Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭, ০৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ০৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী

পীর-মুরীদি : অপপ্রচার ও জবাব

| প্রকাশের সময় : ১৫ আগস্ট, ২০১৭, ১২:০০ এএম

হাবিবুর রহমান মিছবাহ
\ শেষ কিস্তি \
শরিয়তে খিলাফাত ও পীর-মুরীদির প্রয়োজনীয়তা :
নবী করীম স. হাদিস শরীফে বলেন, আমার পক্ষ হতে একটি বাণী হলেও (জাতির মাঝে) পৌছে দাও। অন্য হাদিসে বলেন, তোমরা নামায পড়ো, আমাকে যেভাবে নামায পড়তে দেখো। এবার হাদিস নিয়ে আলোচনা করা যাক।
পীর-মুরীদি বা খিলাফাতের ধারা অব্যাহত না থাকলে, প্রথম হাদিসের দায়িত্ব নিবে কারা? আর মামুর হবে কারা? কিয়ামাত পর্যন্ত আমীর-মামুর বা পীর-মুরীদির ধারা চালু থাকতেই হবে। নাহয় এ হাদিসটির আমল হবে না। নবীজির পক্ষ হতে বাণী পৌছানো মানে কি? অর্থাৎ, রাসূল স. এর নবুয়্যতের ২৩ বছর জিন্দেগীর সকল আদেশ-নিষেধ তথা পবিত্র কোরআন ও হাদিসের বাণীগুলো মানুষের মাঝে পৌছে দেয়া। দেখুন! কতো গভীর কুট-কৌশলে তারা নবীজি স. এর হাদিস প্রচার করা বন্ধ করার পরিকল্পনা নিয়েছে। আপনাকে সুন্দর করে বুঝিয়ে বলবে যে, সামনে কোরআন হাদিস থাকতে পীর মানবো কেনো? তাদের এ কথাগুলো যদি সাধারণ মানুষ গ্রহণ করে, তাহলে আপনি এ মানুষগুলির কাছে হাদিসের দাওয়াত নিয়ে গেলে তারা তা গ্রহণ করবে না। এতে আস্তে আস্তে কোরআন হাদিসের প্রচার বন্ধ হয়ে যাবে।
দ্বিতীয় হাদিসে নবী স. যে বললেন, তোমরা নামায পড়ো, আমাকে যেভাবে পড়তে দেখো। নবীজি স. কিভাবে নামায পড়েছেন তা দেখেছেন সাহাবায়ে কেরাম রাদি.। সাহাবায়ে কেরাম রাদি. কিভাবে নামায পড়েছেন তা দেখেছেন তাবেঈগণ, এভাবে আসতে আসতে আমরা নবীজি স. এর নামাযের ত্বরীকা শিখলাম পীর-মাশায়েখ/শায়খ/উস্তাদের মাধ্যমে। এখন যদি পীর/উস্তাদ না মানি, তাহলে নামায শিখবো কি করে? বাস্তব ট্রেনিং ব্যতীত শুধু বই পড়ে পৃথিবীর কোনো মানুষ কোনো ব্যাপারে úূর্ণতা অর্জন করতে পারে না। নবীজি স. তো আমাদের মাঝে নেই, তাহলে কি আমরা নামায ব্যতীত থাকবো? নাকি যে যেভাবে পারে, সেভাবে মনগড়া নামায পড়বে? দেখা গেলো এ হাদিসটিও যদি বাস্তবায়ন করতে চাই, তাহলেও আমীর-মামূর বা পীর-মুরীদি ছাড়া হচ্ছে না। অতএব, এ ধারা যদি চালু না থাকে, তাহলে মানুষ যার যার মতো মনগড়া আমল করতে গিয়ে ঈমান হারা হয়ে যাবে।
পীর-মুরীদি নতুন কোনো ফিরক্বা নয় :
পীর-মুরীদি বর্তমান সমাজে নতুন কোনো ফিরক্বা নয়। একই গøাসে মধুও পান করা যায়, আবার মদও পান করা যায়। এতে পান করার পাত্র নিয়ে কোনো বিতর্ক চলে না। ভালো মন্দ যাচাই করতে হবে পানকারীর পানীয় নিয়ে। তদ্রুপভাবে পীরের নামে মাজার পূজা, নারী পুরুষ নিয়ে একসাথে নাচানাচি করা, মীলাদ ইত্যাদি শরিয়ত বিরোধী কাজে লিপ্ত থাকা ইত্যাদি, এগুলো বাতিল পীরের আলামত বা নমুনা। আর যারা দীনের দায়িত্ব পালনে এবং সাধারণ মানুষের আমল ও আত্মশুদ্ধির জন্য পীর-মুরীদি করে, তারা খাঁটি তথা হক পীর। এমন পীর মাশায়েখদের বিরুদ্ধে বলা মানেই দীনের বিরুদ্ধে বলা। এমনকি নবীজি স. এর হাদিস শরীফের বিরোধীতা করা। এটি সর্বজনীন প্রমাণিত যে, সাধারণ মানুষ যদি দীনের সহীহ বুঝ পেয়ে থাকে, তাহলে পীর-মাশায়েখদের মাধ্যমেই পেয়েছে। পীর-মুরীদির দলীল সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য থানবী রহ. এর- কসদুস সাবীল, শরিয়ত ত্বরীকত, তালীমুদ্দীন ইত্যাদি দেখা যেতে পারে।
এবার আসুন! পবিত্র কোরআনের আলোকে পীর-মুরীদি সম্পর্কে আলোচনা করা যাক। সবকিছুর ফয়সালা শুধু কোরআন হাদিসের শাব্দিক অর্থ দিয়ে হয় না। তাহলে ব্যাখ্যা বা তাফসীরের প্রয়োজন হতো না। তবুও আমি সরাসরি কোরআনের আয়াত দিয়েই আলোচনা শুরু করতে চাই। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কোরআনে বলেন, তিনিই প্রেরণ করেছেন নিরক্ষর লোকদের মাঝে একজনকে রাসূল রূপে, যিনি তাদের (নিরক্ষর আরবদের) সম্মুখে আয়াতসমূহ পাঠ করে শোনান, আত্মাশুদ্ধি করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমতের শিক্ষা প্রদান করেন।
[সূরা জুম’আ, আয়াত নং-২]
এখন প্রশ্ন হলো, এসব আয়াত কি রাসূল স. এর জমানা পর্যন্তই কার্যকর ছিলো? নাকি কিয়ামত পর্যন্ত কোরআনের রায় সচল থাকবে? নিশ্চয়ই কিয়ামত পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। আর যারা পীর-মুরীদি অস্বীকার করে, তারা কোরআন হাদিস মানার দাবীর আড়ালে কোরআনের এ আয়াতকে কুট-কৌশলে অকার্যকর সাব্যস্ত করতে চায় (নাউযুবিল্লাহ)।
লক্ষ্য করুন! আল্লাহ তা’আলা কোরআনের যতো জায়গায় রাসূল স. এর দায়িত্ব সম্পর্কে বলেছেন, সেখানে আত্মশুদ্ধির কথাও রয়েছে। আত্মশুদ্ধির ব্যাপারে কোরআন দ্বারা দু’টি জিনিষ প্রমাণিত হয়; ১। প্রত্যেকের জন্য আত্মশুদ্ধি করা ফরজ এবং ২। একা একা আত্মশুদ্ধি করা সম্ভব নয়। যদি হতো, তাহলে আল্লাহ তা’আলা রাসূল স.কে কোরআন পাঠ করে শোনানো, কোরআনের শিক্ষা ও কিতাবের বাস্তব প্রশিক্ষণের কথা বলেই শেষ করতেন। কিন্তু না! আত্মশুদ্ধি শুধু আমলের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য একজন শিক্ষক আবশ্যক। এজন্য আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ ফরমান, নবীজি স. মানুষের আত্মাশুদ্ধ করে দিবেন।
নবীজি স. তো আমাদের মাঝে উপস্থিত নেই। তাহলে আল্লাহ তা’আলার নির্দেশিত এ দায়িত্বও বা পালন করবে কারা? রাসূল স. বলেছেন, নিশ্চয়ই ওলামায়ে কেরাম আমার উত্তরসূরী। অর্থাৎ, নবীজির অনুপস্থিতিতে এ মহান দায়িত্ব পালন করবেন হযরত ওলামায়ে কেরাম। যারা এ দায়িত্ব পালন করেন, তাদেরকে পীর, শায়খ বা শিক্ষক/উস্তাদ বলে, আর যারা এই আলেমদের কাছে নিজের সংশোধনের জন্য যায়, তাদেরকে মুরীদ, ছাত্র বা মামূর বলে। প্রমাণ হলো, যারা পীর-মুরীদির বিরুদ্ধে বলে, তারা কোরআনের এ আয়াতের বিরুদ্ধে বললো। যারা পীর-মুরীদি বিরোধীতার অন্তরালে এরকম কোরআন হাদিসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তাদের মুসলমানিত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বাইয়াত সম্পর্কে আলোচনা :
পীর-মুরীদি সম্পর্কে যারা বিরুপ মত পোষণ করে, তারা পীরের কাছে বাইয়াতকেও অস্বীকার করে। নবীজি স. সাহাবায়ে কেরামকে বাইয়াতের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি করাতেন। আর সাহাবায়ে কেরাম এ মর্মে বাইয়াত হতেন যে, আমরা র্শিক করবো না, যেনা করবো না, মিথ্যা বলবো না, পাপ কাজ করবো না ইত্যাদি। এ বাইয়াতকে বাইয়াতে সুলূক বলে। এ বাইয়াতের মাধ্যমে মানুষের আত্মাশুদ্ধ হয়। এখন নবীজির এ দায়িত্ব পালন করবে কে? এ উত্তরও অতি সহজ। নবীজি স. এর প্রতিনিধি হযরত ওলামায়ে কেরামই এ দায়িত্ব পালন করবেন। হ্যাঁ, যিনি বাইয়াত করান তাঁকেই আমরা পীর/শিক্ষক বলি। আর যারা বাইয়াত গ্রহন করেন, তাদেরকে বলি মুরীদ বা ছাত্র। পীরের কাছে মুরীদ সকল পাপ কাজ হতে বিরত থাকার উপর বাইয়াত গ্রহন করা কি অপরাধ? পীর যদি কোরআন হাদিস অনুযায়ী মানুষকে পথ প্রদর্শণ করেন, তাহলে মুরীদের সে অনুযায়ী চলাকে আপনি কুফরী আক্বীদা বলবেন? (নাউযুবিল্লাহ)। বরং কোরআন হাদিস অনুযায়ী কেউ যদি কথা বলে, তাহলে তার কথা মানা সাধারণের জন্য ফরজ।
পীরের কাছে মুরীদ হওয়া ফরজ নয়, কিন্তু আত্মশুদ্ধি করা ফরজ। আর যে মাধ্যমে ফরজ আদায় হয়, সে মাধ্যম অবলম্বন করাও ফরজ। বরং কেউ যদি এ মাধ্যমকে অস্বীকার করে, তাহলে সে ফরজের শত্রু হিসেবেই চিহ্নিত হবে। যেমনঃ ইলমে দীন শিক্ষা করা ফরজ। মাদরাসার ঘর বানানো ফরজ নয় এবং নবীর জমানায়ও মাদরাসার ঘর ছিলো না। কিন্তু, এখন যদি কেউ বলে, মাদরাসা নবীর জামানায় ছিলো না, অতএব মাদরাসা বানানো বিদ’আত। অবশ্যই নয়। কারণ, বর্তমান যুগে মাদরাসা ছাড়া দীনি শিক্ষা অর্জন করা সম্ভব নয়। ইলমে দীন শিক্ষার মাধ্যম হিসেবেই মাদরাসা নির্মাণ করা হয়।
সুতরাং, ইলমে দীন অর্জনের মাধ্যমকে যে অস্বীকার করবে, সে ইলমে দীন শিক্ষার শত্রু হিসেবেই চিহ্নিত হবে। তদ্রুপভাবে কোরআনের ঘোষনা অনুযায়ী আত্মশুদ্ধি যেহেতু একা একা সম্ভব নয়, অথচ আত্মশুদ্ধি ফরজ, তাই আত্মশুদ্ধির মাধ্যম হিসেবেই পীরের কাছে মুরীদ হওয়া। তা ছাড়াও পীর-মুরীদি নতুন কিছু নয়। এটি নবীর যুগ থেকেই চলে আসছে। নবীজি স. পীর/শিক্ষক আর সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন মুরীদ/ছাত্র। সুতরাং, যারা পীর-মুরীদির বিরুদ্ধে বলে, তারা হাদিস মানার নামে ইসলামকে ধ্বংস করতে চায়।
শরীয়তের জাহেরী বিধানের উপর আমল করা যেমন জরুরী, তদ্রুপ ইখলাস, তাক্বওয়া, সবর, শোকর প্রভৃতি অন্তরের গুণাবলী অর্জন এবং রিয়া, হিংসা, তাকাব্বুর প্রভৃতি অন্তরের ব্যাধি দূর করা তথা শরীয়তের বাতেনী বিধানাবলীর উপর আমল করাও জরুরী। এ বাতেনী বিধানাবলীর উপর আমল করাকে তাযকিয়ায়ে নফস বা আত্মশুদ্ধি বলে। আত্মশুদ্ধির এ সাধনাকে বলা হয় আধ্যাত্মিক সাধনা। ওলামায়ে কেরাম এ আধ্যাত্মিক সাধনাকেই তাসাউফ বলেন, আর কোরআনের ভাষায় তাযকিয়াহ এবং বোখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত ঐতিহাসিক হাদিসে জিব্রাইলে ইহসান বলা হয়েছে। অতএব, কোরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত ‘আত্মশুদ্ধি’ ছাড়া দীন পরিপূর্ণ হয় না।

 


Show all comments
  • Ashraful chishti ৩০ অক্টোবর, ২০১৭, ২:২৬ পিএম says : 0
    মোহতারাম অনেক ধন্যবাদ অাপনাকে এই সুন্দর কলামের জন্য।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ