Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৬ জামাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী।
শিরোনাম

কোরবানীর চামড়া নিয়ে সিন্ডিকেট

| প্রকাশের সময় : ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

দেশের চামড়াশিল্প আভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে শতকোটি ডলারের রফতানী আয় করছে। পশ্চিমা বাজারে বাংলাদেশি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে দেশের চামড়াশিল্প রফতানী বাণিজ্যে বিপুল সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষত: বিশ্বের প্রধান জুতা রফতানীকারক দেশ চীনের চামড়া রফতানীবাজার ক্রমে হ্রাস পাওয়ায় তার ছেড়ে দেয়া আন্তর্জাতিক বাজারের হাতছানি বাংলাদেশের রফতানীকারকদের পক্ষে যায়। তবে চামড়াশিল্পে কার্যকর নজরদারি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতার কারণে এ শিল্পের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছেনা। আর চামড়া শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টদের সিন্ডিকেটেড কারসাজির কারণে কৃষক এবং প্রান্তিক চামড়া ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। বিশেষত: কোরবানীর ঈদই হচ্ছে দেশের চামড়াশিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহের সবচেয়ে বড় উৎস। চামড়াশিল্পে সারা বছরের সংগৃহিত চামড়ার ৬০ শতাংশের বেশী আসে ঈদুল আজহায় কোরবানীর পশু থেকে। গরু, মহিষ, ছাগল-ভেড়া মিলিয়ে প্রায় এককোটি পশু কোরবানী হয়ে থাকে। এ থেকে গড়ে প্রায় ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া শিল্পে যুক্ত হয়। কোরবানী ঈদের চামড়া বাজারের সাথে যুক্ত আছে দেশের হাজার হাজার দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লিল্লাহ বোর্ডিং, এতিম, মিসকিন ও দু:স্থ মানুষের স্বার্থ। ঈদের চামড়া সংগ্রহ নিয়ে কারসাজি ও সিন্ডিকেটবাজি আগেও ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চামড়া ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট মূল্যে ধস নামিয়ে কাচা চামড়াকে প্রায় মূল্যহীন বস্তুতে পরিনত করেছে। তবে দেশিয় বা আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া বা চামড়াজাত পণ্যের মূল্য বেড়েই চলেছে।
চামড়া ব্যবসায়ীদের মূল্য কারসাজির সাথে সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতি নির্ধারকরাও কি জড়িত থাকেন? এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। কারণ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোরবানী ঈদের আগে চামড়ার যে মূল্য নির্ধারণ করা হয় তাতে দেখা যাচ্ছে প্রতিবছরই মূল্য কমিয়ে নির্ধারণ করা হচ্ছে এবং প্রান্তিক বাজারে সেই নির্ধারিত মূল্য থেকেও অনেক কমমূল্যে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে সাধারণ মানুষ। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, ২০১৩ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৮৫-৯০ টাকা, ২০১৪ সালে তা কমিয়ে ৭০ থেকে ৭৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পরের বছর তা আরো কমিয়ে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা এবং চলতি মওসুমে তা ৫০ থেকে ৪০ টাকায় নির্ধারণ করা হয়। চামড়ার আন্তর্জাতিক বাজারে এবং চামড়াজাত পণ্যের মূল্য না কমলেও শুধুমাত্র ঈদের মওসুমে এই মূল্যকারসাজি এবং মধ্যস্বত্বভোগিদের সিন্ডিকেটেড চামড়া ব্যবসার কারণে দেশের অবহেলিত, অনগ্রসর কোটি কোটি মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠি ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ভরণ পোষণ ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র এখনো অক্ষম। আমাদের সমাজের দানশীল ও ধর্মপ্রান মানুষ তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। কোরবানীর চামড়া সেই সাহায্যের একটি বড় উৎস।
সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু পাঠানো বন্ধ করে দেয়া হলেও ভারতের চামড়া শিল্পের কাঁচামালের একটি অংশ বাংলাদেশ থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। এ কারণেই প্রতিবছরই কোরবানীর ঈদের আগে সীমান্ত পথে চামড়া চোরাচালান বন্ধে পুলিশ ও সীমান্তরক্ষিদের বাড়তি তৎপরতার কথা বলা হয়। তবে কাঁচা চামড়ার মূল্য অস্বাভাবিক হারে কমিয়ে নির্ধারণ করা এবং মধ্যস্বত্বভোগিদের সিন্ডিকেটেড কারসাজির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ এবং মওসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা কিছুটা বাড়তি মূল্যের প্রলোভনে চামড়া চোরাচালান এজেন্টদের কাছে চামড়া বিক্রি করলে তা’তে বিষ্ময়ের কিছু নেই। প্রথমত: সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল বছরের এই সময়ে চামড়ার মূল্য ও বাজারের সাথে কোটি কোটি প্রান্তিক হতদরিদ্র ও ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের স্বার্থের বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। দ্বিতীয়ত: কাচা চামড়ার মূল্য অস্বাভাবিক কমিয়ে নির্ধারণের ফলে চোরাচালান বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং যথাযথ নজরদারির বিষয়েও তাদের ব্যর্থতা লক্ষ্যনীয়। অন্যদিকে সাভারে চামড়াশিল্প স্থানান্তর প্রক্রিয়া ও অস্বাভাবিক সময়ক্ষেপন ও স্বেচ্ছাচারিতার ধারাবাহিক ঘটনাবলী সামগ্রিকভাবে দেশের চামড়া শিল্পের উপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করছে। এতকিছুর পরও আমাদের চামড়াশিল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বেড়েই চলেছে। আগামী দশকে চামড়া শিল্প থেকে কমপক্ষে ৫ বিলিয়ন ডলার রফতানী আয়ের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ধান, পাট ও লবণ চাষিদের মত চামড়ার প্রান্তিক যোগানদাতারা মূল্য কারসাজি ও মধ্যস্বত্বভোগিদের খপ্পরে পড়েছে। চামড়ার বাণিজ্যিক সম্ভাবনার পাশাপাশি কোরবানীর পশুর চামড়ার সুবিধাভোগি হতদরিদ্র ও এতিম-মিসকিনদের অধিকার বঞ্চনার এহেন কর্মকান্ড বন্ধ করতে হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: কোরবানী

১৭ আগস্ট, ২০১৮
১৫ আগস্ট, ২০১৮

আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ