Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২০, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭, ২০ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

খুলনাঞ্চলে অসাধু চিংড়ি ব্যবসায়ীদের পুশপ্রথা অপ্রতিরোধ্য

দফায় দফায় অভিযান জেল জরিমানা অব্যাহত

| প্রকাশের সময় : ২৯ আগস্ট, ২০১৭, ১২:০০ এএম

আবু হেনা মুক্তি: বৃহত্তর খুলনাঞ্চলে অসাধু চিংড়ি ব্যবসায়ীরা শত কড়াকড়ির মাঝেও অপ্রতিরোধ্য। র‌্যাব পুলিশ মৎস্য অধিদপ্তর দফায় দফায় অভিযান চালিয়েও চিংড়িতে পুশ প্রথা যেন বিলীন করা যাচ্ছে না। খুলনার অভিজাত হোটেল রেস্তোরাতেও পুশকৃত চিংড়ি সরবরাহ হচ্ছে। মাঠ পর্যায় থেকে ফিস প্রসেসিং কোম্পানীগুলো পর্যন্ত সর্বত্র পুশকৃত চিংড়ির ছড়াছড়ি। এ এক মহামারি রোগের মত। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা একে মহাবিপর্যয়ের সাথে তুলনা করেছেন। চিংড়িতে পুশ করে বাজারজাতের মাধ্যমে অসাধু সিন্ডিকেট চক্র রাতারাতি কোটি টাকার মালিক বনে যাচ্ছে। আর প্রকৃত ব্যবসায়ীরা হতাশ হয়ে পড়ছে। বিদেশীদের কাছে দেশের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের এই বৃহৎ খাতকে যারা প্রশ্নবিদ্ধ করছে তাদেরকে একেবারেই কেন নিবৃত করা যাচ্ছে না তা জনগনের বোধগম্য নয়।
সুত্রমতে, র‌্যাব পুলিশ ও জেলা প্রশাসন স¤প্রতি রূপসা এলাকায় বেশ কয়েকটি অভিযান চালিয়ে কয়েক লক্ষ টাকার পুশকৃত বাগদা ও গলদা চিংড়ি জব্দ করেছে। সিলগ্যালা করেছে ডিপোগুলোকে এবং উদ্ধার করেছে পুশকরা সিরিঞ্জ, জেলী, জেলী জ্বালানো গ্যাসের চুলা ও হাড়ি পাতিল। এসময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দ্বারা ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে জেল ও জরিমানা করা হয়। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গত সপ্তাহে খুলনার একটি অভিজাত হোটেলে অভিযান চালিয়ে কয়েক মণ পুশকৃত চিংড়ি মাছ উদ্ধার করা হয়। ভ্রাম্যমান আদালত তাদেরকেও জরিমানা করে। তথাপি মৎস্য কর্তৃপক্ষ ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্যোগকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর পুশ প্রথা এখনও অব্যাহত রয়েছে। ইতোপূর্বেও মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগ এবং বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস্ এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশনের পাশাপাশি খুলনা চিংড়ি বণিক সমিতি ও রূপসা চিংড়ি বণিক সমিতি কর্তৃপক্ষ পুশ বিরোধী অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু পুশকৃত মাছ উদ্ধার করে নষ্ট করেছে। পাশাপাশি কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ীকে জরিমানাও করে মৎস্য বিভাগ। এছাড়া মৎস্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত¡াবধায়নে পরিচালিত ভ্রাম্যমান আদালত গত একবছরে প্রায় অর্ধকোটি টাকা জরিমানা করে।
চিংড়ির পুশ প্রথার কুফল দিক নিয়ে চলছে প্রচার প্রচারনা। সম্ভাবনাময় এ খাতকে কলঙ্কিত না করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগ, বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস্ এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশন, খুলনা চিংড়ি বণিক সমিতি ও রূপসা চিংড়ি বণিক সমিতির পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন যাবত পত্র-পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত চিংড়িকে রক্ষায় ব্যবসায়ীদের সকল প্রকার পুশপ্রথা থেকে বিরত থাকার আহবান জানিয়ে সচেতন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ওই বার্তায় বলা হয়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত চিংড়ির প্রায় একশ’ ভাগই রপ্তানী হয় উন্নত বিশ্বের খাদ্য হিসেবে। বিদেশীরা তাঁদের ল্যাবরেটরীতে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে শুধুমাত্র মানসম্মত চিংড়ি খাদ্য হিসেবে তাঁদের দেশে বাজারজাতকরণের জন্য অনুমোদন দেয়। অতীতে এদেশ থেকে রপ্তানীকৃত চিংড়ির কোন কোন কনসাইনমেন্টের গুণগত মান আশানুরূপ না হওয়ায় ইউরোপ ও আমেরিকায় এদেশের চিংড়ি রপ্তানী প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। যার ফলে ২০০৯ সালের জুন মাস থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ইউরোপে সাময়িকভাবে গলদা চিংড়ি রপ্তানী বন্ধ করতে হয়েছিল।
কিন্তু বহু প্রচেষ্টার পর সরকারী ও বেসরকারীভাবে ইউরোপীয় কমিশনের সঙ্গে অনেক দেন দরবার করে উক্ত রপ্তানী আবার চালু করা সম্ভব হয়। এখন মানসম্মত চিংড়ি রপ্তানী করতে পুনরায় ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের চিংড়ি বিদেশে রপ্তানী চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে হ্যাচারী, চিংড়ি চাষ, ফিড মিল, ডিপো ব্যবসায়ী, বরফকল, চিংড়ি পরিবহন ও মাছ রপ্তানীকারক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে এবং দেশের প্রায় এক কোটি লোক বেকার হয়ে পড়বে। আর বন্ধ হয়ে যাবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ।
মৎস্য বিশেষজ্ঞরা রপ্তানির স্বার্থেই অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উপর গুরুত্বারোপ করে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, কোন অবস্থায় যেন অসাধু ব্যবসায়ীরা চিংড়ির দেহে পানি, ভাতের মাড়, সাবু, এরারুট, লোহা বা সীসারগুলি, মার্বেল, ম্যাজিকবলসহ অনাকাঙ্খিত পদার্থের দ্বারা পুশ করে চিংড়ির ওজন বাড়িয়ে অধিক মুনাফা অর্জনের চেষ্টা না করে। রাসায়নিক তরল পদার্থের মধ্যে চিংড়ি ভিজিয়ে রেখে ওজন বাড়াবার চেষ্টা না করা প্রভৃতি।
কসমস সী ফুডের এমডি মো: মনির হোসেন ইনকিলাবকে বলেন, জেলা প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার অভিযানকে আমরা স্বাগত জানাই। এ অভিযানের ফলে পুশ প্রথা অনেকাংশে কমে গেছে। তবে প্রয়োজন জন সচেতনতা। আর এই সচেতনতা অনেকটাই ফিরে এসেছে ব্যবসায়ীদের মাঝে। নিজেদের স্বার্থে এবং দেশের স্বার্থে পুশপ্রথা বন্ধ এখন সময়ের দাবি।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: খুলনা

১৭ ডিসেম্বর, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ