Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৭, ০৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ০৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৯ হিজরী

রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সক্রিয় হতে হবে

কামরুল হাসান দর্পণ | প্রকাশের সময় : ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭, ১২:০০ এএম

বছর দুয়েক আগে সমুদ্র সৈকতে নিথর হয়ে পড়ে থাকা ফুটফুটে শিশু আয়লানের লাশ দেখে বিশ্ব বিবেক কেঁপে উঠেছিল। সিরিয়া থেকে পরিবারের সাথে নৌকায় চড়ে ইউরোপ পাড়ি দিতে গিয়ে সলিল সমাধি হয়েছিল আয়লানের। সমুদ্রের ঢেউয়ে উপকূলে ভেসে আসে তার লাশ। উপুড় হয়ে পড়ে থাকা তার এ ছবি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে বিবেকবানদের মধ্যে হাহাকার উঠে। কিছুতেই যেন আয়লানের এই মৃত্যু মেনে নেয়া যাচ্ছিল না। অথচ তার এভাবে ডুবে যাওয়ার কথা ছিল না। বাবা-মায়ের কোলেই অতি আদর-যতেœ তার থাকার কথা ছিল। স্ত্রী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদীদের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে পিতা আয়লানকে নৌকায় তুলে দিয়েছিলেন। পিতার এ চেষ্টা সফল হয়নি। আয়লান বাঁচেনি। তার নিথর দেহ নিয়ে পিতার আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠেছিল। আয়লানের মতো এমন অনেক শিশুর লাশ গত সপ্তাহে বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলে ভেসে আসতে দেখা যায়। ফুটফুটে এসব শিশুর লাশ পানি থেকে তুলে মাথায় নিয়ে আসার দৃশ্য পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। আয়লানের মতো সমুদ্র সৈকতে পড়ে থাকার ছবিও ছাপা হয়েছে। তাদের লাশ বিশ্ব বিবেককে এতটুকু বিচলিত করতে পারছে না। কেবল আমাদেরই মন ও আত্মা হু হু করে উঠেছে। যে শিশুদের লাশের কথা বলছি, তারা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা। বলা যায়, এই মুহূর্তে রোহিঙ্গাদের মতো সবচেয়ে অসহায় এবং নিপীড়িত জনগোষ্ঠী বিশ্বে আর কোথাও নেই। যে দেশের নাগরিক তারা, সে দেশেরই সরকার তাদের উপর গণহত্যা চলাচ্ছে। দেশটির সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনী এতটাই নৃশংস ও বর্বর ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে যে, তার নজির সমসাময়িক কালে বিরল। এমনও নয় যে রোহিঙ্গারা কোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠী বা তারা সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের একটাই দোষ, তারা মুসলমান এবং মিয়ানমারে বসবাস করছে। ক্ষুদ্র এই জনগোষ্ঠীকেই মিয়ানমার সরকার মানতে চাচ্ছে না। সে মনে করছে, রোহিঙ্গারা অন্য কোনো দেশ থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। কাজেই তাদের এ দেশ ত্যাগ করতে হবে, না হয় মরতে হবে। এ কাজটিই এখন দেশটির সরকার করছে। রোহিঙ্গাদের নির্মূলে এমন কোনো হিং¯্র পন্থা নেই যা অবলম্বন করা হচ্ছে না। হত্যা, ধর্ষণ, ঘরবাড়ি ও গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া এবং পলায়নপরদেরও পাখির মতো গুলি করা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের এ পৃথিবীতে বসবাস করতে দিতে চাইছে না মিয়ানমার সরকার। একটি সরকার কতটা অসভ্য ও বর্বর হলে পারে যে নিজ দেশের নাগরিকদের এভাবে নির্মূলীকরণ প্রক্রিয়ায় মেতে উঠতে। এর একটি অন্যতম কারণ এই, মিয়ানমার সরকার চাচ্ছে, দেশটিতে মাত্র একটি ধর্মই থাকুক। ইতোমধ্যে পরোক্ষভাবে দেশটিকে ওয়ান রেলিজিয়ন, ওয়ান স্ট্যাট হিসেবে প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা মিয়ানমারকে একটি বৌদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়। বৌদ্ধ ধর্ম ছাড়া আর কোনো ধর্ম থাকবে না। এ লক্ষ্য সামনে নিয়ে দেশটির সরকরের পাশাপাশি উগ্রপন্থী বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্মূল কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
দুই.
ইতিহাস বলে, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারেরই আদিবাসি এবং এখানেই শত শত বছর ধরে বসবাস করে আসছে। তারা ৮ম শতাব্দী থেকে আরাকান অঞ্চলে বসবাস করে আসছে। পরবর্তীতে ১৪৩০ সালে আরাকান শাসক বৌদ্ধরাজ নারামাইখলা রোহিঙ্গা মুসলমানদের এ অঞ্চলে নিয়ে এসেছিলেন এবং বসবাসের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। সংক্ষেপে রোহিঙ্গাদের আদি ইতিহাস এটাই। অথচ মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর শান্তিতে নোবেল জয়ী অং সান সুচি বলেছেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক নন। তারা বাঙ্গালি। একটি দেশের নেত্রী যদি তার দেশের একটি জনগোষ্ঠী সম্পর্কে এমন অসত্য মন্তব্য ও ইতিহাস বিকৃতি করেন, তবে বুঝতে হবে তিনি চাচ্ছেন রোহিঙ্গাদের নির্মূল ও বিতাড়ন করতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে রোহিঙ্গাদের অস্বীকার করার বিষয়টি স্পষ্ট হয় ২০১৪ সালে দেশটির প্রথম আদমশুমারির সময়। এতে দেখা যায়, মিয়ানমারের মোট জনসংখ্যা ৫ কোটি ১০ লাখ। এর মধ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ১০ লাখ। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী হিসেবে ১৩৫টিকে চিহ্নিত করা হয়। দেখা যায়, এর মধ্যে রোহিঙ্গাদের স্বীকৃতি নেই। বলা বাহুল্য, এরপর থেকে নতুন করে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের উৎখাতের পরিকল্পনা শুরু হয়। গত বছর অক্টোবরে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী চৌকিতে হামলাকে উসিলা ধরে রোহিঙ্গাদের উপর শুরু হয় স্মরণকালের ভয়াবহতম হত্যাযজ্ঞ। এতে সেনাবাহিনী, পুলিশসহ মগ দস্যু ও উগ্রপন্থী বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও অংশগ্রহণ করে। তাদের নৃশংস হত্যাকাÐের পাশাপশি ধর্ষণ, লুণ্ঠণ, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়াসহ এমন কোনো অত্যাচার নেই যা তারা করেনি। এতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা প্রাণভয়ে পালাতে থাকে। স্থলপথে, নৌপথে পালাতে গিয়েও হত্যার শিকার হয় রোহিঙ্গারা। এমনকি নৌপথে নৌকা ডুবিয়ে হত্যা করা হয়। সে সময় থাইল্যান্ড ও চীন সীমান্ত পথ খুলে দিলে কিছু রোহিঙ্গা সেখানে গিয়ে আশ্রয় নেয়। বাকিরা বাংলাদেশে ছুটে আসে। অং সান সুচির ক্ষমতাসীন হওয়ার পরপর রোহিঙ্গাদের উপর এমন নৃশংস আক্রমণের কারণে তাকে নিয়ে বিশ্বব্যাপী সমালোচনার ঝড় উঠে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, তিনি যখন গৃহবন্দী ছিলেন, তখন বাংলাদেশের মানুষ তার পক্ষাবলম্বন ও সমর্থন করে। গণতন্ত্রের মানসকন্যা হিসেবে তাকে শ্রদ্ধা করে। বিশ্বব্যাপী তার মুক্তি কামনা করা হয়। এমনকি শান্তির জন্য তাকে নোবেল পুরস্কার পর্যন্ত দেয়া হয়। অথচ সেই অং সান সুচিই কিনা রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যাযজ্ঞে নিশ্চুপ থেকে সমর্থন দিয়ে যান। তাকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে, তিনি বিরক্তি প্রকাশ করে বলেছিলেন, আমি এ নিয়ে কোনো কথা শুনতে চাই না। এতে সারা বিশ্বে নিন্দার ঝড় উঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহারের জোরালো দাবী উঠে। তাকে অশান্তির দূত হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। এত নিন্দার মধ্যেও তার কোনো ভ্রæক্ষেপ ছিল না। জাতিসংঘ কফি আনানের নেতৃত্বে তদন্ত কমিশন গঠন করে দিলে, তাকে সরজমিনে পরিদর্শনে উগ্রপন্থী বৌদ্ধরা বাধা দেয়। এ ব্যাপারেও সুচি নিশ্চুপ ছিলেন। এখন তিনি আরও প্রকাশ্যে এসে বলেছেন, রোহিঙ্গারা বাঙ্গালি সন্ত্রাসী। এর অর্থ হচ্ছে, তাদের নির্মূলে যা করা দরকার তাই করা হবে। করাও হচ্ছে তাই। রোহিঙ্গাদের উপর কী বর্বরতা চলছে, তার খবরাখবর সংগ্রহ করতেও দেয়া হচ্ছে না। শুধু যারা পালিয়ে এসেছে, তাদের মুখের বিবরণ থেকেই জানা যাচ্ছে। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গাদের শিরñেদ ও কেটে দ্বিখÐিত করছে। শিশুদের আগুনে নিক্ষেপ করে হত্যা করছে। সর্বশেষ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে, আরাকানের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে বাড়িঘর ও গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের উপর এমন ঘৃন্যতম গণহত্যা ও নির্যাতন অং সান সুচির অজানা নয়। তিনি নিশ্চুপ আছেন এবং বলা যায় এ গণহত্যা উপভোগ করছেন। রোহিঙ্গাদের উপর চলানো গণহত্যা ও নির্মূলীকরণের কারণে সুচি কি কাঠগড়ায় দাঁড়াবেন না? ইতিহাসে এমন নজির রয়েছে, যারাই গণহত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমরা যদি বসনিয়ার দিকে তাকাই, তবে দেখব সেখানে সার্বরা মুসলমানদের নিজ বাসভূম থেকে উৎখাত করেছিল। হাজার হাজার মুসলমানকে হত্যা করেছিল। সেই গণহত্যাকারী সার্ব জেনারেলদের নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার হয়েছিল। রোহিঙ্গাদের উপর যে গণহত্যা চালানো হচ্ছে এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নেতৃত্বদানকারীদের নিশ্চয়ই একদিন আন্তর্জাতিক বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
তিন.
অসহায় রোহিঙ্গাদের যাওয়ার মতো এক বাংলাদেশ ছাড়া আর কোনো জায়গা নেই। চীন ও থাইল্যান্ডে যাওয়ার পথ থাকলেও দেশ দুটি তাদের সীমান্ত বন্ধ রেখেছে। ফলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নিরুপায় হয়ে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশের দিকে ছুটছে। বাংলাদেশ এতদিন মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও এখন আর সম্ভব হচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের ভার বহন করার মতো সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। ফলে সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করতে বাধ্য হয়েছে। তারপরও রোহিঙ্গারা যে যেভাবে পারছে ঢুকে পড়ছে। মুসলমান হিসেবে বাংলাদেশের মানুষকেই তাদের বেশি আপন মনে হয়। বিষয়টি অনেকটা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে ভাইয়ের দেশে এসে মরতে পারলেও শান্তি পাওয়া যাবে। রোহিঙ্গাদের এমন মনোভাবের কারণে বাংলাদেশ অপারগ হওয়া সত্তে¡ও আশ্রয় দিচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। পরিবার-পরিজনহারা একেবারে নিঃস্ব এসব মানুষের আর কী করার থাকতে পারে। বাংলাদেশের এ ভূমিকাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় স্বাগত জানিয়েছে। তারা বাংলাদেশকে ধন্যবাদও জানিয়েছে, পাশাপাশি মিয়ানমারের নিন্দা করেছে। বলা বাহুল্য, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এ ধন্যবাদ বাংলাদেশের বোঝা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ তারা রোহিঙ্গা নির্মূল ও বিতাড়ন বন্ধে মিয়ানমার সরকারকে বাধ্য করার কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। কেবল নিন্দাজ্ঞাপনের মধ্য দিয়েই দায় সারছে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের এ ভূমিকাকে লোক দেখানো ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে! তাদের ভূমিকা দেখে মনে হচ্ছে, তারা চাচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করা হোক। যদি তা না হতো, তবে অবিলম্বে আরাকানে গণহত্যা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিত। এক্ষেত্রে আমরা কিছু ব্যতিক্রম দেখছি। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান মিয়ানমারকে বেশ কড়া হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, মুসলমান হত্যা ও নির্যাতন বন্ধ করতে। তা নাহলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদকে ফোন করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বাংলাদেশকে সহায়তার অঙ্গীকার করেছেন। ইন্দোনেশিয়াও এ ব্যাপারে সোচ্চার রয়েছে। গত সপ্তাহে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেনতো মারশুদি মিয়ানমার সফর করে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন বন্ধের আহŸান জানিয়েছেন। সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ। দেশটি মিয়ানমারের সাথে সব ধরনের বন্ধ করে দিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিবৃতিতে বলেছে, মিয়ানমারে রক্তপাত বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রæত এবং দৃঢ়ভাবে কাজ করতে হবে। এর অংশ হিসেবে মালদ্বীপ সরকার মিয়ানমারের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অত্যাচার বন্ধ না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত অব্যাহত থাকবে। কিরগিজস্তানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও রোহিঙ্গা হত্যা ও নির্যাতনের প্রতিবাদ করে সাধারণ মানুষ। এর ফলে মিয়ানমারের সাথে একটি আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ বাতিল করে কিরগিজস্তান। তবে বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরিভাবে রোহিঙ্গা সমস্যা আন্তর্জাতিক অঙ্গণে তুলে ধরতে পারছে না বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। এক্ষেত্রে পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত ২১ জুন বিবিসি বাংলার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচটি ইমাম বলেছেন, রোহিঙ্গা ইস্যু ঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারেনি বাংলাদেশ। যেরকমভাবে রোহিঙ্গা ইস্যু প্রকাশ্যে নিয়ে আসা উচিত ছিল এবং বিভিন্ন মহলের যেরকম চাপ দেয়ার কথা ছিল, সেরকমভাবে করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা যখন এ কথা বলেন, তখন পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতার বিষয়টিই ফুটে উঠে। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি বাংলাদেশ সীমান্তে মিয়ানমারের সাথে জঙ্গী ও সন্ত্রাসী দমনে যে যৌথ অভিযানের প্রস্তাব দেয়, এটাও সঠিক হয়নি। এ ধরনের প্রস্তাব অদূরদর্শী এবং অনাকাক্সিক্ষত হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এছাড়া মিয়ানমারের হেলিকপ্টার বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বিলম্বে প্রতিবাদ করা হয়েছে। পররাষ্ট্রনীতির এ ধরনের দুর্বলতা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। বাংলাদেশের উচিত হবে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে বিষয়টি জোরালোভাবে উপস্থাপন করা। এতে বাংলাদেশের কী সমস্যা হচ্ছে, তা তুলে ধরে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। তা নাহলে মিয়ানমার আস্কারা পেয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিতে উঠেপড়ে লাগবে। ইতোমধ্যে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের বাঙ্গালি এবং বাঙ্গালি সন্ত্রাসী ঘোষণা দিয়েই তাদের হত্যা, নিপীড়ন ও নির্যাতনের মাধ্যমে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য করছে। বাংলাদেশকে অবশ্যই এর জোরালো প্রতিবাদ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সাথে নিয়ে এর দ্রæত মোকাবেলা করতে হবে।
চার.
বাংলাদেশে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা অনেক বছর ধরেই বসবাস করছে। এদের ভরণ-পোষণ করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে। তারপরও মানবিক কারণে বাংলাদেশ এই অনাহুত বোঝা বহন করে চলেছে। তাদের পুনর্বাসনের জন্য আলাদা জায়গাও করার উদ্যোগ নিয়েছে। হাতিয়ার মূল ভূখÐ থেকে পূর্বদিকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এবং নলচিরা ঘাট থেকে পূর্বদিকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে জেগে উঠা ঠেঙ্গারচরে পূনর্বাসনের কথা শোনা যাচ্ছে। এর অর্থ হচ্ছে, বাংলাদেশে অনেকটা স্থায়ীভাবে রোহিঙ্গাদের বসবাসের সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন এবং জীবনযাপনের ব্যয় বহন বাংলাদেশকেই করতে হচ্ছে। এটি নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজের জন্য বিরাট চাপ হয়ে দাঁড়াবে। এর উপর নতুন করে এক লাখ বা তারও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এ পরিস্থিতি সামাল দেয়া বাংলাদেশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে। কেবল বাংলাদেশকে ধন্যবাদ দিয়েই দায় সারলে চলবে না। এ সমস্যার বাস্তব সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমেই রোহিঙ্গাদের উপর চলমান গণহত্যা বন্ধে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে হবে। তারপর কফি আনান কমিশনের প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান এবং তাদের মুক্তভাবে চলাফেরার যে সুপারিশ করা হয়েছে, তার বাস্তবায়নে মিয়ানমারের উপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে যেসব রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে, তাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশে যেসব রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে, তাদের ভরণ-পোষণ ও অন্যান্য সুবিধাদি নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে। মুসলমান দেশগুলোকে আরও সক্রিয় হয়ে রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় একযোগে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। মিয়ানমার যাতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়, এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের উপর যে গণহত্যা চালানো হয়েছে, এ ব্যাপারে একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থা গঠন করা অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে যারা দোষী তাদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার করতে হবে।

 


দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ