Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৫ পৌষ ১৪২৫, ১১ রবিউস সানী ১৪৪০ হিজরী

বন্যা নিয়ন্ত্রণে রূপকল্প কোথায়?

শরীফুর রহমান আদিল | প্রকাশের সময় : ২৮ আগস্ট, ২০১৭, ১২:০০ এএম

আমাদের দেশে বর্ষাকাল এলেই বন্যা দেখা দেয়। এমন হয়ে গিয়েছে, দেশে বৃষ্টিপাত হোক আর না হোক বর্ষা মৌসুমে বন্যা অপরিহার্য। কেননা পানির প্রক্রিয়া, জলবায়ুর প্রভাব আর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ প্রাকৃতিকভাবে বন্যাপ্রবণ দেশ। আর এ কারণেই পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমগুলো বাংলাদেশ আর বন্যা এই দুটি শব্দকে সমার্থক মনে করে। বাংলাদেশ ভাটির দেশ হওয়ায় তারা এমনটি মনে করে। এইবার অতিবৃষ্টির নয়, ভারতের পানিই এই বন্যার জন্য দায়ী বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। আর তাই অনেকে বাংলাদেশের বিদ্যমান বন্যাকে মানব সৃষ্ট বন্যা বলে অভিহিত করছেন। উত্তরাঞ্চচল সহ অনেক স্থানে এই উজানের পানির প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। এবারের পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টিপাত আর ভারতের উজানের পানির প্রভাব এতই বেশি যে প্রতিদিনই নিত্য-নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে আর পানি বন্দী হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। এসব মানুষেরা তাদের বসত-বাড়ি আর সম্পদ হারিয়ে তারা আশ্রয় নিচ্ছে বাধের উপর উঁচুস্থানে কিংবা খোলা আকাশের নিচে কোন সড়কের পাশে। সবকিছু হারিয়ে এসব ভানবাসি মানুষ এখন অসহায় হয়ে মানবেতর জীবন- যাপন করছে। ব্যার ভয়াবহতা দেখে কেউ কেউ ১৯৮৮ সালের বন্যার চেয়ে ভয়াবহ বন্যার আশংকা করেছেন। আর এর কারণ দুটি। প্রথমতঃ ১৯৮৭, ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালে যে ধরনের বায়ু কিংবা মৌসুমী বায়ু ও গতিপ্রকৃতি দেখা গিয়েছিলো এবছর সেই একইরকম মৌসুমী বায়ু পরিলক্ষিত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ১৯৮৮ সালের বন্যার সময় কুড়িগ্রাম ও রংপুর সড়কে পানি দেখা যায়নি। কিন্তু এবছর এইসব সড়ক পানিতে ডুবে গিয়ে খালে পরিণত হয়েছে। এ থেকে বুঝা যায় যে এবারের বন্যার ভয়াবহতা কেমন? আর এবন্যার ভয়াবহতায় দুর্যোগ মন্ত্রণালয় যে হিসাব দিয়েছে তাতে ২৬টি জেলার ৯৬টি উপজেলা প্লাবিত হওয়ার সাথে সাথে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে প্রায় ৩২ লক্ষ মানুষ। এ পরিসংখ্যান অনুসারে প্রায় ৭ লক্ষ ৫২ হাজার ৩৪৯ টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ১ লক্ষ ৬০ হাজার ৫৪৫ টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ৪ লক্ষ হেক্টর কৃষি জমি নষ্ট হওয়ার কথা কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ৮ লাখ গরু, ৫৩ হাজার মহিষ, ২ লাখ ৩৭ হাজার ছাগল, ১ লাখ ৯ হাজার ভেড়া, ২৪ লাখ মুরগী ও ৬ লাখ হাঁস মারা যায় বলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাধ্যমে জানা যায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জানা যায়, ২,৫০০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। তবে পানি বন্দী হওয়া মানুষের এই পরিসংখ্যান আরো ২৫ লক্ষ বেশি হবে। কেননা, যারা একেবারে ঘরবাড়ি হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে কেবল তাদেরকে এই পরিসংখ্যানের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে, এছাড়াও শরীয়তপুর, মাদারীপুর, হবিগঞ্জ, সিলেট, সুনামগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, মাদারীপুর প্রভৃতি অঞ্চলের মানুষের দুর্দশার কথা এ পরিসংখ্যানে আনা হয়নি। এসব মানুষের দুর্দশার চিত্র যখন দেখছি তখন অনেকেই ত্রাণের জন্য চিৎকার করে মানবতাবাদী হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। কিন্তু ত্রাণই একমাত্র সমাধান নয়। দুর্গত লোকদের ভাগ্য উন্নয়নে ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে রুপকল্প ঘোষণা করা জরুরি। আমরা আরেকটি বিষয় লক্ষ করছি আর সেটি হলো, ত্রাণ বলতে যা বুঝায় সেই শুকনো খাবারের প্রয়োজন সবর্ত্র নেই, ভুক্তভোগী কেউ কেউ বলছে, আর কতদিন এইসব শুকনো খবার খেয়ে থাকতে হবে? কেউ বলছে ত্রাণ নয় চাই বিশুদ্ধ পানি, কেউ বলছে পানি থেকে নিজেকে আর তার সম্পদ গবাদি পশুকে বাচাতে উঁচু জায়গা প্রয়োজন। আবার কেউ বলছে আামদের স্যানিটেশনের প্রয়োজন। সুতরাং সবাইর ত্রাণের প্রয়োজন আছে এমনটাও না তবে বেশিরভাগ মানুষেরই ত্রাণের প্রয়োজন কিন্তু যে পরিমাণ ত্রাণের প্রয়োজন সে পরিমাণ ত্রাণ এখনো সরকার নিশ্চিত করতে পারেনি। সরকারি হিসেবে ৩৩ লক্ষ আর বেসরকারি হিসেবে ৫০ লক্ষ মানুষ পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করলেও নেই সরকারি পর্যাপ্ত ত্রাণের ব্যবস্থা, তবে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু ত্রাণের ব্যবস্থা করলেও বেসরকারি এনজিও সংস্থাসমূহের পক্ষ থেকে এখনো কোন ত্রাণের তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়নি। আর মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসা মানুষের দেওয়া ত্রাণ আর সরকারি বরাদ্দ ত্রাণ দিয়ে কিছু হচ্ছে না এসব অঞ্চলের লোকদের। অর্থাৎ ত্রাণের অপ্রতুলতা থেকেই যাচ্ছে। কেননা, একটি গ্রামে বর্ন্যাত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার এবং এরা পানি বন্দী অবন্থায় রয়েছে পাঁচ দিন কিন্তু ত্রাণের সাহায্য এসেছে মাত্র ১০০ কেজি চাল! এ ধরনের ত্রাণ সত্যিই অপ্রতুল। আবার সরকারের পক্ষ থেকে যে পরিমাণ ত্রাণ কিংবা আর্থিক সাহায্য আসছে তা যথাযথ ভাবে প্রদান করা হচ্ছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা দরকার। অন্যদিকে, সুপেয় পানিরও রয়েছে ব্যাপক সংকট ১ হাজার ৫৯৯টি আশ্রয়কেন্দ্রের জন্য পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্ট রয়েছে মাত্র ৭টি। আর যারা আশ্রয়কেন্দ্রে স্থান পায়নি তাদের অবস্থা বর্ণনা নাই করলাম। তাদের এ অবস্থা দেখে মনে প্রশ্ন জাগে, উত্তরবঙ্গ সহ এসব অঞ্চলের মানুষগুলো শুধুই কি কষ্ট আর যন্ত্রণা সহ্য করবে? আমরাও কি কেবল ত্রাণের মাধ্যমে করা সাহায্য আর সহানুভূতি নিয়ে বাঁচিয়ে রাখবো? তারা কি রাষ্ট্রের করুণা হয়ে বেঁচে থাকবে? তারা কি প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পত্রিকা আর ইলেট্রনিক মিডিয়ার শিরোনাম হবে? তাদের জন্য স্থায়ী কোন সমাধান কি কখনো হবে না? এসব মানুষদের জন্য আমাদের কি কোনই দায়বদ্ধতা নেই? উত্তরাঞ্চলের মানুষের এত দুর্দশা হওয়ার পরও সরকারের উচ্চ পদস্থ কোন কোন ব্যক্তি এবং কিছু মন্ত্রী বলেছেন, দেশে ঐ ধরনের কোন বন্যা নেই। ঢাকায় বসে এ ধরনের মন্তব্য করাটা একেবারেই স্বাভাবিক। তারা ঢাকার বন্যাকে যেমন জলাবদ্ধতা ভাবেন ঠিক তেমনি উত্তরাঞ্চলের বন্যাকে একইভাবে ধারণা করেন। কে না জানে, সরকার পরিবর্তন হলেও উত্তরাঞ্চলের বন্যা নিয়ন্ত্রণে কেউ কার্যত কোন পদক্ষেপ নেয়নি। যদিও দেশ উন্নয়নের বলি শোনানো হয়েছে বহুবার। রাস্তা ঘাট ব্রিজ-কালভাট আর কয়েকটা ফ্লাইওভার নির্মাণে সব অঞ্চলের মানুষের কিছুটা সুবিধা হলেও উত্তরাঞ্চলের মানুষদের খুব বেশি উন্নয়ন হয়েছে বলে কেউ বলতে পারবে না। প্রশ্ন হলো, এতো উন্নয়ন হলে কেন মানুষের এতো হাহাকার? কেন উন্নয়ন সত্তে¡ও দেশ ভাসছে পানিতে? কেন দেশ ডুবছে পানিতে? আর মানুষের লাশ ভাসছে পানিতে? কেন মৃত মানুষগুলোকে কবর দেওয়ার জায়গা নেই? এসব অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য নিয়ে সাপলুডু খেলা কেন?
দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের প্রধানমন্ত্রী চ্যাম্পিয়ান অব দ্যা আর্থ পুরস্কার পেয়েছেন। সুতরাং বন্যার্ত মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও দুর্যোগ মোকাবেলায় টেকসই সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি। অন্যথায় তার এই অর্জন নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হওয়া সত্তে¡ও নদীগুলোর দূষণরোধ কিংবা ভরাটরোধে নেই কোন তৎপরতা। আর এইসব কর্মকান্ড যারা পরিচালনা করে যাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধেও নেই কোন আইনানুগ ব্যবস্থা। সরকার কেবল সড়ক পথেই উন্নতি সাধন করছে কিন্তু নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় নদীগুলোর প্রতি সরকারের উদাসীনতা বারবার পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিছু সামাজিক আন্দোলন চললেও সরকারিভাবে নেই কোন আইনানুগ ব্যবস্থা। আইনানুগ কোন ব্যবস্থা না নিলে নদী, খাল ভরাট চলতে থাকবে আর এ ধরনের বন্যা প্রতিবছর আরো সীমাহীন দুর্ভোগের সৃষ্টি করবে। ত্রাণ নির্ভর করুণা নয় বরং এসব অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে রূপকল্প-২০১৯ ঘোষণা চাই। অন্যথায় এসব অঞ্চলের মানুষের দুঃখ-কষ্ট কখনোই লাঘব হবে না। আর সত্যি যদি এসব অঞ্চলের মানুষের দুঃখ কষ্ট লাগব করতে হয় তবে বন্যা নিয়ন্ত্রণে টেকসই রূপকল্প এখনই হাতে নিতে হবে আর সাময়িকভাবে এসব ভুক্তভোগীদের জন্য আলাদা ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে বিশ^ব্যাংক ও জাইকা বন্যার্ত মানুষদের জন্য যে অর্থ সহায়তা দিচ্ছে তার সাথে সরকারের পক্ষ থেকে আরো দ্বিগুণ যোগ করে ভুক্তভোগী পরিবারের হাতে তা তুলে দিতে হবে। আর বন্যা নিয়ন্ত্রণ কিংবা সমাধানে আরো বেশি গবেষণা ও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
লেখক : শিক্ষক , গবেষক ও কলামিস্ট



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর