয়া যেতে গড়ান চটবাড়ি এলাকায় বেড়িবাঁধের দুই পাশে অসংখ্য ঝুপড়ি ঘর নির্মাণ করে একাধিক কথিত বিনোদন স্পট গড়ে তোলা হয়েছে। বেড়িবাঁধের পাশে নিচু জমিতে বাঁশের মাচা করে এসব ঝুপড়ি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। ৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের একেকটি ঝুপড়ি ঘরে একটি ছোট টেবিল আর একদিকে দুটি চেয়ার রয়েছে। এসব ঝুপড়ি ঘরে তরুন তরুণীরা অনৈতিক কর্মকান্ড লিপ্ত থাকে। কোন ধরণের রাখ ঢাক নয় প্রকাশ্যেই চলে অনৈতিক কর্মকান্ডের লীলা খেলা। কয়েক মাস আগে হাইওয়ে পুলিশের এএসপি মিজানুর রহমান তালুকদারের লাশ উদ্ধার করা হয়। ছিনতাইকারী চক্রই তাকে হত্যা করেছে। বেড়িবাঁধে পুলিশের এএসপির লাশ পাওয়াতে ওই এলাকায় আরো বেশি অতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এর আগে গত বছরের ১৮ জুন বেড়িবাঁধসংলগ্ন তুরাগ থানা এলাকার একটি খাল থেকে বড় ধরনের অস্ত্রের চালান উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ঘটনার রহস্য এখনও বের করা যায়নি।
বেশ কয়েক মাস আগে রাতে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে মিরপুর থেকে উত্তরায় নিজ বাসায় ফিরছিলেন ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম। তাঁর সঙ্গে গাড়িতে ছিলেন স্ত্রী সন্তানসহ আরও কয়েকজন । মিরপুর বেড়িবাঁধ ধরে উত্তরা যাওয়ার পথে তুরাগের আগে আগে জায়গায় আসতেই গাড়ির ওপর ঢিল পড়তে থাকে। ঢিলের রহস্য বের করতে গাড়ি থেকে নামতেই চাপাতি নিয়ে একদল ছিনতাইকারী ঘিরে ধরে তাঁদের। তারপর তাঁরা টাকা ও মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে চলে যায়।
তুরাগ এলাকার ব্যবসায়ী আতাউর রহমান জানান, রাত নামতেই অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায় বেড়িবাঁধ সড়কে। শিন্নিরটেক থেকে আবদুল্লাহপুর এবং দীপনগর থেকে হাজারীবাগ পর্যন্ত বেড়িবাঁধ সড়কে তখন যাত্রী বা পথচারীদের জানমালের কোনো নিরাপত্তা থাকে না। ট্যাক্সিক্যাব বা ব্যক্তিগত গাড়ি দিয়ে যারা ছিনতাই করে, তারা শিকার নিয়ে চলে বেড়িবাঁধ সড়কে। টাকা-পয়সা নিয়ে যাত্রীকে বেড়িবাঁধ সড়কে ফেলে পালিয়ে যায় ছিনতাইকারীর দল। আবার বেড়িবাঁধ সড়কের পাশে মানুষ মেরে ফেলে যাওয়ার খবরও শোনা যায় মাঝেমধ্যে।
উত্তরা জোনের ডিসি জয়দেব কুমার ভদ্র বলেছেন, আমি নতুন এসেছি, মাত্র যোগদান করলাম। এ ব্যপারে আমি এখনই কিছু বলতে পারছি না। তবে শুনেছি ওই এলাকাটিতে নাকি ক্রাইম হয় বেশি। আমি আমার এলাকায় জনগণের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে যা যা করার প্রয়োজন তাই করবো। প্রয়োজনে পুলিশী টহল বাড়াবো।
এদিকে বেড়িবাঁধ সড়কের নিরাপত্তায় বেশ কয়েক জায়গায় ডিএমপির চেকপোস্ট আছে। কিন্তু রাতে টহল পুলিশ অপরাধীদের ধরতে ব্যর্থতার পরিচয় দিলেও তারা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে মিরপুরের ব্যবসায়ী শহীদুল ইসলাম বলেন, একদিন বিরুলিয়া থেকে ফিরতে তাঁর রাত হয়ে যায়। কোনো যানবাহন না পাওয়ায় আরও তিন সঙ্গী নিয়ে হেঁটেই ফিরছিলেন তিনি। বর্ধিত পল্লবীর কাছাকাছি আসতেই শার্ট-প্যান্ট পরা এক লোক নিজেকে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে তাঁদের থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তিনজন পুলিশ কনস্টেবল। শহীদুলের এক সঙ্গী সংবাদকর্মী পরিচয় দিতেই ডিবি পরিচয় দেওয়া লোকটি স্বীকার করেন তিনি ডিবির লোক নন। এখানে মাছ কিনতে এসেছেন। এভাবে বেড়িবাঁধ সড়কে রাতে তথ্যদাতা (সোর্স) বা ভুঁইফোড় লোকজন নিয়ে পুলিশ সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় করে বলে জানান শহীদুল। ##

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ